নীড় পাতা » ব্রেকিং » ৭৪টি বিদ্যালয়ের উন্নয়ন বরাদ্দের টাকা নয়ছয়ের অভিযোগ

লংগদু

৭৪টি বিদ্যালয়ের উন্নয়ন বরাদ্দের টাকা নয়ছয়ের অভিযোগ

ফাইল ছবি

রাঙামাটির লংগদু উপজেলার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের উন্নয়নের নামে বরাদ্দকৃত টাকা নিয়ে নয়ছয়ের অভিযোগ উঠেছে। ২০১৯-২০২০ অর্থ বছরে উপজেলার বিভিন্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মেরামত, রুটিন মেন্টেইন্স ও স্লিপ খাতের জন্য ৭৬ লাখ ১০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয় সরকার। বরাদ্দের এই টাকা থেকে উৎকোচ দিতে হয়েছে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাসহ অন্যান্য খাতে। অপরদিকে বিদ্যালয়গুলোতে নামমাত্র কাজ করে এমনকি কাজ না করেও শুধুমাত্র কাগজে কলমে ব্যয় দেখিয়ে এই টাকা ভাগবাটোয়ারা করেছেন এসব কাজের সাথে সংশ্লিষ্টরা, এমনটাই অভিযোগ বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটি ও অন্যান্য শিক্ষকদের।

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্র জানা গেছে, উপজেলার ৭৪ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে স্কুল লেভেল ইনপ্রুভমেন্ট প্ল্যান (স্লিপ) খাতে ৩৫ হাজার টাকা করে ১২টি বিদ্যালয়ের জন্য ৪ লাখ ২০ হাজার টাকা, ২৫ হাজার টাকা করে ৬২টি বিদ্যালয়ের জন্য ১৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা। রুটিন মেন্টেইন্স খাতে ৪০ হাজার টাকা করে ৩৬টি বিদ্যালয়ের জন্য ১৪ লাখ ৪০ হাজার টাকা এবং ক্ষুদ্র মেরামতের খাতে ১লাখ ৫০ হাজার টাকা করে ২৮টি বিদ্যালয়ের জন্য ৪২লাখ টাকাসহ সব মিলিয়ে ৭৬ লাখ ১০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয় সরকার। এসব প্রকল্পের কাজের জন্য গত ৩০ জুনের মধ্যেই বিল ভাউচার দিয়ে সব টাকা তুলে নেওয়া হলেও বেশিরভাগ বিদ্যালয়ে কোন কাজই হয়নি বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

সূত্রে আরো জানা যায়, উপজেলা শিক্ষা কমিটির নির্দেশনা রয়েছে এলজিইডি প্রাক্কলন তৈরি করে ১৭ জুনের মধ্যে কাজ শেষ করার। ৫০% কাজ শেষ করার পর সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটির রেজুলেশনসহ বিল ভাউচার করে সংশ্লিষ্ট অফিসে জমা দেবে। এরপর উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিপ্তরের (এলজিইডি) প্রতিনিধি বিদ্যালয়ে গিয়ে পরিদর্শন শেষে কাজের ওপর প্রতিবেদন দেবেন। সেই প্রতিবেদনের ওপর শিক্ষা কর্মকর্তা অথবা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা বিদ্যালয়ে গিয়ে মান যাচাই-বাচাই করে যতটুকু কাজ হয়েছে তার বিল ছাড় দেবেন। কিন্তু এসব নিয়মনীতি তোয়াক্কা না করে শুধু বিল ভাউচার জমা দেওয়া হয়েছে। এখানে বিল ভাউচারে উপজেলা প্রকৌশলীর স্বারক্ষর থাকার কথা থাকলেও তা নেওয়া হয়নি।

এদিকে বিভিন্ন বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সাথে কথা হলে তারা জানায়, মেরামত, রুটিন মেইন্টেন্যান্স ও স্লিপের টাকা পেতে উপজেলা শিক্ষা অফিসে বিভিন্ন খাতের নামে উৎকোচ দিতে হয়েছে।

উপজেলার মাইনীমুখ ইউনিয়নের দক্ষিণ সোনাই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটির সহ-সভাপতি মোঃ ফিরোজ বলেন, ২০১৯-২০ অর্থ বছরে আমাদের বিদ্যালয়ের মেরামত খাতে জন্য ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং স্লিপ বাবদ ৩৫ হাজার টাকাসহ মোট ১ লাখ ৮৫ হাজার টাকা বরাদ্দ পায়। মেরামতের টাকা থেকে ১৫ হাজার টাকা এবং স্লিপের টাকা থেকে ১হাজার ৫শত টাকাসহ মোট ১৬ হাজার ৫শত টাকা উপজেলা শিক্ষা অফিসে উৎকোচ দিতে হয়েছে বলে প্রধান শিক্ষক ও সভাপতি জানিয়েছেন। স্কুলে যতসামান্য কাজ করে বরাদ্দের সিংহভাগ টাকা তাদের পকেটস্থ করা হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক প্রধান শিক্ষক মুঠোফোনে জানান, শিক্ষা কর্মকর্তার নামে উপজেলা শিক্ষা অফিসের অফিস সহকারী সঞ্জয় চাকমা সেই উৎকোচের টাকা তিন কিস্তিতে আদায় করেছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এই অফিস সহকারী সঞ্জয় চাকমা ২৮টি বিদ্যালয়ের মেরামত খাত থেকে তিন কিস্তিতে ১৫ হাজার টাকা করে ৪ লাখ ২০ হাজার টাকা, ৩৬টি বিদ্যালয়ের রুটিন মেরামত খাত থেকে ২ হাজার ৫শত টাকা করে ৯০হাজার টাকা, ৭৪টি বিদ্যালয়ের স্লিপের খাত থেকে ১ হাজার ৫শত টাকা করে ১লাখ ১১হাজার টাকা আদায় করেছে শিক্ষা কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন খাতের নামে।

