নীড় পাতা » পার্বত্য পুরাণ » শৈলেনদা এবং একটি দাবি

শৈলেনদা এবং একটি দাবি

soilen-da-pic-01শৈলেনদা কোনো দিন কবিতা লিখেছেন কিনা জানা হয়নি। তবে তাঁকে প্রথম দেখে আমার জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ফটোকপি মনে হতো। কবিতা না লিখলেও কী যেন প্রচুর লিখতেন তা পরে জেনেছি। সেই লেখা আসলে ‘নিউজ’। সাংবাদিকতার প্রথম কর্ম নিউজ লেখা, সেটা তিনি প্রচুর লিখতেন।
গত শতাব্দীর সেই আশির দশকের কথা। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় প্রায় ছোটগল্প লিখতাম। সেই সময় এখনকার মতো ফ্যাক্স বা মেইল ছিল না। তাই গল্প দিতে মাঝে মাঝে সাপ্তাহিক বনভূমি ও দৈনিক গিরিদর্পন সম্পাদক পার্বত্য চট্টগ্রামের সাংবাদিকতার অন্যতম প্রতিকৃত জনাব এ কে এম মকছুদ আহমদের কাছে যেতাম। তখন সেই অফিসটি ছিল সৈকত বোর্ডিংয়ের নিচ তলায়। একটি বড় কক্ষে পার্টিশন দেওয়া কক্ষ ছিল তিনটা। প্রথম ঢুকে দীলিপ, রূপনসহ আরও কয়েকজন বসে থাকতেন। সেটা পার হয়ে সম্পাদক মকছুদ ভাইয়ের কক্ষ। তারপরই শৈলেন দা এবং তাপসী দির কক্ষ। আমি যেতাম মূলত মকছুদ ভাইয়ের কাছে কথা বলতে বা গল্প করতে। তখন মাঝে মাঝে শৈলেনদার কক্ষে গিয়ে কথা বলতাম। সেই খুপরির মতো কক্ষে পান চিবোতে চিবোতে শৈলেনদা লিখতেন আর লিখতেন। সেই লেখা গিরিদর্পনে নিউজ হয়ে আসত এক কী দুই দিন পর। মানুষ পড়ত। কিন্তু জানতো না সেটার কারিগর কে। সেটার কারিগর আমাদের নির্লোভ নিরহংকার আর সদালাপী শৈলেনদা। ও… আর একটা কথা, আমি পান খাওয়াতে অভ্যস্ত নই। কিন্তু শৈলেনদার ওই কক্ষে গেলে তিনি পানের বাটা দিয়ে আমাকে আপ্যায়ন করতেন। আমিও নির্দ্বিধায় পান বানিয়ে খাওয়া শুরু করতাম। সেটা পরে প্রেসক্লাব পর্যন্ত এসেছে। অর্থাৎ প্রেসক্লাবেও আমি তাঁর পানের বাটা থেকে পান নিয়ে খেতাম। আমি আর একজনের কাছে পানের ভাগ বসাতে খুব পছন্দ করি তিনি আমার শ্রদ্ধেয় সুনীল দা। আর পান হাতে নেওয়ার পর যখন সুনীলদা গালি দেন তখন তা খুব শ্র“তিমধূর মনে হয়।
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হয়ে নব্বই দশকের প্রথম দিকে যখন সাংবাদিকতা শুরু করি তখন শৈলেনদার সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে মেশার সুযোগ হয়। তাঁকে কোনোদিন রাগ করতে দেখিনি। তবে পার্বত্য চট্টগ্রামে আর এক প্রতিকৃত সাংবাদিক সুনীল কান্তি দের (সুনীলদা) ওপর মাঝে মাঝে রাগ করতে দেখতাম। পরে বুঝেছি আসলে সুনীলদার জ্ঞাতি ছোটভাই বলে তিনি সুনীলদার কাজের সমালোচনা করতেন। সেটা তিনি অধিকার হিসেবে করতেন বলে আমার মনে হয়। মাঝে মাঝে দুই ভাইয়ের মধ্যে এমন তর্ক লেগে যেত যেন মারামারি হবে। কিন্তু সেই পর্যন্ত দুই ভাইয়ের তর্ক কোনোদিন গড়াত না। ওই সময় তিনি বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকেও কাজ করতেন। তখন নিউজ নিয়ে, কীভাবে সাংবাদিকতার উন্নয়ন করা যায় আর পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি নিয়ে প্রচুর আলাপ করতাম শৈলেনদার সঙ্গে।
