নীড় পাতা » ফিচার » খোলা জানালা » শুদ্ধ চেতনার খোঁজে-

শুদ্ধ চেতনার খোঁজে-

রাঙ্গামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়……শুরু থেকেই এর তীব্র বিরোধিতা করে আসছিল জেএসএস এবং তার অঙ্গ সংগঠনগুলো। প্রায় একই ইস্যু রাঙ্গামাটি মেডিকেল কলেজের উদ্বোধন নিয়েতো রীতিমতো সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, কারফিউ পর্যন্ত হয়ে গেল এই পার্বত্য জেলা শহর রাঙ্গামাটিতে। প্রশ্নটা এখানেই….এই বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজের বিরোধিতা কি স্রেফ জেএসএসের এজেন্ডা ছিল….শুধু কি জেএসএসএরই কর্মসূচী ছিল এই প্রতিরোধ আন্দোলন….আমারতো মনে হয় যারা বাস্তবতা বোঝেন এমন প্রায় সকল শিক্ষিত-সচেতন পাহাড়ীর এই আন্দোলনে মৌন সমর্থন ছিল। কেন আর তা নাইবা বললাম। কারণ, কারণটা অনেকেই বিশ্বাস করেন কিন্তু মুখ ফুটে বলতে চাননা, পাছে সংকীর্ণমনা, সাম্প্রদায়িক, উন্নয়ন বিদ্বেষীর তকমা না লেগে যায় নিজের নামের পাশে, ‍উন্নয়নের হালুয়া-রুটির ভাগ বঞ্চিত হতে হয় শেষে। অবশ্য তার বাইরেও চাকরির হিসাব কষা, জায়গা বেচে রাতারাতি কোটিপতি বনে যাওয়ার স্বপ্নে বিভোর হওয়া লোকজনের সংখ্যাও নেহায়েত কম ছিল বলা যাবেনা। হিলের বাইরে যারা থাকেন; বিশ্ববিদ্যালয় পেয়েও পায়ে ঠেলে দেয়ার কোন কারণ হয়তো তাদের খুঁজে না পাওয়াটা’ই স্বাভাবিক। কারণ কোন জার্মান দার্শনিক নাকি বলেছিলেন, “মানুষ তার নিজের চোখেই পৃথিবীটাকে দেখে”। তাই হয়তো অন্যের বাস্তবতাটা তার চোখে ধরা পড়েনা কিংবা ধরা দিলেও বোধগম্য হয়না। সেই বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যারা গেছেন তারাই ভাল বোঝে তার ভূত-ভবিষ্যৎ।

মূল প্রসঙ্গে ফেরা যাক। না চাইলেও সরকারেরতো উন্নয়ন করতে হবে…হয়ে গেলো বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ। সরকারের সাথে কি পারা যায়…এমন কোন শক্তি কি আছে এ সংগঠিত শক্তিকে চ্যালেঞ্জ জানাবে। পারা যায়… পারা যেতো যেমন তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে মঈন-ফখরূল সরকার যেমন বাঙালীকে ভাত না খাইয়ে আলু খাওয়াতে চেয়েছিলো….পেরেছিলো কি। কথা হল আমজনতা যদি এ মাল না গেলেন তবে গেলানো কার বাপের সাধ্যি। তবে সৌভাগ্যবশত আমাদের পাহাড়ী তথা জুম্মদের মধ্যে মাল খাওয়া পাবলিকের অভাব নেই। অবশেষে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি-মেডিকেল ট্যাবলেট গিলতেই হল…..উন্নয়ন বলে কথা, উন্নয়নের আবার বিরোধিতা করতে আছে নাকি। আমাদের বাঘাবাঘা বড় বড় পাশ দেয়া প্রফেসর-অফিসাররা সব বড়সড় চেয়ারগুলোতে বসে গেলেন। সরকার চাইছে যেহেতু আরতো পারা যাবেনা…লঘু দরে যেহেতু গুরু দায়িত্ব পাওয়া যাচ্ছে সেহেতু কতক্ষণ আর মুখ ফিরিয়ে থাকা যায়…আফটারঅল সরকারী চাকরি করেন; সরকারের নির্দেশতো মানতে হবে। তাছাড়া, সরকারি চাকুরি বিধিমালাতে আত্নমর্যাদা বিকিয়ে দেয়ার কথাটা লেখা আছে যে !!!!!!

