নীড় পাতা » পার্বত্য পুরাণ » সাংগ্রাই অনুগদ্য

সাংগ্রাই অনুগদ্য

cover“সাংগ্রাই মা ঞি ঞি ঞা ঞা
রি কেজাইঃ গাইঃ পা মে
ও ঞি অকোরো ও এমে ¤্রহ্ িরো লাগাইঃ লাগাইঃ
লাগাইঃ লাগাইঃ লাগাইঃ লাগাইঃ
চুঃ প্য গাইঃ মে লে।”
বঙ্গানুবাদ : সাংগ্রাই তে মিলে মিশে, পানি খেলা করি, ও ভাই সকলে, ও দিদি বৌদি সকলে এসো, এসো এসো এসো, এসো একত্রে মিলে আনন্দ করি।
প্রারম্ভিকতা দেখেই বোঝা যায় যে, সাংগ্রাই উৎসব উপলে পার্বত্য চট্টগ্রামের মারমা আদিবাসীদের একটি উদ্দীপনামূলক গানের কলি। গানটির লেখক ও সুরকারÑ উচহ্লা, বিসিএস (বিচার), বর্তমানে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বৌদ্ধ ভিু ভদন্ত উ পঞাজোত মহাথেরো। তবে এ গানটির আনুষ্ঠানিকভাবে প্রথম প্রচার পেয়েছিলÑ বাংলাদেশ বেতার, চট্টগ্রামের এক কিংবদন্তি শিল্পী অনন্ত চৌধুরীর ভরাট কন্ঠে, যাঁর প্রকৃত নাম অংথোয়াইচিং চৌধুরী এবং যিনি চন্দ্রঘোনার স্বনামখ্যাত রায় সাহেব থোয়াইপ্র“ চৌধুরীর নাতি ছিলেন। সাংগ্রাই উপলে রচিত ও প্রচারিত আধুনিক মারমা গানের মধ্যে এখন পর্যন্ত এ গানটিই সবচেয়ে জনপ্রিয়। মারমা সমাজে সাংগ্রাই আগমনী গান হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। এরূপ আধুনিক মারমা গান এ পর্যন্ত আর রচিত হয় নি। এখানে সবাইকে উৎসবে যোগদান করতে আহ্বান জানানো হয়েছে এবং ইঙ্গিত রয়েছে যে, মারমারা আজন্ম উৎসবপ্রিয়। তাঁদের উৎসবসমূহ প্রধানতঃ ধর্মীয় দিবসকেন্দ্রিক। একমাত্র সাংগ্রাইÑই সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উৎসবরূপে পরিগণিত।
তাত্ত্বিকভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, চৈত্র সংক্রান্তি অর্থ বিষুব সংক্রান্তি। সংক্রান্তি সংস্কৃত শব্দ। দণি পূর্ব এশিয়ায় যেভাবে বিবর্তিত হয়ে মিয়ানমারে ছিংগ্যেয়েন (ঞযরহমধুবহ) রাখাইন প্রদেশে ও বাংলাদেশের সমতলে রাখাইন সম্প্রদায়ের সাংগ্রাইং এর অনুরূপে মারমাদের নিকট সাংগ্রাই শব্দের উৎপত্তি ঘটেছে। মারমা ভাষায় হইসুং (বর্ষ বিদায়) অর্থাৎ ঋতু পরিবর্তনই হল সাংগ্রাই এবং যার ভিত্তি ¤্রাইমার সাক্রই (মারমা বর্ষপঞ্জি)। আরাকানী শাসনামলে সৃষ্ট মঘীসন ¤্রাইমা সাক্রই নামেই প্রবিষ্ট হয়েছে। চট্টগ্রামে ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত জমি সংক্রান্ত কাজে এ সন প্রচলিত ছিল। মোগল সম্রাট