নীড় পাতা » পাহাড়ের রাজনীতি » সবুজ পাহাড়ে হিংসার ঝরনাধারা

সবুজ পাহাড়ে হিংসার ঝরনাধারা

pic-01১৯৯৭ সালে ২ ডিসেম্বর পার্বত্য শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের পর পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষ যখন স্বস্তি আর শান্তির সম্ভাবনায় বিমোহিত,সেই সম্ভাবনা তিরোহিত হতে সময় লাগেনি। চুক্তি সাক্ষরের পর খাগড়াছড়ি স্টেডিয়ামে আনুষ্ঠানিক অস্ত্র সমর্পণের সময়ই চুক্তির বিরোধীতা করে স্টেডিয়ামেই নিজেদের উপস্থিতি জানান দেয়,পরবর্তীতে চুক্তিবিরোধী হিসেবে পরিচিত এবং সংগঠিত ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)। পরে চুক্তিস্বাক্ষরকারী পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) এর সাথে পাহাড়ে আধিপত্য নিয়ে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে সংগঠনটি। ১৯৯৮ সালের ২৬ ডিসেম্বর ঢাকায় আনুষ্ঠানিক এক কনভেনশনের মাধ্যমে যাত্রা শুরু করে এই সংগঠনটি। আর গত ১৫ বছরেও থামেনি এই সশস্ত্র সন্ত্রাস। যদিও তারা উভয়পক্ষই এই বিরোধে নিজেদের দায়দায়িত্ব স্বীকার করেনা কখনই।
২ ডিসেম্বর চুক্তি সাক্ষরের মাত্র ৪৭ দিন পর ১৯৯৮ সালের ১৮ জানুয়ারি রাঙামাটির জেলার নানিয়ারচর উপজেলাধীন কুতুকছড়ি এলাকায় চুক্তিবিরোধীদের প্রহারে নিহত হন জনসংহতির এক সমর্থক। জনসংহতি সমিতি এই হত্যাকান্ডের হন্য তৎকালীন প্রসিত-সঞ্চয় গ্রুপ(যাদের নেতৃত্বেই পরবর্তীতে গঠিত হয় ইউপিডিএফ) কে দায়ী করে থাকে। তবে ইউপিডিএফ এর বক্তব্য ভিন্ন। তাদের দাবী,১৯৯৮ সালের ৪ এপ্রিল খাগড়াছড়ির পানছড়ি উপজেলার লতিবান এলাকায় জনসংহতি সমিতির কর্মীদের হাতে খুন হন তাদের সমর্থক প্রদীপ লাল চাকমা এবং কুসুমপ্রিয় চাকমা। আর এর মাধ্যমেই পাহাড়ে ভ্রাতৃঘাতি সংঘাতের পাল্টাপাল্টি দাবী তাদের। তবে দুটি দলই যে দাবীই করুক না কেনো,বাস্তবতা হলো,গত ১৬ বছরে ইউপিডিএফ এর দেয়া তথ্য অনুসারে নিহত হয়েছে ২৫২ জন নেতা-কমী-সমর্থক। আর বিপরীতদিকে জনসংহতির নিহত হয়েছে ৯২ জন প্রত্যাগত শান্তিবাহিনীর সদস্যসহ ৩ শতাধিক কর্মী ও চুক্তির সমর্থক। পাশাপাশি ২০০৮ সালে জনসংহতি সমিতি থেকে বেরিয়ে নতুন সংগঠন জনসংহতি সমিতি(এমএনলারমা) নামে আত্মপ্রকাশ করা সংগঠনটির ২৭ জন নেতাকর্মী নিহত হওয়ার তথ্য জানিয়ে সংগঠনটি সকল হত্যাকান্ডের জন্য সন্তু লারমা সমর্থিত জনসংহতি সমিতিকে দায়ী করেছে। সেই হিসেবে গত ১৫ বছরে তিনটি সংগঠনের নিহত হয়েছে প্রায় ৬শত জন নেতাকর্মী। আবার ইউপিডিএফ এর অভিযোগ নিরাপত্তাবাহিনীর হাতেও তাদের ১৩ নেতাকর্মী নিহত হয়েছে। নিহতদের মধ্যে উভয় সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতা যেমন আছে,আছে দলগুলোর সামান্য সমর্থকও। আবার কখনো পিতার সাথে নিহত হয়েছে ৩ মাস বয়সী শিশু সন্তানও। এই বিবাদমান দলগুলোর সহিংসতা থামাতে একাধিকবার পাহাড়ী সুশীল সমাজের পক্ষ থেকে নানা উদ্যোগও নেয়া হয়। আলোচনার টেবিলেও নিয়ে আসা হয় উভয়পক্ষকে। তবে একবারই উভয়পক্ষের মধ্যে সমঝোতা চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে নষ্ট হয়ে যায় শর্তভঙ্গের পাল্টাপাল্টি অভিযোগে।
ভ্রাতৃঘাতি সংঘাত প্রসঙ্গে ইউপিডিএফ নেতা মাইকেল চাকমা বলেন- ‘এটা শুরু হয় চুক্তির পর ১৯৯৮ সালে চেয়ারম্যান কুসুমপ্রিয়-প্রদীপলালকে হত্যার মধ্য দিয়ে। সেই সময় সন্তু লারমার সাথে সাক্ষাত শেষে ফেরার পথে সন্তু লারমার নির্দেশেই খাগড়াছড়ির পানছড়ি উপজেলার লতিবান নামক এলাকায় সন্তু লারমার নির্দেশে তাদের নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। এরপর থেকে সন্তু লারমারা একের পর এক আমাদের সংগঠনের নেতাকর্মীদের হত্যার রাজনীতি শুরু করলো। আমরা তাদের কাছে বারবার এই সংঘাত বন্ধ করার অনুরোধ জানিয়েছিলাম। আমরা এটা(সংঘাত) চাইনি। সন্তু লারমা এই সংঘাতের জন্য দায়ী।
