নীড় পাতা » খাগড়াছড়ি » স্বপ্নের বাগান নিজেই কেটে ফেলল চাষি !

স্বপ্নের বাগান নিজেই কেটে ফেলল চাষি !

রক্ত পানি করা শ্রম দিয়ে, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে লালনপালন করা প্রায় ৮ বছরের সাজানো বাগান স্বেচ্ছায় কেটে ফেলেছেন এক কৃষক। অথচ যথাযথ সুযোগ-সুবিধা থাকলে বাগানটি হতে পারতো স্থানীয়ভাবে তেলের চাহিদা মেটানোর অন্যতম উৎস।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার পূর্বাভাস অনুযায়ী বিশ্বব্যাপী পাম তেলের চাহিদা ২০২০ সালে দ্বিগুণ এবং ২০৫০ সালে তিনগুণ হবে। এমন গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সম্ভাবনার পাম বাগান গড়ে তোলা কৃষক পরিবারটির প্রায় আট বছরের শ্রম, অর্থ দুটোই জলে গিয়েছে শুধু আনুষঙ্গিক সুবিধার অভাবে। সাজানো বাগানের গাছ কেটে ফেলার অন্যতম কারণ হচ্ছে, ফল প্রক্রিয়াজতকরণ ও বাজারজাত-বিপননগত সুবিধা করতে না পারা।

পুষ্টি গুণসমৃদ্ধ ভোজ্য তেল হিসেবে এবং বিভিন্ন খাদ্য দ্রব্য প্রস্তুতিতে পাম তেলের বিশেষ উপযোগিতা রয়েছে। পাম গাছের রোগবালাই নেই বললেই চলে। জীবনীশক্তিও অসাধারণ। রোপণের আড়াই থেকে তিন বছরের মধ্যে এই উদ্ভিদ ফল দেয়া শুরু করে এবং ২৫ বছর পর্যন্ত এর ফলন অর্থনৈতিকভাবে উপজীব্য থাকে।

অনেক কষ্টে গড়ে তোলা এমন একটি বাগানের গাছগুলো স্বেচ্ছায় প্রণোদিত হয়ে কেটে ফেলা হতাশ কৃষকের নাম রবীন্দ্র চাকমা। তবে বেঁচে থাকলে আর ভবিষ্যতে উপযুক্ত পরিবেশ পেলে আবারো পাম বাগান গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেন তিনি। সাহায্য চাইলে যে কাউকে প্রশিক্ষণ, পরামর্শ সহযোগিতা করবেন। সুযোগ পেলে সারা দেশে নিজের স্বপ্নকে ছড়িয়ে দিতে চান।

রবীন্দ্র চাকমার (৭০) বাড়ি খাগড়াছড়ি জেলার পানছড়ি উপজেলায়। ২৪৬ নং ছোট পানছড়ি মৌজার বাউরা পাড়া গ্রামে। বাগানের ভেতরেই পরিবার নিয়ে থাকেন। অপ্রচলিত বাগানের পেছনের গল্প জানতে কথা হয় তাঁর সাথে। সঙ্গে ছিলেন রবীন্দ্র চাকমার মেজো ছেলে খাগড়াছড়ি ফায়ার সার্ভিসে কর্মরত বিনোদন চাকমা (৩৯)।

তাঁরা জানান, আমাদের দেশের ভৌগলিক অবস্থান ও জলবায়ু পাম চাষের জন্য উপযোগী। রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, চুয়াডাঙ্গাসহ সারাদেশের বিভিন্ন স্থানে বাণিজ্যিকভাবে পাম চাষ হচ্ছে। নিয়মিত পরিচর্যায় পামের ফলনও ভালো হয়। কিন্তু তারপরও প্রতিনিয়ত চাষিদের পড়তে হয়েছে চরম বিপাকে। ক্রেতা না পাওয়া, তেল উৎপাদনে সমস্যা হওয়াসহ বিভিন্ন কারণে লাখ লাখ টাকার ক্ষতির কারণে হতাশ পাম চাষিরা। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে সহযোগিতা, প্রচার-প্রচারণার অভাব, ফল প্রক্রিয়াজতকরণ, তেল বিপনন-বাজারজাতকরণ সুব্যবস্থা না থাকায়, বাধ্য হয়েই তারা কেটে ফেলছেন বহু সাধনার পাম গাছগুলো। বিসিকের তথাকথিত তেল মিল, চাষী-ভোক্তাদের তেমন কোনো উপকারেই আসেনি। ভালো মানের তেল মিল আর প্রচারণা থাকলে খুব সহজেই স্থানীয় তেলের চাহিদা-বাজার তৈরি করা যেতো বলে তাদের দৃঢ় বিশ্বাস।

