নীড় পাতা » ব্রেকিং » ২০০১ ব্যাচ বন্ধুদের স্মরণীয় একটি দিন

২০০১ ব্যাচ বন্ধুদের স্মরণীয় একটি দিন

ঘড়ির সময় যখন সন্ধ্যা সাতটা। ঠিক শেষ সময়ে লঞ্চটি গিয়ে ঠেকলো তবলছড়ির ঘাটে। লঞ্চে তখনও সাউন্ড বক্সে চলছিল সেই বিখ্যাত গানটি, মেলা যায় রে, মেলা যায় রে। যে গানের মাধ্যমে শেষ হলো ২০০১ সালের আরেকটি স্মরণীয় দিন, আরেকটি স্মরণীয় মুহূর্ত। প্রিয় গানটি শেষ হওয়ার সাথে সাথে একে-অপরকে জড়িয়ে যখন বিদায় জানাচ্ছিল, নিজেদের অজান্তে চোখের কোণটায় জলে ভিজে উঠলো সকলের। আবার এক বছরের অপেক্ষা। এক বছর পর আবারো দেখা হবে সেই বন্ধুদের, যাদের নিয়ে শৈশবের স্মৃতি গাঁথা হয়েছিল।

দিনটি শুক্রবার। ১০ জানুয়ারি। ২০০১ ব্যাচের বন্ধুদের মিলনমেলার দিন। স্মরণীয় করে রাখার সেই দিনে সকাল আটটা বাজতেই বন্ধুরা মিলিত হলো শহীদ মিনার ঘাট সংলগ্ন উন্নয়ন বোর্ডের ঘাটে। তবলছড়ি থেকে বাকি বন্ধুদের নিয়ে লঞ্চ আসার অপেক্ষা। তবলছড়িতে বন্ধুরা বনভোজনের মালপত্র বোঝাই করে উন্নয়ন বোর্ডের ঘাটে আসার পর সকলের ডাক পড়লো গ্রুপ ছবি নেওয়ার। সোহেল, তারেক, রাজীব, রাসেল সবাইকে ডাক দিলো শহীদ মিনারে গিয়ে বসতে। শহীদ মিনারে সকলেই একসাথে বসে সময়টি স্থিরচিত্রে ধারণ করে নিতে হবে। লঞ্চ থেকে আসা রনি, হেলাল, সালাউদ্দীন, ইসমাইলসহ বাকিরা সকলকে ডেকে শহীদ মিনারে আসার পর একই ফ্রেমে বন্ধুদের ছবি ধারণ করা হলো। ছবি নেয়ার পর এবার কাপ্তাই হ্রদে লঞ্চ ভাসানোর পালা। ‘প্রাণের টানে মিলি বার বার’ এই শ্লোগানে কাপ্তাই হ্রদের বুক চিরে ২০০১ ব্যাচের তরী আস্তে আস্তে এগিয়ে যাচ্ছিল। গন্তব্য কামিলাছড়ির গ্রাম রাইন্যা তুগুনে। যেটি বর্তমানে পর্যটকদের প্রিয় এক স্থান।

