নীড় পাতা » খাগড়াছড়ি » স্বীকৃতি চান মহালছড়ির চার শহীদ পরিবার

স্বীকৃতি চান মহালছড়ির চার শহীদ পরিবার

Untitled-1১৯৭১ সাল। খাগড়াছড়ি জেলা সদর থেকে ২৫ কিলোমিটার দুরের মহালছড়িই তখনকার উপজেলা হেডকোয়ার্টার। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে সেই মহালছড়ি থেকেই প্রথম সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তোলেন সেখানকার সাধারণ মানুষ। জেলা সদর, রামগড়, মানিকছড়িসহ বিভিন্ন স্থানে পাক বাহিনীর সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধ সংগঠিত হয়। তবে ২৭ এপ্রিল মহালছড়ি যুদ্ধটি ছিল উল্লেখযোগ্য। চেঙ্গী নদীর ওপার থেকে পাক বাহিনী আক্রমন চালায়। সেদিনই মহালছড়িতেই পাক বাহিনীর সাথে সম্মুখ যুদ্ধেই প্রান হারান ক্যাপ্টেন আফতাবুল কাদের বীর উত্তম।
এরই মধ্যে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে হানাদার প্রতিরোধ সংগ্রাম কমিটি গঠন করা হয়। মুক্তিযোদ্ধোদের আশ্রয় এবং খাবার ব্যবস্থা করেন স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা ও সহযোগিরা। মাইচছড়ি এলাকার চিত্ত রঞ্জন চাকমা ছিলেন হানাদার প্রতিরোধ সংগ্রাম কমিটির সক্রিয় সদস্য। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অর্থ সংগ্রহ, খাদ্য সংগ্রহ ও সংগঠিত করা সব কাজেই তিনি ছিলেন এগিয়ে। আর এটিই চোখে পড়ে রাজাকারদের। তাই রাজাকাররা চিত্ত রঞ্জন চাকমাসহ স্থানীয় পাহাড়ী-বাঙ্গালী মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে নানা কুটকৌশল গ্রহণ করে এবং পাক আর্মিদের কাছে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করে।

মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক প্রধান শিক্ষক মোবারক মাষ্টার জানান, একই রাতে মহালছড়ি বাজারসহ আশাপাশের সব পাহাড়ী ও বাঙ্গালী গ্রাম পুড়িয়ে দেয় পাক হানাদাররা। এছাড়া পাক বাহিনী মহালছড়িতে আশ্রয় নেয়ার পর শুরু হয় নারী নির্যাতন থেকে শুরু করে মানবতা বিরোধী কর্মকান্ড। মহালছড়িতে তৎকালীন সার্কেল অফিসারের বাসায় নারী নির্যাতনসহ পাশবিক নির্যাতন করা হতো। আর সার্কেল অফিসে বসেই পরিকল্পনা করতো পাক বাহিনীর সদস্যরা।

তিনি আরো জানান, অধিকাংশ মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারন মুক্তিকামী মানুষ ভারতে চলে গেলেও থেকে যেতে হয়েছিল চিত্তরঞ্জন চাকমাসহ আরো অনেককে। সেটিই কাল হয়েছিল তাদের। পাক হানাদাররা জেলার মাইচছড়ির নিজবাড়ী থেকে ডেকে নিয়ে মহালছড়ির তেলেনতাংগায় নিয়ে ব্রাশ ফায়ার করে হত্যা করে চিত্তরঞ্জন চাকমাকে। সমসাময়িক সময়ে পাকবাহিনীর হাতে শহীদ হন ইপিআর সদস্য রমনী রঞ্জন চাকমা, গৌরাঙ্গ মোহন দেওয়ান (হেডম্যান), সব্যসাচী চাকমা। স্থানীয় রাজাকার জাকারিয়া এবং জাকির বিহারী, পাকসেনাদের কাছে ১২৩ জনের যে হিটলিষ্ট দিয়েছিল,নিহত এসব পাহাড়ীদের নামও ছিল সেই তালিকায়।
তৎকালীন মহালছড়ি আওয়ামীলীগের সংগঠক মংসাথোয়াই মাষ্টার জানান, ‘আমি সিঙ্গিনালার এক বন্ধুর কাছ থেকে তথ্য পেয়ে ক্যাপ্টেন কাদেরকে খবর পাঠাই যে পাক বাহিনী নানিয়ারচর থেকে মুবাছড়ি হয়ে মহালছড়ি আক্রমন করতে আসছে। দুদিন আগে সে সংবাদটি না পৌঁছালে আরো বড় ধরনের হত্যাযজ্ঞ হতে পারতো। তিনি জানালেন, ১৭ এপ্রিল পাক বাহিনীর দেয়া আগুনে পুড়ে শহীদ হন থলিবাড়ীতে বাঅং মারমা ও রিপ্রুচাই মারমা নামের ২ জন ও সিঙ্গিনালায় অজ্ঞাত এক পাহাড়ীকে গুলি করে হত্যা করা হয়।’

