নীড় পাতা » ফিচার » খোলা জানালা » সমাজভিত্তিক পর্যটন বিকাশে জেলা পরিষদের ভূমিকা

সমাজভিত্তিক পর্যটন বিকাশে জেলা পরিষদের ভূমিকা

lalit-c-chakmaপর্যটন বিষয়ে গণমানুষের ধারণা খুব একটা ইতিবাচক নয় এদেশের প্রেক্ষাপটে। আমাদের প্রেক্ষাপটে এ খাতটি যথাযথ বিকাশের দাবী রাখলেও অদ্যবধি খুব একটা অগ্রসরমান বিকাশ হয়েছে তেমনটা নজীর নেই। অথচ পৃথিবীর নানা দেশে পর্যটন খাত জাতীয় রাজস্ব আয়ের অন্যতম প্রধান খাত। জাতীয়ভাবে যেহেতু এ খাতটি আজও উপেক্ষিত খাত হিসেবে পরিগণিত তা সত্বেও নানা হিসাবের সমীকরণে এ খাতের উন্নয়নে আমাদের জেলা পরিষদ সমূহ কী পদক্ষেপ নিতে পারে বা তাদের ভূমিকা কী হতে পারে তার আলোকপাত করার লক্ষ্যে নিয়ে এই নিবন্ধের অবতারণা। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর প্রতি জেলা পরিষদের দায়িত্ব বা তাদের দায়িত্ব পালনে ক্ষমতা বা অক্ষমতার সীমারেখা টানার কোন প্রয়াস এখানে নেই। তবে, পর্যটন খাত যে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন তথা; আয়বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বাহ্যিক সংস্কৃতির সাথে আন্তঃক্রিয়া করণের সুযোগ প্রাপ্তি, পর্যটন ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ, পর্যটন খাত থেকে প্রাপ্ত আর্থিক সুবিধার ন্যায্য হিস্যা প্রাপ্তি ইত্যাদির নিরিখে সমাজ ভিত্তিক পর্যটন একটি নতুন প্রপঞ্চ। কাজেই, এ বিষয়ে মানুষের ধারণাগত জগৎকে নাড়া দিতে আমার এ ক্ষুদ্র প্রয়াস।

পার্বত্য এলাকার মানুষের মনে সমাজভিত্তিক পর্যটন তো দুরে থাক যেখানে প্রচলিত বা গণ পর্যটন নিয়েই মিশ্র অনুভুতি বিদ্যমান সেখানে এই পর্যটন ধারনা নিয়ে আলোচনার সুত্রপাত কতটুকু প্রাসঙ্গিক তা জানিনা তবে এ বিষয়ে আলোচনার সামাজিক প্রয়োজন থেকেই বিষয়টি জনসমক্ষে নিয়ে আসলাম। এ বিষয়ে যে কারওর জ্ঞানগর্ভ আলোচনা-সমালোচনাকে আমি স্বাগত জানাবো। ব্যাপক পরিসরে পর্যটন ধারণা নিয়ে বিশদ আলোচনার অবকাশ নেই বিধায় এখানে জনপ্রতিষ্ঠান হিসেবে জেলা পরিষদ সমূহ কী কী করতে পারে তা নিয়েই লেখার বিষয়বস্তু আবর্তিত হবে। মূল বিষয়ে যাবার আগে পর্যটন এবং সমাজ ভিত্তিক পর্যটন বিষয়ে কিছু স্পষ্টতা আনা জরুরী। আমার মনে হয়েছে যে সাধারণ হিসেবে আমরা পর্যটনের অর্থই পর্যটন বলে আমাদের ধারণাগত জগৎকে নিবৃত্ত রাখি। কিন্তু পর্যটনের যে অনেকগুলো ধারা আছে সে বিষয়ে আমাদের ধারণাগত স্বল্পতা যেমনি রয়েছে, তেমনি রয়েছে পর্যটন প্রভাব সম্পর্কে নানা উদ্বেগ, উৎকন্ঠা। সেকারণেই মনে হয় পর্যটন সংক্রান্ত এখানকার মানুষের মিশ্র অনুভুতি; নানা মাত্রায়, নানা ধঙে।

