সাজেকের স্বপ্ন ও কাপড় বোনা

সাহিত্যিক বিপ্রদাশ বড়ুয়ার ভ্রমণ বিষয়ক এই লেখাটি ৪ আগষ্ট’২০১৫ তারিখে দৈনিক কালের কন্ঠে প্রকাশিত হয়েছে। লেখাটি পাহাড়টোয়েন্টিফোর ডট কম এর পাঠকদের জন্য কালের কন্ঠের প্রতি বিশেষ কৃতজ্ঞতাসহ প্রকাশ করা হলো :

সাজেক নির্জনতার কাঙাল। যখন থেকে ওর নাম শুনছি তখন যেমন এখনো তেমনটি আছে। খুব সম্ভবত পাংখোরা এর আদি বাসিন্দা। সাজেকের সর্বশেষ সীমায় ভারতের মিজোরামের কাছে ওরা থাকত। আর সাজেকের এই চূড়ায়। ওরা সব সময় সবার ওপরে থাকায় বিশ্বাসী। মিজোরামের কাছের বসতির নাম কংলাক। আর সাজেকের বসতি গ্রামের নাম রুইলুই। সেই রুইলুইয়ে এখন ত্রিপুরী ও লুসেইদের আবাস, আমাদের ভ্রমণ আড্ডার বর্তমান সাজেক। এখানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর স্থায়ী দপ্তর আছে। ওরা সীমান্ত রক্ষার প্রহরী। ওদের জন্য সাজেকের সুরক্ষিত পরিবেশে নিশ্চিন্তি পাই। পানীয় জলব্যবস্থা ও বৈদ্যুতিক সুরক্ষা ভোগ করি। এখান থেকে দুর্দান্তভাবে মোবাইল যোগাযোগ করতে পারি। কলকাতার সঙ্গে যেমন, লন্ডনে ভাইপো জিতু ও ডলসির সঙ্গেও পারব নিশ্চয়ই। চাঁদ ও মঙ্গল গ্রহের সঙ্গেও ভবিষ্যতে একদিন হবে।

চারদিকে আকুল অবারিত সবুজ। অরণ্য নেই তো কী আর করা যায়, সবুজ পাহাড় ও উপত্যকার ঝোপঝাড় ও কলাবাগান তো আছে। জুমের ধান ও তার সঙ্গী শস্যরা তো মাথা তুলে আশা জানাচ্ছে। এখানকার কলার কোনো তুলনা হয় না। কি চিনিচাঁপা, কি কবরী শ্রেষ্ঠত্বে কারুর সঙ্গে কাউকে তুলনা করা যাবে না। আর এর বাঁশের কোঁড় বা জুমের ভুট্টা, মারফা, চিনার, তিল, তিসি বা আদা-হলুদের ফুল সবই উপাদেয়। আমি খেয়েছি আদা-হলুদ ফুলের ভাপা ভর্তা, জুমের পাশে চাষির বাড়িতে। সেই বাড়িও আমাদের স্বপ্নের অতীত নির্জন স্বপ্নলোক। আমি তেমন বাড়িতে রাত কাটিয়েছি। গল্প ও ভ্রমণবৃত্তান্ত লিখেছি। চার-পাঁচ বছর আগে আমার নীরব জন্মদিনও নিঃসঙ্গ পালন করেছি। ধ্রুব এষ, হাশেম খান ও আমার জাপানি প্রিয় বন্ধুর ফোন পেয়েছি। রুবী বড়ুয়া ও ছেলেমেয়ের কথা কি বলার দরকার আছে? সাজেক যাওয়ার পথে ধইন্যার মায়ের ঝরনার অপার সৌন্দর্যের কথা! পাহাড় ও সবুজ এমন নাছোড়বান্দা বন্ধু যে একটুও ছাড়তে চায় না। সেবার সাজেকের উঁচু টিলায় উঠে ফোন করতে হয়েছিল। পথে ফেলে আসা ধইন্যার মা ঝরনার কথা আগে অন্য লেখায় লিখেছি। এখানে আসতে আসতে পথে পথে এত কিছু দেখার আছে যে জহুরি পথপ্রদর্শক না থাকলে তার কিছুই আপনি ভোগ করতে পারবেন না। এ জন্য আমি সব সময় তেমন কাউকে সঙ্গী করি। আমার সেই জহুরি পথপ্রদর্শক লেখক কে ভি দেবাশীষ চাকমা এবার নেই। আছেন খাগড়াছড়ি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী একাডেমির পরিচালক সুসময় চাকমা, তাঁর স্ত্রী সহেলী ও তাঁদের ভাইঝি রিপনা চাকমা ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. আবসার আহমেদ। ওরা সবাই সাজেকের সৌন্দর্যের ঝরনাধারায় নাইছে। আমি মজে গেছি পোষা ও সদ্য উড়তে শেখা বুলবুলি ছানার মালিক ত্রিপুরী ছেলেটির বাড়িতে। ওর মা তাঁতে বুনছেন ত্রিপুরী পরিধান। ওই শেলাইবিহীন লুঙ্গি। চাকমাদের পিননের সঙ্গে এর মৌলিক পার্থক্য আছে। চাকমাদের পিননে চাবুগি থাকে, চাবুগিতে থাকে নানা নকশা। ত্রিপুরীদের ওই নকশা বা ফুল থাকে না। চাকমাদের ওই চাবুগি বা আলাম না করতে পারলে বলা হয় সেই কুমারী মেয়ের বিয়ে হবে না। পার্বত্যবাসীদের ওই কোমর-তাঁত বা বেইন আজও টিকে আছে। ত্রিপুরীদেরও আছে। সেই ত্রিপুরী তাঁত বোনা দেখার সৌভাগ্য হয়েছে বুলবুলির ছানার ঐশ্বর্যে, ও আমাকে রাস্তা থেকে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। সে আকর্ষণ ছিন্ন করার নয়। তাই আবার এই লেখা।

