নীড় পাতা » পাহাড়ের সংবাদ » ‘হা—ভাতে’ না ‘হা—মদে’

‘হা—ভাতে’ না ‘হা—মদে’

রাজার ছেলে গ্লাস বাড়িয়ে দিল দ্বিধার সঙ্গে, মুখে স্নিগ্ধ হাসি, চোখে খানিকটা সন্দেহ… ড্রিংক? আমিও হেসে মাথা ঝুঁকিয়ে আদবের সাথে গ্লাসটা হাতে নিলাম। বান্দরবানে…রাজপুণ্যাহ! রাজবাড়ির ওই অনুষ্ঠানে প্রচুর বিদেশি এসেছেন। রাজপুত্র আমাকে যতœ করে বিদেশিদের সাথে বসতে দিয়েছেন রাজবাড়ির ছাদে, শামিয়ানা টাঙানো প্যান্ডেলে। আদিবাসী তরুণ—তরুণীরা আদিবাসী ভাষায় গান ও নাচ পরিবেশন করছেন। আমার পাশে চৌধুরী বাবুল বড়ুয়া (সম্পাদক, সমুজ্জ্বল সুবাতাস)। বাবুলদা বললেন অনুষ্ঠানটা উপভোগ করেন আমিন ভাই। আমি একটু ঘুরে আসি। হঠাৎ পাশে এসে বসল চট্টগ্রামের এক পপশিল্পী। তিনি আমাকে চিনলেন। ঢাকায় কোনো একটা পার্টিতে তিনি নাকি গান গেয়েছিলেন। আমি চেনার চেষ্টা করলাম। চিনতে পারছি না। এই শিল্পীর দিকে রাজপুত্র সদয়ভাবে তাকাচ্ছেনও না। আর শিল্পী সাহেব রাজপুত্রের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করে মরিয়া। আশু লক্ষ্য যদি একটা গ্লাস জুটে যায়! হাভাতে আমি দেখেছি জীবনে, কিন্তু হা—মদে এইমাত্র দেখলাম। বুঝতে পারছি শিল্পী প্রচুর দোচুয়ানি এরই মধ্যে সাবাড় করে বিদেশি পানীয়ের সন্ধানে এখানে চলে এসেছে বনশুকরের মতো উদগ্রীবতাসমেত। আমার বুঝতে বাকি রইল না যে শিল্পীটি এখানে রবাহুত। আমন্ত্রিত নন। শিল্পী আমার সঙ্গে দৃষ্টিগ্রাহ্য খাতির লাগাবার চেষ্টা করছেন। রাজপুত্র কি ভেবে বসেছেন বিনা দাওয়াতিটি আমার সঙ্গী? কে জানে।
একটু পরে মদমত্ত শিল্পী নিজ দায়িত্বে গিয়ে একটা গ্লাস নিলেন। ঢক ঢক করে গ্লাস ভরা গ্লাস পেটে চালান করলেন। এবার তিনি যারপরনাই মাতাল হলেন। মাইক্রোফোন কেড়ে নিলেন অদিবাসী শিল্পীদের হাত থেকে। গাইতে শুরু করলেন হিন্দি গান। রাজপুত্রসহ ভলান্টিয়াররা হতভম্ব। গাইছে অবশ্য খারাপ না। কিন্তু আদিবাসী কণ্ঠের সারল্য নস্যাৎ হয়ে যাচ্ছে, হিন্দি ফিল্মের গান অনুষ্ঠানের গাম্ভীর্যকে গলা টিপে খুন করেছে। আমার পাশের চেয়ার থেকে উঠে গিয়ে তিনি এই অকাজ শুরু করেছেন।
মনে পড়ে গেল পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজস্থলীর ঘটনাটা। চারপাঁচটি পাহাড় ডিঙিয়ে, জোঁকের কামড় খেয়ে আমি ও কয়েকজন রাজস্থলীর আদিবাসী পাড়ায় পৌঁছতে পারলাম সন্ধ্যার পর। সারা পাড়ায় আনন্দের বন্যা। পাড়া প্রধান অনুমতি দিয়েছেন। নাচগান হবে আমাদের ঘিরে। বিরাট একটা পাহাড়ের মাথায় একটা টং ঘরে গিয়ে বসলাম। আদিবাসী নরনারীগণ প্রবল ভালোবাসার সঙ্গে আমাদেরকে স্বাগত জানালেন। বলাবাহুল্য হৃদয়ের আবেগ জ্বাল দিয়ে তারা তৈরি করেছে পানীয়। আমাদের জন্য। সঙ্গে তাদের জন্যও। তর সইছে না আমাদের সঙ্গীদের। তারা যেন মদ খেতেই পাহাড়ে এসেছেন। আমাদের সঙ্গী, যার সাথে আমার সেদিনই পরিচয় হয়েছে, তিনি আবার চট্টগ্রামের গল্পকার; স্বাগতিকদের হাত থেকে যেন ছো মেরে গ্লাস নিয়ে ঢক ঢক করে পেটে চালান করে দিলেন কয়েক গ্লাস আদিবাসী পানীয়! তারপর মাতাল হলেন। শুরু হলো খিস্তিখেউর! কোথায় যেন শুনেছিলাম একটা মানুষ কতটা সভ্য বা অসভ্য বোঝা যায় মদ্যপ হলে। বমি দিয়ে তিনি ভাসিয়ে দিলেন টংঘরটি। নারকীয় এক পরিবেশ সৃষ্টি হলো।
আমি বিষণœতায় কাতর হলাম। আদিবাসী তরুণ—তরুণীরা সমতলের মানুষদের আচরণে বাকরহিত। তারা জানতেন কবি আসছে। কবি না জানি কত মজার। নাচ হবে গান হবে পান হবে। এখন তারা কেবল দেখছেন বমি হচ্ছে। সেদিনও বাবুল বড়ুয়া আমার সঙ্গে ছিলেন। বাবুলদাকে নিয়ে আমি পাহাড়ের একপাশে চোরের মতো পালিয়ে গেলাম।
পাহাড়কে আমি অসম্ভব পছন্দ করি। কারণ পাহাড়ে আমি মেঘের খেলা দেখতে পাই। কত যে রং বদল হয় নিমেষে। আমি আধ্যাত্মিক হই। পাহাড়ে গেলে আমি খানকটা উঁচুও হই! কিন্তু সেদিন খুব নিচু হয়ে গিয়েছিলাম।

Micro Web Technology

আরো দেখুন

লংগদুতে ডেঙ্গু প্রতিরোধে বিএনপি’র প্রচারপত্র বিতরণ

রাঙামাটির লংগদু উপজেলায় ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়া প্রতিরোধে জনসচেতনতামূক প্রচারণা ও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার …

Leave a Reply