পর্যটন, বিভিন্ন গন্তব্যে মানুষের চলাচল এবং অবস্থান করা থেকে সৃষ্ট। পর্যটনের দুটি মৌলিক বিষয় রয়েছে; যথা- গন্তব্যে ভ্রমন এবং সেখানে থাকা। সংক্ষেপে, পর্যটনের অর্থই হল ভ্রমণকারীদেরকে তথ্য, পরিবহন, আবাসন, এবং অন্যান্য সেবাদান (ঘোষ,২০০১/রহমান, ২০১০)। ইংরেজীতে ‘ট্যুর’ শব্দটি ল্যাটিন থেকে উৎপত্তি। গ্রীক ভাষায় ‘টরনোস’ শব্দ চক্র অর্থ বহন করে। এই দুই শব্দের সাধারণ অর্থ হল অক্ষ বা কেন্দ্র বিন্দুর চারপাশে ঘুরাঘুরি করা। ফরাসি ভাষায় ‘ট্রাভেলি’ ইংরেজী ট্রাভেল মানেই কষ্টকর এর সমার্থক। এটি ইতিহাসের প্রথমযুগের প্রতিফলন ঘটায় যখন ভ্রমন আজকের দিনের মতো এতো সহজ ছিলনা। ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে, পর্যটন বিকশিত হতে শুরু করে যখন শিল্প বিপ্লব থেকে অর্থনৈতিক উন্নয়ন দ্বারা চাহিদা ও যোগান উভয় শর্তই পূরন হয়। ১৯৭০ দশক নাগাদ, গণ বিনোদনমূলক পর্যটন এবং এর সমজাতীয় বা ক্ষুদ্র স্বাতন্ত্র্যপূর্ণ অবকাশ সেবার ব্যাপক পরিসরের মোড়কায়ন বিশ্ব পর্যটনকে নিয়ন্ত্রণ করেছিল। শিল্প ক্ষেত্রে এই প্রবণতা গণপর্যটন উন্নয়ন হিসেবে জানা যায়। প্রধানত তাদের প্রদত্ত অবকাশ পরিষেবার সমরুপতার কারনে এই পরিষেবাসমূহের যোগানদারদের মধ্যে নিবিড় প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পেয়েছে । অধিকন্তু, গণপর্যটন পর্যটন বিকাশে বিবেচনাযোগ্য অস্থায়ীত্বশীল উপাদান সৃষ্টি করেছে (সিলভা এবং উইমালারাটানা)।

অন্যদিকে, সমাজভিত্তিক পর্যটন হল গণপর্যটন এর পরিবর্তে একটি নতুন ধারণা ও কৌশল। Responsible Ecological Social Tours (REST) এর মতে, ‘সমাজভিত্তিক পর্যটন হল পর্যটনই যা পরিবেশগত, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক স্থায়ীত্বশীলতাকে গুরুত্ব দেয়। এটি জনগোষ্ঠীর জন্য, জনগোষ্ঠীর মালিকানাধীন ও তাদের দ্বারা পরিচালিত এবং জনগোষ্ঠীর ও স্থানীয় জীবনধারা সম্পর্কে দর্শণার্থীদের জানতে ও সচেতনতা বৃদ্ধিকরণে সহায়ক উদ্দেশ্যপূর্ণ’। সমাজভিত্তিক পর্যটন একটি স্বাগতিক-দর্শণার্থীর মধ্যকার পারস্পরিক উপকারযুক্ত আন্তক্রিয়া যা স্থায়ীত্বশীল উপায়ে ব্যক্তিগত তথা সমষ্টিগত সুবিধার সর্বোচ্চ করণে সকল অংশীজনদের মধ্যকার ‘জয়-জয়’ সহযোগিতা অর্জনে সহায়তা করে। এটি পর্যটন দ্বারা প্রয়োজনীয় উৎকর্ষ সাধিত এবং সংশ্লিষ্ট কার্যাবলী এক বা একাধিক নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠী দ্বারা পরিচালিত ও মালিকানাধীন (সিলভা এবং উইমালারাটানা)।