মুক্তিযুদ্ধে শহীদ চিত্ত রঞ্জন চাকমার (কার্বারী) ছেলে খাগড়াছড়ি সরকারী ডিগ্রি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. সুধীন কুমার চাকমা স্মৃতিচারণ করে বলেন, পাকসেনারা মহালছড়ি এলে জাকারিয়া নামের এক বিহারীসহ আরো বেশ ক‘জন এদেশীয় দোসর, মুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীনতার স্বপক্ষের লোক ওপর নির্যাতন শুরু করে। তার সহযোগিতায় আমার বাবাকে ১৩ মে সন্ধ্যায় খাগড়াছড়ি জেলার মহালছড়ি উপজেলার মাইচছড়ি বাজারে নিয়ে যায়। এছাড়াও পাক হানাদাররা গোরাঙ্গ হেডম্যান ও সব্য সাচীসহ কয়েকজনকে ধরে নিয়ে অমানবিক নির্যাতন চালায়। আধামরা অবস্থায় ঐ রাতেই পাক সৈনিকরা আমার বাবাসহ অন্যান্যদের মহালছড়ি সদরে নিয়ে যায়। পরের দিন মহালছড়ি বাজারের উত্তরদিকে তেলেনতাংগা নামক এলাকায় ব্রাশ ফায়ার করে হত্যা করে বলে শুনেছিলাম। বাবার লাশ তো পাই-ই নি, জান নিয়ে বেঁচে গিয়েছিলাম সেদিন।’
তিনি বলেন, ‘স্বীকৃতি বলতে বঙ্গবন্ধু কর্তৃক ২ হাজার টাকার একটি চেক। এরপর আর কোন স্বীকৃতি পাইনি। এ পর্যন্ত জেলা পর্যায়ে নির্মিত মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিসৌধে আমার বাবাসহ অপর ৩ মুক্তিযোদ্ধার নাম স্থান পায়নি। দু’ হাজার সালে মহালছড়ির তৎকালীন ইউএনও বিমল বিশ্বাস মহালছড়িতে একটি স্মৃতিস্তম্ভে বাবার নামটি জায়গা পাওয়াটাই এখন পর্যন্ত বড় স্বীকৃতি। আমার বাবারা দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছে, সেই স্বীকৃতি আমরা চাই। আর কোন চাওয়া পাওয়া নেই।’

সাবেক জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মংসাথোয়াই চৌধুরী বলেছেন, বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামে বাঙ্গালীদের পাশাপাশি পাহাড়ীরাও পিছিয়ে ছিলেন না। যুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহন ছাড়াও তারা নানাভাবে সহযোগিতা দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা রেখেছিলেন। মহালছড়িতেও অনুরূপ ৪জন পাহাড়ী শহীদ হবার কথা শুনেছি। তাদের স্থানীয়ভাবে স্বীকৃতি দেয়া যেতে পারে বলে মন্তব্য করেন।

Micro Web Technology

আরো দেখুন

জনপ্রিয় হচ্ছে ‘তৈলাফাং’ ঝর্ণা

করোনার প্রভাবে দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল খাগড়াছড়ির পর্যটন ও বিনোদনকেন্দ্র। তবে টানা বন্ধের পর এখন খুলেছে …

Leave a Reply