লাভজনক না হওয়ায় পাম ফল চাষ বাদ দিয়ে এখন ফলদ বাগানের দিকে ঝুঁকেছেন পাম চাষিদের অনেকেই। রবীন্দ্র চাকমা ও ছেলে বিনোদন চাকমা জানান, ২০১১-১২ সালের দিকে তারা ৪ একর জমিতে ১৯০০টি পাম চারা রোপণ করেন। প্রতিটি প্রায় ৪৫ টাকা করে যার মোট মূল্য ৮২ হাজার টাকা। শ্রমিক, চারা লাগানো, পানি সেচের পাম্প ক্রয়, পরিচর্যা ইত্যাদিসহ এই কয়েকবছরে বিভিন্ন খাতে প্রায় ৬-৭ লাখ টাকা ব্যয় করেছিলেন। তিন বছরের মাথায় পাম গাছে প্রচুর ফল আসলেও, কীভাবে কী করতে হবে তা না জানায় তেমন কিছু করার ছিলো না। নিজে নিজেই ঘরোয়া পদ্ধতিতে কিছু পরিমাণ তেল তৈরি করেছিলেন। ফল ও চারা বিক্রি করেও কিছু অর্থোপার্জন করেন কিন্তু তাতে বাগান খরচও উঠিয়ে নিতে পারেননি। এরমধ্যে ঢাকা থেকে আগত একজন নিজেকে পাম বিশেষজ্ঞ দাবি করে প্রতিটি গাছে দেড় কেজি করে রাসায়নিক সারের মিশ্রণ, ঔষধ, গোবর পানি প্রয়োগের পরামর্শ দেন। তার প্ররোচণায় নিজের ও ছেলেদের টাকা মিলিয়ে বাগানে ২লাখ টাকা ব্যয় করেন। তবে সেই কথিত বিশেষজ্ঞের নামটি মনে করতে পারেননি তিনি।

তাঁরা আরও বলেন, ব্যক্তিগত উদ্যোগে খাগড়াছড়ির অন্যান্য উপজেলায়, পানছড়ি উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ছোট পরিসরে পাম চাষ হচ্ছে। কিন্তু এর বাজার চাহিদা সৃষ্টি, বাজারজাতকরণ বা তেল তৈরিকরণ প্রক্রিয়া কোনটিরই প্রচার, প্রসার ঘটেনি। ফলে ক্ষতির মুখে পড়েন চাষীগণ। সরকারি পর্যায় থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা না পেলে, পাম চাষ থেকে পুরোপুরিভাবে কৃষকগণ মুখ ফিরিয়ে নিবে। এরফলে স্থানীয় ও দেশের তেল খাত আরো বেশি আমদানি নির্ভর হবে এবং ঊর্ধ্বমুখী অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।

স্থানীয় অন্যান্য পাম চাষি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সাথে আলাপচারিতায় জানা যায়, আনুমানিক বিগত ২০০৭-২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে পাম অয়েল তেলের আমদানি নির্ভরতা কমানোর জন্য, দেশে পাম অয়েল গাছ রোপণের ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। এসময় এনজিওসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান পাম গাছের চারা বাজারজাত করে। শুধু তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে নয়, তার আগেও অনেকে শখের বশে পাম অয়েলের গাছ রোপণ করেছেন। বিশেষ উদ্যোগ ও প্রচার পায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে।

পাম তেল আন্তর্জাতিক মানের উন্নতমানের উদ্ভিজ ভোজ্য তেল হিসেবে পরিগণিত। পাম তেল কোলেস্টেরল মুক্ত এবং সহজপাচ্য। দেহে সহজে শোষিত হয় ও শক্তির উৎস হিসেবে কাজ করে। পাম তেলে বিদ্যমান অনন্য উপাদানের জন্য পাম তেল পুষ্টিতে ভরপুর এবং এর ব্যবহারও বহুমুখী। ব্রিটেনের শিল্প বিপ্লবের সময় যন্ত্রপাতির জন্য পিচ্ছিলকারক (লুব্রিকেন্ট) হিসাবে পাম তেল ব্যবহার করা হতো।

পাম তেল পাওয়া যায় পাম ফল থেকে। আর পাম ফল যে গাছে ফলে তার সাধারণ নাম হল “অয়েল পাম” আর বৈজ্ঞানিক নাম হল “এলিইস গিনিনসিস”। অয়েল পাম একটি বহুবর্ষজীবী উদ্ভিদ।সয়াবীন, পাম, সরিষা, সূর্যমূখী, বাদাম, কর্ণ প্রভৃতি প্রতিটি ভোজ্য তেলই স্বাস্থ্যপ্রদ ও পুষ্টি প্রদানকারী তেল। তবে এ’গুলোর মধ্যে পুষ্টির দিক দিয়ে পাম তেল অনন্য বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। বিদ্যমান ভিটামিন ‘ই’ এবং ক্যারোটিনয়েড পাম তেল অনন্য পুষ্টি গুণে সমৃদ্ধ।

পাম ফল হলে, কীভাবে ফল থেকে তেল পাওয়া যাবে সে ব্যাপারে তেমন কোন তথ্য মানুষজন জানতো না। বলা হতো, ‘যদি কোন পরিবারে মাত্র ৪টা গাছ থাকে, তাহলে সেই গাছ থেকে ০৪ জনের একটা পরিবারের সারা বছরের খাবার তেলের সংস্থান হয়ে যাবে’ এমনটা বলেই মানুষকে উৎসাহিত করা হয়েছিল।

