নীড় পাতা » বিশেষ আয়োজন » শুভমসুন্দরম শ্রী প্রভাংশু ত্রিপুরা

শুভমসুন্দরম শ্রী প্রভাংশু ত্রিপুরা

Prabhangshu-tripura১৯৭৪ সনে স্থাপিত জেলার মধ্যে খাগড়াছড়ি কলেজই একমাত্র বেসরকারি কলেজ। নতুন স্থাপিত এ কলেজে ১৯৭৪-১৯৭৫ শিক্ষাবর্ষে প্রথম শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয় মাত্র ৬০জন শিক্ষার্থী নিয়ে। তারপর বৎসরান্তে পরবর্তী শিক্ষাবর্ষ ১৯৭৫-১৯৭৬এর শিক্ষা কার্যক্রমও শুরু হয় শিক্ষা বোর্ডের নির্ধারিত সময়ে। এ শিক্ষাবর্ষে অন্য দশ শিক্ষার্থীর ন্যায় শান্ত-সৌম্য স্বভাবের অজ পাড়াগাঁয়ের জনৈক এক শিক্ষার্থীও ভর্তি নেয় একাদশ শ্রেনির মানবিক শাখায়। এ শিক্ষার্থী আর কেহ নন, সদ্য বাংলা একাডেমি-র পুরস্কারে ভূষিত খাগড়াছড়ি কলেজের দ্বিতীয় ব্যাচের প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও জেলার কৃতি সন্তান এবং বাংলাদেশ বেতার চট্টগ্রাম- এর মূখ্য প্রযোজক- শ্রী প্রভাংশু ত্রিপুরা।
ঐচ্ছিক বিষয়ের মধ্যে প্রভাংশু আমার পাঠদানের বিষয় যুক্তিবিদ্যালকেও বেছে নিয়েছেন। জানিনা কোন ধারণা পোষন করে সে এ বিষয়কে নির্বাচিত করেছিল। তবে অনেকের ধারণা যুক্তিবিদ্যা পাঠ করলে যুক্তিতর্ক ভালভাবে রপ্ত করা যায়। কিন্তু মনে রাখা ভালো- যুক্তিবিদ্যা মানুষকে যুক্তিতর্ক করতে শিক্ষা দেয় না, বরং কিভাবে যুক্তি প্রদান করলে যুক্তি নির্ভূল ও যথার্থ হবে, যুক্তিবিদ্যা শুধু তাই শিক্ষা দিয়ে থাকে। যাক, প্রভাংশু তার গবেষণামূলক গ্রন্থসমূহে যুক্তিবিদ্যার শিক্ষা সামান্যতমভাবে কাজে লাগিয়ে বস্তনিষ্ঠ তথ্য সন্নিবেশিত করতে পারলে তার যুক্তিবিদ্যা পাঠ স্বার্থক বলে মনে করবো তার একজন শিক্ষাগুরু হিসেবে।
সামান্য বারুদ লিপ্ত কিছু কাঠির নিয়ে একটি ক্ষুদ্র বাক্সে দিয়াশলাই এর বাহ্যিক অবয়ব। এ ক্ষুদ্র বাক্সের এক একটি কাঠির মধ্যে যে কি প্রচন্ড বিস্ফোরন লুকানো আছে, সুপ্ত আছে কি পরিমান দাবানল এবং স্বল্প ঘর্ষনেই যে সৃষ্টি হতে পারে এক প্রলয়ংকর অগ্নিকান্ড তা সে জানেনা। আজ থেকে ৩৮ বছর পূর্বে খাগড়াছড়ি কলেজে একাদশ শ্রেনিতে ভর্তি হওয়া জনৈক ছেলেটিও জানতোনা তার মধ্যে কি প্রতিভা লুকায়িত ছিল, যে প্রতিভা তাকে বাংলা একাডেমিক মতো সম্মনীয় একটি পুরষ্কারের আসনে অধিষ্ঠিত করেছে। বাংলা, ইংরেজী ইত্যাদি বিষয়ের ন্যায় যুক্তিবিদ্যার ক্লাসেও সহপাঠীদের সঙ্গে প্রভাংশুরও সরব উপস্থিতি ছিল এবং অফ পিরিয়ড়ে আমোদ প্রমোদ বা হই-হুল্লায় সময় কাটানোর পরিবর্তে অনুষ্ঠিত লেকচারের নোট করা পয়েন্টগুলো বুঝার চেষ্টা করতো। পাঠদানের মাধ্যম তখন ছিল ইংরেজি। পরবর্তীতে বিভিন্ন বিষয়ের ওপর বাংলা মাধ্যমের বই প্রকাশিত হলে আস্তে আস্তে পাঠদানের মাধ্যমে ইংরেজীর পরিবর্তে