আকবর কর্তৃক উদ্ভাবিত ফসলী বা বাংলা সন (৯৯২ হিজরী ও ১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দ) আবহমান বাংলার বর্ষপুঞ্জিরূপে গৃহিত। বাংলা নববর্ষ বা চৈত্রসংক্রান্তি উৎসব ম্রাইমা সাক্রইকেন্দ্রিক সাংগ্রাই নামে স্মরণাতীতকাল হতে প্রতিপালিত হচ্ছে। এ সন চান্দ্র মাস ভিত্তিতে প্রবর্তিত। চন্দ্রকে ভিত্তি করেই মাসসমূহও নামকরণকৃত। যেমন কছুংলা, নাইঞোলা, ওয়াছোলা, ওয়াখংলা, তস্লাঙ লা, ওয়াগৈলা, তাইংছবোলা, নাইত লা, প্রাসোলা, তবোথিলা, তবংলা ও তাইংখুঙলা। লা অর্থ চন্দ্র বা চাঁদ।
সাংগ্রাই এর আনুষ্ঠানিকতা সম্পর্কে বাংলা ভাষায় এ যাবৎ লেখালেখি কম হয় নি। কিন্তু দর্শনগত বিচার কিংবা বিশ্লেষণধর্মী লেখা তেমন হয় নি। মারমা সমাজে সাংগ্রাই অনুষ্ঠান কখন শুরু হয়েছিল, তার সময়কাল কিংবা কোন ইতিহাস অনুসন্ধান করে পাওয়া যায় না। তবে বাংলা বর্ষের পাশাপাশি ম্রাইমা সাক্রই অনুসারে সাংগ্রাই প্রচলিত। এ বছর ম্রাইমা সাক্রই ১৩৭৫, যা বাংলা সনের ৪৬ বৎসর পর শুরু। পয়লা বৈশাখের ১/২ দিন পর উক্ত পঞ্জিকা আরম্ভ হয়। এ বছর তেস্রা বৈশাখে ম্রাইমা সাক্রই তাইংখুলা মাসের পয়লা তারিখ, সে হিসেবে ১৬ এপ্রিল নববর্ষ। ১৫ এপ্রিল তবংলা ব্রে (পূর্ণিমা) এর পরদিন তবংলাছুৎ ১দিন। এটাই হল বর্ষ পঞ্জির নিয়ামক, যা গঃ জাঃ সাক্রই নামেও পরিচিত।
সাংগ্রাই উৎসবের পেছনে নানা উপাখ্যান ও পৌরাণিক কাহিনী প্রচলিত রয়েছে। এ সব উপাখ্যানের প্রভাবে নানা লোকাচার ও কৃত্যের সৃষ্টি হয়েছে। যেমনÑ শিবের স্ত্রী পার্বতী একাকীত্ব ঘোচানোর জন্য গণেশকে সৃষ্টি করে স্বীয় দেহরী নিযুক্ত করে। এরপর গণেশের সাথে শিবের দেহরীদের যুদ্ধ বাধে, এতে শিবের রীরা হেরে যায়। শিব ক্রুদ্ধ হয়ে গণেশের মাথা কেটে হত্যা করে। এতে পার্বতী কালীমূর্তির রূপ ধারণপূর্বক ধ্বংসযজ্ঞ শুরু করে। এমতাবস্থায় দেবতারা শঙ্কিত হয়ে পড়ে এবং ইন্দ্র রাজের মধ্যস্থতায় এ মহাকান্ডের সুরাহা হয়। ইন্দ্র একটি হাতির মাথা কেটে গণেশের শরীরে সংযক্ত করে তাকে জীবিত করে তোলে ও গণেশের পূর্বের মাথা স্বর্গে নিয়ে যায়। (সূত্র: মং চাই শে ম্যা, বান্দরবান)। ঐ মাথার পচাঁগলা রক্ত জমা করে সাংগ্রাই প্রাক্কালে মর্ত্যে ফেলে দেওয়া হয়। এ পঁচা রক্ত যে বছর ছড়ায় নদীতে পড়ে, সে বৎসর বন্যা হয়, যে বছর ডাঙ্গায় পড়ে সে বছর ফসল কম হয়। অপরদিকে