নীড় পাতা » আলোকিত পাহাড় » ‘সাংবাদিকতায় বিত্তকে প্রাধান্য দিলে চিত্ত পরিশুদ্ধ হয় না’

‘সাংবাদিকতায় বিত্তকে প্রাধান্য দিলে চিত্ত পরিশুদ্ধ হয় না’

SunilDA‘সাংবাদিকতা পেশায় আসব এমনটি ভাবিনি কখনো। ১৯৬৫ সালে যখন রাঙামাটি সরকারী কলেজ প্রতিষ্ঠা হয়, তখন কলেজের প্রথম ব্যাচের ছাত্র ছিলাম। সেসময় নানা কারণে ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতি প্রকাশ্যে করা যেত না। তাই  মূলনীতির সাথে মিল রেখে ছাত্র ইউনিয়নের মতাদর্শের ছাত্ররা “জাগৃতি” নামক সংগঠন করে। সে সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ-সম্পাদকের দায়িত্ব দেয়া হয় আমাকে। ছাত্র ইউনিয়ন করার সুবাধে দৈনিক সংবাদপত্র পাঠ করা হতো। সেই থেকে সংবাদপত্রে কাজ করার প্রতি আকর্ষন সৃষ্টি হয়।’ এইভাবেই নিজের সাংবাদিকতায় আসায় পেুক্ষাপট জানালেন পাহাড়ের প্রবীন সাংবাদিক,ঐতিহ্যবাহি দৈনিক সংবাদের পার্বত্যাঞ্চল প্রতিনিধি ও বর্তমানে রাঙামাটি প্রেসক্লাবের সভাপতি সুনীল কান্তি দে।

স্মৃতি হাতড়ে সুনীল কান্তি দে জানালেন,স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হলে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের নিয়ে প্রশিক্ষণের জন্য ভারতে চলে যাই। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ফিরে এসে ১৯৭৪ সালে জ্ঞানেন্দু বিকাশ চাকমা (তখন দৈনিক সংবাদের পার্বত্যাঞ্চল প্রতিনিধি ছিলেন) দৈনিক সংবাদে কাজ করতে বলেন। ১৭৮ টাকা মাসিক বেতনের চাকরি। সেই শুরু। ১৯৭৫সালে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর তাঁর বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি করে সরকার। সেই থেকে নিরুদ্দেশ তিনি। অনেকদিন পালিয়ে থাকতে হয়েছিল তাঁকে।

সাংবাদিকতা পেশায় যোগ দিয়ে জীবনের তিক্ত অভিজ্ঞার কথা বলতে গিয়ে সুনীল কান্তি দে বলেন, ১৯৮১সালে রাঙামাটি হাসপাতাল নিয়ে দৈনিক গিরিদর্পণে “বিংশ শতাব্দিতে এইও কি সম্ভব!” শিরোনামে একটি রিপোর্ট করি। এ রিপোর্টের পর শুরু হয় নানা কায়দায় নির্যাতন। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হত্যাকান্ডের পর তাঁর উপর নেমে আসে অমানিশার কালো ছায়া।
সেইসব দিনের স্মৃতিচারণ করে সুনীল কান্তি দে বলেন,১৯৮১ সালের ৪ জুন তাঁকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর শুরু হয় অমানবিক অত্যাচার। ছয় মাস পৃথিবীর আলো দেখতে দেয়নি তাঁকে। হাত-পা আর চোখ বেধে অন্ধকার ঘরে রেখে অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয় তাঁর উপর। মধ্যযুগের বর্বরতাও এমন ছিল কিনা সন্দেহ। পৈশাচিক নির্যাতন আর মিথ্যা মামলায় জেলা খাটতে হয় ২ বছর ৯ মাস ২২দিন। এ সময়টা ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে দুর্বিষহ সময়।
এসব বেদনা বিধুর অতীত স্মৃতির কথা যখন তিনি বর্ণনা করছিলেন। তখন পাশে বসা তাঁর সহধর্মিনী স্কুল শিক্ষিকা বন্দনা দে নীরবে চোখের জল ফেলছিলেন।

তিনি বলেন, এখনো ভয়ে আতঁকে উঠি সেসব দিনের কথা স্মরণ হলে। জেল-জুলুম আর নির্যাতনের পর আবারো শুরু করেন সাংবাদিকতা। ১৯৯২ থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত দৈনিক সংবাদের চট্টগ্রাম অফিসে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এরপর ১৯৯৪ হতে অদ্যাবধি পার্বত্যাঞ্চল প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

সাংবাদকিতা জীবনের অন্যতম ঘটনা হিসেবে জানালেন পাকুয়াখালি হত্যাকান্ডের ঘটনাটি কাভার করা। তিনি বলেন, ১৯৯৬ সালে পাকুয়াখালী হত্যাকান্ডের পর সেখানে গিয়েছিলাম। মানুষ কত নিষ্ঠুর আর বর্বর হতে পারে, সে নৃশংস হত্যাকান্ড না দেখলে কেউ বিশ্বাস করবে না। Sunillla

সাংবাদিকতা জীবনের মজার অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে প্রবীন এ সাংবাদিক বলেন, সাংবাদিকতা পেশা অত্যন্ত শৈখিন এবং শৈল্পিক এক পেশা। সৃজনশীল এ পেশায় এসে যখনই কোনো সমস্যার বিষয়ে রিপোর্ট করেছি, সে সমস্যা নিরসন হয়েছে। সমস্যার রিপোর্ট করে পরে সমাধান হওয়াটা খুবই উপভোগ করতাম, দারুন মজা পেতাম।

একজন প্রকৃত সাংবাদিকের প্রকৃত কোনো বন্ধু থাকতে পারে না। কাউকে হেয় আবার কাউকে হিরো বানাতে গিয়ে হলুদ সাংবাদিকতার আশ্রয় না নিয়ে প্রকৃত সত্যটাকে তুলে ধরতে হবে।  সাংবাদিকতা পেশায় আসতে হলে তাকে অবশ্যই শিক্ষিত হতে হবে। শিক্ষা মানুষকে বিনয়ী হতে শেখায়। সৌজন্যবোধ এ পেশার জন্য অলংকারস্বরূপ। আর অর্ধশিক্ষিত ও জ্ঞানপাপীরা সাংবাদিকতা পেশাকে কলুষিত করে ফেলছে।

তখনকার সাংবাদিকতা আর বর্তমান সাংবাদিকতার বিষয়ে বলতে গিয়ে তিনি বলেন, তখনকার সাংবাদিকতা আর বর্তমান সাংবাদিকতার মধ্যে অনেক পার্থক্য রয়েছে। যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য তখন একটি রিপোর্ট করার পর তা ডাকযোগে পাঠাতে হতো। ফলে ঘটনার সপ্তাহ দুয়েক পেরিয়ে যাওয়ার পর তা পত্রিকায় ছাপা হতো। এরপর আসলো টেলিগ্রাম। সেখানেও দেখা যেত নানা বিড়ম্বনা পোহাতে হতো। রিপোর্ট দিলাম একরকম। পরে পত্রিকায় ছাপা হতো অন্যভাবে। এতে করে নানা বিড়ম্বনা সৃষ্টি হতো। তখন রিপোর্ট করার জন্য নিজেকেই ঘটনাস্থলে উপস্থিত হতে হতো। কপি করার সুযোগ ছিল কম। তখন তথ্য পাওয়ায় দুরূহ ব্যাপার ছিল। কিন্তু বর্তমানে তথ্য প্রযুক্তির উন্নতির কারনে সাংবাদিকতা পেশা অনেক সহজ হয়ে পড়েছে। যখনই ঘটনা তখনই সাংবাদিকরা তথ্য পেয়ে যান। তথ্য প্রযুক্তির অভূতপূর্ব উন্নতির কারণে কপি করাটাও সহজ হয়ে গেছে। যার কারণে অনেক সাংবাদিককে ঘটনাস্থলে না গিয়েই রিপোর্ট করতে দেখা যায়। এটা সাংবাদিকতা পেশায় উন্নতির অন্তরায়। অথচ এখন অনেক সুযোগ রয়েছে।

সাংবাদিকতার নৈতিকতা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে সুনীল কান্তি দে বলেন, বিত্ত আর চিত্ত এক জিনিস নয়। এ পেশায় কেউ যদি বিত্তকে প্রাধান্য দেয় তবে চিত্ত পরিপূর্ণ পরিশুদ্ধ হয় না। তাই বিত্তের পিছনে না দৌঁড়ে চিত্তের স্বাধীনতাকে প্রাধান্য দিলে সমাজ ও দেশের সাধারণ মানুষ উপকৃত হবে নিঃসন্দেহে।
নবীন সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে সুনীল কান্তি দে বলেন, একজন প্রকৃত সাংবাদিকের ভালো কোনো বন্ধু থাকতে পারে না। সুতরাং কাউকে হেয় আবার কাউকে হিরো বানাতে গিয়ে হলুদ সাংবাদিকতার আশ্রয় না নিয়ে প্রকৃত সত্যটাকে তুলে ধরতে হবে। তিনি বলেন, এ সময়ে সাংবাদিকতা পেশায় আসতে হলে তাকে অবশ্যই শিক্ষিত হতে হবে। শিক্ষা মানুষকে বিনয়ী হতে শেখায়। সৌজন্যবোধ এ পেশার জন্য অলংকারস্বরূপ। আর অর্ধশিক্ষিত ও জ্ঞানপাপীরা সাংবাদিকতা পেশাকে কলুষিত করে ফেলছে বলে মন্তব্য করেন পাহাড়ের প্রবীন এই সাংবাদিক।

Micro Web Technology

আরো দেখুন

সকাল থেকে মধ্যরাত-মানুষের পাশে জামাল

করোনা মহামারীর কারণে সামর্থ্যবান অনেকেই ও জনপ্রতিনিধিদের কেউ কেউ নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছেন। আবার অনেকেই নিজের …

Leave a Reply