নীড় পাতা » খাগড়াছড়ি » সভাপতি-সম্পাদক নিয়ে বেকায়দায় খাগড়াছড়ি ছাত্রলীগ?

সভাপতি-সম্পাদক নিয়ে বেকায়দায় খাগড়াছড়ি ছাত্রলীগ?

কমিটি গঠনের দীর্ঘ ৪ বছরেও সংগঠনের বর্ধিত সভা করতে না পারা, নতুন ইউনিটের সম্মেলন দিতে না পারা, দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে অবস্থান, নেতাকর্মীদের সাথে সমন্বয়হীনতা, অযোগ্য লোকদের পদ দেয়া, দলে বিভক্তি, কেন্দ্রের নির্দেশ অমান্য, শৃঙ্খলা ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেয়াসহ বিস্তর অভিযোগ জমেছে খাগড়াছড়ি জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি টিকো চাকমা ও সাধারণ সম্পাদক জহির উদ্দিন ফিরোজের বিরুদ্ধে।

ইতিমধ্যে এই সংক্রান্ত বেশ কিছু অভিযোগ কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সভাপতি-সম্পাদকের কাছে জমা দিয়েছে খাগড়াছড়ি জেলা ও উপজেলা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। তারা বলছেন, গত ৪ বছরে ছাত্রলীগকে বিভক্ত করে ব্যক্তি স্বার্থে, নানাভাবে দলের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে সাংগঠনিকভাবে দুর্বল করেছে সভাপতি-সম্পাদক। নেতাকর্মীকে বহিষ্কার কিংবা পুনর্বহাল দুটো সভাপতি-সম্পাদকের ইচ্ছেতে চলে। এই বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলেও প্রতিকার পাওয়া যায়নি। ইতিমধ্যে এই বিষয়ে জানতে কেন্দ্রীয় নেতারা খাগড়াছড়ি জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি ও ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের সাথে যোগাযোগ করেছেন বলে জানা গেছে। তবে এসব ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখছেন সভাপতি টিকো চাকমা ও সম্পাদক জহির উদ্দিন ফিরোজ।

জানা যায়, ২০১৫ সালের ১ জুন খাগড়াছড়ি জেলা ছাত্রলীগের সম্মেলনের ১৪ দিন পর কমিটি অনুমোদন দেয় কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ। এই কমিটি নিয়ে দলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ ছিল। কারণ খাগড়াছড়ি ছাত্রলীগের ইতিহাসে এটিই ছিল নেতাকর্মীদের ভোটে নির্বাচিত কমিটি। তবে নেতাকর্মীদের উৎসাহে ভাটা পড়ে। কমিটি গঠনের পর থেকে সভাপতি সম্পাদক কোন বর্ধিত সভা করতে পারেননি। প্রত্যেকটা উপজেলা কমিটির বয়স ৫ থেকে ৭ বছর পেরিয়ে গেলেও দিতে পারেনি কোন সম্মেলন। অভিযোগ রয়েছে ওয়ার্ড, ইউনিয়ন পর্যায়ের কোন কমিটিতে পদে না থাকার পরও অনেককে জেলা ছাত্রলীগে পদ দেয়া হয়েছে। এতে অসন্তুষ্ট নেতাকর্মীরা।

মানিকছড়ি উপজেলা কমিটির সভাপতি মোঃ আলমগীল হোসেন বলেন, এখনকার চেয়ে ছাত্রলীগের আগের কমিটি অনেক শক্তিশালী ছিল। নতুন জেলা ছাত্রলীগ কমিটি গঠনের পর পদ পদবি থাকলেও সম্মিলিত সাংগঠনিক কর্মকান্ড নেই। নেতাকর্মীদের সাথে যোগাযোগ নেই। একসাথে বসে সাংগঠনিক কর্মকান্ড শক্তিশালী করা, নেতাকর্মীদের উজ্জীবিত করার মতও কোন কর্মকান্ড নেই। তারপরও এরমাঝে আমরা উপজেলা ছাত্রলীগ ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে যাচ্ছি।

জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি-সম্পাদকের কাছে প্রতিকার না পেয়ে দুই দফায় কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছে পানছড়ি উপজেলা আওয়ামীলীগ ও ছাত্রলীগ। এতে শৃঙ্খলা ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেয়া, কারণ ছাড়া শৃঙ্খলা ভঙ্গকারীর বহিষ্করাদেশ প্রত্যাহারসহ বেশ অভিযোগ করা হয়।

অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, পানছড়ি উপজেলা আওয়ামীলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জয়নাথ দেবের ওপর হামলার ঘটনায় উপজেলা ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক তোফাজ্জল হোসেনসহ বেশ কয়েকজন জড়িত ছিল। এই সংক্রান্ত মামলা চলমান। একই সাথে তোফাজ্জল হোসেন একটি ধর্ষণ মামলার আসামি। দলের সাংগঠনিক সম্পাদক মোঃ শামিম ইয়াবাসহ পুলিশের কাছে আটক হয়। তাদের বিরুদ্ধে জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি-সম্পাদককে সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বলা হলেও কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। উল্টো কোন কারণ ছাড়া ২০১৫ সালে ছাত্রলীগ থেকে বহিষ্কৃত সহ সভাপতি মশিউর রহমানের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করে পুনর্বহাল করা হয়।

পানছড়ি উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি শ্রীকান্ত দেব মানিক বলেন, সভাপতি-সম্পাদক থেকে আজ পর্যন্ত কোন ধরনের সাংগঠনিক সহযোগিতা পাইনি। উল্টো শৃঙ্খলা ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বলায় আমাদের কমিটির কার্যক্রম স্থগিত করা হয়। যদিও পরে তা প্রত্যাহার করে। জামাত-বিএনপির ইন্দনদাতা মশিউর রহমানকে কোন কারণ ছাড়া বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করে। সভাপতি সম্পাদক কারো সাথে আলোচনা না খেয়াল খুশিমত সিদ্ধান্ত দিচ্ছে।

মহালছড়ি উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি জিয়াউল ইসলাম বলেন, জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি-সম্পাদক সাংগঠনিক অবস্থা জানতে কোনদিন আমাদের সাথে যোগাযোগ করেনি। বিভক্ত ছাত্রলীগের সভাপতি-সম্পাদক কর্মকান্ড থেকে আমরা দূরে ছিলাম। তাই আমাদের মধ্যে কোন গ্রুপিং সৃষ্টি হয়নি।

খাগড়াছড়ি জেলা ছাত্রলীগের সহ সভাপতি নুরুল আলম রনি বলেন, অযোগ্য নেতৃত্ব, দলে গ্রুপিং ও ভিন্ন মতাদর্শীদের নেতা বানানোর কারণে দল সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হয়ে গেছে। এছাড়া জেলা ছাত্রলীগ গঠনের ৬ মাস পর পৌর নির্বাচনে সভাপতি-সম্পাদক বিভক্ত অবস্থান নেয়ায় তা তৃনমুল নেতাকর্মীদের মাঝে প্রভাব পড়ে। দলের বিভিন্ন পদে আঞ্চলিক সংগঠনের লোকজনকেও ঠাঁই দেয়া হয়েছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।

২০১৫ সালে খাগড়াছড়ি পৌর নির্বাচনে সভাপতি টিকো চাকমা ও জহির উদ্দিন ফিরোজ বিভক্ত অবস্থান নেন। টিকো চাকমা আওয়ামীলীগ মনোনিত প্রার্থী মোঃ শানে আলমের পক্ষে অবস্থান নিলেও জহির উদ্দিন ফিরোজ স্বতন্ত্র প্রার্থী ও বর্তমান আলোচিত সমালোচিত পৌর মেয়র মোঃ রফিকুল আলমের পক্ষে অবস্থান নেন। গ্রুপিং এর শুরু সেখান থেকে। সর্বশেষ সংসদ নির্বাচনেও জহির উদ্দিন ফিরোজ দলের মনোনিত প্রার্থী খাগড়াছড়ি জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি ও বর্তমান সংসদ সদস্য কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে মানববন্ধনে অংশ নেন। মূলত পৌর নির্বাচনের পর থেকে আলোচিত আলম পরিবারের পক্ষে অবস্থান নিয়ে আলাদাভাবে সাংগঠনিক কার্যক্রমে অংশ নেন। যাদের ছবি এখনো ফিরোজের ফেসবুক আইডিও কাভার ফটোতে রয়েছে।

তবে খাগড়াছড়ি জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক জহির উদ্দিন ফিরোজ তাঁর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলো ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, ‘আমি পৌর নির্বাচনে মাটিরাঙ্গায় নৌকার প্রার্থী মোঃ শামছুল হকের পক্ষে কাজ করেছি। আর সংসদ নির্বাচনের আগে আমিসহ বেশ কয়েকজন নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা ছিল। আমরা চেয়েছি নির্বাচনের আগে যেন মামলাগুলোর সমাধান হয়। তারপরও আমরা নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীকে বিজয়ী করতে পুরোদমে মাঠে ছিলাম। দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান ছিল না বলে জানান তিনি। এদিকে দলে গ্রুপিং এর কারণে সাংগঠনিক তৎপরতা বৃদ্ধি ও শৃঙ্খলাভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থ নিতে না পারার বিষয়টি স্বীকার করেন।

খাগড়াছড়ি জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি টিকো চাকমা বলেন, জেলা ছাত্রলীগের দ্বায়িত্ব নেয়ার ৬মাসের মাথায় পৌর নির্বাচন নিয়ে সংগঠনে বিরোধ দেখা দেয়। সে সময় আমি নৌকা প্রতীকের পক্ষে থাকলেও সাধারণ সম্পাদক স্বতন্ত্র প্রার্থী রফিকুল আলমের পক্ষে অবস্থান নেয়। সেখান থেকে দলে গ্রুপিং শুরু হয়। সম্পাদক বার বার দলের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ার কারণে দলকে সেভাবে চাঙ্গা করতে পারিনি। বিভক্তির কারণে শৃঙ্খলা ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া, ইউনিটের সম্মেলন দেয়ার মত কাজ করতে পারিনি।

তবে আঞ্চলিক সংগঠনের গোপন সম্পৃক্ততা, চাকরীর প্রলোভন দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ, বিভিন্ন ইউনিট থেকে মাসোহারা আদায়সহ নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি সাক্ষাতে কথা বলবেন জানালেও আর দেখা করেননি।

তবে সভাপতি-সম্পাদক দুইজন আগামী নভেম্বরের মধ্যে জেলা উপজেলার প্রত্যেকটা ইউনিটের সম্মেলন দিয়ে নতুন নেতৃত্বের কাছে দলের ভার তুলে দেয়ার কথা বলেছেন।

খাগড়াছড়ি জেলা আওয়ামীলীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নির্মলেন্দু চৌধুরী বলেন, পৌর নির্বাচন থেকে ছাত্রলীগে যে গ্রুপিং সৃষ্টি হয়েছিল তা সংগঠনটিকে আলাদা করে ফেলেছে। বিষয়গুলো আমরা কেন্দ্রেও জানিয়েছিলাম। আপাতত তাদেরকে আমরা বলেছি দ্রুত জেলা উপজেলার সম্মেলনগুলো দিতে। নতুন নেতৃত্ব আনা গেলে দল নতুন করে চাঙ্গা হবে।

Micro Web Technology

আরো দেখুন

বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নির্মাণে বিরোধীতার প্রতিবাদ রাঙামাটিতে

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য নির্মাণে বিরোধীতার নামে ‘উগ্রমৌলবাদ ও ধর্মান্ধগোষ্ঠীর জনমনে বিভ্রান্তির …

Leave a Reply