আমি শৈলেনদার বয়সে অনেক ছোট হলেও আমাকে দাদা বলে ডাকতেন। বলেছি আমাকে কেন দাদা ডাকেন। তিনি বলতেন দাদা শব্দটা শুধু বড় হলে ডাকবো তা নয়। যাঁকে শ্রদ্ধা করা যায় তাঁকে দাদা ডাকতে আপত্তি নাই। এই সেই শৈলেনদা, যিনি ছোটবড় সবাইকে ভালবাসতে, শ্রদ্ধা করতে আর সম্মান দিতে জানতেন। আমি দেখেছি শৈলেন দা আমার স্ত্রী রুচিরা দেওয়ানকে সব সময় বৌ মা বলে ডাকতেন। শুধু মুখে ডাকতেন তা নয় তাঁর আচার আচরণেও ছোট ভাইয়ের বৌ এর মর্যাদা ছিল আমার স্ত্রীর।
শৈলেনদার মনে একটা দুঃখ ছিল। শুধু দুঃখ নয়, একজন শহীদ পরিবারের সন্তান হিসেবে প্রশাসন ও সরকারের কাছে দাবিও ছিল। পুরাতন বাসস্ট্যান্ডের শাপলা চত্বর থেকে যে সড়কটি তবলছড়ি দিকে গেছে সেই সড়কটির নাম কোন এক পৌরসভার চেয়ারম্যান/ মেয়র নাম দিয়েছেন এইচ টি হোসেন সড়ক। তিনি আমাকে বলেছিলেন সেই সড়কের নামের যে স্তম্ভ সেটি দেখলে তার গা জ্বালা করে এবং মনে হয় লাত্থি মেরে গুড়িয়ে দিতে। এইচ টি হোসেন ছিলেন তালিকাভূক্ত যুদ্ধাপরাধী। পরে বঙ্গবন্ধুর সাধারণ ক্ষমার আওতায় ক্ষমা পেয়েছিলেন। বাংলাদেশের অসুস্থ রাজনৈতিক ধারায় শৈলেনদার মতো শহীদ পরিবারের সন্তানরা বার বার উপেক্ষিত হয়েছেন। আর এইচ টি হোসেনের মতো স্বাধীনতাবিরোধীরা সমাজে মাথা উঁচু করে ঘুরছেন। এই যুদ্ধাপরাধী ও স্বাধীনতাবিরোধীরা যতদিন শাস্তি পাবে না ততদিন শৈলেনদাদের আত্মা শান্তি পাবে না। তিনি সর্বশেষ ২০১৩ সালের স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে আমাকে মুঠোফোনে বলেন, হরিদা এইচ টি হোসেন সড়টির নাম পরিবর্তনের ব্যাপারে কোনোকিছু লিখছেন না কেন। লিখে যদি প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করা যায় আমি আপনার প্রতি খুবই কৃতজ্ঞ থাকব। সেই সময় আমি আমার প্রথম আলো পত্রিকায় নিউজ করেছিলাম। কিন্তু প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষিত হয়েছে কিনা জানা যায়নি। যদি দৃষ্টি আকর্ষিত না হয়ে থাকে আমি আবারও সরকার এবং প্রশাসনের কাছে দাবি জানাব, ওই সড়কটির নাম পরিবর্তন করে হয় কোনো শহীদের নামে অথবা শহীদ সড়ক হিসেবে নাম রাখা হোক।
এইচ টি হোসেন সড়ক লেখাটি যখন দেখি তখন বার বার শৈলেনদার আকুতির কথা মনে পড়ে। যদি সড়কটির নাম পরিবর্তন করা হয় শৈলেনদার শহীদ পিতা এবং শৈলেনদাসহ সব শহীদ ও শহীদ পরিবার শান্তি পাবে। আর বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষের সব মানুষ গর্বিত হবে। আমি ব্যক্তিগতভাবে শৈলেনদার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এই সামান্য লেখা শেষ করলাম। সৃষ্টিকর্তা শৈলেনদার পরিবার পরিজন এবং আত্মীয় স্বজনদের প্রতি শোক বইবার ক্ষমতা দিন।

হরি কিশোর চাকমা ঃ নিজস্ব প্রতিবেদক, রাঙামাটি, প্রথম আলো

Micro Web Technology

আরো দেখুন

স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার আহ্বান কুজেন্দ্রের

কভিড-১৯ মহামারী উত্তরণে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে প্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রীর ইফতার সামগ্রী বিতরণ করেছে খাগড়াছড়ি পার্বত্য …

Leave a Reply