রাইন্যা তুগুনে লঞ্চ যখন পৌঁছলো, তখন সকাল প্রায় সাড়ে এগারোটা। সকল বন্ধুরা মিলে সব মালপত্র লঞ্চ থেকে নামানো হলো। বন্ধু সুজন বাহুবলীর মতো প্রায় একশ চেয়ার নিজের কাঁধে করে স্পটের মূল জায়গায় নিয়ে গেলো। একই সাথে বন্ধু ইমু, সোহেল ত্রিপুরাসহ বাকিরাও মালামাল নিয়ে বাবুর্চি জাহাঙ্গীরকে সহায়তা করলো। বাবুর্চি তার ডেসকি-পাতিল নিয়ে যখন ঢুং ঢাং শব্দে ব্যস্ত হয়ে পড়লো, সে সময় বন্ধু রাজীব ও মাসুদ মাইকে ডাক দিলো সব বন্ধুদের এক হতে। যেখানে বন্ধু সম্মিলনের মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে। শুরুতেই জাতীয় সঙ্গীতের মাধ্যমে শুরু হওয়া অনুষ্ঠানে যখন এক এক করে সব বন্ধুদের ডাক পড়ছিলো, তখন মঞ্চে উঠে বন্ধুদের মজার মজার সব স্মৃতি রোমন্থন উপস্থিত সকলকে হাস্যরসে ভরিয়ে দেয়। শুধু বন্ধুরাই না, বন্ধুদের বউরাও যখন মঞ্চে উঠে একে অপরের অনুভূতি, স্মৃতি রোমন্থন করছিল, তখন সকলের অট্টহাস্যে বার বার নীরব প্রকৃতিও সরব হয়ে উঠছিল। নতুন বিয়ে করা ববি(যাকে সকলে পোয়া ববি নামে চিনে) তার বউকে নিয়ে যখন মঞ্চে উঠলো, তখন তাকে বেশ নার্ভাস দেখাচ্ছিল, তবে তাকে নিয়ে বিয়ের পর তার বউয়ের প্রথম দিনের যে অভিজ্ঞতা, সেটা তার বউয়ের মুখে শুনে বেচারা শীতের এই দিনেও বারবার নিজের ঘাম মোছার চেষ্টা করছিল, যা দেখে বাড়তি আনন্দও নিল বন্ধুরা। এমনভাবে এক এক বন্ধু তাদের স্কুল বা ক্যাম্পাসের স্মৃতি রোমন্থন করে যাচ্ছিল। মধ্যাহ্নে জুমার নামাজের জন্য বিরতির পর বাবুর্চির অসাধারণ সব খাবার যখন প্রস্তুত, তখন অনুষ্ঠানের কথা ভুলে গিয়ে সকলেই বসে পড়লো উদর পূর্তিতে। নানান পদের রাজসিক খাবারে উদর পূর্তির পর এবার শুরু হলো বন্ধুর বউদের নিয়ে মজার খেলা বালিশ বদল। বালিশ বদলে প্রথম হয়েছে বন্ধু আদরের বউ। দ্বিতীয় ও তৃতীয় হয়েছে বেলালের বউ ও উত্তমের বউ। ঝুঁড়িতে বল নিক্ষেপ প্রতিযোগিতায় বন্ধু কামরুলের বউ প্রথম, মিজানের বউ দ্বিতীয় ও তারেকের বউ তৃতীয় স্থান লাভ করে। এরপর বাচ্চাদের ড্যান্স প্রতিযোগিতা শেষে বন্ধুদের আত্মরক্ষা ও হাঁড়ি ভাঙ্গা খেলার আয়োজন করা হয়। যেখানে লম্বা লম্বা সাইজের বন্ধুদের হারিয়ে সাইজে সবার ছোট ক্যাশিয়ার বেলাল প্রথম স্থান লাভ করে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় হয়েছে যথাক্রমে ফরিদ ও সুজন সেন। এছাড়া হাঁড়ি ভাঙ্গা খেলায় প্রথম হয়েছে মিজান। দ্বিতীয় ও তৃতীয় হয়েছে শিবলু ও কেনেডি। শেষে র‌্যাফেল ড্র অনুষ্ঠানে প্রথম হয়েছে চারবারের মধ্যে প্রথমবার সস্ত্রীক অংশ নেয়া উত্তম কুমার রায়। আর দ্বিতীয় ও তৃতীয় হয়েছে ইসমাইল ও রিগ্যান। বন্ধু সম্মিলনের আহ্বায়ক রনি, সালাউদ্দিন, নরেশ চাকমা, হেলাল, লেনিন চাকমা, প্রণব চাকমা, বাতায়ন চাকমা, জুয়েল চাকমা, মোর্শেদ ও মিঠুর মাধ্যমে বন্ধু ও বাচ্চাদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ শেষে পৌষের বিকেলে বন্ধু লিটন চাকমা গিটারে চমৎকার সুর তুললো। সেই গিটারে কণ্ঠ দিলেন লিটন চাকমা নিজেই। সাথে সুর মেলালেন খোকন, মাসুদ, দেবাশীষ ও সম্মিলনে যোগ দেওয়া একমাত্র বান্ধবী সুমি।

সূর্য পশ্চিমাকাশে হেলে গিয়েছে অনেক আগেই। কুয়াশায় সূর্যের রশ্মিটুকুও দেখার অবকাশ নেই। এবার ফেরার পালা। আস্তে আস্তে সকল বন্ধু আবারো পথ ধরলো লঞ্চের দিকে। মালপত্র সব ঘুচিয়ে যখন লঞ্চ রাইন্যা তুগুন ছাড়লো তখন সন্ধ্যা প্রায় ছয়টা। পূর্ণিমার আলোতে উদ্ভাসিত এই সন্ধ্যায় পুরো পথটাই আরো বেশি আনন্দে ভরিয়ে দিলো কাপ্তাই হ্রদের ওপর চাঁদের আলোর সেই স্বর্গীয় দৃশ্য। চাঁদের সেই আলোতে বন্ধু পুতুল, নিশু, ইসমাইল, জুয়েল, সুমেধসহ সকল বন্ধুদের নাচে সেই সন্ধ্যাটি আরো মোহনীয় হয়ে উঠলো। বিশেষ করে বাংলা ফিল্মের খলনায়কের স্টাইলে নিশু সাহার নাচ ও নায়ক সালমান খানের স্টাইলে পুতুলের নাচ ছিল সবার চেয়ে আলাদা ও হিমেল সন্ধ্যার কাপ্তাই হ্রদে উপভোগ্য দৃশ্য।

শেষে ‘মেলা যায় রে’ গান দিয়ে ইতি টানা ২০২০ সালের বন্ধু সম্মিলনে আবারো সকলের প্রতিজ্ঞা ২০২১ সালে দুই দশকের পুনর্মিলনীতে সকলেই আবারো স্মরণীয় একটি দিন কাটাবে। টি-টুয়েন্টির ১০ জানুয়ারির চাইতে আরো একটি বিশেষ দিন কাটাবে এমন একটি প্রত্যাশা নিয়ে অন্তরে বন্ধুদের ভালোবাসা ও চোখের কোণে আনন্দাশ্রু নিয়ে বাড়ির দিকে পথ বাড়ালো সব বন্ধু। আবারো অপেক্ষা আরো একটি বছরের।

Micro Web Technology

আরো দেখুন

কর্ণফুলীতে ভেসে উঠল নিখোঁজ মা-ছেলের মরদেহ

রাঙামাটির কাপ্তাইয়ে ইঞ্জিনচালিত নৌকা ডুবির ঘটনায় কর্ণফুলী নদীতে নিখোঁজ মা-ছেলের মরদেহের সন্ধান পাওয়া গেছে। নিখোঁজের …

Leave a Reply