নীড় পাতা » পাহাড়ের অর্থনীতি » সবুজ পাহাড়ে জুমের সোনালী হাসি

সবুজ পাহাড়ে জুমের সোনালী হাসি

jum-picc“হিল্লো মিলেবো, জুমত যায় দে,জুমত যায় দে, যাদে যাদে পধত্তুন পিছ্যা ফিরি রিনি চায় ,শস্য ফুলুন দেঘিনে বুক্কো তার জুড়ায়…..।” এটি চাকমা জনগোষ্ঠীর খুউব প্রিয় একটি গান। সারা বছর পরিশ্রম শেষে পাহাড়ী তরুণীরা যখন জুম ক্ষেতের পাকা ফসল ঘরে তুলতে যায়, যখন মনের আনন্দে জুম ঘরের মাচায় বসে জুম্ম তরুন -তরুনীরা গানটি গেয়ে থাকে। এ গানের বাংলা অর্থ হলো- ‘পাহাড়ী মেয়েটি জুমে যায় রে, যেতে যেতে পথে পথে পিছন ফিরে চায় , পাকা শস্য দেখে তার বুকটা জুড়ায়।’ জুমে বীজ বপনের পাঁচ মাস পরিচর্যা ও রক্ষানাবেক্ষনের পর ফলিত ফসল দেখে হাসি ফুটে ওঠে জুম চাষীদের মুখে।

এ মৌসুমে জুম ক্ষেত থেকে ফসল ঘরে আনতে শুরু হয় উৎফুল্ল জুমিয়া নারী- পুরুষের। কিছু কিছু জুমিয়া ঘরে নবান্ন্ উৎসবের আয়োজনও শুরু হয় এসময়ে। এ বছর জুমের সোনালী ফসল ঘরে তুলতে পারায় জুম্ম নারী-পুরুষ ফিরে পেয়েছে মুখের হাসি। চোখে ফুটে উঠেেেছ আশার আলো। পাহাড়ে জুম ক্ষেতে এখন পাকা ফসল তোলার ভরা মৌসুম । জুমিয়াদের ঘরে উঠেছে অনেক পরিশ্রমের জুমের সেই সোনালী ফসল। আর ফলানো ফসল ঘরে তুলতে পেরে জুময়িা নারী -পুরুষের মুখে ফুঠেছে হাসি। চোখে আশার আলো । জুম্ম নারীরা উৎফুল্ল মনে ব্যস্ত জুমের পাকা ধান কাটতে ।

তিন পার্বত্য জেলা রাঙামাটি ,খাগড়াছড়ি, ও বান্দবানের পাহাড়ী পল্লীর জুম ক্ষেতে সবেমাত্র শুরুর হয়েছে পাকা ধান কাটা। ধুম পড়েছে মারফা (পাহাড়ী শশা), ছিনারগুলা (পাহাড়ী মিষ্টিফল),,বেগুন,ধানি মরিচ, ঢেড়ঁশ, কাকরোল,কুমড়াসহ ইত্যাতি ফসল তোলার কাজ। এরপর ঘরে উঠবে তিল,যব, এবং সবশেষে তোলা হবে তুলা। জুমচাষীরা পৌষ-মাঘ মাসে পাহাড়ের ঢালে জঙ্গল পরিষ্কার করে করে শুকানোর পর ফাল্গুন-চৈত্র মাসে আগুনে পুড়িয়ে জুম ক্ষেত্র প্রস্তুত করে । এরপর বৈশাখ-জৈষ্ঠ্য মাসে পোড়া জুমের মাটিতে শুঁচালো দা দিয়ে গর্ত খুড়ে একসঙ্গে ধান তুলা ,তিল কাউন,ভুট্টা,ফুটি চিনার,যব ইত্যাদি বীজ বপন করে। আষাঢ়-শ্রাবন মাসে জুমের ফসল পাওয়া শুরু হয়।সে সময় মারফা (পাহাড়ী শশা),,কাঁচা মরিচ, চিনার ,ভুট্টা পাওয়া যায়। ধান পাকে ভাদ্র- আশ্বিন মাসে সব শেষে তুলা তিল ,যব ঘরে তোলা হয় কার্ত্তিক-অগ্রহায়ন মাসে।

