নীড় পাতা » ফিচার » অন্য আলো » সংশোধনী বিল পাস করা হোক

সংশোধনী বিল পাস করা হোক

3333333

নবম জাতীয় সংসদের মেয়াদ প্রায় শেষ পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু ভূমি মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি এখনো ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন (সংশোধন) আইন, ২০১৩’ বিলের ওপর মতামত প্রদান রহস্যজনকভাবে ঝুলিয়ে রেখেছে।
গত ৩ জুন অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে এ বিল অনুমোদিত হয়েছে। এরপর ১৬ জুন ওই সংশোধনী বিল জাতীয় সংসদে উত্থাপিত হয়েছে এবং মতামতের জন্য সেটি ভূমি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির কাছে পাঠানো হয়েছে। ওই বিলে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক চূড়ান্ত করা ১৩ দফা সংশোধনী প্রস্তাবের মধ্যে মাত্র ১০টি সংশোধনী প্রস্তাব এ বিলে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। বাকি তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সংধোশনী প্রস্তাব সম্পূর্ণভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে এবং অপরদিকে উত্থাপিত ১০টি সংশোধনী প্রস্তাবের মধ্যে দুটি প্রস্তাব ওই বিলে যথাযথভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। তাই পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন যথাযথভাবে সংশোধনকল্পে ওই বিলের ওপর পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি ১৮ জুন সরকারের কাছে পাঁচটি সংশোধনী প্রস্তাব পেশ করে।
সর্বশেষ ৩ অক্টোবর ২০১৩ অনুষ্ঠিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভায় এ বিল চূড়ান্ত করার কথা ছিল। ওই সভার আলোচ্যসূচিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন (সংশোধন) আইন, ২০১৩ বিলটি এক নম্বর আলোচ্য বিষয় হলেও রহস্যজনকভাবে সংসদীয় কমিটি এ বিষয়ে কোনো ধরনের আলোচনা না করে ঝুলিয়ে রেখে দেয়। ভূমি কমিশন আইনটি সংশোধনে কালক্ষেপণ ও ধীরে চলো নীতি গ্রহণ করার ফলেই এভাবে সিদ্ধান্তহীন অবস্থায় বিলটি রেখে দেওয়া হয়েছে বলে জানা যায়।
তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের এক দিন আগে তড়িঘড়ি করে ২০০১ সালের ১২ জুলাই পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের সঙ্গে কোনো রূপ আলোচনা ছাড়াই পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন, ২০০১ জাতীয় সংসদে পাস করা হয়। ফলে ওই আইনে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির সঙ্গে অনেক বিরোধাত্মক বিষয় অন্তর্ভুক্ত হয়।
বস্তুত পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবেই ভূমি কমিশন আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু যারা ভূমি কমিশনসহ পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির বিরোধিতা করে আসছে এবং যারা পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির মধ্য দিয়ে পার্বত্যাঞ্চল থেকে ফেনী পর্যন্ত ভারতের অংশ হয়ে যাবে এবং ভূমি কমিশন আইন সংশোধিত হলে দেশের সার্বভৌমত্ব হুমকির মধ্যে পড়বে বলে গোড়া থেকেই অপপ্রচার চালিয়ে আসছে, সেই পার্বত্য যুবফ্রন্ট, পার্বত্য নাগরিক পরিষদ, বাঙালি ছাত্র পরিষদ নামক সেটেলার বাঙালিদের ভুঁইফোড় সংগঠনের নেতাদের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভায় আমন্ত্রণ জানানো নিঃসন্দেহে চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারের সদিচ্ছাপ্রসূত ছিল না বলে বিবেচনা করা যায়। সেটেলার বাঙালিদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত ওই সভার পর থেকেই সরকার পার্বত্য ভূমি কমিশন আইন সংশোধনের ক্ষেত্রে আত্মঘাতী ‘ধীরে চলো নীতি’ গ্রহণ করেছে বলে প্রতীয়মান হয়েছে।
