নীড় পাতা » ব্রেকিং » সংবিধানের মধ্যে থেকেই পাহাড়ের সমস্যার সমাধান

সংবিধানের মধ্যে থেকেই পাহাড়ের সমস্যার সমাধান

shekh-Hasinaবাংলাদেশের সংবিধানের মধ্যে থেকেই পার্বত্য চট্টগ্রামের সব সমস্যার সমাধান করা হবে জানিয়ে জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, শান্তিচুক্তির পর ২৩২টি অস্থায়ী সেনা ক্যাম্পের মধ্যে ১১৯টি সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহার করা হয়েছে। বাকীগুলো ধারাবাহিকভাবে প্রত্যাহার করা হবে বলে। তিনি বলেন, পার্বত্য শান্তি চুক্তির ৭২টি ধারার মধ্যে ৪৮টি ধারা বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এছাড়া ১৫টি ধারা আংশিক বাস্তবায়ন ও ৯টি ধারা বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী সংসদে ১০ ফেব্রয়ারি দিনটিকে একটি ঐতিহাসিক দিন উল্লেখ করে বলেন, চুক্তির পর ১৯৯৮ সালে ১০ ফেব্রুয়ারি খাগড়াছড়ি স্টেডিয়ামে জনসংহতি সমিতি অস্ত্র সমর্পণ করেছিলো। এরপর সরকারও চুক্তি বাস্তবায়নের দিকে মনোনিবেশ করেন। এরই ধারাবাহিকতায় পার্বত্য মন্ত্রণালয়, আঞ্চলিক পরিষদ গঠন করা হয়েছে। এছাড়া চুক্তি মনিটরিংয়ের জন্য সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা হোসেনকে দিয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে তিনি সংসদে জানান । বুধবার বিকেল সাড়ে চারটায় রাঙামাটির সংসদ সদস্য ঊষাতন তালুকদার সংসদে প্রধানমন্ত্রীর কাছে তারকা চিহ্নিত প্রশ্ন উত্থাপন করলে তিনি এসব কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর পার্বত্য চট্টগ্রামে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ শুরু হয়। এসময় এই অঞ্চলে প্রচুর নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যসহ বেসামরিক মানুষ মারা যায়। অনেক উপজাতি উদ্বাস্তু হিসেবে ভারতে চলে যায়। পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালে আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর পার্বত্য সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেয়।

তিনি বলেন, আমি দেশে আসার পর পার্বত্যাঞ্চলে সমস্যাকে রাজনৈতিক সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করি। রাজনৈতিক সমস্যাকে সামরিক শক্তি দিয়ে মোকাবেলা না করে রাজনৈতিকভাবে সমাধানে মনোনিবেশ করি। এজন্য একটি জাতীয় কমিটি গঠন করা হয়। তিনি বলেন, আওয়ামীলীগ সরকারের প্রজ্ঞার ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামে রক্তপাত বন্ধ করতে সক্ষম হয়। কোনো বিদেশি সহায়তা ছাড়াই আমরা চুক্তি সম্পাদন করি। এতে পাহাড়ে সুবাতাস বইতে শুরু করে। চুক্তির পর আমরা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে মনোনিবেশ করি। কিন্তু আমরা সময় পেয়েছি খুবই কম। ২-৩ বছর পর আওয়ামীলীগ সরকারের বিদায়ের পর বিএনপি-জামায়াত সরকার ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার চুক্তির অগ্রগতিতে কোনো কাজ করিনি। ২০০৯ সালে মহাজোট সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর আমরা চুক্তি বাস্তবায়নে নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করি।

চুক্তির ফলে পার্বত্যাঞ্চলে অর্থনীতি ও রাজনৈতিক বিকাশ হয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, রাঙামাটি জেলা পরিষদে ৩০টি বিভাগ, খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদের ৩০টি ও বান্দরবান জেলা পরিষদে ২৮টি বিভাগ হস্তান্তর করা হয়েছে। বাকীগুলো পর্যায়ক্রমে হস্তান্তর করা হবে। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী জনগণকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ভারত প্রত্যাগত ১২,২২৩টি পরিবারকে পুনর্বাসন করা হয়েছে। যারা চাকরি করতেন, তাদেরকে শর্ত শিথিল করে চাকরিতে পুনর্বহাল করা হয়েছে। এজন্য একটি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। যার চেয়ারম্যানের দায়িত্বে রয়েছেন যতীন্দ্র লাল ত্রিপুরা। ২০০১ সালে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন গঠন করা হয়েছে। কিন্তু আঞ্চলিক পরিষদ এনিয়ে আপত্তির পর সংশোধনী আবারো মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর এখন সংসদে পাশের অপেক্ষায় রয়েছে।

পার্বত্যাঞ্চলের উন্নয়নের কথা তুলে ধরতে গিয়ে তিনি বলেন, একটি থানা সাজেক, একটি উপজেলা গুইমারা ও একটি ইউনিয়ন বড়ইতলী বৃদ্ধি করা হয়েছে। চ্ুিক্তর পর ১৭৬টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণ, সংস্কার করা হয়েছে। এছাড়া সম্প্রতি মেডিকেল কলেজ ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। তিনি বলেন, পার্বত্যাঞ্চলের অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আবাসিক করা হবে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম পর্যটন শিল্পে একটি অমিত সম্ভাবনা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, স্থিতিশীল পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারলে পর্যটন শিল্প বিকাশ পাবে। তিনি বর্তমানে পার্বতাঞ্চলের বেশ কিছু স্পটের প্রশংসা করে বলেন, এতে এই অঞ্চলে দেশি ও বিদেশে পর্যটক বৃদ্ধি পাবে।