মোট কথা, সমাজ ভিত্তিক পর্যটন হল পর্যটনেরই একটি শাখা। বর্তমানকালে এই ক্ষ্রেত্রর মনিষীরা এটাকে পর্যটনের উৎকৃষ্ট রুপ হিসেবে পরিগণিত করে কেননা; এটি আয় বৃদ্ধি ও দারিদ্র্য হ্রাস, সম্পদ সংরক্ষণে জনগনকে উদ্বুদ্ধকরণ এবং পর্যটনের যথাযথ শাসন ও ব্যবস্থা গঠনে জনগনকে দায়িত্বশীল করার মাধ্যমে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর চাহিদা পরিপূরণ করে। এটি অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশত বিষয়ে স্থায়ীত্বশীলতাও নিশ্চিত করে। কাজেই, এই রূপ পর্যটন বর্তমান বিশ্বে স্বাগত এবং এটি এখন একটি গণআন্দোলন রূপে পরিগ্রহ করছে।rainna-tugun-cover-01

১৯৮৯ সালে সরকার কর্তৃক আইন পাশ এবং তৎবলে তিন পার্বত্য জেলার জন্য তিনটি পৃথক ‘স্থানীয় সরকার পরিষদ’ গঠিত হওয়ার পর জেলার উন্নয়ন কর্মকান্ডের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। অন্যান্য স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান যেমনঃ উপজেলা পরিষদ, ইউনিয়ন পরিষদ ও বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড’ এর ক্ষমতা ও কার্যক্রমের পরিসীমার নিরিখে জেলা পরিষদেও কার্যপরিসীমা ব্যাপক। সেই হিসেবে এই গণপ্রতিষ্টানটি কিছু কিছু ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা থাকা সত্বেও জেলার উন্নয়ন বিশেষত াবকাঠামো উন্নয়নে জন্ম লগ্ন থেকেই কাজ কওে যাচ্ছে। তবে এ প্রতিষ্ঠানটির এযাবৎ কালের উন্নয়ন তৎপরতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে যে, পর্যটন খাতে এর অবদান যৎসামান্যই বলা যায়। বিগত ৫ বছওে রাঙ্গামাটি জেলা পরিষদ ৪ কোটি ৫৮ লক্ষ টাকা খরচ করে এবং ২০১৪-১৫ অর্থ বছরে ১ কোটি টাকা বাজেটে বরাদ্ধ রাখে ( www.pahar24.com)। পরিমাণ বিবেচনায় বাজেটে বরাদ্ধকৃত এ অর্থ অত্যন্ত নগন্য হলেও জনচাহিদার নিরিখে এটাকে সামান্য বলার জো নেই। তবে, প্রশ্নটা হল সুনিদিষ্টভাবে রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ ঐ ব্যয়িত অর্থ পর্যটন খাতের কোন দৃশ্যমান জায়গায় ব্যয় করেছে তার সঠিক তথ্য আমার জানা নেই। আর এখানেই ফুটে উঠে যে, এ খাতটি উক্ত জেলা পরিষদের অগ্রাধিকারভূক্ত খাত না হওয়ার বিষয়টি। অথচ আইন অনুযায়ী রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান হিসেবে ‘স্থানীয় পর্যটন’ পরিচালনা করার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত। আইনের পরিভাষায় স্থানীয় পর্যটনর্ কি অর্থে বুঝানো হয়েছে তা স্পষ্ট না হলেও জেলার পর্যটন সংক্রান্ত বিষয়াদি দেখভাল করার আইনী কর্তব্য পালনকে ধরে নিলেই মনে হবে জেলা পরিষদ অনেক পিছিয়ে রয়েছে। সঙ্গত কারনেই স্থানীয় পর্যটনের অর্থ দাড়ায় ‘বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশন’ এর স্থানীয় কর্মতৎপরতা যার মধ্যে রয়েছে হলিডে রিসোর্টও। সরকার কর্তৃক এ রিসোর্ট পরিচালনাভার যদি জেলা পরিষদ সমূহের কাছে ন্যস্ত করা হয় এবং জেলা পরিষদগুলো শুধু পর্যটন মোটেলগুলো পরিচালনার মধ্যে তাদের কর্মতৎপরতা সীমাবদ্ধ রাখে তবে ধরে নিতে হবে যে স্থানীয় পর্যটন বিষয়টি তাদের কাছে হস্তান্তর করা না করা একই অর্থ দাড়াবে। সম্প্রতি পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাননীয় সচিব মহোদয় রাঙ্গামাটির এক সভায় বলেন ‘পার্বত্য চুক্তির আলোকে সরকার স্থানীয় পর্যটন বিভাগকে এ মাসেই তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের নিকট হস্তান্তর করা হবে। জেলা পরিষদের আওতায় স্থানীয় পর্যটন বিভাগকে হস্তান্তর করা গেলে এ অঞ্চলে পর্যটন শিল্প বিকাশে একটি সুযোগ তৈরী হবে’ (হিলবিডি২৪.কম, ১৭ আগষ্ট)। নানামুখি সুযোগ যে সৃষ্টি হবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। তবে আমাদের বুঝতে হবে এই সুযোগ গুলো কি কি উপায়ে, কোন কোন ক্ষেত্রে এবং কখন ও কার কাছে যাবে। তার জন্য দরকার এই বিষয়ে যারা চিন্তাভাবনা করেন বা কাজ করে চলেছেন তাদের সমন্বয়ে একটি সমন্বিত মঞ্চ তৈরী করার উদ্যোগ গ্রহন।

