নীড় পাতা » ফিচার » খোলা জানালা » শুভ বুদ্ধ পূর্ণিমা : সকল প্রাণী সুখী হোক

শুভ বুদ্ধ পূর্ণিমা : সকল প্রাণী সুখী হোক

আজ বুদ্ধের জন্মদিন। সবাইকে বুদ্ধ পূর্ণিমার মৈত্রীময় শুভেচ্ছা। বুদ্ধের জন্ম, বুদ্ধত্বলাভ ও মহাপরিনির্বাণ লাভের ত্রিস্মৃতিবিজড়িত শুভ মাহেন্দ্রক্ষণ এ বৈশাখী পূর্ণিমা। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন বুদ্ধের প্রতি অনুরক্ত। শান্তনিকেতনের বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠানে শুভ বৈশাখী পূর্ণিমার দিনে বুদ্ধের স্মরণে তিনি- ‘হিংসায় উন্মত্ত পৃত্থি’ গানটি শুনতেন। তিনি লিখেছেন, ‘আমি যাকে অন্তরের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ মানব বলে উপলদ্ধি করি আজ এই বৈশাখী পূর্ণিমায় তাঁর জন্মোৎসবে আমার প্রণাম নিবেদন করতে এসেছি’।

রবীন্দ্রনাথকথিত হিংসায় উন্মত্ত পৃথিবীতে বৌদ্ধদর্শন নিয়ে প্রচুর গবেষণা হচ্ছে। ব্রিটেন ও আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশে বহু মেডিটেশন সেন্টার ও বুদ্ধবাদের ওপর চর্চা ও গবেষণা তার প্রমাণ। তাছাড়া, বুদ্ধদর্শনের ওপর সবচেয়ে উপাদেয় গ্রন্থগুলো যারা লিখেছেন তাঁরা সিংহভাগ বৌদ্ধপরিচয়ে পরিচিত নন। বরঞ্চ, আমরা যারা বুদ্ধধর্মাবলম্বীর তকমা লাগিয়ে নিজেদেরকে পরিচয় দিচ্ছি তারাই এ অগ্রযাত্রায় পিছিয়ে রয়েছি। বুদ্ধের যে সার্বজনীনতা তা তো বিশ্বমানবতাবাদেরই বহিঃপ্রকাশ। সকলের কাছে সহজভাবে পরিচিত ‘সব্বে সত্তা সুখীতা হোন্তু’ বা ‘সকল প্রাণী সুখী হোক’- এ মৈত্রীপূর্ণ বাণী তো তিনি কোনো নির্দিষ্ট অংশের জন্য প্রচার করেননি। এজন্য, আধুনিক দার্শনিকগণ বলছেন, বুদ্ধধর্ম কোনো ধর্ম নয়। কথাটি শুনতে কারও কাছে বিরূপ ঠেকতে পারে। কিন্তু, আমরা যখন ইংরেজি Religion শব্দের আভিধানিক অর্থ অক্সফোর্ড ডিকশনারিতে দেখি তখনই কিছুটা মুক্তি মিলে। ল্যাটিন শব্দ religio থেকে Religion যার সংজ্ঞায় বলা হয়েছে – the belief in and worship of a superhuman controlling power of God or gods, or a message given by the God through a messenger, reverence for God or gods ইত্যাদি।

এখানেই বুদ্ধবাদের সাথে Religion শব্দটি তাত্ত্বিক দিক থেকে সাংঘর্ষিক হয়ে দাঁড়ায়। কারণ, বুদ্ধবাদে তো সৃষ্টিকর্তা নেই। বরং তিনি সৃষ্টির রহস্য নিয়ে সত্ত্ব বা প্রাণীগণের জন্ম-মৃত্যুর একটি তত্ত্বের ব্যাখ্যা করেছেন যার নাম ‘প্রতীত্যসমুৎপাদনীতি’ বা ‘কার্যকারণনীতি’ ( The Dependent Origination) যা আইনস্টাইনের ‘থিওরি অব রিলেটিভিটি’র সাথে অত্যাশ্চর্য মিল রয়েছে মর্মে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শনের অধ্যাপক ড. নীরু কুমার চাকমা তাঁর “বুদ্ধ্: ধর্ম ও দর্শন” বইতে উল্লেখ করেছেন । আর, দুঃখমুক্তির জন্য তাঁর সবচেয়ে বড় আবিষ্কার হলো “চতুরার্যসত্য (Four noble truths)”। নিজের কৃতকর্মের ফল ভোগের সাথে সংস্কারজাত, সন্তাপজাত ও বিপরীনামধর্মী দুঃখসত্যের তত্ত্বকেও অনেকেই বিশ্লেষণ করেন নিউটনের তৃতীয় সূত্রের সাথে। সুতরাং, এদিক থেকে বিজ্ঞানের সাথে বুদ্ধবাদের নিবড় ঘনিষ্টতাও আছে।

বাস্তবিকপক্ষে, এসব তত্ত্ব কি কেবল বৌদ্ধদের জন্য? অন্যান্য প্রাণী বা মানবজাতি কি জন্ম-মৃত্যু বা চতুরার্যসত্যের থিওরির বাইরে? নাকি বুদ্ধ তাদেরকে বাদ দিয়ে বলেছেন? এখানেই বুদ্ধ ও তাঁর ধর্মের সার্বজনীনতা। সমস্যা হলো, এখনও ধর্মের অপব্যাখ্যা প্রতিনিয়ত দেওয়া হচ্ছে। শ্রী সত্যনারায়ণ গোয়েঙ্কাজী দেখিয়েছেন, বুদ্ধের ধর্ম নামে ত্রিপিটকে কোথাও উল্লেখ নেই। কালের বিবর্তনে মানুষই এর অপব্যাখ্যা দিয়েছে। কারণ, বুদ্ধের ধর্ম বা বুদ্ধধর্ম বললে বুদ্ধকে তাঁর নিজস্বতার ছকবাঁধা গণ্ডিতে আবদ্ধ করা হয়। ব্যাখ্যাটা এভাবেও দেওয়া যেতে পারে যে, এটা আমার ধর্ম, সেটা তোমার ধর্ম – যা বিভেদের ভেদরেখা টেনে দেওয়ার মত। অথচ, বুদ্ধাঙ্কুর সকল ভেদাভেদের ঊর্ধ্বে। তাঁর সংস্পর্শে চন্ডাল, ব্রাহ্মণ, রাজা, ভৃত্য, ধনী, দরিদ্র- সকলেই নৈর্বানিক মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে জীবন ধন্য করেছেন। বুদ্ধের ভাষায় হলো ‘ধাম্মা (Dhamma)’; ‘Religion ( ধর্ম)’ নয়। ধাম্মা হলো সবার জন্য। বুদ্ধ তাই এই ধর্মকে ওষুধ রূপে ব্যাখ্যা করেছেন। আর মুক্তিকামীগণকে বলেছে রোগী। ওষুধের কাজ যেমন যেকোনো ব্যক্তি, সম্প্রদায় বা জাতির রোগ নিরাময়ের জন্য, ধর্মও যেন ঠিক তাই । তাঁর আবিষ্কৃত ধর্মরূপ ওষুধ যিনি সেবন করেন তিনিই রোগমুক্তি হন। আর সেই ওষুধ যে উপায়ে সেবন করতে হবে তা হল – আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ।

শুরু করেছি রবীন্দ্রনাথ দিয়ে, শেষ করতে চাই রবীন্দ্রনাথ দিয়ে। কবিগুরুর ভাষায় – “এত বড় রাজা কি জগতে আর কোনদিন দেখা দিয়েছে! বর্ণে বর্ণে, জাতিতে জাতিতে, অপবিত্র ভেদবুদ্ধির নিষ্ঠুর মূঢ়তা, ধর্মের নামে আজ রক্তে পঙ্কিল করে তুলেছে এই ধরাতল, পরস্পর হিংসার চেয়ে সাংঘাতিক পরস্পর ঘৃণার মানুষ এখানে পদে পদে অপমানিত। সর্বজীবে মুক্তিকে যিনি মুক্তির পথ বলে ঘোষনা করেছিলেন সেই তারই বাণীকে আজ উৎকন্ঠিত হয়ে কামনা করি এই ভ্রাতৃবিদ্বেষষ কলুষিত হতভাগ্য দেশে”। জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক, দুঃখ থেকে মুক্তিলাভ করুক।

লেখক : সুমিত্র চাকমা; প্রধান শিক্ষক, শিলকাটাছড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।

Micro Web Technology

আরো দেখুন

পর্যটক এবং নাগরিক ভাবনায় রাঙামাটি : সমস্যা ও সম্ভাবনা

দেশের সবচে বড় জেলা একই সাথে পার্বত্য এলাকার কেন্দ্রবিন্দু রাঙামাটি। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তম কৃত্রিম জলাধার …

Leave a Reply