নীড় পাতা » খাগড়াছড়ি » ১২ মাসে ১২ খুন, গুলিবিদ্ধ ১০, অপহৃত ১৪

১২ মাসে ১২ খুন, গুলিবিদ্ধ ১০, অপহৃত ১৪

khg-gateপার্বত্য অঞ্চলে খুন অপহরন বন্দুকযুদ্ধ যেন নিত্যদিনের ঘটনা। পার্বত্য চুক্তির মধ্য দিয়ে পাহাড়ে শান্তি আসার কথা থাকলেও এখনো তা অধরা। আধিপত্য বিস্তার, আভ্যন্তরীন কোন্দল, চাঁদাবাজিসহ নানা কারণে প্রতিদিন ঘটছে ভ্রাতৃঘাতি সংঘাত, বড় হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল। ২০১৪ সালে তিন পার্বত্য জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংঘাতের ঘটনা ঘটে খাগড়াছড়িতে। যেখানে এ বছরে মারা গেছে ১২ জন।

এই হত্যাকান্ডগুলো ছাড়াও পৃথক ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হন ৫ জন। এছাড়াও আরো ৪টি ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হন ৫ জন। আর তিনটি পৃথক ঘটনায় অপহরণের স্বীকার হন ১৪ জন। এদিকে নিহতদের মধ্যে কয়েকজনকে অপহরণের পর হত্যা করা হয়। তবে এই হিসাব বাস্তবতার সাথে অনেক অমিল। প্রশাসন অবগত আছে এমন ঘটনাগুলোই শুধুমাত্র এখানে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য মতে, ২০১৪ সালে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট(ইউপিডিএফ)র ৪ জন, সন্তু লারমা সমর্থিত পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির ২ জন, আওয়ামীলীগের ২ জন এবং ৪ জন সাধারণ মানুষ মারা যান। ৪টি ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হন ৫জন। এরমধ্যে এমএন লারমা ও সন্তু লারমা সমর্থিত জনসংহতি সমিতির ১ জন করে দুই জন এবং সাধারণ মানুষ ৩ জন। আর ৩ ঘটনায় অপহরণে স্বীকার হন ১৪ জন। এরমধ্যে ১টি এমএন লারমার সমর্থিত জনসংহতি সমিতির এবং বাকী দুটি ঘটনায় অপহরণের স্বীকার হন সাধারণ মানুষ।

তবে, ২০১৩ সালের সহিংস ঘটনার অনুপাতে এ বছর তার অর্ধেক ঘটনা ঘটেছে। ২০১৩ সালে মোট ২২টি খুনের ঘটনা ঘটে, গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন ১৩ জন। আর বিভিন্ন সময়ে ১০টি অপহরণের ঘটনা ঘটেছিলো।

১২ মাসে ১২ খুন
৮ জানুয়ারী খাগড়াছড়ির পানছড়ি উপজেলায় লোগাং ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সহ সভাপতি নব রঞ্জন ত্রিপুরা(৪২)কে বাসা থেকে ডেকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ১৯ ফেব্রুয়ারী অপহরণের পর মিন্টু বিকাশ চাকমা (৩৫) ওরফে মিনু চাকমা নামে এক যুবককে গুলি করে হত্যা করা হয়। নিহত মিন্টু বিকাশ চাকমা উপজেলার বাবুছড়া ইউনিয়নের রুকচন্দ্র কার্বারী পাড়ার মৃত দিবাকর চাকমার ছেলে। ১ মার্চ শনিবার একটি জুম ক্ষেতের পাশে তার গুলিবিদ্ধ লাশ পাওয়া যায়।

৯ মার্চ রবিবার দীঘিনালা উপজেলার বাবুছড়া এলাকায় রবিবার সুদৃষ্টি চাকমা(৩৭) নামে এক ইউপিডিএফ সদস্যকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। তিনি বাবুছড়া মগ্যা কার্বারী পাড়া এলাকার মৃত নিতাই চাকমার ছেলে। এই ঘটনায় হৃদ্ধি চাকমা(৩৩) নামে দলটির অন্য এক সদস্য গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। তিনি বাঘাইছড়ি সদরের মৃত শরৎ কার্বারীর ছেলে।

৫ এপ্রিল খাগড়াছড়ি জেলার লক্ষীছড়ি উপজেলার বেলতলি এলাকায় প্রতিপক্ষের গুলিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির(সন্তু গ্রুপ) নারায়ন মারমা(২৫)নামে এক সমর্থক নিহত হয়েছেন। এই ঘটনায় জীতেন চাকমা(২০) নামে এক যুবক আহত হয়েছেন।

১২ এপ্রিল খাগড়াছড়ি সদর উপজেলার ভাইবোন ছড়া ইউনিয়নের বরইতলী এলাকায় সকালে অস্ত্রধারীদের গুলিতে দুই ইউপিডিএফ কর্মী নিহত হয়েছে। নিহতরা হলেন পানছড়ি উপজেলার পানছড়ি গ্রামের মৃত নলমনি চাকমার ছেলে নতুন কুমার চাকমা ওরফে কারণ (৪৮) ও রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ির সাজেক ইউনিয়নের মাচালংর বসন্ত চাকমার ছেলে প্রতুলময় চাকমা ওরফে রকেট(৩০)।