উদ্যোগ গ্রহণ ও উন্নয়ন বিনিযোগের বিবেচনায় তিন পার্বত্য জেলার মধ্যে বান্দরবান পার্বত্য জেলা অনেকটা এগিয়ে। নৈসর্গীক সৌন্দর্য্য এবং অনুকুল পরিবেশ এর প্রধান নিয়ামক হলেও এমন এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সাহসী ভুমিকাকে খাটো করে দেখার অবকাশ নেই। এখানেও বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ পিছিয়ে রয়েছে। বান্দরবানে পর্যটন শিল্প বিকাশে জেলা পরিষদের তুলনায় জেলা প্রশাসনের ভূমিকা অগ্রগণ্য। বান্দরবান জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত ‘মেঘলা পর্যটন কমপ্লেক্স’ ও ‘নীলাচল পর্যটন কেন্দ্র’ এখন দেশব্যাপী পরিচিত নাম। দেশী-বিদেশী পর্যটকদের কাছে এই স্থাপনাসমূহ বান্দরবান জেলার নতুন পরিচিতি এনে দিয়েছে। অথচ আইনী দায়িত্ব থাকার পরও সেখানকার জেলা পরিষদ কেনো এরকম কোন উদ্যোগ নিতে পারেনি তা বোধগম্য নয়। সার্বিক বিবেচনায় তাই মনে হয় যে, জেলা পরিষদ সমূহ এই শিল্প খাতের উন্নয়নে বরাবরই উদাসীন থেকেছে। ভবিষ্যতেও হস্তান্তরিত বিভাগ হিসেবে শুধুমাত্র পর্যটন কর্পোরেশনের সংশ্লিষ্ট জেলায় অবস্থিত মোটলসমূহ পরিচালনাভার নিয়েই পার্বত্য জেলা পরিষদ সমূহ তৎপরতায় সীমাবদ্ধ থাকুক তা কারওর কাম্য নয়। আর তা হলেই ধরে নিতে হবে ‘স্থানীয় পর্যটন’ বিষয় হিসেবে পার্বত্য জেলা পরিষদ সমূহের কাছে হস্তান্তর হওয়া-না হওয়া সমান কথা।

পর্যটন বিচিত্রা নামক এ সাময়িকীতে প্রকাশিত ‘পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে রিয়েল এস্টেট কোম্পানী’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে দেশের শীর্ষস্থানীয় রিয়েল এস্টেট কোম্পনীর কর্ণধারগণ দেশের পর্যটন সম্ভানাময় অঞ্চলগুলোর মধ্যে কক্সবাজার এরপর রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান জেলাকে শীর্ষতালিকায় স্থান দিয়েছেন। তাদের বিবেচনায় সেন্টমার্টিন, কুয়াকাটা, সুন্দরবন এবং সিলেটের চেয়েও সৌন্দর্য্যর আবেদন ও সম্ভাবনায় এগিয়ে আমাদের রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান জেলা। কিন্তু কি কারণে এখানে এ শিল্পের কাঙ্খিত বিকাশ ঘটছেনা তা খতিয়ে দেখা দরকার উৎসুক মননে। গভীরতার মধ্যে ডুবে যদি কারন সমূহ অনুসন্ধান করা যায় তবে, চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলায় খুব একটা বেগ পেতে হবে না। বিনিয়োগ কারীরা যদি বিনিয়োগে উৎসাহী হয় তবে সরকার ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান গুলোকে এতে সর্বাতœক সহযোগিতা দিতে হবে।

