নীড় পাতা » পাহাড়ে নির্বাচনের হাওয়া » সশস্ত্র লড়াই থেকে ভোটের মাঠে

সশস্ত্র লড়াই থেকে ভোটের মাঠে

election02একসময় যৌথখামার গড়ার স্বপ্ন বুনে গহীন বনে অস্ত্র হাতে ঘুরে বেড়িয়েছেন একসাথে,ঘুমিয়েছেন একই বিছানায়,সূদীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েছেন কখনো লড়াইয়ে,কখনো পাহাড়ের পথে পথে গোপন আস্তানায়,সেদিন বিশ্বাসই একমাত্র সম্বল ছিলো তাদের পরস্পরের প্রতি। ছিলো ভালোবাসা আর হৃদ্যতার মাখামাখিও। কিন্তু মাত্র ষোল বছরেই বদলে গেলো সব,বাঁক নিলো সম্পর্কে,শুরু হলো নানান টানাপোড়েন। প্রাপ্তি আর প্রত্যাশা,চিন্তা আর আদর্শের বিরোধ তাদের দুরত্ব ক্রমশঃ বাড়িয়ে দিয়েছে যোজন যোজন। এককালের ‘ভীষণ প্রিয়’ সহযোদ্ধারা এখন পরস্পরকে খুঁজে ফেরেন ‘ভালোবাসা’ নয়, ‘মৃত্যু’ উপহার দিতে। পারস্পরিক ঘৃণা আর প্রতিশোধ ছড়ানোর লড়াইয়ে ইতোমধ্যেই ত্রিধাবিভক্ত তারা। পাল্টাপাল্টি ‘হামলা’য় খুন হয়েছেন প্রায় সহস্রাধিক,প্রতিনিয়তই ঝড়ছে রক্ত,হচ্ছে অপহরণ,গুম। কিন্তু এই ‘জিঘাংসা’য় এবার আসছে নয়া মেরুকরণ।

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন তাদের সশস্ত্র আধিপত্যের লড়াই থেকে নিয়ে এসেছে গনতান্ত্রিক মাঠের রাজনীতিতে। পাহাড়ে এই প্রথমবারের মতো তাই সরাসরি ‘জনপ্রিয়তা যাচাই’ এর সুযোগ নিচ্ছে তিন আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি,প্রসিত খীসার নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট(ইউপিডিএফ) এবং সুধাসিন্ধু খীসার নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি(এমএনলারমা)। এর আগেও নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলো সন্তু লারমার জনসংহতি ও ইউপিডিএফ। কিন্তু কোনবারই সরাসরি মুখোমুখি হতে হয়নি তাদের। ২০০১ সালে ইউপিডিএফ প্রধান প্রসিত খীসা রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি থেকে নির্বাচন করলেও সেইবার নির্বাচন বর্জন করে সন্তু লারমার জনসংহতি,আর তখনো জন্মই হয়নি জনসংহতি(এমএনলারমা)র। আবার ২০০৮ সালে রাঙামাটি আসনে জনসংহতি নির্বাচনে অংশ নিলেও ‘না’ ভোটের পক্ষে প্রচারণায় অংশ নেয় ইউপিডিএফ। ফলে দীর্ঘদিন পর এবারই প্রথমবারের মতো সরাসরি নির্বাচনী যুদ্ধে মুখোমুখি হচ্ছেন তারা। রাঙামাটি আসনে জনসংহতি সমিতির প্রার্থী হচ্ছেন উষাতন তালুকদার,ইউপিডিএফ প্রার্থী হচ্ছেন সচিব চাকমা,জনসংহতি (এমএনলারমা)র প্রার্থী হচ্ছেন সুধাসিন্ধু খীসা। খাগড়াছড়িতে ইউপিডিএফ প্রার্থী হচ্ছেন প্রসিত বিকাশ খীসা,জনসংহতি সমিতি(এমএনলারমা)’র প্রার্থী হচ্ছেন প্রকৌশলী মৃণাল কান্তি ত্রিপুরা,বান্দরবানে ইউপিডিএফ ছোটন কান্তি তংচঙ্গ্যা প্রার্থী হলেও সেখানে বাকী দুই আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের কোন প্রার্থী নেই।