এই সংঘাতে নিজেদের ২৫২ জন নেতাকর্মী নিহত এবং প্রায় ৫ শতাধিক অপহরণের শিকার হয়েছে বলে দাবী করে তারা বলেন-‘সন্তু লারমাদের সাথে ২০০০ সালে,২০০৬ সালে এবং এর মাঝে একবার ঐক্যের ব্যাপারে আমরা বৈঠক করেছি। এই ব্যাপারে একটি চুক্তিও হয়েছিলো। গনতান্ত্রিকভাবে যে যার মতো আন্দোলন করে যাবে,এমন সিদ্ধান্তই ছিলো চুক্তিতে। কিন্তু সন্তু লারমারাই সেই চুক্তি ভঙ্গ করেছে। তবুও আমরা এখনো ঐক্য চাই। জাতির বৃহত্তর সাথে মতপার্থক্যকে পেছনে ফেলে আামাদেরকে আলোচনার মাধ্যমে একটা চুক্তিতে উপনীত হওয়ার দরকার,আমরা ঐক্যের আহ্বান জানাই। এটা বিভিন্ন জনপ্রতিনিধি,মানবাধিকারকর্মী, সমাজের বিশিষ্টজনরা অর্থাৎ তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে আলোচনার টেবিলে বসেই আমরা সমস্যাটির নিরসন চাই। জনসংহতি সমিতির কোন নেতাকর্মী হত্যার সাথে নিজেদের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করে তিনি বলেন-তারা (জনসংহতি) কল্পনাপ্রসূত অভিযোগ করে । এইসব তাদের বিরুদ্ধে জনগণের প্রতিরোধ । তারা জনগণের উপর নানাভাবে নিপীড়ন করায়,জনগণের পাল্টা প্রতিরোধে তাদের ক্ষতি বা কেউ মারাও যেতে পারে। এর জন্য ইউপিডিএফ সাংগঠনিকভাবে দায়ী নই।
আর জনসংহতির বক্তব্য হলো–চুক্তি সাক্ষরের পরপরই ইউপিডিএফ এর জন্ম দেয়া হয়েছে জনসংহতির নেতৃত্বকে ধ্বংস করার জন্য এবং চুক্তি বাস্তবায়নে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা-এই দুটি মূল উদ্দেশ্য নিয়ে। সরকার তথা শাসকগোষ্ঠীর বিশেষ মহলের সহযোগিতায়। ইউপিডিএফ এর সশস্ত্র সন্ত্রাাসের কারণে পার্বত্যাঞ্চল অশান্ত অবস্থা,নিরাপত্তাহীনতা। এখানে কোটি কোটি টাকার চাঁদাবাজি। এখানে শত শত মানুষকে জিম্মি করে ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করা হচ্ছে। তাই ইউপিডিএফ এর হাতে নিপিড়ীত মানুষ সংগঠনিত হয়েছে এবং ইউপিডিএফ বিরোধী একটি সশস্ত্র গ্রুপ গড়ে উঠেছে। আত্মরক্ষার জন্য, নিজস্ব প্রতিরক্ষার জন্য যে গ্রুপটি গড়ে উঠেছে তারা চুক্তির স্বপক্ষের,চুক্তির বাস্তবায়ন চায় এবং একটা নিরাপদ জীবন পেতে চায়। তারাই ইউপিডিএফ এর সশস্ত্র সন্ত্রাসের বিপক্ষে অস্ত্র ধরেছে। এবং আজকের বিভিন্ন স্থানে যে সংঘাত চলছে তা হচ্ছে,ইউপিডিএফ এর বিরুদ্ধে যারা আত্মরক্ষার জন্য অস্ত্র ধরেছে তাদের মধ্যে,এটা জেএসএস নয়। জেএসএস এখনো সেই পথে যায় নাই।
ইউপিডিএফ এর জন্মই হয়েছে একটা হীন উদ্দেশ্য নিয়ে,যারা জন্ম দিয়েছে তারাও হীন উদ্দেশ্যে জন্ম দিয়েছে-এমন অভিযোগ করে সন্তু লারমা সংগঠনটিকে নিষিদ্ধ করার দাবী জানান। তিনি বলেন- তাদের সাথে আমাদের কখনই কোন চুক্তি হয় নাই,এটা সত্যি,তাদের সাথে বৈঠক হয়েছে অনেকবার। তারা সন্ত্রাসী হলেও আমরা শান্তির স্বার্থে ধৈর্য্য ধরে, দুরদর্শী হয়ে চেষ্টা করেছি সমঝোতার। আমরা তাদের একটা কথাই বলেছি-তোমরা অস্ত্র ত্যাগ করো, তোমাদের অস্ত্র কাকে জমা দিবা তা আমরা জানিনা,সে অস্ত্র জমা দিয়ে তোমরা আরো দশটা রাজনৈতিক দল করো,এতে আমাদের কোন আপত্তি নাই। তিনি আরো বলেন- এরা সন্ত্রাসী,এদের সাথে কিসের চুক্তি হবে। এদের সাথে আমরা বৈঠক করেছি,আমরা বলেছি,এখনো বলছি,এই মুহূর্তে তারা যদি অস্ত্র ত্যাগ করে এসে বলে আমাদের কাছে আর অস্ত্র নাই,আমরা আর কাউকে খুন করবেনা,পঙ্গু করবনা,তাহলে ঐক্য হতে পারে। এটাও আমরা আহ্বান করেছিলাম,তারা সেটা মানে নাই।pic--