এ ধরনের নেতিবাচক নীতি গ্রহণ করা পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নে সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকারেরই বরখেলাপ এবং চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারের চরম অসদিচ্ছারই প্রতিফলন বলে নিঃসন্দেহে বিবেচনা করা যায়। ২০০১ সালের ভূমি কমিশন আইনের সংশোধনী প্রস্তাব চূড়ান্তকরণে এ সরকারের পাঁচ বছর মেয়াদের মধ্যে সাড়ে চার বছরাধিক সময় ক্ষেপণ করা হয়। এরপর সরকারের একেবারে শেষ মেয়াদে এসে ত্রুটিপূর্ণভাবে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন (সংশোধন) আইন, ২০১৩ বিল জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হয়। তারপর এই ত্রুটিপূর্ণ বিল সংশোধন করতে সংসদীয় স্থায়ী কমিটি চার মাসের অধিক সময় ক্ষেপণ করে চলেছে, যা বিলটি জাতীয় সংসদে পাস না করার ষড়যন্ত্রেরই অংশ হিসেবে বিবেচনা করা যায়। নানা প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও দীর্ঘ সাড়ে চার বছরের ঐকান্তিক ধৈর্য ও নিরলস প্রয়াসের মধ্য দিয়ে যে বিষয়টি সফলতার দ্বারপ্রান্তে নিয়ে আসা হয়েছে ‘ঝুলিয়ে রাখার নীতি’ গ্রহণের ফলে; তা অনেকটা ‘ঘাটে এসে নৌকা ডুবানোর’ মতো অবস্থায় দাঁড়িয়েছে।
এ বিল পাস করা হলে বাঙালি-পাহাড়ি উভয় সম্প্রদায়ই অখুশি হবে এবং তাতে আওয়ামী লীগের ভোট কমে যেতে পারে বলে সরকারকে ধারণা দেওয়া হয়েছে। তাই নির্বাচনের আগে এ ধরনের স্পর্শকাতর কোনো বিল সংসদে পাস না করার জন্য সরকারকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে বলে নানা সূত্রে জানা গেছে। যারা পার্বত্যাঞ্চলের ভূমি সমস্যা জিইয়ে রাখতে চায় এবং জিইয়ে রেখে কায়েমি স্বার্থ হাসিল করতে চায়, তারাই এ ধরনের উদ্ভট ধারণা পোষণ করতে পারে।
গত ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৩ জেনেভায় জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদের ২৪তম অধিবেশনেও পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি ভূমি কমিশন আইন সংশোধনের পূর্ণ প্রতিশ্রুতি দিয়ে এসেছেন। তাই ভূমি কমিশন আইন সংশোধন করা হলে দেশে-বিদেশে সরকারের ভাবমূর্তি আরও বাড়বে, তা নিঃসন্দেহে বলা যায়।
অপ্রিয় হলেও সত্য, নির্বাচনী অঙ্গীকার থাকা সত্ত্বেও এ সরকারের মেয়াদকালে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নে আশানুরূপ অগ্রগতি না হওয়ায় জনমনে ক্ষোভ ও অসন্তোষ পুঞ্জীভূত হয়েছে। সরকারের শেষ মেয়াদে এসে ভূমি কমিশন আইন যথাযথভাবে সংশোধনের মাধ্যমে সেই ক্ষোভ ও অসন্তোষ কিছুটা হলেও লাঘবের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
তাই পার্বত্যাঞ্চলের ভূমি বিরোধ যথাযথ ও অনতিবিলম্বে সমাধানের স্বার্থে চলমান সংসদ অধিবেশনের মধ্যে সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত ১৩ দফা সংশোধনী প্রস্তাব অনুসারে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন (সংশোধন) আইন, ২০১৩ বিল পাস করার জন্য জরুরি বলে পার্বত্যবাসী মনে করে।

লেখক : মঙ্গল কুমার চাকমা: তথ্য ও প্রচার সম্পাদক, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি। ( লেখাটি  দৈনিক  প্রথম আলোর ২০-১০-২০১৩  তারিখের সম্পাদকীয় পাতায় প্রকাশিত হয়েছে )

Micro Web Technology

আরো দেখুন

পাহাড়ে জুমচাষ নিয়ে বিতর্ক

ক্ষুদ্র নৃ-তাত্ত্বিক গোষ্ঠীর আবেগ-অনুভূতির সঙ্গে জড়িত ‘জুমচাষ’। সাধারণ পাহাড়িরা জুমচাষকে পরিবেশবান্ধব ও ঐতিহ্যবাহী কৃষিব্যবস্থা হিসেবে …

Leave a Reply