সাজেক: প্রত্যাশার বিপরীতে প্রতিবন্ধকতা

Morning-at-Sajek-Valleyইংরেজিতে Precious বলে একটা শব্দ আছে। যেটাকে খাঁটি বাংলায় ‘যক্ষের ধন’ বলা চলে। হলিউডের বিখ্যাত চলচ্চিত্র দ্য লর্ড অব দ্য রিংস-এ গলাম নামের একটি চরিত্র আছে। তার কাছেই থাকে সেই রিং বা আংটি। গলামের কাছে সেটিই হলো Precious! যক্ষের ধনের মতো সেই আংটিকে সবসময় আগলে রাখতো গলাম। তবে একটা সময় আংটিটি হারিয়ে যায়। সেটি আবার গলাম পায় বটে। কিন্তু ততক্ষণে গলাম চলে যায় সব অনুভূতির উর্ধ্বে।
ইদে পাহাড়ে এসে হঠাতই ঘুরতে গেলাম সাজেকে। এর আগে যখন সাজেকের এত নাম-যশ ছিল না, তখনও একবার গিয়েছিলাম ভিন্ন কারণে। কিন্তু এবারের উদ্দেশ্য ছিল সম্পূর্ন নির্দোষ – স্রেফ পর্যটন। এক পর্যায়ে সাজেক গিয়ে পৌঁছালাম। এক কথায় দারুণ! প্রকৃতি আর মানুষের যত্নের মিশেল। পুরো পাহাড়ে এমন বুনো সৌন্দর্য আর কখনও দেখিনি। সাজেক থেকে ফেরার পর প্রিয় একজন শিক্ষককে ক্ষুদেবার্তা পাঠালাম সাজেক ঘুরে যাবার জন্য। ফিরতি বার্তায় তিনি জানালেন, তিনি অধীর আগ্রহে সাজেক দেখার জন্য অপেক্ষা করছেন। আমিও প্রত্যুত্তরে বললাম, দেরি হবার আগেই সাজেক অবলোকন করা উচিৎ। তার মানে কি কোনো বিপদ অপেক্ষা করছে সাজেকের জন্য? দেরি হয়ে যাবার আগে – এর অর্থ কী? আমার কাছে মনে হয়েছে সাজেকের মাঝে প্রকৃতির এক নিষ্পাপ ছোঁয়া আছে। কিন্তু পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে জানি, মানুষের পায়ের ছাপ যখন প্রকৃতিতে পড়ে, তখন থেকেই যেন একটা দূষণের জন্ম নেয়। সে দূষণ থেকে প্রকৃতি নিস্তার পাবার আগেই, আরও মানুষ এসে হাজির হয়। সাজেক পাহাড়ের জন্য সেই Precious বা যক্ষের ধন। খুব শিগগিরই আরেক সাজেক উপত্যকা আবিষ্কৃত হবে না পাহাড়ে। তাই সাজেককে টিকিয়ে রাখার জন্য মানবসৃষ্ট দূষণ এড়ানো খুব জরুরী।
খাগড়াছড়ি থেকে দীঘিনালা হয়ে সাজেক যাবার পথে দু’টি ঝরনা আছে। তৈদুছড়া আর হাজাছড়া। আজ থেকে প্রায় ৭-৮ বছর আগে ঘুরতে গিয়েছিলাম তৈদুছড়ার ওদিকটায়। তখনও এ ঝরনার কথা খুব কম মানুষই জানতো। আমাদের দলেরও কেউ জানতো না। বলতে গেলে ভুল পথে হাটতে গিয়েই হঠাত ঝোপঝাড় পেরিয়ে এক পাথুরে সরু জলপথ আবিষ্কার করি! দেখলাম, চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ছোটবড় বহু পাথর। আর তার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে নিষ্কলুষ স্বচ্ছ জল। মুগ্ধ হবার তখনও বাকি। কিছুদূর সামনে গিয়ে শুনতে পাই শব্দ। এগিয়ে গিয়ে দেখি বিশাল এক ঝরনা! বিষয়টা খুব অদ্ভুদ! আমরা রীতিমত বিস্ময়ে আভিভূত! চারদিকটা এত সুন্দর ছিল বলে ব্যাখ্যা করা যাবে না। আশেপাশে মানববসতির কোনো চিহ্ন নেই। বুনো প্রাচীন এক পাহাড়ি জঙ্গলে আপনি ঝরনা আবিষ্কার করলেন- বিষয়টা কতটা অদ্ভুদ একবার চিন্তা করে দেখুন।