পর্যটন শিল্প খাতটি একটি বহুমাত্রিক কর্মসংস্থান সৃষ্টির খাত হিসেবে বিবেচ্য। শিল্প-কল-কারখানা বিহীনএ অঞ্চলে সামাজিক ভারসাম্য রক্ষা ও অর্থনৈতিক বিকাশ নিশ্চিত করতে হলে যুবদের কর্মসংস্থান সৃষ্টিকরণ একটি অগ্রাধিকার ইস্যু হিসেবে পরিগণিত করতে হবে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা না গেলে সংঘাত, অস্থিরতা এবং পশ্চাৎপদতা এগুলোর এখানকার মানুষের নৈমিত্তিক অনুষঙ্গ হয়ে থাকবে। পর্যটন শিল্পখাতের বিকাশ সাধিত হলে বেকার যুব থেকে শুরু করে, দোকানদার, হোটেল মালিক, পরিবহন শিল্পসহ ক্ষুদ্র ও মাঝারী শিল্প উদ্যোক্তা, রাষ্ট্রীয় রাজস্বআয় সব কিছূতেই ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। যথাযথ প্রণোদনার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে লুপ্ত প্রতিভার উন্মেষ ঘটিয়ে এর সদ্ব্যবহার করতে পারলে এখানকার জনজীবনে শান্তি, সম্প্রীতি ও অগ্রগতি সহ শিল্পায়নের প্রাথমিক দ্বার উম্মোচিত হবে। তবে সে ক্ষেত্রে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ হিসেবে জেলা পরিষদ সমূহকে বাড়তি দায়িত্বশীলতা অবশ্যই গ্রহণ করতে হবে। কর্তৃপক্ষসমূহকে স্থানীয়দের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়েই পর্যটন বিকাশের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। প্রয়োজন হলে জেলা পরিষদের নেতৃত্বে একটি ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং টীম গঠন করে সিকিম, শ্রীলংকা, আসাম, নেপাল এবং থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায় সমাজভিত্তিক পর্যটন বিকাশের কলা কৌশলগুলোর উপর অধ্যয়ন করা যেতে পারে। তাদের অভিজ্ঞতা ও কৌশলগুলো রপ্ত করে এ শিল্প বিকাশে পদক্ষেপ নেওয়া হলে আমার বিশ্বাস স্থানীয় লোকজনের জীবন-জীবকার পরিবর্তনসহ আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন সাধিত হবে।rainna-04
পার্বত্য জেলাসমূহে সমাজ ভিত্তিক পর্যটন বিকাশে জেলা পরিষদ সমূহ যে সকল উদ্যোগ বা পদক্ষেপ নিতে পারেঃ
১. কালের উৎসূক ফটোগ্রাফার, ফটো সাংবাদিক এবং আগ্রহী যুবদের দ্বারা ইকো ট্যুরিজম বা সমাজ ভিত্তিক পর্যটন স্পট গুলো চিহ্নিত করার জন্য ‘এক্সপ্লোরিং ট্যুর স্পন্সশিপ প্রোগ্রাম’ চালু করা যেতে পারে। জেলা পরিষদ সমূহ নিজে বা অন্য কোন সংস্থা দ্বারা এ ট্যুরগুলোর অর্থায়ন করতে পারে। কাংখিত এক্সপ্লোরারগণ নিজ উদ্যোগে নানা এলাকা ঘুরে সম্ভাবনাময় স্পট গুলোর ছবি সংগ্রহ করবেন।
২. এক্সপ্লোরারগণদের কাছ থেকে প্রাপ্ত ছবি ও মতামত সংগ্রহ পূর্বক স্ব-স্ব জেলায় ইকো ট্যুরিজম বা সমাজ ভিত্তিক পর্যটন বিকাশে সম্ভাবনাময় গ্রাম সমূহ চিহ্নিত করে সেখানে একটি করে ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন বা বিদ্যমান গ্রাম উন্নয়ন কমিটির সাথে অংশীদারিত্ব স্থাপন করা যেতে পারে।
৩. গ্রাম উন্নয়ন কমিটির সাথে দ্বি-পাক্ষিক চুক্তিতে উপনীত হয়ে পর্যটন উদ্যোগ গ্রহণ এবং ব্যবস্থাপনা বিষয়ে গ্রামবাসীর ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে নানা কর্মসূচীর উদ্যোগ নিতে পারে। এ ক্ষেত্রে আগ্রহী ও যোগ্যতা সম্পন্ন স্থানীয় বেসরকারী সংস্থা সমূহের সাহায্য সহযোগিতা নেওয়া যেতে পারে।
৪. গ্রাম উন্নয়ন কমিটির আগ্রহ ও সম্মতি থাকলে দ্বিপাক্ষিক চুক্তির আওতায় জেলা পরিষদ সমূহ স্ব-স্ব জেলায় শুধুমাত্র পর্যটন খাতে বরাদ্ধকৃত বাজেট দিয়ে প্রতিবছর অন্ততপক্ষে ২ টি গ্রামে সমাজ ভিত্তিক পর্যটনের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ করে যেতে পারে। প্রতি জেলায় যদি পর্যটন খাতে প্রতি বছর ১ কোটি টাকা বরাদ্ধ করা হয় তাহলে ৫০ লক্ষ টাকা করে এক একটা গ্রামে অবকাঠামো নির্মীত হলে ২ টি গ্রামে উন্নয়নের বিকেন্দ্রীভূত পদ্ধতির যথাযথ প্রয়োগ ঘটবে।
৫. সমাজভিত্তিক পর্যটনের আওতাভূক্ত গ্রামগুলোর প্রতি বছরের আয় থেকে একটি নিদিষ্ট পরিমাণ আয় জেলা পরিষদের তহবিলে যুক্ত করা হলে সেই অর্জিত অর্থদিয়ে একটি ‘পর্যটন সহায়ক তহবিল’ গড়ে উঠতে পারে। আর সেই তহবিলের অর্থ পরবর্তীতে পুনঃবিনিয়োগ করা যেতে পারে অন্য গ্রামের উন্নয়নের জন্য।
৬. অর্থের অপচয় রোধ করতে পৌর এলাকার বাইরে অন্য কোথাও সম্ভাবনাময় গ্রাম সমূহে পর্যটন খাতের অর্থ বিনিয়োগ করতে হবে। পৌর এলাকায় সৌন্দর্য্য বৃদ্ধির দায়িত্ব পৌর কর্তৃপক্ষের উপরই ছেড়ে দিতে হবে।
৭. প্রকৃতি, প্রবিবেশ, স্থানীয় সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ, নৃতাত্বিক বৈশিষ্ট্য সমুন্নত রাখার লক্ষ্যে পর্যটকদের দায়িত্বশীলতা ও সংবেদনশীলতা তৈরীর লক্ষ্যে গণমাধমে প্রচার-প্রচারণা বৃদ্ধি করতে পারে।
৮. জেলা শহরের পর্যটন কমপ্লেক্স এ একটি করে পর্যটন তথ্য সেবা কেন্দ্র চালু করে এবং ওয়েভ পেইজ খুলে নান্দনিক স্থান সমূহের উপর পর্যটকদের তথ্য সরবরাহ করার উদ্যোগ গ্রহন করা যেতে পারে।rainna-02

