নীড় পাতা » ফিচার » খোলা জানালা » শৈলেন দে : মিলিয়ে গেছে যে নক্ষত্র

শৈলেন দে : মিলিয়ে গেছে যে নক্ষত্র

soilen-da-pic-033চন্দ্রালোকের স্নিগ্ধতা যখন কোনো মানুষ কে মুগ্ধ করে; তখন তার এ কথা ভাববার অবকাশ থাকেনা যে, চাঁদের নিজস্ব কোনো আলো নেই। জোৎস্নার স্নিগ্ধ আলোয় অবগাহন করে মানুষ দুঃখ ভুলে যায়; ক্ষণিকের জন্য হলেও ইট-পাথরের সমাজ কাঠামো, জীবনের চাপ আর স্বার্থপরতার অনেক কিছু ভুলে গিয়ে নির্মলানন্দে ভাবুক হয়ে উঠে। গত কয়েকদিনের তাপদাহে অতিষ্ট যন্ত্রমানুষদের মধ্যে যারা সন্ধ্যার আঁধারে বা রাতের কোনো সময় চাঁদের নীচে গিয়ে দাঁড়াবার সুযোগ পেয়েছেন। তারা চন্দ্রালোককে শশীকর বলার বদলে আজীবন হয়তো জোৎস্নাই বলতে পছন্দ করবেন। চাঁদ যা পেয়েছে তা বিলোয় আঁজলা ভরে, কিন্তু এ আলো যে তার নয় বোবা চাঁদ কখনও একথা মুখ ফুটে বলতেও পারে না। বলতে পারেনা সূর্যও কারণ সেও বোবা; অথবা উদার। তবে এই তথ্যতো ধরায় অধরা থাকেনি। বিজ্ঞানীদের গবেষণার কল্যাণে সবাই আজ জানে চাঁদের নিজস্ব কোনো আলো নেই। প্রয়াত প্রতিভাবান সাংবাদিক শৈলেন দে’র আলোয় আলোকিত হয়ে পাহাড়ের কত চাঁদ যে চান্দু হয়ে গেছে, তা বোধকরি আমার চেয়ে বেশী আর এক দু’জন জানেন। শৈলেন দে ছিলেন তেজদীপ্ত এক সূর্য। যিনি আলোকিত করেছেন ব্যক্তিকে, সমাজকে, জাতিকে, সংস্থাকে প্রতিষ্ঠানকে আর পাহাড়ের বিভিন্ন নৃ-গোষ্ঠীকে। তাঁর রশ্মিতে বিখ্যাত হয়েছেন অনেকেই, আর তিনি থেকে গেছেন নেপথ্যে।soilen-da-pic-034
সাম্প্রতিক কয়েকটি মাস শৈলেন দা’র সাথে যখনই দেখা হতো, তখনই কেন জানি বার বার একটি গানের কলি আমার ঠোটপ্রান্তে এসে ঘুরে ঘুরে বেড়াতো..“এক বুক জ্বালা নিয়ে বন্ধু তুমি- কেন একা বয়ে বেড়াও”। এই মাসখানেক আগে প্রেস ক্লাবে বসে দু’জন গল্প করছিলাম। আমাদের সার্বক্ষণিক গল্পের পার্টনার আলীভাই (মোহাম্মদ আলী) তখনও এসে পৌঁছাননি। কিছুক্ষণ গল্প করার পর শৈলেনদা একটি সাময়িকী খুলে বসলেন পড়ার জন্য। আমিও পত্রিকার পাতায় চোখ বুলাচ্ছি। হঠাৎ মুখ ফসকে গানটি বেরিয়ে এল শব্দ করে। চকিতে ম্যাগাজিনের পাতা ছেড়ে শৈলেন দা আমার দিকে তাকালেন। আমিও না বুঝেই ওনার দিকে তাকালাম। স্মিত হাস্যে শৈলেন দা বললেন ‘দাদা কি গানটি আমাকে উদ্দেশ্য করে গাইলেন?’ আমি আমতা আমতা করলাম তবে অস্বীকার করতে পারলাম না। এর পর দু’জনে অনেক কথা হলো, সেদিন আবারও জানলাম না জানা অনেক কথা। এই কথাগুলো হয়তো কখনই ছাপার অক্ষরে প্রকাশ করা যাবে না। তবে সেদিন আমি আরও একবার অনুভব করলাম কতটা নিঃস্বার্থ এবং নির্লোভী হলে একজন মানুষ এই পরিমাণ উদার চিত্ত ধারণ করতে পারেন।soilen-da-pic-035
হয়তো অনেকেই ভাবছেন লেখার শুরুতেই কেন আমি অপ্রিয় প্রসঙ্গগুলো টেনে আনলাম। আসলে শৈলেনদা আমাদের মাঝে আর কখনই আসবেন না (অন্তত শৈলেন হয়ে নয়) এ কথাটা নিজেকে বিশ্বাস করাতেই কষ্ট হচ্ছে। তাই এ ক’দিন তাঁকে নিয়ে লিখবো লিখবো করেও এই প্রসঙ্গে কি বোর্ডে হাত দিতে ইচ্ছা করেনি। এর ফাঁকেই এমন কিছু কথা কানে এলো এবং এমন কিছু অপ্রিয় প্রসঙ্গ অবলোকন করতে হলো যে, লেখাটি আপনাতেই এ ভাবে শুরু হলো। ওই দেখুন আবার প্রসঙ্গ সেদিকেই যাচ্ছে..।
শৈলেন দে পার্বত্য চট্টগ্রামের একটি অতি পরিচিত নাম। শুধুমাত্র সৎ সাংবাদিকই নন, একজন সজ্জন ব্যক্তি, গবেষক এবং নিরহংকারী মানুষ হিসেবে পাহাড়ের মানুষের কাছে সমধিক পরিচিত ছিলেন তিনি। সকলের ভালোবাসায় সিক্ত নির্লোভী ও অভিমানী এই মানুষটি হঠাৎ করেই আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন না ফেরার দেশে। তাঁর এই অনন্তযাত্রা আমাদের সকলের জন্য বিষাদময়…..। এভাবে একটি চিঠি ড্রাফ্ট করেছিলাম শৈলেন দা’র শোক সভার জন্য। পরে চিঠিটি পড়ে নিজের কাছে নিজেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছি বারে বারে। শৈলেন দা’ কি আসলেই সকলের ভালোবাসায় সিক্ত ছিলেন? এ প্রশ্ন নিঃসন্দেহে আপেক্ষিক। একভাবে বলতে গেলে শৈলেন দা ছিলেন একজন শত্রুহীন মানুষ। তিনি জ্ঞানত কারো বিপক্ষে শত্রুতা পোষণ করতেন বলে জানতে পারিনি। প্রকাশ্যে তারও কোনো শত্রু ছিল না। তবে প্রকাশ্যে শত্রুতা না থাকলেও তিনি নানাভাবে ক্ষতির শিকার হয়েছেন অনেকজনের হাতে। যেমন বংশ গৌরব, তেমনি চেহারা, নিখাদ ব্যক্তিত্ব, বিনয় আর স্নেহের সংমিশ্রণে ব্যক্তি শৈলেন এমন এক ব্যক্তিত্ব যাকে পছন্দ না করে উপায় নেই। প্রথম দেখাতে যে কেউ তাঁর সাথে পরিচিত হতেন আগ্রহ ভরেই। তিনি ছিলেন যেমনি বিনয়ি তেমনি সুভাষি। তবে সবার সাথে শৈলেনদার আলাপ জমতো না। এ জন্য অধিকাংশরাই ভাবতেন তিনি স্বল্পভাষি মানুষ।
আমি যতদুর জানি আশির দশকে সাংবাদিকতা পেশায় আসা স্বশিক্ষিত শৈলেন দে একাধারে কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক এবং গবেষক ছিলেন। আপাদমস্তক পেশাদার হয়ে যিনি ছিলেন বৈষয়িক চেতনার দিক থেকে একেবারে উদাসিন এবং উন্নাসিক। লোভ কখনও যেমন তাঁর ধারে কাছেও ঘেঁষতে পারেনি। তেমনি পেশার পরিচয়ে কোথাও তিনি পোষাকি সুবিধাটুকুও নেননি। উনবিংশ শতকের শেষ দশক; যখন গিরিদর্পণের রমরমা অবস্থা। তখন বেশ ক’বছর পার্বত্য স্থানীয় সরকার পরিষদসহ পার্বত্য চট্টগ্রামের জ্বালাময়ী অনেকগুলো বিষয় নিয়ে শৈলেন দে’র বেশ কিছু ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। এই রিপোর্টগুলো পড়ে অনেকেই এক নজর দেখতে চাইতেন কে এই শৈলেন দে। তখন রাঙামাটিতে সাংবাদিকও মাত্র হাতে গোণা কয়েকজন। কিন্তু শৈলেন দে তাঁর জানালাহীন বদ্ধঘরের সম্পাদনা টেবিল আর নিজ বাসার বাইরে তেমন একটা বেরুতেন না। কাজেই শৈলেন দে কে আগে থেকে চিনতেন না এমন পাঠকরা অনেকেই জানতে পারেনি; কে এই শৈলেন। আজাদী দেদারসে ছেপেছে তাঁর লেখা। কিন্তু স্বয়ং ওবায়েদ ভাই বা অরুণ বাবুও প্রায় এক যুগ শৈলেন দে কে চেহারায় চিনতে পারেনি, আজাদীর তখনকার চীফ রিপোর্টার হেলাল ভাই তাকে চিনেছেন আরো অনেক পরে। তাঁর দর্শন ছিল একজন সাংবাদিক হিসেবে বস্তুনিষ্ঠ রিপোর্ট করে যাওয়াই তার কাজ। এর বিনিময়ে কি পাওয়া গেলো বা কে চিনতে পারলো সেটা বড় করে দেখার বিষয় নয়। সে কারণেই আজাদী, ভোরের কাগজ আর গিরিদর্পণ মিলিয়ে তার প্রাপ্তিযোগ ছিল নিতান্তই সামান্য। এই সামান্য দিয়েই তিনি একটি বিশাল সংসারের ঘানি টেনে গেছেন যুগের পর যুগ। হয়তো পরিবারের কাউকে তিনি বুঝতেও দেননি তাদের চাহিদার তুলনায় তার সামর্থ কতটুকু। এতো টানাপোড়নের মাঝেও শৈলেন দে কোনো প্রশাসন বা সংস্থা থেকেই কোনো বাড়তি সুবিধা নেওয়ার চেষ্টাটুকুও করেননি কখনও। বরং উল্টোটা করেছেন। তার পেশাগত জীবনে নিম্ন বেতনভূক কর্মচারিদের মধ্যে যারাই তার সাহচর্যে গেছেন, তারা হয়তো জীবনেও কখনও ভূলতে পারবে না শৈলেন স্যারের ছোট ছোট অবদানগুলো। সেই গিরিদর্পণের বোবা মানুষটি, রূপম, দিলীপ; প্রেসক্লাবের পিয়ন নয়ন, শাহ আলম, ইয়াসিন, তরণী, অফিস সহকারি অনিক ইসলাম, শফিক; দৈনিক রাঙামাটির মোস্তফা, শহীদ, ফরিদ এবং কপসেবা সংঘের দু’জন পাহাড়ি কর্মচারি এ মুহুর্তে যাদের নাম মনে করতে পারছি না। এরা সকলেই জীবন্ত স্বাক্ষী। তাদের যে কাউকে জিজ্ঞেস করলেই জানা যাবে মানুষ ও মানবতার প্রতি কতটা দরদ ধারণ করতেন শৈলেন দে। যাদের নাম উল্লেখ করলাম এর মধ্যে অনেকের সাথেই এখন আর সব সময় দেখা হয় না। কিন্তু দেখা হলে তারা আমার কুশল জিজ্ঞেস করার পর প্রথমে যার কথাটি জানতে চায়, তিনি হলেন তাদের প্রিয় শৈলেন স্যার কেমন আছেন।

এতো গেলো ব্যক্তি শৈলেন দে’র মানবিক দিক। সাংবাদিক হিসেবে পেশাদারিত্বের পাশাপাশি নীতি নৈতিকতার প্রশ্নে তিনি ছিলেন আপোষহীন। ফরমায়েসী রিপোর্ট বলতে আমরা যা বুঝি শৈলেন দা কখনই এ ধরণের কোনো ফরমায়েসী রিপোর্ট করেননি। একটি পত্রিকা চালাতে গেলে সম্পাদনা বিভাগকে অনেক কিছুর সাথেই মানিয়ে নিতে হয়। কিন্তু শৈলেন দা সব সময় সময় প্রকাশ্যে বলতে না পারলেও নানা কৌশলে এই ঝামেলা থেকে মুক্ত থাকার চেষ্টা করতেন। ‘সাংবাদিকতার ইথিক্স্’ শব্দটি হালে অনেক সঙ্কুচিত। কিন্তু জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তিনি নীতির প্রশ্নে আপোষহীন থেকে সকল নিয়মকানুন মেনেই একটি সংবাদ ছাড় দিতেন বা গঠন করতেন। ‘মুঠোফোনে যোগাযোগ করে তার সাড়া পাওয়া যায়নি’ শৈলেন দা ছিলেন এমন উক্তির ঘোর বিরোধী।

ব্যক্তি জীবনে শৈলেন দে ছিলেন কল্পনাতীত ধর্মানুরাগী একজন মানুষ। অথচ কুসংস্কারমুক্ত ও আধুনিক। প্রতিদিন স্নানশেষে পুজো না দিয়ে কখনও তিনি ঘর ছাড়েননি বলেই জানতাম আমি। তবে তাঁর সাথে সাধারণ কোনো সনাতনী চেতনার মানুষ কথা বলতে গেলে তার কাছে নির্ঘাৎ মনে হতো তিনি একজন নাস্তিক (ধর্ম সম্পর্কে উদাসীন)। ধর্ম নিয়ে তার পড়াশুনা ছিল কল্পনাতীত। গীতা, রামায়ন ও মহাভারত ছাড়াও বেদ এর প্রায় সবক’টি খন্ড তিনি পড়ার চেষ্টা করেছেন। এর বাইরে ইসলাম ধর্মের কোরআন- হাদীসের উপরও তার বেশ দখল ছিল। তিনি বাইবেল পড়েছেন জীবনের শেষলগ্নে। ধর্ম নিয়ে তাঁর সাথে আমার প্রায়ই আলোচনা হতো। এটা ছিল তুলনামুলক বিশ্লেষণ। অনেক সময় এমন হতো সংবাদের কাজ শেষ করে আমরা আলোচনা করতে করতে রাত সাড়ে দশটা এগারোটা বেজে যেতো। ইতোমধ্যে আমাদের ফেলে চলে গেছে সবাই, এমনকি শফিকও। এই বেশী রাত হয়ে যাওয়া দিনগুলোতেও বাইকে চড়িয়ে খুব কমদিনই আমি তাঁকে ঘর অবদি পৌঁছে দিতে পেরেছি। তিনি মাঝপথে নেমে যেতেন এবং বাকি পথ হেটেই যেতেন..। যা বলছিলাম, এতো প্রচুর সময় শৈলেনদা পড়াশুনার পিছনে ব্যয় করতেন যে অনেকের কাছে অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে। একটি পত্রিকার আদ্যপান্তে চোখ বুলাবার চেষ্টা করতেন তিনি। ওয়েবে নয়, তিনি পড়তেন কাগজের পত্রিকা। অনেক সময় আমি ভ্যাবাচ্যকা খেতাম, যখন তিনি কোনো একটি পত্রিকার বিশেষ কোনো নিবন্ধের প্রসঙ্গ টেনে কথা বলতে শুরু করতেন। তিনি জানতেন আমিও পড়ি, কিন্তু কয়েকটি পত্রিকায় চোখ বুলাতে গিয়ে যে আমি আসল বিষয়টিই মিস করে গেছি. তা তো তাঁর জানার কথা নয়। বানান নিয়ে আমাদের প্রচুর খিটিমিটি হতো; তাঁর শব্দভান্ডার এতটাই সমৃদ্ধ ছিল যে, আমি শব্দ প্রসঙ্গ এলেই সিঁটিয়ে থাকতাম। তবে শেষ পর্যন্ত অভিধান দেখে সমাধান হতো। এজন্য অফিসে আমরা দু’জন দুরকম অভিধান এনে রাখতাম। যে অভিধান দু’টো এখনও অফিসেই আছে। এক কলেবরে এতবড় লেখা হয়তো মানানসই নয়। তবুও আমি অতি প্রয়োজনীয় বিষয়গুলোর সবকটিতেই একটু একটু করে ছোঁয়া দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম এই কারণে যে, আমার এবং আমার পাঠকদের আজকের এই আবেগ হয়তো সবসময় থাকবে না। কিন্তু আমি হলফ করে বলতে পারি এখানে বিবৃত প্রতিটি বিষয় এক একটি নিবন্ধের সূচনা হতে পারে। শৈলেন দা বিষয়ে লিখতে গেলে এই প্রতিটি বিষয় আরো বিস্তারিত ব্যাখ্যার দাবি রাখে; যা কোনো না কোনোভাবে আমাদের উত্তর প্রজন্মের জন্য পাথেয় হয়ে থাকবে।
পাহাড়ের বর্ণিল সংস্কৃতি, এখানকার বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর ঐতিহ্য ও প্রথা, পার্বত্য চট্টগ্রামের গোড়াপত্তন থেকে শুরু করে সামাজিক বিকাশ এই সবকিছু নিয়ে তিনি বহুমাত্রিক গবেষণা করেছেন প্রায় সাত বছর। পুঁথিগত তথ্যের পাশাপাশি বাস্তব অবস্থা সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ এবং প্রবীণদের মুখনিসৃত তথ্যাবলী রেকর্ড করতে তিনি চষে ফিরেছেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। দুর্গম পাহাড়ের চুড়ায় গড়ে ওঠা জনবসতি আর পাহাড়ি পল্লীতে কাটিয়েছেন রাতর পর রাত। এর মাত্র কিছু অংশ উঠে এসেছে কপসেবা সংঘের ১১ খন্ডের প্রকাশনায়। অবশিষ্টটুকু সঞ্চিত আছে শৈলেন দে’র ডায়েরীতে। শৈলেনপুত্র সৌরভ দে বাবার এই অপ্রকাশিত কর্মযজ্ঞ আলোয় আনতে পারবে কিনা জানি না। তবে এই তথ্যটুকু অন্তত সবার জানা থাকা প্রয়োজন বলে মনে করি।

মাতৃভক্তির আধার ছিলেন শৈলেন দে। কষ্ট হলেও মায়ের কথার বাইরে কখনও যাওয়ার চেষ্টা করেননি। প্রতিনিয়ত মাকে প্রণাম করেই ঘর থেকে বেরুতেন তিনি। হায়েনার হাতে স্বামীকে হারিয়ে অল্প বয়সে বৈধব্য বেশ নেওয়া শহীদ জায়া মালতি রাণী দেও বড়ছেলেকে যেন একটু অন্য চোখেই দেখতেন। ছেলের জেদের মূল্য দিতে জানতেন তিনি। ছেলেও মায়ের শোক সংগ্রাম হৃদয় দিয়ে অনুভব করতেন। তাই হয়তো দু’জনের মিলিত প্রচেষ্টায় শত দীনতাকে উপেক্ষা করেও প্রথম প্রজন্মের প্রতিটি সদস্যকে প্রতিষ্ঠিত করে সুপাত্রপাত্রীদের সাথে গাঁটছড়া গেঁেথ দিতে তেমন বেগ পেতে হয়নি। অনেকটা অপ্রত্যাশিতভাবে কপসেবা সংঘ ছেড়ে চলে আসার পর শৈলেন দা যখন ইঙ্গিত দিলেন সাংবাদিকতা হয়তো আমাকে ছাড়তে চাইছে না। তখন মোহাম্মদ আলী ভাইয়ের সহযোগীতা নিয়ে দূর দিয়ে কৌশলে দৈনিক রাঙামাটিতে বসালাম শৈলেন দা কে। কথা ছিল তিনি তার গবেষণা কর্ম চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি লিখবেন কলামও। কিন্তু নানা বাস্তবতা আর সংসারের চাপ সামলাতেই কেটে গেলো ক’টি বছর। শেষ পর্যন্ত মাও শয্যাশায়ী হলেন। অসুস্থ মেয়ের সাথে অসুস্থ মা। তার পরও পরম মমতায় দু’দুবার স্ট্রোক করা মাকে নার্সিং করে আবার মেঝেতে হাটার উপযোগী করে শৈলেন দা কি অসাধ্য সাধন করেছেন। সে অভিজ্ঞতা যাদের নেই তারা হয়তো বুঝতেও পারবেন না।

মহান মুক্তিযুদ্ধে আত্মউৎসর্গকারী একটি শহীদ পরিবারের সন্তান হিসেবে জাতির কাছ থেকে কখনই বাড়তি সুবিধা পায়নি পার্বত্য চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী ‘বঙ্গগোষ্ঠী’। এ নিয়ে তাঁর কোনো আক্ষেপও ছিল না। এমনকি জাতীয় দিবসগুলোতে শহীদ পরিবারের সংবর্ধনায় যোগ দেওয়ার ব্যাপারেও তাঁর তেমন কোনো আগ্রহ ছিল না। তিনি কারো সাথে অযাচিতভাবে কথা বলা একেবারেই পছন্দ করতেন না। এতে অনেকে তাকে মনে করতো তিনি আত্মকেন্দ্রিক। প্রকৃতপক্ষে তিনি কথা বলতেন না; তাঁকে কথা বলাতে হতো। একবার জায়গামতো খোঁচা দেওয়া গেলে অনর্গল বলে যেতেন তিনি। অকালে বাবাসহ সকল অভিভাবক হারিয়ে সংসারের ঘানি নিজের কাঁধে তুলে নেন। মা ছেলের সংগ্রাম সাধনায় তিনি পরিণত হন অন্য এক মানুষে। এর মাঝেই টানাপোড়নের সংসারে ঘরণী হয়ে আসেন রুনু প্রভা দে। একরোখা স্বামীর সকল জেদ যিনি মাথা পেতে নিয়েছেন পরম ভালোবাসায়। মা-স্ত্রী-সন্তানই শুধু নয় ভাই, বোন সকলকে নিয়ে শতভাগ সততার সাথে তিনি সমাজে মাথা উঁচু করে টিকে থাকতে চেয়েছেন নিজস্ব স্বকীয়তায়। কিন্তু বঞ্চনার স্বীকার হয়েছেন পদে পদে। সমাজ জীবনের কঠিন অংকের হিসাব নিকাশ তাঁর নখদর্পণে ছিল, কিন্তু ভেঙ্গেছেন মচকাননি। শেষ ভাঙ্গন টা হয়তো এভাবেই ভেঙ্গে গেলো। একেবারে নির্বান্ধব নিরাত্মীয় অবস্থায় হাসাপাতালের বেডে যখন তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন, তার ২৪ ঘন্টা আগেও তিনি ছিলেন সুস্থ স্বাভাবিক একজন মানুষ। সব শেষ হবার খনেক আগে অনুজকে কাছে ডেকে বলেছিলেন বাস্তববাদী হতে। শেষ মুহুর্তে উপস্থিত হন বড়ভাই সুনীল কান্তি দে এবং বন্ধু মোহাম্মদ আলী। সেদিন নেটওয়ার্কের কারণে যোগাযোগের সমস্যা ছিল, চেষ্টা করেও আমার কাছে সময়মতো সংবাদটি পৌঁছাতে পারেননি তারা। আমরা যে ক’জন শৈলেনের কাছের বলে মনে করতাম তারা কোনো কাজেই আসতি পারিনি সেদিন তার জীবনীশক্তিটুকু হারিয়ে যাবার আগে। ওই সময় হাসপাতালের বারান্দায় আজীবন বড়ভাই আর অভিভাবকের আসনে থাকা মকছুদ ভাইয়ের পায়ে আঁছড়ে পড়ে বৌদি যখন বুকফাটা চিৎকার করছিলেন, তখন কেন জানি বার বার মনে হচ্ছিল অ-নে-ক কিছু শেষ হয়ে গেলো। একটি পরিবার যেমন তার প্রধান অবলম্বন হারিয়ে এক অনিশ্চিত পথে নামলো, তেমনি অনেক অনেকগুলো স্বপ্ন আজ শেষ হয়ে গেলো। সে স্বপ্ন কখনও পুনুরুজ্জীবিত হবে কিনা জানি না। তবে, মানুষ হিসেবে অনেকভাবে অক্ষম স্বস্তি দে’র সহজ সরল কচি দু’টি চোখ বার বার খুঁজে ফেরে মমতায় ভরা দু’টি চোখ, আর লাকড়ি ফেঁড়ে শক্ত হয়ে যাওয়া দু’টি হাত, যে হাতের ছোঁয়া আর বুকের উঞ্চতাই তার কাছে ছিল সমগ্র পৃথিবী। ভালো লাগছে এই ভেবে যে শৈলেনের সকল সহকর্মী এ পর্যন্ত তার পরিবারের সাথে এবং পাশেই আছে।

লেখক : সম্পাদক, দৈনিক রাঙামাটি

Micro Web Technology

আরো দেখুন

জনপ্রিয় হচ্ছে ‘তৈলাফাং’ ঝর্ণা

করোনার প্রভাবে দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল খাগড়াছড়ির পর্যটন ও বিনোদনকেন্দ্র। তবে টানা বন্ধের পর এখন খুলেছে …

Leave a Reply