যোগাযোগের ক্ষেত্রে সড়ক ও জনপথ বিভাগ এবং ইসিবি মিলে দুর্গমাঞ্চলে রাস্তা, সেতু, কালভার্ট নির্মাণ করছে। তিনি বলেন, চুক্তির পর এ পর্যন্ত ৪০৪ কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে। ১০৫ কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণ চলমান ও ১৬০ কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। সীমান্তে নিরাপত্তা বিধানে দশটি সড়ক নির্মাণ করা হবে তিনি জানান। যার মধ্যে পাঁচটি সড়কই রাঙামাটির বিভিন্ন সীমান্তে করা হবে।

তিনি বলেন, ১৩০টি দেশি-বিদেশি এনজিও পার্বত্যাঞ্চলে শিক্ষা-স্বাস্থ্য ও আর্থ সামাজিক উন্নয়নে কাজ করছে। ইউএনডিপি চুক্তির পর ১২০ কোটি টাকার কাজ করেছে এবং ২০১৫ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত দুই হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্প এখন মন্ত্রণালয়ের পরীক্ষাধীন রয়েছে। এছাড়া তিনি বিদ্যুৎ, অরক্ষিত সীমান্ত নিয়ে সংসদে আরো বিভিন্ন পরিকল্পনার কথা জানান।

সংসদে প্রধানমন্ত্রী বক্তব্যে পর রাঙামাটির সংসদ সদস্য ঊষাতন তালুকদার এক সম্পূরক প্রশ্নে চুক্তি স্বাক্ষরে প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে চুক্তির মৌলিক বিষয় বাস্তবায়নে রোডম্যাপ ঘোষণা করা হবে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, চুক্তির ধারা কতটুকু বাস্তবায়ন হয়েছে, বাকী কতগুলো রয়েছে আমি তা আমার বক্তব্যে বলেছি। এবং আমাদের পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি বলেন, জেলা পরিষদে যে বিষয় হস্তান্তর করা হবে, সে বিষয়গুলো ধারণ ক্ষমতা বা সক্ষমতা কতটুকু তাও বিবেচনা করতে হবে। ধারাবাহিকভাবে সবই করা হবে। তিনি বলেন, স্থানীয় প্রশাসনসহ সকলকেই আমি নির্দেশ দিয়েছি, যেসব কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে তা যেন আঞ্চলিক পরিষদের সাথে আলোচনার ভিত্তিতে করা হয়। আমরা সকলে মিলেই কাজ করতে চাই। আলোচনার মাধ্যমে সবই সম্ভব। এজন্য আত্মবিশ্বাস থাকতে হবে। চুক্তির স্বাক্ষরের সময়ে বিএনপি-জামায়াতের বিরোধিতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রবল বিরোধিতার পরও আমি চুক্তি স্বাক্ষরে অটল ছিলাম। ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য আঞ্চলিক পরিষদ ও জেলা পরিষদের আরো বেশি সহযোগিতার কথা উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যখন চুক্তি হয় বিএনপি-জামায়াত তার বিরোধিতা করেছিল। বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া বলেছিলেন-এই চুক্তি বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশের ফেনী পর্যন্ত ভারত হয়ে যাবে।’

‘উনি তখন ফেনীর সংসদ সদস্য, তাই উনাকে প্রশ্ন করেছিলাম ফেনী যদি ভারত হয়ে যায়, তাহলে কী তিনি ভারতের সংসদে গিয়ে বসবেন? যেদিন অস্ত্র সমর্পন হয়, সেদিন বিএনপি পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় হরতাল-অবরোধ ডেকেছিল, যাতে অস্ত্র সমর্পন না হয়। এই ১০ ফেব্রুয়ারি কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামে অস্ত্র জমা দেন বিদ্রোহীরা।’

সরকার দলীয় সংসদ সদস্য শামসুল হক চৌধুরীর (চট্টগ্রাম-১২) অপর এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে এয়ারপোর্ট করতে হলে, পাহাড় কেটে করতে হবে, সেটা পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য ভালো হবে না।

‘আমরা রাস্তা করে দিচ্ছি, কক্সবাজার বিমানবন্দর থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বেশি দূরে নয়, প্রশস্থ রাস্তা আছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের সৌন্দার্য উপভোগ করার জন্য রাস্তা দিয়ে চলাই সুন্দর হবে। এয়ারপোটের দরকার নেই।’

Micro Web Technology

আরো দেখুন

জুরাছড়িতে গুলিতে নিহত কার্বারির ময়নাতদন্ত সম্পন্ন

রাঙামাটির জুরাছড়ি উপজেলায় স্থানীয় এক কার্বারিকে (গ্রামপ্রধান) গুলি করে হত্যা করেছে অজ্ঞাত বন্দুকধারী সন্ত্রাসীরা। রোববার …

Leave a Reply