আশাকরি, জেলা পরিষদ সমূহ আগ্রহী হলে এরকম জনবান্ধন উন্নয়ন তৎপরতা শুধুমাত্র পর্যটন খাতেই নয় এটি জেলা পরিষদ সমূহের বিকেন্দ্রীকৃত উন্নয়ন মডেলের নজীর স্থাপন করবে এবং উন্নয়ন পক্রিয়ায় জনমানুষের অংশগ্রহণ ও মালিকানার আবহ সৃষ্টি করে স্থায়ীত্বশীলতার একটি অনন্য দৃষ্টান্ত হাজির করবে। জেলা পরিষদ ও স্থানীয় জনগণের মধ্যে এক ধরণের ভ্রাতৃত্বপূর্ণ ও দায়িত্বশীল সম্পর্কের সেতুবন্ধ রচিত হবে। স্থানীয় মানুষের আয় রোজগার এর সুযোগ সৃষ্টি হয়ে মানুষের কর্মক্ষমতা, সৃজনশীলতা এবং শান্তিতে সহবস্থানের মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত হবে। পরমুখাপেক্ষীতা ও সরকারী সাহায্য সহযোগিতা মুখী প্রবণতার বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটাতে হলে মানুষের সম্ভাবনাকে আমলে নিতে হবে। মানুষকে নিজের প্রতি আস্থা আর বিশ্বাস অর্জনে সহযোগিতার নমূনা তৈরী করে দেওয়া গেলে উন্নয়নের সর্বোচ্চধাপ অর্জন হবে আপনাআপনিই। কাজেই জেলা পরিষদ সমূহকে এখনই প্রস্তাবগুলো বিবেচনায় নিয়ে পরীক্ষামূলক কাজ করে যেতে হবে। ক্ষমতার বলয়ে দায়িত্বগ্রহণের চাইতে এখানকার মানুষের প্রতি কর্তব্য পালন এখন জেলা পরিষদ সমূহের কাছে নতুন চ্যালেঞ্জ। এখানকার প্রতিনিধিদের দ্বারা পরিচালিত এ জনপ্রতিষ্ঠানগুলো নিশ্চই পাহাড়ের মানুষগুলোর দুঃখ, কষ্ট, চাওয়া-পাওয়া, অভাব-অভিযোগ সর্ম্পকে ওয়াকিবহাল আছে। কাজেই তাদের কর্তব্য পালনে কেন্দ্রমুখাপেক্ষীতার সংস্কৃতি থেকে বেড়িয়ে এসে এখানকার মানুষের কল্যানেই সঠিক পদক্ষেপটি বেঁচে নিতে সাহসী ভূমিকা রাখতেই হবে। তবেই পার্বত্য চট্টগ্রাম একটি শান্তিপূর্ণ জনপদের অভিধা অর্জনের পথে ক্রমান্বয়ে অগ্রসর হবে।