এর কয়েকমাস পর আমাদের আরেকটা দল সেখানে বনভোজনের পরিকল্পনা করে। পরিকল্পনা মোতাবেক রান্না করার সামগ্রী নিয়ে গেলাম সেখানে। প্রথমে রান্না, এরপর খাওয়া-দাওয়া, জলস্নান, অতঃপর ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফেরা। আরও ২-৩ বছর পর আবার গেলাম তৈদুছড়ায়। এবার অবশ্য নতুন এই ঝরনার গল্প স্থানীয় লোকালয় ছাড়িয়ে দেশের মানুষও কমবেশি জানতে পেরেছে। সেবার ঝরনাটায় গিয়ে আহত হলাম। চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অজস্র প্লাস্টিকের বোতল, ময়লা-আবর্জনা, উচ্ছিষ্ট, ইত্যাদি। পাথুরে সৌন্দর্য আর অবশিষ্ট নেই। প্রকৃতি যেভাবে পাথরগুলোকে থরেথরে সাজিয়ে রেখেছিল, সেই অবস্থা যেন অতীত। স্বচ্ছ পানি নোংরা হয়েছে। বহু মানুষের আনাগোনা চারপাশে। এভাবেই ধীরে ধীরে ধ্বংস হয়েছে একটি সম্ভাবনা। হাজাছড়ার ঝরনা দেখতে গেলাম কয়েকদিন আগে। একই অবস্থা সেখানেও। বর্ষা থাকায় প্রকৃতি কিছুটা দাপট দেখাচ্ছে। কিন্তু মানুষের পায়ের আঘাতে পিষ্ট যেন চারপাশ।
সাজেক সেই তুলনায় কিছুটা ভালো আছে। সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার দরুন এখনও প্রাকৃতিক বিশুদ্ধতা মানব স্থাপনার মাঝেও ভালো আছে। প্রতিদিন যে পরিমাণ মানুষ সেখানে যায়, তা আশা জাগানিয়া বটে। কিন্তু তাদের ফেলে আসা আবর্জনা পড়ে থাকে রাস্তার পাশে কিংবা পাহাড়ি খাদে। সেসবেরও সঠিক ব্যবস্থাপনা জরুরী।
সাজেকের সঙ্গে সেনাবাহিনীর অন্যান্য পর্যটন প্রচেষ্টার একটা পার্থক্য আছে। সেটি হলো, এখানে পুরো প্রচেষ্টায় স্থানীয়দের অংশগ্রহণ কার্যকরভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে। তারাও এখন সম্ভাবনা দেখছে। আমি কথা বলেছি কয়েকজন স্থানীয় ত্রিপুরা, লুসাই ও পাঙ্খোয়ার সঙ্গে। অনেকে দোকান দিয়েছে, অনেকে হোটেল। কেউবা আবার থাকার ব্যবস্থা বানিয়েছে পর্যটকদের জন্য। আমাদের যাদের হাজার হাজার টাকা ব্যায়ে সেনাবাহিনীর রিসোর্টে থাকার সামর্থ্য নেই, তাদের জন্য স্থানীয় আবাসিক হোটেলগুলোই ভরসা। মোটামুটি সবাই বিষয়টা নিয়ে খুশি। এছাড়া সরকারী বিদ্যালয়ের বিষয়টিও ইতিবাচক। আমি লুসাই শিশুদের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা স্কুলে যায়। কিন্তু আমি জানি, তাদের জন্য যে সমস্ত কোটা বরাদ্দ থাকে দেশের উচ্চ শিক্ষায়, তা তারা পাবে