হিমালয়ের গহীন বনে বা মহাসমুদ্রে পড়লে সে বছরে মর্ত্যরে লোকেরা শান্তিতে থাকে। যে বৎসর গণেশের পঁচা রক্ত ছড়ায় /নদীতে পড়বে জানতে পারবে তার পূর্বদিনেই খাবার পানি সংগ্রহ করে রাখা হয়। এ ঐতিহ্য ব্রাত্যজনেরা এখনো পালন করে। এমন উপাখ্যানের আলোকে জ্যোতিষী কর্তৃক প্রণীত “সাংগ্রাইজা” (বাৎসরিক ভবিষৎবাণী) মিয়ানমার থেকে প্রকাশিত হয় যুগে যুগে। সেখানে শুভ অশুভ বর্ণনা থাকে। পড়শীদের ঘরের উঠোনে সামান্য শস্যদানা ছিটিয়ে দেয়া, দঅ্ কজাঃ (ঘিলা খেলা), পাঁচন রান্না ইত্যাদি অনুষঙ্গের অনুরূপ কাহিনী বা উপাখ্যান রয়েছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা ও ত্রিপুরা আদিবাসীদের মত মারমারাও সাংগ্রাই উৎসব ৩ দিন পালন করে থাকে। যেমনÑ পাইঁছোয়াই (ফুল তোলা), আক্যা (মূল সাংগ্রাই) ও আপ্যাইং (প্রস্থান)। বিন্নি চালের নানা রকম পিঠা তৈরী, পাঁচন রান্না উৎসবেব প্রধান উপাদান। অতঃপর দঅ্ কজাঃ (ঘিলা খেলা), রি কাজাঃ পোয়ে (পানি খেলা)। সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে আছে কাপ্যা (মারমা সামাজিক লোকগীতি), চাগায়াং (জুমভিত্তিক মারমা লোকগীতি), রদ্দু (কাহিনীভিত্তিক লোকগীতি), খ্রেখ্রং আহ্মুঃ (খ্রেখ্রং বাজানো, যা চাকমাদের কাছে হেংগরং নামে পরিচিত), প্রিঃ আহমুঃ (বাঁশি বাজানো) এর দ্বারা অতীতের স্মরণীয় মুহুর্তগুলো উপস্থাপন করা। হারানো নষ্টালজিয়াকে খুঁজে ফেরা ইত্যাদি উপলকে প্রতিভাত করা হয়।
মারমাদের সাংগ্রাই উৎসব জীবিকাভিত্তিক বা বনÑপাহাড়কেন্দ্রিক। বনে ঘিলা পাওয়া যায়। বাঁশÑবেতের কোন অভাব নেই। নানা রকম ফলÑমূলের উৎস বন ও পাহাড়। তাছাড়া চৈত্রের প্রচন্ড খরতাপে বনে শ্বেত বর্ণের গুচ্ছাকারে এক প্রকার ফুল ফোটে, যা সাংগ্রাই পাঁই নামে পরিচিত (চাকমারা ভাতজোড়া ফুল, ত্রিপুরারা বৈসুফুল, তঞ্চঙ্গ্যারা বিষুফুল, বড়–য়া সম্প্রদায় ও সনাতন ধর্মলম্বীরা বিউ ফুল বলে)। বৎসরে কেবলমাত্র সাংগ্রাই সময়েই একবার ফোটে আকর্ষণীয় এ ফুল। এ ফুল দিয়ে ঘর সাজানো হয়, গবাদি পশুর গলায় ঝুলিয়ে দেওয়া হয় (চাকমারা এ ফুল দিয়ে ‘গাংপূজা’ করে)। প্রায় সবকিছু পাহাড় ও বন থেকে পাওয়া যায় বিধায়, দ্অ কজাঃ, পাঁচন রান্না, পিঠা তৈরীর উপকরণ, প্রিঃ, খ্রেখ্রং বাজানো ও লোকগীতি গাওয়ার রেওয়াজ সৃষ্টি হয়েছে। মারমারা সাংগ্রাই আগমনের পূর্বেই