তথ্য নির্দেশ/সহায়ক গ্রন্থপঞ্জী

হিলবিডি২৪.কম, ১৭ আগষ্ট।
পর্যটন বিচিত্রা, ঢাকা, সংখ্যা-৫, এপ্রিল ২০১০।
অফরোজ, নূসরাত নাহিদা ও মোঃ হাসানুজ্জামান (২০১২)ঃ প্রোবলেম এন্ড প্রসপেক্ট অব ট্যুরিজম ইন বাংলাদেশ: বান্দরবান ডিষ্ট্রিক্ট কেইস, গ্লোবাল জার্নাল অব ম্যানেজমেন্ট এন্ড বিজনেস রিসার্চ, সংখ্যা ১২।
Häusler, Nicole & Strasdas, Wolfgang (January 2002): Training Manual for Community-based Tourism,
DSE-ZEL Zschortau. DSE DOKU 1956, Germany.
Heredge. Marianne, (2006):Pro-poor tourism: is it an answer to poverty alleviation?. Retrieved from (www.mtnforum.org)
Haroon, Agha Iqrar (2000): Role of communities in ecotourism, Ecotourism Society Pakistan, Pakistan
Choudhury, Maitreyee (2001): Community Development and Tourism: The Sikkim Experience in the Eastern Himalayas, World Mountain Symposium 2001.
http://wordpress-23193-50017-134259.cloudwaysapps.com
Sharma et al (2000): Ecotourism in Sikkim: Contributions toward Conservation of Biodiversity Resources, in Institutionalizing Common Pool Resources, ed. by D. Marothia, Concept Publishing Company, New Delhi
Rahman, Md. Lutfur at el (December 2010 ): An Overview of Present Status and Future Prospects of the Tourism Sector in Bangladesh: Journal of Bangladesh Institute of Planners Vol. 3, pp. 65-75, Dhaka.

Silva, Dr. D. A. C. and Wimalaratana, Dr (Rev.) W.: Community Based Sustainable Tourism Development in Sri Lanka: Special Reference to Moneragala District.

লেখক : একজন উন্নয়ন সংগঠক এবং সাস নামক স্থানীয় উন্নয়ন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক পদে কর্মরত।

Micro Web Technology

আরো দেখুন

কাপ্তাইয়ে করোনা সংক্রমণ কমছে

প্রশাসনের কঠোর নজরদারি এবং থানা পুলিশের তৎপরতায় রাঙামাটির কাপ্তাইয়ে করোনা সংক্রমন হার কমছে। কাপ্তাই উপজেলা …

One comment

  1. Good and an effective idea, I think. If the initiatives are taken a good result must come out.Thanks Lalit C for giving a creative idea.

Leave a Reply

%d bloggers like this: