নীড় পাতা » পার্বত্য পুরাণ » শৈলেন নেই-অত:পর…

শৈলেন নেই-অত:পর…

soilen-da-pic-0123‘শৈলেন নেই’- একথাটি মেনে নিতে অনেক কষ্ট হতো, যদি তার মরন কালে পাশে না থাকতাম। শৈলেনের ছোট ভগ্নিপতি ডাঃ নুপুর যদি মোবাইলে আমাকে শৈলেনের হাসপাতালে অবস্থানের কথা না জানাতেন তাহলে আমিও হয়তো আর দশজনের মতো মৃত্যুর দিন বিকালে জানতে পারতাম তার মৃত্যুর সংবাদ।
কিন্তু দু:খ হলো মৃত্যুর সময় তার পাশে দাঁড়িয়েও কিছু করতে পারিনি আমি ও রাঙামাটি প্রেসক্লাব এর সম্পাদক মোহাম্মদ আলী, করতে পারিনি মানে কিছু করার সুযোগ শৈলেন কাউকে দেয়নি। দেয়নি তার মা-স্ত্রী-ভাই বোন ও আপন পুত্রকে, দেয়নি তার আত্মীয় স্বজনদের বা শুভাকাংখীদের। কেন দেয়নি সে প্রশ্ন অবান্তর; বাস্তবতা হলো এ নষ্ট সমাজ ব্যবস্থায় সাংবাদিকতাকে কুলষিত হতে দিতে চায়নি শৈলেন। যে কারনে অনেক আমানুষকে মানুষে পরিণত করে সে মরে গেছে শুধুমাত্র একটি ভয়ে, তাহলো সে অমানুষটি বা অমানুষেরা যদি তাদের পূর্বস্থানে নিয়ে যায় তাহলে কি হবে এটা ভেবে। পার্বত্য চট্টগ্রামে দ্রুত ধনীতে পরিণত হওয়ার সব পথ ঘাট নিজের কাছে চেনা থাকলেও শৈলেন সে পথে পা না বাড়িয়ে নিজের পথেই হেঁটেছে। সে চেয়েছিল সৎভাবে জীবনযাপন করে বৃদ্ধা মা, প্রতিবন্ধি কন্যা ও স্ত্রী-পুত্র এবং নিজের হাতে গড়ে তোলা ভাইবোনদের নিয়ে সত্যিকারের জীবনযাপন করতে। আমৃত্যু সে বিশ্বাস ধারন করতে পেরেছিল বলেই হয়তোবা মফস্বলের একজন সংবাদকর্মী হয়েও শৈলেন সবার কাছে শ্রদ্ধার পাত্রে পরিণত হতে পেরেছে।
জানি, তার মৃত্যুর পর নানাজনে নানাভাবে ইনিয়ে বিনিয়ে তার সম্পর্কে নানা ধরনের স্মৃতিবাক্য আওড়াবেন, শোক জানাবেন, এক মিনিট নীরবতা অবলম্বন করা হবে তার আত্মার সদগতি কামনায়, শোকসভা বা স্মরণ সভায় শৈলেনের আদর্শ বাস্তবায়নের প্রতিজ্ঞায় আবদ্ধ হবেন অনেকেই। তার শোকাহত পরিবারের ভবিষৎ বির্নিমাণে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিবেন অনেকেই। কিন্তু পরবর্তীতে কি হবে? বাস্তবতা বলে, কিছুই হবে না। যা হবে তা তার কর্মফলের কারণে তার রেখে যাওয়া বর্তমান ও ভবিষৎ বংশধরেরা হয়তোবা এগিয়ে যাবে, নয়তোবা তাঁর জীবদ্দশায় যে দু:খ কষ্টের মধ্যে কালাতিপাত করেছে তার মধ্যে থেকেও, তাঁকে অনুসরন করার চেষ্টা চালিয়ে যাবে।