জুম চাষের জন্য জঙ্গল কেটে তা শুকিয়ে পোড়ানোর কাজ সেরে নেয়। এ সব কাজের ফাঁকে ফাঁকে যুবকÑযুবতীদের ‘খ্রেখ্রং’ বাজানো, বাঁশীতে সুর তোলার প্রণোদনা সৃষ্টি হয়। লোকগীতির তালিম ও জুমের জমি প্রস্তুতকালীন সময়ে শুরু। চৈত্রের তাপদাহে পাড়ার বয়স্ক লোকেরা ওষ্ঠাগত, যুবতীরা দলবেঁধে সানন্দে বয়স্কদের স্নান করিয়ে দেয়, যা তারা পূণ্যময় দায়িত্ব মনে করে। প্রান্তিক এলাকায় এসব ঐতিহ্য এখনো চালু আছে।
রি কাজাঃ পোয়ে বর্তমানে আকর্ষণীয় ইভেন্ট। মারমা সমাজে আগে এটা ছিলো না। কারণ মারমারা গোত্রগতভাবে পাহাড় ও সমতলে বাস করে কিন্তু তাদের নিকট পানি সহজলভ্য ছিল না। তবে বান্দরবানের সার্কেল চীফ বা বোমাং রাজার পূর্ব পুরুষ সমতল তথা আরাকান রাজার অধীনে মংচ পিয়ো ১৬১৪ খ্রিষ্টাব্দে চট্টগ্রামের শাসনকর্তা নিযুক্ত হন। সে সুবাদে বার্মা সংস্কৃতির অনুসারে এ রিকাজাঃ পোয়ে তাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় অনুষ্ঠিত হয়ে সমাজে প্রবিষ্ট হয়ে থাকতে পারে। কেননা ৫ম বোমাং রাজা কংহলাপ্র“ বান্দরবানে ১৭২৭ খ্রিষ্টাব্দে দপ্তর স্থানান্তরের পর এ অনুষ্ঠান ছড়িয়ে পড়ে। চট্টগ্রামের হিসাব ধরা হলে পানি খেলার উৎস ৪০০ বছর। মং রাজা ক্যজয় ধ্বব্ইও (সোর্ড অব অনার) সমতলের রাউজান থানাধীন পাহাড়তলীতে দপ্তর স্থাপন করেছিলেন। তিনি বা তাঁর অনুসারীগণ সম্ভবতঃ রিকাজাঃ পোয়ে প্রচলন করেন নি। তার কারণ তাঁর অনুসারীগণ প্লইঁসা গোত্রের। বর্তমানে খাগড়াছড়ির মারমা সমাজে রিকাজাঃ পোয়ের চালু ছিলো না। উনিশত নব্বই দশকে এ ক্রীড়া বান্দরবান ও চন্দ্রঘোনা থেকে খাগড়াছড়িতে স্থানান্তরিত হয়।
উপমহাদেশে বৃটিশ আসার পর ১৮১৩ খ্রিষ্টাব্দে মং রাজা কংজয় ধব্ব্ই চট্টগ্রামের পাহাড়তলীতে দপ্তর স্থাপন সূত্রে একটি বৌদ্ধ বিহার প্রতিষ্ঠা করেন ও দৃষ্টিনন্দন এক বিশাল মহামুনি বুদ্ধের প্রতিমূর্তিও স্থাপন করেন। আরাকান থেকে চাইংগ্য ঠাকুর নামে এক খ্যাতিমান বৌদ্ধ ভিুকে পাঙ (আহ্বান) করে আনেন। বিহারের পশ্চিমে বিশাল এ দিঘী খনন করেন। রাজা বাহাদুর বিষুব সংক্রান্তি উপলে সম্মেলন আহ্বানপূর্বক এক বৌদ্ধ মেলার আয়োজন করেন। পার্বত্য চট্টগ্রামের মারমা, চাকমা, তঞ্চঙ্গ্যারা তীর্থ করতে দলবেঁধে যেতেন। পার্বত্য চট্টগ্রামের তৎকালীন সুপারিনটেনডেন্ট লে. কর্ণেল থমাস হার্বাট লুইন সাহেবও রাজার নিমন্ত্রিত হয়ে তাঁর আতিথ্য গ্রহণ করেছিলেন। তিনি লিখেছেন, সাংবাৎসরিক সঞ্চিত আয় নিয়ে সরল পাহাড়ীরা তীর্থ ও আনন্দ করতে মেলায় যান। বাঙালি ব্যবসায়ীরা শৌখিন রুচিবোধকে আকর্ষণকারী মাটির তৈরী জিনিষ, কমদামের গৃহস্থ দ্রব্যাদি উচ্চ মূল্যে বিকিয়ে দিয়ে টাকা হাতিয়ে নিত। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের যুবকÑযুবতীরা সীংÑএ (ভিু সীমা) দল বেঁধে কাপ্যা রদ্দু গেয়ে গেংখুলি গেয়ে খ্রেখ্রং বা বাঁশীতে সুর তুলে প্রদণি করে আনন্দ উচ্ছ্বাস প্রকাশ করত। পাত্রÑপাত্রী বাছাই করে বিয়ে করত। পাহাড়ীরা সব সঞ্চয় উজাড় করত মেলায়। এখানে নেতিবাচক দিক থাকলেও থাকতে পারে। কারণ আদিবাসী পাহাড়িদের সামাজিকতাকে ধর্মীয় প্রলেপ দেওয়ার উপল প্রতীয়মান। ভালোর দিক হলোÑ বিভিন্ন বৌদ্ধ সম্প্রদায় একাকার হয়ে এক মহামিলনের ত্রে রচনা করত। সময়ের করালগ্রাসে সেখানে মং রাজাও নেই, দপ্তরে নেই, সে বিশাল দিঘীও ভরাট হয়ে ইতিহাস থেকে হারিয়ে গেছে। পাহাড়িরাও তীর্থ করতে তেমন আর যান না। এভাবেই মহামুনি মেলার বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মিলনের স্মারক স্তম্ভের অপÑমৃত্যু ঘটেছে।
বৌদ্ধ ধর্মের সাথে কোন রকমেই সাংগ্রাই এর যোগসূত্রতা খুঁজে পাওয়া যায় না। তারপরেও সাংগ্রাই শরীরে ধর্মের পোষাক পড়িয়ে শত শত বছরব্যাপী প্রচলনের ব্যবস্থা করেছেন মারমা সমাজে, তা গবেষণা বা অনুসন্ধান করে দেখা যেতে পারে।
বর্তমানে মারমাদের জীবন ও জীবিকার ব্যাপক রূপান্তর ঘটেছে। ফলে ঐতিহ্যবাহী সংগীতের তেমন চর্চা আর হয় না, নতুন জুৎসই গানও আর সৃষ্টি হয় না। অতীতে জীব বৈচিত্র্য বজায় রেখে জুমচাষ করত। এখন জুম পোড়ার নামে পাহাড়ের পর পাহাড় বন পুড়িয়ে দিচ্ছি। ফলে সাংগ্রাই পাঁই (বুনোফুল)Ñও দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠেছে। জীব বৈচিত্র্য ব্যাপকভাবে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
সাংগ্রাই অনুষঙ্গগুলো থেকে মারমা সমাজ কী দর্শন ধারণ করেছে? পাহাড়ের সংস্কৃতি রায় কতটুকু তৎপর? সমাজকে মহিমান্বিত করতে কোন বৈচিত্র্যতা আনয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে কি? আমার মনে হয়, সমাজ জীবনকে শাণিত করবার মত সামুহিক প্রয়াস এ পর্যন্ত নেওয়া যায় নি। চৈত্র মাসে শুধু জুম কেন সেগুন বাগানের উর্বরতা রার নামেও পাহাড় পুড়িয়ে বিরান করে দেয়া হচ্ছে। তা বিরত করবার কোন সামাজিক আন্দোলন গড়ে উঠছে না।