পাম চাষে আগ্রহী হওয়া ও চারা সংগ্রহ সম্পর্কে রবীন্দ্র চাকমা বলেন, তৎকালীন জেলা প্রশাসনের প্রচারণার মাধ্যমে তিনি পাম ওয়েল সম্পর্কে জেনেছিলেন। গ্রামের কাছের ভাইবোনছড়া বাজারে বেড়াতে আসা জনৈক আব্দুল জলিলের মাধ্যমে সুদূর নাটোর থেকে চারা কিনেছিলেন। সাপ্তাহিক হাটবারে বাজারে পরিচয় হয় জলিলের সাথে। জলিলের বাড়ি নাটোর-এ।

পিতা-পুত্র আরও জানালেন, নিয়মিত যত্ন ও সঠিক পরিচর্যায় প্রায় সারা বছরই পাম গাছে ফল ধরে। তবে প্রধানত বর্ষাকালে ফল পরিপক্ক হয়! একটি গাছ থেকে ২০ কেজির অধিক ফল পাওয়া যায়। আব্দুল জলিলের অসত্য পরামর্শও তাদের ক্ষতি করেছে। সে ৯ হাত বা প্রায় ১৪-১৫ ফুট দূরত্বে চারা লাগাতে বললেও, বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায় এর ডালপালা প্রায় ৪০ ফুট ছড়ায়। ১৫ ফুটে চারা কাছাকাছি করে লাগালে চারা বৃদ্ধি ও ফলন কমে যায় কিন্তু খরচ বেড়ে যায়। বেশি চারা বিক্রির লোভেই মূলত চারা থেকে চারার দূরত্বে, মিথ্যার আশ্রয় নেন জলিল। এছাড়া পূর্বভিজ্ঞতা, পরিচর্যায় দক্ষতা না থাকলে অথবা উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ছাড়া পাম চাষে ভালো করা সম্ভব নয় বলেও তাঁদের অভিমত।

রবীন্দ্র চাকমার পাম বাগান’র স্থানীয় চা-এর দোকানে অনতিদূরে দেখা হয় বেসরকারি সংস্থা জাবারাং কল্যাণ সমিতিতে কর্মরত উন্নয়ন কর্মী রুমেল মার্মা ও ২৪৬নং ছোট পানছড়ি মৌজার হেডম্যান জগদীশ রোয়াজার সাথে। তাঁরা পাম বাগানি পরিবারের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করে বলেন, ‘একদিকে পাম আমাদের দেশে অপ্রচলিত ফসল। অধিক পানি শোষণ করে বলে পাহাড়ি এলাকার জন্য এটি তেমন উপযুক্ত নয়। অন্যদিকে প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা নেই, ভোক্তা কম। এরচেয়ে বরং মিশ্র ফলদ বাগান করা অধিক লাভজনক।’

পানছড়ি উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগে কর্মরত উপসহকারী উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা অরুনাংকর চাকমা বলেন, ‘২০১২-১৩ সালের দিকে খাগড়াছড়ি জেলায় ব্যাপকভাবে পাম চাষের দিকে কৃষকরা কে বা কাদের মাধ্যমে উদ্ধুদ্ধ হয়। ঠিক তেমনিভাবে পানছড়িতেও অনেক কৃষক পাম চাষ শুরু করে। তিন-চার বছর পর যখন ফলন আসা শুরু হয়, তখন কৃষকরা মহাসংকটের সম্মুখীন হয়। কারণ পাম বীজ থেকে তেল উৎপাদনের জন্য কোনো প্রক্রিয়া তাদের জানা ছিলো না। উৎপাদন ব্যাপক না হওয়াতে সরকারি এবং বেসকারিভাবেও পাম বীজ থেকে তেল উৎপাদনের জন্য তেমন কোন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। তাছাড়া স্থানীয় বাজারে পাম অয়েলের চাহিদাও কম। ফলে পাম চাষি বিনোদন চাকমার মতো গুটিকয়েক পাম চাষি বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হন। বর্তমানে তারা অনেকটা নিরুপায় হয়ে কৃষি বিভাগের পরামর্শ মোতাবেক পাম গাছ ছাটাই করে, আম এবং মাল্টা চাষ শুরু করেছেন। রবীন্দ্র-বিনোদন চাকমার কর্তনকৃত পাম বাগানে বর্তমানে খাগড়াছড়ি হর্টিকালচার সেন্টার কর্তৃক স্থাপিত, বছরব্যাপী ফল উৎপাদন প্রকল্পের বিভিন্ন ফলদ চারা রোপণ করা হয়েছে। যা দেখে বিনোদন চাকমাদের নতুন আশার সঞ্চার হচ্ছে।’

Micro Web Technology

আরো দেখুন

বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নির্মাণে বিরোধীতার প্রতিবাদ রাঙামাটিতে

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য নির্মাণে বিরোধীতার নামে ‘উগ্রমৌলবাদ ও ধর্মান্ধগোষ্ঠীর জনমনে বিভ্রান্তির …

Leave a Reply