এ বছর রাঙামাটিসহ পার্বত্য তিনটি জেলার পাহাড়ে জুমের ভালো ফলন হয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছে। জুম চাষী সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত বছর কাংখিত বৃষ্টিপাতের ফলে সময়মতো জুমচাষ সম্ভব হয়েছে,ফলনও হয়েছে আশাতীতভাবে। রাঙামাটি সদর উপজেলার বরাদম ইউনিয়নের গোলাছড়ি এলাকার অর্পনা চাকমা জানিয়েছেন গতবারের চেয়ে এবার তার জুমের ফসল অনেক ভালো হয়েছে। রাঙামাটি সদরের মগবান ইউনিয়নের বৌদ্ধ চাকমা তার জুমের ফসল কাটতে কাটতে হাস্যোজ্বল মুখে বলেন,এবার আমার জুম থেকে প্রায় ৩০ মন ধান পাবো আশা করছি। মগবান ইউনিয়নের আরেক জুমচাষী রিকল চাকমা বলেন,দেড় একরের মতো জায়গায় জুমচাষ করেছি । এ জুমে উৎপাদিত ফসল দিয়ে আমি আগামী ৭-৮ মাস পর্যন্ত আমার চলে যাবে। এর পাশাপাশি আমি হলুদ ও রোপন করেছি । এখান থেকে আমি বেশকিছু অর্থ আমার উপার্জন হবে। কিন্তু এখানে সমস্যা হলো কৃষি বিভাগ থেকে আমরা কোন সহযোগিতা পাইনা ।

এদিকে ১০৬ নং কামিলাছড়ি মৌজার হেডম্যান এডভোকেট ভবতোষ দেওয়ান বলেন,এবার বরাদম থেকে শুরু করে জীবতলি,রামপাহাড় এলাকায় ভালো ফলন হয়েছে। ১১৫ নং মগবান মৌজার হেডম্যান সুজিত দেওয়ান বলেন,আগের মতো জমির উর্বরতা শক্তি না থাকায় কিছুটা কম হয়েছে।

জুমচাষী তান্যবী জানিয়েছেন,জুমের ফসল ভাল হয়েছে। ভবিষ্যতে কৃষিবিভাগের কাছ থেকে যদি কিছু সহযোগিতা পাই তাহলে আমরা ধান ও অন্যান্য ফসলও ভালোভাবে রোপন করতে পারবো।

পার্বত্য তিন জেলায় প্রতি বছর কত একর জায়গায় জুম চাষ হয় তার সঠিক হিসাব কৃষি বিভাগ জানাতে না পারলেও বিশেষ পদ্ধতির এ আদি জুম চাষ পার্বত্য মানুষের জীবিকার অন্যতম প্রধান উৎস। বাংলাদেশের একমাত্র পার্বত্য চট্টগ্রামেই জুম চাষ হয়ে থাকে।

জুম চাষ সম্পর্কে রাঙামাটি জেলা কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক তরুন ভট্টচার্য্য বলেন, এই বার জুমের ফলন ভালো হয়েছে।জুমচাষে আমরা পর্যবেক্ষন করে দেখেছি,এবার রাঙামাটি জেলায় ৬৩৮৫ হেক্টর জমিতে ধান চাষ হয়েছে। প্রতি হেক্টর জমিতে ১.৩৩ মে:টন করে ৮৪৯২.০৫ মে:টন চাল উৎপাদন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি বলেন, আবার প্রতি হেক্টর জমিতে নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করে হেক্টর প্রতি ১.৪ মে: টন করে ৯২৫৮.২৫মে: টন চাল উৎপাদন হতে পারে। পার্বত্য রাঙামাটিতে সবচেয়ে ভালো ফলন হয় বিলাইছড়ি উপজেলা ও জুরাছড়িতে।

Micro Web Technology

আরো দেখুন

স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার আহ্বান কুজেন্দ্রের

কভিড-১৯ মহামারী উত্তরণে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে প্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রীর ইফতার সামগ্রী বিতরণ করেছে খাগড়াছড়ি পার্বত্য …

Leave a Reply