বৈচিত্র্যতা আনয়ন হোক, সংযোজনই হোকÑ বর্তমানে মারমাদের সাংগ্রাই উপলে র্যা লি বা পদযাত্রার ব্যবস্থা দেখি। ঊনিশত আশির দশকে এরশাদশাহী শাসনের বিরুদ্ধে ঢাকায় পয়লা বৈশাখে প্রথম মঙ্গল শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। তার অনুকরণে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় অথবা নিজেদের উদ্যোগে র্যা লি বা পদযাত্রার আয়োজন করে অন্যদের কাছে নিজেদেরকে জানান দেয়। কিন্তু কোন সামাজিক বক্তব্য পরিলতি হয় না। এ নিগড় থেকে বেরিয়ে এসে সামষ্টিক বক্তব্য প্রকাশ করা উচিত। স্মরণাতীত কাল হতে বয়ে আসা এ উৎসব মারমা সমাজে কালে কালে নানা অনুষঙ্গ যুক্ত করে কৃত্রিমতার আবহ তৈরী করেছে, ঢুকে পড়েছে বাণিজ্য। নতুন নতুন প্রণোদনা সৃষ্টি করে উৎসবকে প্রলম্বিত করা হচ্ছে। শহুরের মারমা সমাজ গ্রামকে বিছিন্ন করে দিয়েছে। গ্রামে বা প্রান্তিক এলাকায় ঐতিহ্য এখনো প্রতিফলিত হচ্ছে। কিন্তু গ্রামের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সামর্থ্য শহুরের শক্তির মোকাবেলা করতে পারছে না। শহুরের আধিপত্য গ্রামকে গ্রাস করে ফেলেছে। সাংগ্রাই বা চৈত্র সংক্রান্তির প্রাক্কালে এ সুষ্পষ্ট বিভাজন রেখা দৃশ্যমান হয়। বিদগ্ধ সমাজ মনে করে এসব থামিয়ে দিতে হবে।
সাংগ্রাই একটি উৎসব, উৎসব মানে গান, একটি অনুকাব্য, একটি সামগীতÑ এ সব উপজীব্যের ভেতর দিয়ে মারমা জীবনধারা বা সংস্কৃতি একটি নদীর মত প্রবাহমান কাল থেকে কালে। অনন্ত চৌধুরীর গানের প্রতিধ্বনি এখনো সবার মন ছুঁয়ে যায়। কিন্তু এরপর সুমহান ঐতিহ্যের স্থলে কৃত্রিম অনুসঙ্গ স্থাপন করে সাংগ্রাই এর কাব্যময়তাকে বিবর্ণ করে তোলা হচ্ছে। যা দ্রুত আত্মÑউপলব্ধির পদপে নিতে হবে। নতুবা শতাব্দীর গৌরবময় উৎসবের প্রণোদনাসমূহ মারমাদের জীবনধারা থেকে বিলীন হয়ে যাবে অচিরেই।

( খাগড়াছড়ি থেকে প্রদীপ চৌধুরী,সৈকত দেওয়ান ও ফয়সল অভির সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘উৎসব’ লিটলম্যাগের সৌজন্যে )

Micro Web Technology

আরো দেখুন

জেসমিন সুরভী’র কবিতা স্বপ্নের ফেরিওয়ালা

অচেনা ফেরিওয়ালা হরেক রঙের স্বপ্ন ফেরি করে হাঁটছে এ গ্রাম থেকে সে গ্রাম, ইটের শহর …

Leave a Reply