১৯ এপ্রিল লক্ষীছড়ি উপজেলার জর্গাছড়ি নামক এলাকায় সকালে অস্ত্রধারীদের গুলিতে জয়কুমার চাকমা(৪৫) নামে এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। ঘটনায় কল্প রাণী চাকমা(১২) নােেম এক স্কুল ছাত্রী গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। শনিবার সকাল ৯টার দিকে এই ঘটনা ঘটে। এদিকে ঘটনার পরপরি পুলিশ ও সেনা অভিযানে অস্ত্র ও গুলিসহ মঙ্গল চাকমা নামে সন্তু লারমা সমর্থিত জনসংহতি সমিতির এক সদস্যকে আটক করা হয়।

২ জুন রাত সাড়ে ১১টার দিকে জেলার মহালছড়ির দূর্গম বড়ইছড়ি এলাকায় অজ্ঞাত বন্দুকধারীর গুলিতে এক জ্যোতি ময় চাকমা(৩৫) নামে এক ব্যক্তি নিহত হয়েছে। নিহত জ্যোতি চাকমা (৩৫) সিন্দুকছড়ি ইউনিয়নের বড়ইছড়ি গ্রামের মৃত সুর্য কুমার চাকমার ছেলে।

১৮ জুলাই জেলার মানিকছড়ির কুমারী এলাকায় সন্তু লারমা নেতৃত্বাধীন জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) ও ইউপিডিএফ এর মধ্যে বন্দুকযুদ্ধে ১জন নিহত ও আরো ২জন গুলিবিদ্ধ হয়েছে। নিহত ব্যক্তির পরিচয় পাওয়া যায়নি। তবে, ইউপিডিএফ সমর্থক বলে জানা গেছে। অন্যদিকে আহত দু‘জন জনসংহতি সমিতির কর্মী। তারা হলেন, শান্তি চাকমা (২০) ও আনন্দ চাকমা (৩০)।

৫ আগষ্ট দীঘিনালার বাবুছড়ার ইউনিয়নের দূর্গম তালুকদার পাড়ায় আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে চলমান ভ্রাতৃঘাতি সংঘাতের বলি হয়েছেন ৪৬ নং ধনপাতা মৌজার দায়ীত্বপ্রাপ্ত হেডম্যান অজিত তালুকদার (৩৬)। মঙ্গলবার রাত ৮টার দিকে নিজ বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায় একদল সশস্ত্র সন্ত্রাসী। পরের দিন বুধবার সকালে পার্শ্ববর্তি সেগুন বাগান থেকে অজিতের গুলিবিদ্ব লাশ উদ্ধার করে স্বজনরা।

৬ ডিসেম্বর জেলার মানিকছড়িতে দুর্বৃত্তদের হামলায় মানিকছড়ি কলেজিয়েট হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক চিংসামং চৌধুরী নিহত ও জনসংহতি সমিতির মানিকছড়ি উপজেলা সভাপতি মংসাজাই চৌধুরী আহত হন। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ১৬ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম মেডিকেলে মারা যান। রাত পোনে ৮টার দিকে মানিকছড়ি বাজারের রাজপাড়ায় জনসংহতি সমিতি সভাপতি মংসাথোয়াই মারমার নিজ বাড়ীতে ঢুকে অজ্ঞাতনামা দুর্বৃত্তরা এলোপাথারি গুলি এই হতাহতের ঘটনা ঘটে।

৪ ঘটনায় ৫ গুলিবিদ্ধ
২৪ ফেব্রুয়ারী দীঘিনালার বাবু পাড়া এলাকায় সোমবার রাত ৮টায় পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি এমএন লারমা গ্রুপের নিহারু চাকমা(৩৫) নামে এক কর্মী গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। সে সংগঠনটির কালেক্টর বলে জানা গেছে।
১ মার্চ শনিবার সকালে চিগলু চাকমা(২২)নামে এক যুবকের গুলিবিদ্ধ হয়েছে। সে উপজেলার বাবুছড়া ইউনিয়নের দূর্গম জারুলছড়ি এলাকার শুকনাছড়ি গ্রামের শান্তিময় চাকমার ছেলে।

৬ ডিসেম্বর শনিবার জেলার পানছড়ি উপজেলার হলধরপাড়ায় দুর্বৃত্তদের গুলিতে স্বামী-স্ত্রী গুরুতর আহত হয়েছেন। আহতরা হলেন ওই এলাকায় বর্গাচাষী রমজান আলী (৫৫) স্ত্রী আনোয়ারা বেগম (৪০) বসবাস করতেন। রাত ৮টার দিকে একদল অস্ত্রধারী বাড়ীতে ডুকে অতর্কিতভাবে গুলি চালায়।

