নীড় পাতা » আলোকিত পাহাড় » হ্রদের বুকে ছোট্ট টিলায় চিরনিদ্রায় এক বীর

হ্রদের বুকে ছোট্ট টিলায় চিরনিদ্রায় এক বীর

Rouf-01পার্বত্য চট্টগ্রামের সবুজ পাহাড়ের পাশেই,কাপ্তাই হ্রদের বুকে জেগে থাকা একটি ছোট্ট টিলায় শুয়ে আছেন বাঙালি জাতির এক মহান সাহসী বীরযোদ্ধা বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ। ১৯৭১ সালের ২০ এপ্রিল এই মহান দেশপ্রেমিক নিজ মাটি আর মাতৃভূমির প্রতি অকৃত্রিম শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় বিলিয়ে দিয়েছেন নিজের জীবন। কি হয়েছিলো সেদিন ? তখন সকাল গড়িয়ে দুপুর নেমেছিল কাপ্তাই হ্রদের বুকে। তখন চিংড়িখাল বরাবর উত্তর-দক্ষিণের হ্রদের ছোট এক টুকরো দ্বীপের উপর প্রতিরক্ষা ব্যূহ তৈরী করে শত্রু পক্ষের গতিবিধি লক্ষ্যে রাখার জন্য মেশিনগানার হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন তৎকালীন অষ্টম ইস্টবেঙ্গল ও ইপিআরের (ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস,বর্তমানে বিডিআর) সদস্য শহীদ ল্যান্স নায়ক মুন্সী আব্দুর রউফ।
এই সময় তীব্র গতিতে এগিয়ে আসছিল পাক হানাদার বাহিনীর দ্বিতীয় কমান্ডো ব্যাটালিয়নের এক কোম্পানীর অধিক সৈনিক, ভারী অস্ত্রসহকারে তিনটি লঞ্চ ও দুটি স্পিড বোট নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের এলাকায় ঢুকে মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থানকে চতুর্দিকে ঘিরে ফেলে। মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থানের উপর মর্টার শেল ও অন্যান্য ভারী অস্ত্র দিয়ে গোলাবষর্ণের ফলে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরক্ষা সম্পূর্ন ভেঙ্গে পড়ে। কিন্তু প্রতিরক্ষা ব্যূহতে দায়িত্বরত ল্যান্সনায়েক মুন্সী আব্দুর রউফ শত্রু পক্ষের প্রবল গোলা বর্ষণের মূখেও মেশিনগান নিয়ে নিজস্ব অবস্থানে স্থির ছিলেন। তিনি তাঁর নিজস্ব অবস্থান থেকে মেশিনগান দিয়ে শত্রুর উপর গোলা বর্ষণ আব্যাহত রেখে সহযোদ্ধাদের সকল সদস্যদের নিরাপদে পশ্চাদপসারনে যাওয়ার নির্দেশ দেন। সহযোদ্ধাদের বাঁচাতে পরিখা থেকে বের হয়ে গুলিবর্ষন অব্যাহত রেখে পাক বাহিনীকে ব্যতিব্যস্ত রাখেন তিনি। মেশিনগান তুলে ধরে অনবরত গুলি ছুড়তে লাগলেন সরাসরি শত্রুর স্পিট বোটগুলোকে লক্ষ্যে করে। তার অসীম সাহস ও দুর্দান্ত মেশিনগানের গুলির আঘাতে শত্রু পক্ষের ২টি লঞ্চ ও একটি স্পিট বোট পানিতে ডুবে যায় এবং দুই প্ল¬াটুন শত্রু সৈন্যের সলিল সমাধি হয়। বাকী দুটি অক্ষত স্পিড বোট এ অবস্থা দেখে দ্রুত পশ্চাদপসারণ করে মুন্সী আব্দরু রউফের মেশিনগানের রেঞ্জের বাইরে নিরাপদ দুরত্বে অবস্থান করে সমগ্র প্রতিরক্ষা ব্যুহ এলাকায় গুলি বর্ষণ শুরু করে। কিন্তু হঠাৎ পাকিস্তান বাহিনীর একটি মর্টারের গোলা তাঁর উপর আঘাত করে এবং তিনি শাহাদাৎ বরণ করেন। শহীদ মুন্সি আব্দুর রউফের আসীম সাহস ও বীরত্বপূর্ন পদক্ষেপের ফলে শত্রু বাহিনী মহালছড়িতে মুক্তিবাহিনীর মূল অবস্থানের দিকে অগ্রসর হতে পারেনি। তিনি তাঁর জীবন উৎসর্গ করে কর্তব্যপরায়নতা ও দেশ প্রেমের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। এজন্য তাঁকে দেয়া হয় বীরত্ব ও দেশ প্রেমের অমর স্বীকৃতি হিসেবে ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ উপাধী।

বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ ১৯৪৩ সালে পহেলা মে ফরিদপুরের বোয়ালমারী থানার সালামতপুরে গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। তারঁ পিতার নাম মুন্সী মেহেদী হোসেন ও মাতার নাম মুকিদুন নেছা। তিনি ১৯৬৩ সালের ৮ মে তৎকালীন ইষ্ট পাকিস্তান রাইফেলস এ সৈনিক পদে যোগদান দান করেন। যার নাম্বার হল ১৩১৮৭। দেশ স্বাধীন হওয়ার দীর্ঘ ২৫ বছর পর শহীদের কবর শনাক্ত হয় রাঙ্গামাটি শহর থেকে ২৫ কিলোমিটার উত্তরে নানিয়ারচর উপজেলার বুড়িঘাট ইউনিয়নের চিংড়িখাল এলাকার একটি ছোট্ট দ্বীপে।
রাঙামাটিবাসী তাই প্রতিনিয়ত শ্রদ্ধায় অবনত হয় এই বীর শহীদের প্রতি। রাঙামাটি শহরের প্রবেশপথেই মানিকছড়িতে নির্মিত হয়েছে এই শহীদের সুবিশাল ভাস্কর্য। বুড়িঘাটে তার সমাধিস্থলটিও এমনভাবে সাজানো,যেনো সবুজ পাহাড় আর হ্রদের বুকে ভাসমান সাদা পদ্ম,রাঙামাটি শহরের শহীদ মিনার চত্বরে আছে একটি স্মারক ম্যূরাল,আছে তার নামে একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান,ক্লাব,সংগঠন। তাইতো পাহাড়ের মানুষের অবিরত ভালোবাসা এই বীরযোদ্ধার জন্য।

Micro Web Technology

আরো দেখুন

স্বাস্থ্য বিভাগকে সুরক্ষা সামগ্রী দিলো রাঙামাটি রেড ক্রিসেন্ট

নভেল করোনাভাইরাসের (কভিড-১৯) সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে রাঙামাটির ১২টি সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য কেন্দ্রসমূহে স্বাস্থ্য …

Leave a Reply