ফলে রাঙামাটিতে আঞ্চলিক তিন রাজনৈতিক দলের নিজস্ব ত্রিমুখী লড়াইয়ে যুক্ত হবেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রার্থী দীপংকর তালুকদারও,খাগড়াছড়িতে ইউপিডিএফ এবং জনসংহতি সমিতি(এমএনলারমা)র পাশাপাশি লড়বেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা। আবার রাঙামাটি আসনে মনোনয়নপত্র বাতিল হলেও নির্বাচন কমিশনে আবেদন করে মনোনয়ন ফেরত পেয়েছে পাহাড়ের বাঙালীভিত্তিক আঞ্চলিক সংগঠন পার্বত্য চট্টগ্রাম সমঅধিকার আন্দোলনের রাঙামাটি জেলা কমিটির সাধারন সম্পাদক এডভোকেট আবছার আলী।

একসময় যৌথখামার গড়ার স্বপ্ন বুনে গহীন বনে অস্ত্র হাতে ঘুরে বেড়িয়েছেন একসাথে,ঘুমিয়েছেন একই বিছানায়,সূদীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েছেন কখনো লড়াইয়ে,কখনো পাহাড়ের পথে পথে গোপন আস্তানায়,সেদিন বিশ্বাসই একমাত্র সম্বল ছিলো তাদের পরস্পরের প্রতি। ছিলো ভালোবাসা আর হৃদ্যতার মাখামাখিও। কিন্তু মাত্র ষোল বছরেই বদলে গেলো সব,বাঁক নিলো সম্পর্কে,শুরু হলো নানান টানাপোড়েন। প্রাপ্তি আর প্রত্যাশা,চিন্তা আর আদর্শের বিরোধ তাদের দুরত্ব ক্রমশঃ বাড়িয়ে দিয়েছে যোজন যোজন। এককালের ‘ভীষণ প্রিয়’ সহযোদ্ধারা এখন পরস্পরকে খুঁজে ফেরেন ‘ভালোবাসা’ নয়, ‘মৃত্যু’ উপহার দিতে। পারস্পরিক ঘৃণা আর প্রতিশোধ ছড়ানোর লড়াইয়ে ইতোমধ্যেই ত্রিধাবিভক্ত তারা। পাল্টাপাল্টি ‘হামলা’য় খুন হয়েছেন প্রায় সহস্রাধিক,প্রতিনিয়তই ঝড়ছে রক্ত,হচ্ছে অপহরণ,গুম। কিন্তু এই ‘জিঘাংসা’য় এবার আসছে নয়া মেরুকরণ।

পাহাড়ের আঞ্চলিক দলগুলোর নির্বাচনী লড়াইয়ে ভিন্নমাত্রা যোগ হচ্ছে এবার। প্রত্যেকের নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের প্রার্থী হলেও নির্বাচনী মাঠে থাকতে হবে ‘স্বতন্ত্র’ প্রার্থী পরিচয়েই। কারণ সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে নির্বাচন কমিশন কোন আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলকে নিবন্ধন দেয়নি। ফলে পার্বত্য এলাকার অঞ্চলভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো নিবন্ধিত সংগঠন না হওয়ায় তাদের দলীয় পরিচয় বাদ দিয় নির্বাচনী মাঠে থাকতে হবে ‘স্বতন্ত্র’ পরিচয়েই। কিন্তু বাইরে যতই স্বতন্ত্র পরিচয় থাকুক না কেনো,বাস্তবে ভেতরে আসল লড়াইটা হবে দলীয় পরিচয়েই।

এদিকে এই প্রথমবারের মতো সরাসরি নির্বাচনী মাঠে নেমেছে পাহাড়ী আঞ্চলিক তিন সংগঠন। সশস্ত্র আধিপত্যের লড়াইয়ের অধ্যায়ের সাথে যুক্ত নির্বাচনী অধ্যায়ও। ধারণা করা হচ্ছে,নির্বাচনে বিজয়ী হতে সর্বোচ্চ চেষ্টাই চালাবেন প্রতিটি দলের সদস্যরা। ফলে পাহাড়ের বিভিন্ন স্থানে নির্বাচন ইস্যুকে কেন্দ্র করে এই তিনটি দলের মধ্যে সংঘাত সহিংসতা হানাহানি বেড়ে যেতে পারে। সারাদেশে নির্বাচনী অনেকটা একতরফা বা প্রাণহীন হলে পাহাড়ে আঞ্চলিক দলগুলোর অংশগ্রহণের কারণে তা হয়ে উঠেছে অনেক বেশি প্রতিদ্বন্ধিতামূখর।

