নীড় পাতা » পাহাড়ের সংবাদ » ‘সাধু..সাধু..সাধু..’ ধ্বনির মুখরতায় শেষ হলো কঠিন চীবর দান

‘সাধু..সাধু..সাধু..’ ধ্বনির মুখরতায় শেষ হলো কঠিন চীবর দান

chibor-03রাঙামাটি রাজবনবিহারে লাখো পুণ্যার্থীর অংশগ্রহনে শেষ হলো দুইদিনব্যাপী ৪১ তম কঠিন চীবর দান উৎসব। এই উৎসবকে ঘিরে গত দুইদিন রাঙামাটি শহর ছিলো যেনো উৎসবের নগরী, এই ধর্মীয় উৎসব পরিণত হয়েছিলো পাহাড়ী-বাঙ্গালীর মিলন মেলা। রাঙামাটি রাজবনবিহারের আবাসিক প্রধান শ্রীমৎ প্রজ্ঞালংকর মহাস্থবির এর দেশনার মাধ্যমে চীবর দান উৎসবের সমাপ্তি ঘটে।

শুক্রবার দুপুর ১২ টা থেকে রাজবন বিহারের মাঠের বিশাল এলাকাজুড়ে শুরু হওয়া বর্ণাঢ্য বস্ত্র ও কল্পতরু শোভাযাত্রা মুহুর্মুহু আনন্দ ধ্বনি এবং উৎসবের জোয়ার প্রকম্পিত করে। ভোর থেকেই বিহার চত্বরে জড়ো হতে থাকেন পুন্যার্থীরা। এসময় হাজারো মানুষের পদভারে মুখরিত হয়ে উঠে রাজববিহারের বিশাল এলাকা।
প্রয়াত বনভান্তের শিষ্যবর্গ ও অনুত্তর ভিক্ষু-সংঘ অনুষ্ঠান মঞ্চে উপস্থিত হলে ভক্তদের ‘সাধু..সাধু..সাধু…’ কন্ঠধ্বনিতে সমগ্র আশপাশ এলাকা প্রকম্পিত হয়ে ওঠে। বেলা আড়াইটায় দানযজ্ঞের প্রথম পর্বে অনুষ্ঠিত হয় ভক্তদের পঞ্চশীল গ্রহণ। পরে পর্যায়ক্রমে অনুষ্ঠিত হয় সংঘদান, অষ্ট পরিস্কার দান, বুদ্ধমুর্তি দান, ২৪ ঘন্টার মধ্যে তৈরী পূণ্যার্থীদের কঠিন চীবর দান উৎসর্গ। chibor-02

বিকেলে সমবেত পুন্যার্থীদের উদ্দেশ্যে ধর্মীয় দেশনা দেন বৌদ্ধধর্মীয় অন্যতম গুরু মহামতি বনভান্তের প্রধান শিষ্য শ্রী প্রজ্ঞালংকর মহাস্থবির। এসময় উপস্থিত ছিলেন-, চাকমা সার্কেল চীফ রাজা ব্যারিষ্টার দেবাশীষ রায়,নতুন চাকমা রানী ইয়ান ইয়ান,রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান নিখিল কুমার চাকমা, জেলা প্রশাসক মোস্তফা কামাল, পুলিশ সুপার আমেনা বেগম,অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবুল কালাম আযাদ,সাবেক রাষ্ট্রদুত মেজর জেনারেল (অব.) অনুপ চাকমা,রাজবন বিহার উপাসক-উপাসিকা পরিষদের কর্মকর্তাসহ পাহাড়ের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ ।

৩০ অক্টোবর বৃহস্পতিবার বিকাল ৩টায় সুতা কাটা থেকে বুনন শুরু করে চীবর তৈরি শেষে ৩১ আক্টোবর শুক্রবার বিকাল ২টা ৫০ মিনিটে চাকমা রাজা ব্যারিষ্টার দেবাশীষ রায় বৌদ্ধ ধর্মালম্বীদের রাজবনবিহারের আবাসিক প্রধান শ্রী প্রজ্ঞালংকর মহাস্থবিরকে চীবর উৎসর্গ করার মাধ্যমে দান কার্য সম্পাদন করে। এরপর আনুষ্ঠানিকভাবে চীবর দান অনুষ্ঠান শুরু হয়। অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্য প্রদানকালে রাজা ব্যারিষ্টার দেবাশীষ রায় বলেন, এ কঠিন চীবর দানের মধ্য দিয়ে শান্তির প্রতি শ্রদ্ধা ও গভীরতা বৃদ্ধি পায় এবং সকলেই সংকল্পবদ্ধ হয়ে সকল প্রকারের হানাহানি ও হিংসার অবসানের মধ্য দিয়ে যাতে এ অঞ্চলে ও সারাদেশে সত্যিকার অর্থে জনমূখী ও পরিবেশমূখী উন্নতি আনতে পারি সে লক্ষ্যে কাজ করতে পারি। এই কঠিন চীবর দানের মধ্য দিয়ে এ অঞ্চলের জুম চাষের প্রথার মাধ্যমে জুমের যে তুলা রয়েছে তা থেকে সুতা তৈরী করে চীবর তৈরী হয় থাকে এতে আমাদের বৌদ্ধ ধর্মীয় কৃষ্টি সংরক্ষন হচ্ছে অন্য দিকে পার্বত্য এলাকার জুমিয়াদের কৃষ্টিও সংরক্ষন হচ্ছে। তিনি বলেন,নারী-পুরুষ সকরে মিলে আমাদেরকে একসাথে কাজ করতে হবে। দেশের সকল ক্ষেত্রে পুরুষের পাশাপাশি নারী ভুমিকা অনস্বীকার্য। এদিকে, রাজা দেবাশীষ রায় ভারতের মাহারাষ্ট্র থেকে আগত ১৪০ জন উপাসক-উপাসিকাকে রাজবনবিহারের কঠিন চীবর দানে অনুষ্ঠানে উপস্থিত হওয়ায় ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন।chibor-01