৬ ডিসেম্বর খাগড়াছড়ির জেলার মাটিরাঙ্গা উপজেলার ধলিয়া ব্রীঝ এলাকায় অজ্ঞাত অস্ত্রধারীদের গুলিতে আশুতোষ চাকমা নামে একজন গুলিবিদ্ধ হয়েছে। তিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি(সন্তু গ্রুপ)র কর্মী। গুলিবিদ্ধ আশুতোষ ত্রিপুরা মাটিরাঙ্গা উপজেলার তপ্তমাষ্টার পাড়ার অন্নশষী ত্রিপুরার ছেলে।

তিন ঘটনায় অপহরণের স্বীকার ১৪ জন
৩ জানুয়ারী খাগড়াছড়ি জেলা সদরের গিরিফুল এলাকা থেকে অপহরণ করার ৫ ঘন্টা পর পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি(এম এন লারমা)র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের স্বতন্ত্র প্রার্থী মৃনাল কান্তি ত্রিপুরার স্ত্রীসহ ৭ জনকে ছেড়ে দিয়েছে অপহরণকারীরা। তাদের মধ্যে ৪ জনের নাম জানা গেছে। তারা হলেন স্বতন্ত্র প্রার্থী মৃনাল কান্তি ত্রিপুরার স্ত্রী পরিনিতা চাকমা, মেনকা চাকমা, অনুতা চাকমা ও রুপালী চাকমা।

৫ মার্চ খাগড়াছড়ি জেলার দূর্গম লক্ষীছড়ি উপজেলার বর্মাছড়ির এলাকা থেকে স্থানীয় হেডম্যানসহ তিনজনকে অপহরণ করেছে দূর্বৃত্তরা। বুধবার সকাল আনুমানিক ৯টার দিকে এই ঘটনা ঘটে বলে জানা গেছে। অপহৃতরা হলেন, বর্মাছড়ি এলাকার হেডম্যান সাথোয়াই প্রু মারমা, বসু মেম্বার ও তুফান চাকমা।

৬ জুলাই মাটিরাঙ্গার ব্যঙ্গমারা নামক এলাকায় নির্মানাধীন একটি ব্রীজের সাইট থেকে অপহৃত ৪ নির্মান শ্রমিক অপহৃত হন। রবিবার রাত আনুমানিক ১১টার দিকে ব্যাঙমারা এলাকায় কয়েক রাউন্ড গুলির শব্দ শোনা যায়। শ্রমিক হলেন বোলড্রোজার চালক ময়মনসিংহের রাজু মিয়া, সহকারী হাসান, এস্কেলেটর চালক মোঃ ফারুক মিয়া, ও নির্মাণ শ্রমিক লিয়াকত আলী। অপহরণের ১১ দিন পর মহালছড়ি উপজেলার পঙ্খীমুড়া এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয়।

ইউপিডিএফের প্রচার ও প্রকাশনা বিভাগের প্রধান নিরন চাকমা জানান, চলতি বছর খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটিতে আমাদের ১৩ জন কর্মী সমর্থককে হত্যা ১০ জন গুলিবিদ্ধ এবং ৪ জনকে অপহরণ করা হয় বলে জানান।

পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সহ তথ্য ও প্রচার সম্পাদক সজীব চাকমার পাঠানো তথ্য মতে খাগড়াছড়িতে চলতি বছর নিজেদের ৩ জন কর্মী সমর্থক খুন, ৭টি অপহরণ এবং ১টি অপহরণের পর হত্যার ঘটনা ঘটেছে। এদিকে এই ঘটনাগুলোর জন্য একে অপরকে দায়ী করেছে সংগঠন দুটি।

পুলিশ সুপার শেখ মোঃ মিজানুর রহমান জানান, প্রতিটি হত্যাকান্ডই হয়েছে আধিপত্য বিস্তার, চাদাঁবাজি, এবং রাজনৈতিক মাঠ দখলের জন্যই। আর এই ঘটনাগুলোতে পুলিশের করার কিছুই থাকেনা। কারণ নিহতের পরিবাররা পুলিশের কাছে কোন অভিযোগ করেনা। এমনকি পুলিশ গেলে কোন তথ্য দিতে চায়না । আর নিহতরা সন্ত্রাস চাদাঁবাজের সাথে সম্পৃক্ত। আর এই সব ঘটনাকে খাগড়াছড়ির আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিন্দু মাত্র অবনতি বলেও মানতে নারাজ তিনি।

Micro Web Technology

আরো দেখুন

ডিপ্লোমা প্রকৌশলী পরিষদের প্রধান উপদেষ্টা হলেন দীপংকর তালুকদার

বঙ্গবন্ধু ডিপ্লোমা প্রকৌশলী পরিষদ রাঙামাটি জেলা শাখার প্রধান উপদেষ্টা হয়েছেন খাদ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী …

Leave a Reply