ইউপিডিএফ মুখপাত্র মাইকেল চাকমা বলেন,আমরা জয়ের জন্যই মাঠে নেমেছি। আমরা জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী। পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে পাহাড়ী নামধারী ব্যক্তি বিজয়ী হয়ে সংসদে যায়,তারা পাহাড়ীদের অধিকার আদায়ের ব্যাপারে কোন ভূমিকা না রেখে, দলীয় কর্মীর ভূমিকা রাখেন। তাই আমরা মনে করি পাহাড়ীদের সংসদে যেতে হবে,সত্যিকার অর্থে যারা পাহাড়ীদের প্রতিনিধিত্ব করে তারা যেনো বিজয়ী হয়ে নিজেদের কথা বলতে পারে সেই জন্যই আমরা নির্বাচনে যাচ্ছি। পাহাড়ের তিনটি সংগঠনেরই নির্বাচনে অংশ নেয়া সম্পর্কে তিনি বলেন, সবার অধিকার আছে নির্বাচনে অংশ নেয়ার,তাই হয়তো নিচ্ছে তারা। তবে আমরাতো সবসময়ই ‘সমঝোতা’র কথা বলি,নির্বাচনকেন্দ্রীকও সমঝোতা হতে পারে,যদি তারা চায়।

জনসংহতি সমিতি(এমএনলারমা)র কেন্দ্রীয় নেতা রূপায়ন দেওয়ান বলেন,পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের জন্যই আমরা মনে করেছি সংসদে যাওয়া দরকার,সংসদে এবং সংসদের বাইরে চুক্তি বাস্তবায়নের দাবি একযোগে করা গেলে বাস্তবায়নের সম্ভাবনা আরো বাড়বে। তাই আমরা নির্বাচনে যাওয়ার প্রয়োজন বোধ করেছি। জয়ের ব্যাপারে অবশ্যই আমরা আশাবাদী বলেই নির্বাচনী মাঠে নেমেছি। পাহাড়ের তিনটি রাজনৈতিক দলই নির্বাচনে যোগ দেয়ার ভোটের রাজনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে স্বীকার করে তিনি বলেন,জনগণ চাইলে যেকোন ধরণের নির্বাচনী সমঝোতা হতে পারে। তিনি বলেন,পাহাড়ের মানুষ আমাদের বিশ্বাস করে এবং আমাদের উপর আস্থা রাখে,তাই আমার বিশ্বাস তারা আমাদের প্রার্থীকেই নির্বাচিত করবে।

অন্যদিকে রাঙামাটি আসনের প্রার্থী ও জনসংহতি সমিতির কেন্দ্রীয় সহসভাপতি উষাতন তালুকদার,যিনি ২০০৮ সালের নির্বাচনেও অংশ নিয়েছিলেন, তিনি বলেন,-আমরা বিজয়ী হওয়ার জন্যই নির্বাচনে নেমেছি। জনসংহতি সমিতি পাহাড়ের সবচে বড় এবং জনপ্রিয় সংগঠন হিসেবে মনে করে,পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নসহ আদিবাসীদের ভূমি অধিকারসহ সকল সম্প্রদায়ের অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি সংসদে তুলে ধরা প্রয়োজন। তাই জাতীয় সংসদের নিজেদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার জন্যই আমরা নির্বাচনে নেমেছি। সুষ্ঠু ও অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে বিজয়ী হওয়ার ব্যাপারে নিজেদের দৃঢ় আশাবাদের কথা জানান তিনি। অন্য দুই আঞ্চলিক দলের সাথে নির্বাচনী সমঝোতার বিষয়ে এখনো কোন আলোচনা হয়নি বলেও জানান তিনি। নির্বাচিত হলে পার্বত্য রাঙামাটির সকল সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় কাজ করবেন বলে জানিয়েছেন তিনি।

তবে পাহাড়ের আঞ্চলিক দলগুলোর শীর্ষ নেতারা যাই’ই বলুক না কেনো.শেষ পর্যন্ত যদি তারা নির্বাচনের মাঠে থাকেন,তাহলে নিশ্চিত বলা যায়,আওয়ামী লীগের সাথে মূল লড়াইয়ের পাশাপাশি নিজেদের মধ্যেও ভোটের সমীকরণের লড়াই হবে ব্যাপক। আর এ লড়াইয়ে তারা কেউই চাইবেন না,কারো চেয়ে কম ভোট পেতে কিংবা হেরে জেতে। শংকাটাও এখানেই। লড়াই যেনো শেষ পর্যন্ত গনতান্ত্রিকই হয়,তা যেনো সংঘাতে রূপ না নেয় এমনই প্রত্যাশা সাধারন মানুষের।

Micro Web Technology

আরো দেখুন

নারীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় অবদান রাখবে কিশোরী ক্লাব

রাঙামাটির বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (এনজিও) প্রোগ্রেসিভের বাস্তবায়নে ‘আমাদের জীবন, আমাদের স্বাস্থ্য, আমাদের ভবিষ্যৎ’ এই প্রকল্পের …

Leave a Reply