অভিযোগে আরো জানা গেছে, বদলি হওয়া শিক্ষা কর্মকর্তা, এলজিইডি অফিস, হিসাব রক্ষণ অফিসের নামে বরাদ্দপ্রাপ্ত বিদ্যালয় থেকে সঞ্জয় চাকমা ৬লাখ ২১ হাজার টাকা আদায় করেছেন। পরে শিক্ষা কর্মকর্তা ও শিক্ষকদের মধ্যে একটি প্রভাবশালী শিক্ষক সিন্ডিকেট মিলে অফিস সহকারীর আদায়কৃত উৎকোচের টাকা ভাগবাটোয়ারা করেন।

এই ব্যাপারে উপজেলা শিক্ষা অফিসের অফিস সহকারী সঞ্জয় চাকমার কাছে জানতে চাইলে তিনি জানান, ‘আমার জন্য আমি কিছু নিই নাই। এখানে আমি একা কিছু না। আমাকে নিয়ে লেখালেখি হলে এখানে সবাই বাজবে(ধরা পড়বে), কান টানলে মাথা যেমন আসে তেমনি। তিনি আরো বলেন, জেলা পরিষদে চেয়ারম্যান আমার আত্মীয়, ওপর লেভেলে আমার অনেক আত্মীয় আছে।

লংগদু উপজেলা এলজিইডি’র সহকারী প্রকৌশলী নাদিম হায়দার বলেন, শুনেছি এলজিইডি অফিসের নামে শিক্ষা অফিসের এক অফিস সহকারী টাকা আদায় করেছে। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক। বিদ্যালয়ের নামের বিভিন্ন বরাদ্দের তদারকিতে এলজিইডি বিভাগের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। অথচ তরা আমাদের কোন তদন্ত কাজ ছাড়াই বিল ভাউচার করে টাকা তুলে নিয়েছেন। যা নিয়ম বহির্ভূত কাজ।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন লংগদু উপজেলার সাবেক শিক্ষা কর্মকর্তা আবুল হোসেন। গত জুন মাসের মাঝামাঝি সময়ে তিনি লংগদু উপজেলা থেকে বদলি হয়ে বর্তমানে নেত্রকোনার মদন উপজেলায় দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি বলেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বরাদ্দ থেকে কোন অর্থ ভাগবাটোয়ারা হইছে কিনা আমার জানা নাই। আমি কারও কাছ থেকে কোন উৎকোচ গ্রহণ করিনি। আমি কাউকে আমার জন্য টাকা নিতে বলিনি। আমি বদলি হয়ে চলে আসার পর কি হয়েছে, কিভাবে এসব হয়েছে আমার জানা নেই।

এদিকে এসব বিষয়ে রাঙামাটি জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সাজ্জাদ হোসাইনকে মুঠোফোনে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, আমি সবেমাত্র নতুন যোগদান করেছি। বর্তমানে করোনার জন্য স্কুলগুলো বন্ধ, তাই স্কুল পর্যায় গিয়ে পরিদর্শনও করা যাচ্ছে না। স্কুল চালু হলে অবশ্যই বরাদ্দের কাজের ব্যাপারে তদন্ত হবে।

লংগদু উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মোঃ মনিরুজ্জামান বলেন, বর্তমানে করোনাকালীন সময়ে স্কুল বন্ধ থাকায় মনিটর করা হচ্ছে না। স্কুলের বরাদ্দকৃত টাকার কাজ অবশ্যই করতে হবে। পরিস্থিতি ভালো হলেই সব কিছু তদন্ত করা হবে।

নব যোগদানকৃত উপজেলা শিক্ষা অফিসার মোঃ ইমাম হোসেন জানান, আমি নতুন এসেছি। এখানকার সব কিছু বুঝে উঠতে সময় লাগবে। পরিবেশ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে এসব ব্যাপারে অবশ্যই তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Micro Web Technology

আরো দেখুন

জুরাছড়িতে গুলিতে নিহত কার্বারির ময়নাতদন্ত সম্পন্ন

রাঙামাটির জুরাছড়ি উপজেলায় স্থানীয় এক কার্বারিকে (গ্রামপ্রধান) গুলি করে হত্যা করেছে অজ্ঞাত বন্দুকধারী সন্ত্রাসীরা। রোববার …

Leave a Reply