বাংলায় হয়ে যায়। যতদূর মনে পড়ে প্রভাংশু ক্লাসে মনোযোগী শিক্ষার্থীর দলে ছিল এবং ক্লাসে লেকচার বুঝতে না পারলে কোন সংকোচ, দ্বিধা দ্বন্দ্ব ব্যতিরেকে দাড়িয়ে যেতো এবং লেকচার পুনরাবৃত্তি করার অনুরোধ জানাতো। লেখা-পড়ার প্রতি আগ্রহী শিক্ষার্থীদের এটাইতো শিক্ষার্থী সুলভ লক্ষন। এ ধরনের শিক্ষার্থীর কারনে শিক্ষকরা ক্লাসে লেকচার প্রদানে সতর্কতা অবলম্বন করতে বাধ্য হন এবং একজন প্রকৃত শিক্ষকও শিক্ষার্থীদের নিকট থেকে এ ধরনের প্রতিক্রিয়া প্রত্যাশা করে থাকেন।
উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার স্তর অতিক্রমের পর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পড়াশুনা অবস্থায় সম্ভবত: প্রভাংশু চাকুরীতে ঢুকে পড়ে। আর তখন থেকেই (এর পূর্বেও হতে পারে) তার লেখনীয় কাজ শুরু হয় এবং এভাবে পর্যায়ক্রমে তার বিভিন্ন গ্রন্থ প্রকাশিত হতে থাকে। সে তার নিজস্ব জাতির ইতিহাস, সাহিত্য, সংস্কৃতি ঐতিহ্য ইত্যাদি যেমন বিশদভাবে জানার চেষ্টা করেছে এবং তেমনি অন্যদের জানার সুযোগও সৃষ্টি করে দিয়েছে। তার প্রকাশিত গ্রন্থের মাধ্যমে। আমরা জানি একজন লেখক তার লব্ধ জ্ঞান লেখনীর মাধ্যমে বিবৃত করেন আপন মনে- কোন পুরষ্কার বা সম্মানে ভূষিত হওয়ার প্রত্যাশায় নয়। কিন্তু একসময় দেখা যায় আপন মনে লিখিত সে সব গ্রন্থ পুরষ্কারে ভূষিত হওয়ার যোগ্যতার কাতারে উন্নীত হয়ে যায়। আর প্রভাংশুর বেলায়ও সেকথা যথাযর্থভাবে প্রযোজ্য। কোন পুরষ্কার বা সম্মান প্রাপ্তির কোন হাতছানি তাকে লেখনীর জগতে আকৃষ্ট করেনি। বরং নিজ মনের তাগিদ থেকেই সে লিখে গেছে আপন মনে। আর এভাবে তার প্রকাশনার তালিকায় অন্তর্ভক্ত হয়েছে একে একে ২৪টি গবেষনামূলক গ্রন্থ। বাংলা একডেমি পুরষ্কার প্রাপ্তিতে শুধু সে নিজে সম্মানিত হয়নি, একই সঙ্গে সম্মানিত ও গৌরবান্বিত করেছে তার সমাজ ও জাতিকেও
বাংলা একাডেমির পুরষ্কার মূল্যমানের দিক থেকে দেড় লক্ষ টাকার মতো। বর্তমান সময়ে অনেকের কাছে এ পরিমান অর্থ তেমন কিছু নয় বলে মনে হতে পারে। কিন্তু এ পুরষ্কারের মাধ্যমে যে সম্মান অর্জিত হলো, তা কোন কিছুর সঙ্গে তুল্য নয়। এ অর্জন ব্যক্তি বিশেষের হতে পারে, কিন্তু সম্মান বয়ে এনেছে সমগ্র পার্বত্যবাসীর জন্যও। তাই বলতো শুভ হোক তোমার পথ চলা, সুন্দর এবং শানিত হোক তোমার মনন শক্তি আর সমগ্র পার্বত্যবাসীর কণ্ঠে উচ্চারিত হোক শুভমসুন্দরম শ্রী প্রভাংশু ত্রিপুরা।

প্রফেসর বোধি সত্ত্ব দেওয়ান : সাবেক অধ্যক্ষ, খাগড়াছড়ি সরকারি কলেজ
Micro Web Technology

আরো দেখুন

ভাষা শিক্ষায় আশার আলো

একটা সময় ছিলো যখন প্রাথমিক স্তরে মাতৃভাষা শিক্ষার ক্ষেত্রে সরকারকে অন্যতম প্রতিবন্ধকতা মনে করতেন অনেকেই। …

Leave a Reply