অনুষ্টানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য প্রদানকালে পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান নিখিল কুমার চাকমা বলেন, বনভান্তে নেই তা আমাদের মনে হয় না। শ্রদ্ধেয় বনভন্তের বদৌলতে তার এই অনবদ্য কর্মযজ্ঞ আমাদের সকলের মাঝে প্রেরনা যুগিয়েছে। আমরা সকলে মৈত্রীর বন্ধনে আবদ্ধ হতে চাই। সমাজের মধ্যে যে অহিংসা হানাহানি কুসংস্কার চলছে তা সকলকে বন্ধ করতে হবে। চিত্তকে পরিশুদ্ধ করার জন্য এবং এবং ধর্মীয় সুধা পান করার জন্য সকলকে একে অপরের প্রতি সহনশীল মনোভাব গড়ে তুলতে হবে।

অনুষ্ঠানে অন্যান্যর মধ্যে বক্তব্য রাখেন, রাজবন বিহার উপাসক উপাসিকা পরিষদের সিনিয়র সহ-সভাপতি গৌতম দেওয়ান,সহ-সাধারন সম্পাদক অং থোয়াই মারমা, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শুভেচ্ছাবাণী প্রদান করেন পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান নিখিল কুমার চাকমা,বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শুভেচ্ছা বাণী প্রদান করেন জেলা বিএনপির সভাপতি এডভোকেট দীপেন দেওয়ান।chibor-04

প্রসঙ্গত,আজ থেকে আড়াই হাজার বছর পূর্বে ভগবান গৌতম বুদ্ধের উপাসক বিশাখা ২৪ ঘন্টার মধ্যে তুলা থেকে সুতা কেটে বৌদ্ধ পুরোহিতদের ব্যবহার্য চীবর (বস্ত্র) তৈরি করে দানকার্য সম্পাদন করার পদ্ধতিতে এ কঠিন চীবর দান প্রবর্তন করেন। প্রত্যেক বছর বৌদ্ধ ভিক্ষুদের বর্ষাবাস শেষে আশ্বিনী পূর্ণিমা বা প্রবারণা পূর্ণিমায় বৌদ্ধরা এই মহাপূন্যানুষ্ঠান কঠিন চীবর দানোৎসব পালন করে। প্রতি বছরের ন্যায় এবছরও কঠিন চীবর দান অনুষ্ঠানে দেশ-বিদেশ থেকে হাজার হাজার ভক্ত অনুরাগী অংশ নেন। রাজবন বিহারে ১৯৭৪ সালে এক স্বর্গীয় অনুভূতিতে বনভান্তে বিশাখা প্রবর্তিত নিয়মে সর্বপ্রথম কঠিন চীবর দান প্রচলন করেন। এর আগে রাঙামাটি জেলার তিনটিলা বৌদ্ধ বিহারের ১৯৭৩ সালে এই কঠিন চীবর দান করা হয়। বিশাখা প্রবর্তিত নিয়মে আড়াই হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী কঠিন চীবর দান ২৪ ঘন্টার মধ্যে সুতা থেকে কাপড় তৈরি করে একমাত্র পার্বত্য চট্টগ্রামে বনভান্তের অনুসারী বৌদ্ধ সম্প্রদায় সম্পাদন করে। chibor-05

দুইদিনের কঠিন চীবর দান উপলক্ষ্যে তিন পার্বত্য জেলাসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আগত অগণিত পুণ্যার্থী ও দর্শণার্থীর ভিড়ে যেনো উৎসবস্থলে পরিণত হয় রাজবন বিহারের বিশাল এলাকা। পুলিশ প্রশাসনের কড়া নিরাপত্তা বেষ্টনীতে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের এ বিশাল মহাসমাবেশ সৌহার্দ্য সম্প্রীতি ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে। শুক্রবার সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত হয় সার্বজনিন প্রদীপ পূজা। সন্ধ্যায় সার্বজনীন প্রদীপ পূজার মধ্য দিয়ে শেষ হয় উৎসবের বর্নাঢ্য সব আয়োজনের। chibor-06

Micro Web Technology

আরো দেখুন

বান্দরবানে ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে ধর্ষণ মামলা

বান্দরবানের লামা উপজেলার রুপসীপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাচিং প্রু মারমার বিরুদ্ধে ধর্ষণ মামলা দায়ের করা …

Leave a Reply