ইতিমধ্যে শৈলেনকে নিয়ে বেশ কয়েকজন তাঁদের মনের অনুভুতির কাব্য ব্যক্ত করেছেন। তাঁদের অনুভুতি প্রকাশ তাঁদের একান্তই ব্যক্তিগত প্রকাশ। এগুলোর মাধ্যমে কেউ যদি শিক্ষা নিতে বা পেতে চান সেখানে আমার কোন দ্বিমত থাকবে না। কিন্তু জীবনের বাস্তবতার নামে যদি উল্টো কিছু ঘটে যায় তাহলে সে দু:খ রাখার জায়গা হয়তো খুঁজে পাওয়া যাবেনা। কেননা, একদিনের কথা আমার বারবার মনে পড়ে, যেদিন একজন জনপ্রতিনিধির কাছে শৈলেন যে ভাবে অপদস্থ হয়েছিলেন সে কথা মনে পড়লে ক্ষোভ-লজ্জায় মাথা হেঁট হয়ে যায়। যখন সে জনপ্রতিনিধি শৈলেন দে’কে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু স্বাক্ষরিত শহীদ পরিবারের স্বীকৃতি পত্রটি তাচ্ছিল্যের সাথে ছুড়েঁ দিয়ে বলেছিলেন ‘পয়সা দিলে এরকম স্বীকৃতিপত্র ভুড়িভুড়ি পাওয়া যায় পথেঘাটে’। ঘটনাটি আমার উপস্থিতে না ঘটলেও আমি অনুভব করতে পারি কেন শৈলেন সবকিছু থেকে নিজেকে গুটিয়ে ফেলেছিলেন । সেদিন থেকে শৈলেন ও তাঁর পরিবার কোন রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণে উপস্থিত হননি, এমনকি ক্ষোভে- দু:খে নিজের প্রতিবন্ধী কন্যার জন্য কোন সরকারী সাহায্য-সহায়তা পাওয়ার চেষ্টা করেননি। এজন্যই বোধহয় মৃত্যুর পূর্ব মুহুর্তে সবার ছোট ভাই কমলকে অস্পষ্ট স্বরে বলে গেছেন বাস্তববাদী-হ। জীবনের শেষ উচ্চারনে শৈলেন ছোট ভাইকে কোন বাস্তবের কথা বলে গেছেন?
শেষের দিকে বলতে চাই, যে সমস্ত নীতি আর্দশ অনুসরণ করার কারনে মৃত্যুর পরে আমার শৈলেনকে বিভিন্ন বিশেষনে বিশেষায়িত করেছি সে সমস্ত পথে তার সহযোদ্ধারা আদৌ অনুসরণে ব্রতী হবেন কিনা? তা যদি হয় তাহলেই বলা যাবে মৃত শৈলেন দে, যার পারিবারিক পরিচিতি নুনু, তাঁর বিদেহী আত্মা শান্তি পাবে। তখনই হয়তো কবি গুরু রবীন্দ্র নাথের সে বিখ্যাত গানের দুটি লাইন আমাদের সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে অর্থাৎ
‘নয়ন সমুখে তুমি নাই
নয়নের মাঝখানে নিয়েছো যে ঠাঁই’
ঠাঁই প্রাপ্ত শৈলেনের ছবি যেন আমাদের সৎ ও বস্তুনিষ্ট সাংবাদিকের পথ অনুসরণ করা আর সাংবাদিকতার মতো মহৎ পেশাকে মহত্ব দানে আমরা সকলেই যেনো আন্তরিক হই।

লেখক : সুনীল কান্তি দে,সভাপতি, রাঙামাটি প্রেসক্লাব।

Micro Web Technology

আরো দেখুন

ফুটবলের বিকাশে আসছে ডায়নামিক একাডেমি

পার্বত্য এলাকা রাঙামাটিতে ফুটবলকে আরও জনপ্রিয় করে তোলা, তৃনমূল পর্যায় থেকে ক্ষুদে ফুটবল খেলোয়াড় খুঁজে …

Leave a Reply