তোমরা অস্ত্র ত্যাগ করো, তোমাদের অস্ত্র কাকে জমা দিবা তা আমরা জানিনা,সে অস্ত্র জমা দিয়ে তোমরা আরো দশটা রাজনৈতিক দল করো,এতে আমাদের কোন আপত্তি নাই। তিনি আরো বলেন- এরা সন্ত্রাসী,এদের সাথে কিসের চুক্তি হবে। এদের সাথে আমরা বৈঠক করেছি,আমরা বলেছি,এখনো বলছি,এই মুহূর্তে তারা যদি অস্ত্র ত্যাগ করে এসে বলে আমাদের কাছে আর অস্ত্র নাই,আমরা আর কাউকে খুন করবেনা,পঙ্গু করবনা,তাহলে ঐক্য হতে পারে। এটাও আমরা আহ্বান করেছিলাম,তারা সেটা মানে নাই।…..সন্তু লারমা

জনসংহতি সমিতি এবং ইউপিডিএফ এর ভ্রাতৃঘাতি সংঘাত প্রসঙ্গে চাকমা সার্কেল চীফ ব্যারিষ্টার দেবাশীষ রায়, পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক কমিটির সভাপতি গৌতম দেওয়ান,রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান শিক্ষাবিদ ড.মানিক লাল দেওয়ান বিভিন্ন সময় নানান কর্মসূচীতে অংশ নিয়ে হতাশা ব্যক্ত করে বলেছেন-পাহাড়ের মানুষ এই সংঘাত চায়না,পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন,আদিবাসী হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতিসহ আদিবাসীদের অধিকার আদায়ে এখন ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন প্রয়োজন। এই সংঘাত আদিবাসীদের জন্য মঙ্গল বয়ে আনবেনা বলে মন্তব্য এই তিনবিশিষ্ট ব্যক্তিসহ পাহাড়ী সুশীল সমাজের।

Micro Web Technology

আরো দেখুন

নানিয়ারচর সেতু : এক সেতুতেই দুর্গমতা ঘুচছে তিন উপজেলার

কাপ্তাই হ্রদ সৃষ্টির ৬০ বছর পর এক নানিয়ারচর সেতুতেই স্বপ্ন বুনছে রাঙামাটি জেলার দুর্গম তিন …

Leave a Reply