না। অথচ, পাহাড়ের যদি কেউ শিক্ষায় বা চাকরিতে বিশেষ কোনো সুবিধা বা প্রিভিলেজ প্রাপ্য হয়ে থাকে, তাহলে সর্বপ্রথম নাম আসবে এসব লুসাই বা পাঙ্খোয়াদের। অথচ, তারাই এসব পায় না। তাদের দেখিয়ে কত কোটি কোটি টাকা কতজন মেরে দেয়, সে খবর হয়তো তাদের জানাও নেই। রাষ্ট্র তাদের প্রাপ্য হিস্যা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে। তাদের হিস্যা আজ অন্য অনেকে সুবিধাবাজদের দখলে। কিন্তু আমি এ-ও জানি, একদিন তারা জাগবে। তাদের নায্য হিস্যা দাবি করবে। সেদিন রাষ্ট্র ও সুবিধাবাদীরা জবাব দিতে পারলেই হয়।
তবে এদের সবারই এক জায়গায় মিল। তাদের প্রত্যেককেই ‘ভিতর পার্টি’কে কিছু না কিছু দিতে হয়। অথচ এই ‘ভিতর পার্টি’ কিন্তু তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেনি। সাজেকে পৌঁছে আমরা প্রথমেই যেতে চেয়েছিলাম ‘কমলাক’-এ। সেখানে গেলে আরও স্থানীয় অধিবাসীর দেখা মিলতো। এছাড়া চূড়া থেকে মেঘের চলাচল উপভোগ করা যায় আরও কোমলভাবে। কিন্তু কিছুদূর গিয়েই ফিরে এলাম। বলা হলো, ‘ভিতর পার্টি’ আসবে, সেজন্য ওখানে এখন যাওয়া যাবে না! আমি আশ্চর্য্য হইনি। কারণ, আমার খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু একবার কমলাকে গিয়ে একই ধরণের পরিস্থিতিতে পড়েছিল। স্থানীয় দোকানে বসে সবাই যখন ডাব খাচ্ছে, তখনই অস্ত্র হাতে ১০-১২ জন ‘ভিতর পার্টি’র আগমন। তবে স্পটে উপস্থিত ছিল বিজিবি সদস্যরা। তাদের দেখে ১০-১২ জনের ওই দলটা অস্ত্র লুকিয়ে কার্ড খেলতে বসে গেল। বিজিবি সদস্যরাও হয়তো কিছু বুঝতে পেরেছে। তাই বিব্রতকর পরিস্থিতি এড়াতে তারা সরে গেল সেখান থেকে।
এসব অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। পর্যটন স্পটে এই ধরণের ‘ভিতর পার্টি’র আবির্ভাব ভালো কিছুর ইঙ্গিত দেয় না। এসব বরং নেতিবাচক। এছাড়া একটি নিরাপত্তা স্থাপনার পাশে তাদের আনাগোনা কী করে থাকে, তা-ও প্রশ্নের জন্ম দেয়। এ সমস্ত প্রতিকূলতা এড়িয়ে সাজেক হয়ে উঠুক নীলগিরি বা নীলাচলের মতো কিংবা তার চেয়েও বেশি সফল। তবে অক্ষুণ্ণ থাকুক সাজেকের প্রাকৃতিক বিশুদ্ধতা। সব কিছুতে অংশগ্রহণ থাকুক স্থানীয়দেরও। এই প্রত্যাশা রাখি।

লেখক: সাংবাদিক।

[লেখায় প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব ]

Micro Web Technology

আরো দেখুন

কারাতে ফেডারেশনের ব্ল্যাক বেল্ট প্রাপ্তদের সংবর্ধনা

বাংলাদেশ কারাতে ফেডারেশন হতে ২০২১ সালে ব্ল্যাক বেল্ট বিজয়ী রাঙামাটির কারাতে খেলোয়াড়দের সংবধর্না দিয়েছে রাঙামাটি …

Leave a Reply