ওই ত্রিপুরী মহিলার ছবি তোলার অনুমতি চাইলাম। তিনি আমাকে বুলবুলি ও নিজের ছেলের ছবি তোলা দেখে আশ্বস্ত ও বিশ্বাসী হয়ে সম্মতি জানালেন। আমি জানি সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর অনেক অভিমান আছে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর প্রতি। রাষ্ট্রও সংখ্যালঘুর চেয়ে সংখ্যাগুরুর মন জুগিয়ে চলে বেশি। সাম্প্রদায়িক বিভেদের কথা এখানে তুলব না সাজেকের অবারিত প্রাকৃতিক সৌন্দর্য-নিরপেক্ষতায়। আমি প্রাত্যহিক তুচ্ছতায় আজ মন দিতে চাই না সৌন্দর্যসেবন করতে এসে। সাজেক আমাকে এই সবক দিচ্ছে প্রথম থেকে, প্রকৃতি আমাকে বলছে উদার হতে, সবার বন্ধু হতে। মেঘও উড়ে আসছে উতল হাওয়ায় সওয়ার হয়ে। আহা, সাজেকসহ যদি ওড়া যেত!

ঝুকুঝুকু খটখট তাঁত-শব্দ দ্রুত ছুটছে। মহিলা আর তাঁর ছেলে ও আমার দিকে সরাসরি নজর দিচ্ছে না। ছবি তুলে নিলাম তাঁর, সম্মান জানালাম আবার। সুসময় চাকমা ডাক পাড়লেন। নজরুল এসে দাঁড়ালেন আমাকে নিয়ে যেতে। আমাদের খাওয়া তৈরি হয়েছে এক পাংখো বাড়িতে। ভ্রমণবিলাসীদের রান্না করেন তাঁরা অর্থের বিনিময়ে। খুশি হলাম পাংখো রান্না জীবনে প্রথম খেতে পাব বলে।

কী দুর্দান্ত বাচ্চুরি বা বাঁশের কোঁড় রান্না। ওই এক তরকারি দিয়েই তো তৃপ্তি ভরে খাওয়া যায়। আগে যদি জানতাম আমি পাংখো পদ্ধতিতে মুরগি রাঁধতে বলতাম। আলু ভর্তাও ব্যাপক স্বাদের। ডাল ভর্তাকে কী বলে প্রশংসা করব! ওই বাচ্চুরি বা বাঁশের অঙ্কুরসহ সব রান্না কাঠের আগুনে, স্টোভে বা কেরোসিনের চুলায় নয়। এ জন্য এত সুস্বাদু আদরে মাখা সব রান্না। শুধু মন খারাপ হয়ে গেল যখন সুসময় থেকে জানতে পারলাম যে ওই মুরগি ধরেছে গুলতি মেরে কাবু করে। এ কথা খাওয়ার আগে জানতে পারলে এক টুকরোটাও খেতে পারতাম না। আমি খাওয়ার সঙ্গে মানসিক সম্পর্কের খুব মূল্য দিই সব সময়।

আবার বৃষ্টি নামল ঝিরঝির। সামরিক বাহিনীর বিখ্যাত রিসোর্ট, স্থানীয় জনসাধারণের রেস্তোরাঁ ও মূল্য দিয়ে রাতে থাকার ঘরের হাতছানি কবুল করলাম আমি। আবার আসব শিগগিরই। চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চ্যঙ্গা ও সব আদিবাসী কাপড় বোনায় অভ্যস্ত ও দক্ষ। গামছা, পাগড়ি, চাদর থেকে বক্ষবন্ধনী সবই তাঁরা বোনেন। সব পোশাক রং বৈচিত্র্যে খুব উজ্জ্বল, নজরকাড়া। নতুন-পুরনো উল দিয়ে শীতের পোশাকও অত্যন্ত আকর্ষণীয়। ততক্ষণে আবার ঝিরিঝিরি বাদল নামল। শীতের আমেজও আছে। পুব দিক থেকে ঢেউ তোলা নিচু পাহাড় শ্রেণি ঢুকে গেল কুয়াশার মসলিন শাড়িতে। আমাকে একদিন হেঁটে হেঁটে ওখানে যেতে হবে সাজেকের সবুজ গালচেতে পা ফেলে স্বপ্ন বুনতে বুনতে। কল্পনায় ভেসে বাংলার ভূস্বর্গে…পাঠিকা-পাঠকদের হাতে ধরে নিয়ে।

Micro Web Technology

আরো দেখুন

কারাতে ফেডারেশনের ব্ল্যাক বেল্ট প্রাপ্তদের সংবর্ধনা

বাংলাদেশ কারাতে ফেডারেশন হতে ২০২১ সালে ব্ল্যাক বেল্ট বিজয়ী রাঙামাটির কারাতে খেলোয়াড়দের সংবধর্না দিয়েছে রাঙামাটি …

Leave a Reply