এবার তাকানো যাক শিক্ষিত-সচেতন তরুন সমাজের দিকে…বড় বড় পাশ দিয়ে যারা সমাজে প্রতিষ্ঠার মিছিলে পা দিয়েছেন তারা কি ভাবছেন………. লাইফ ইজ আ রেস…..এ রেসে ন্যায়-অন্যায়, মূল্যবোধ, বিবেক, মনুষ্যত্ব এসব দেখার সময় কোথায়….একটা চাকরি চাই, প্রতিষ্ঠা চাই, টাকা চাই…..এসব নাহলে লাইফে কিসের ভাল থাকা। অমুক প্রতিবছর বিদেশ বিহারে যাচ্ছে, তমুক প্রাডো কিনেছে, যমুকের বউ মাসে দশখানা অঙ্গাবরণ কিনছে….যেভাবেই হোক ভাল থাকতে হবে। সেখানে আবার বিবেক কি-মূল্যবোধ কি..যত্তসব ফাল্তু কথা…..বেকডেটেড চিন্তাভাবনা….স্মার্টফোন, লেপটপ, উইকএন্ডে বারবিকিউ পার্টি, পিকনিক, চার্মিং জুমে গিয়ে ছবি ওঠা, কোন পানি সংগ্রহে ব্যস্ত রমনী কিংবা জঙ্গল থেকে মণখানেক ওজনের লাকড়ির বোঝা নিয়ে ফেরা মানুষের সাথে সেলফি দিয়ে জীবন সংগ্রামে সহমর্মিতা জানিয়ে আহা, উহু করে বিবেকের দায় এড়ানো এটাইতো আধুনিক জীবন। আধুনিক জীবন যাপন করতে করতে আধুনিক চেতনার জায়গা থেকে কখন যে সরে এসেছে আজকের তরুন সমাজ, শিক্ষিত সমাজ তা তাদের কালারফুল জীবনের ব্লাক এন্ড হোয়াইট চিন্তাভাবনায় কখনো ধরা পড়েছে কি। যে মানুষটা চারটা পাহাড় ডিঙিয়ে পানি সংগ্রহ করছে, লাকড়ির বোঝার সাথে সমাজের-রাষ্ট্রের অবহেলার বোঝা বয়ে নিয়ে চলেছে যুগের পর যুগ তার ভাগ্য ফেরানোর দায়িত্ব কার !!!!!!! হ্যাঁ; সরকারের। কিন্তু সরকার কে? আপনি আমি আমরা সবাই। কারণ ভাবনার শুরুটাতো হবে আপনার-আমার মস্তিষ্ক থেকে। তারপরইতো পৌঁছুবে সরকারের কাছে। সকালের ব্রাশটা থেকে শুরু করে রাতে ঘুমানোর আগ পর্যন্ত সেলফি দিয়ে যে বিজ্ঞান নির্ভর দিনের সমাপ্তি আমরা কজন তরুন আছি সে বিজ্ঞানকে ধন্যবাদ জানাই। কর্মবাদী মতবাদের বৌদ্ধ ধর্মীয় আধুনিক তরুন সমাজ কখনো কি ভেবেছেন কর্মটা ঠিকঠাক আছেতো। ধর্মের নামে চিত্ত উচাটন করা অন্ত:সারশূন্য চেতনা ও বানিজ্যিক আনুষ্ঠানিকতায় ভরা ধর্ম ব্যববায়ীদের কাছে কবেই আমরা বিকিয়ে দিয়েছি আমাদের সৃষ্টিশীল তারুণ্য। রাজনৈতিক লেজুরবৃত্তির জোয়ারে কবেই হারিয়ে গেছে আমাদের প্রকৃত আর্দশিক অবস্থান। তারপরও আমরা চিন্তা-চেতনায়-কর্মে আধুনিক তরুন-শিক্ষিত সমাজ। কারণ এতেই আমরা ভালো আছি। কারণ ভাল থাকার মানেটা এখন বদলে গেছে… সবাইকে নিয়ে ভালো থাকা নয়, ভালো থাকা নিজেকে নিয়ে । তাই মাঝরাতে পাশের বাসায় কেউ মারা গেলেও আমরা বিচলিত হইনা, দশ লাখ টাকা দিয়ে চাকরি নিয়েছি সে কথাও আমরা রাস্তায় বলে বেড়াই এবং আশ্চর্য্যজনকভাবে আমরা বিব্রতও হইনা।

রাঙ্গামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরির বিজ্ঞপ্তি বেরিয়েছে সম্প্রতি। তোলপাড় চলছে পাহাড়ে, পাহাড়ীদের মধ্যে। তরুন-শিক্ষিত ভাই-বোনেরা আদাজল খেয়ে নেমেছেন, অমুকের কাছে দৌড়ুচ্ছেনতো তমুকের কাছে রেস লাগাচ্ছেন। কারণ একটা চাকরি চাই, প্রতিষ্ঠা চাই, ভাল থাকা চাই। তরুনের সাথে একটু মধ্যবয়সী, অর্ধবয়সীরাও রেইস লাগিয়েছেন সমানতালে। কারণ উপজাতিয় প্রার্থীদের জন্য বয়স, শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার মধ্যে ২টি শর্ত শিথিলযোগ্য। বলাতো যায়না বুড়া বয়সে “যদি লাইগ্যা যায়”। ভবিষ্যতে তখন বলা যাবে, অমুক আমাদের বংশের লোক, যে তমুক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম রেজিস্টার । অথচ এরাই কিছুদিন আগে বিভিন্ন সামাজিক-আসামাজিক, জন-গন মাধ্যমে এর বিরুদ্ধে লাইক-ডিসলাইক, মন্তব্য, বিবৃতি দিয়ে আন্দোলনে পাশে থাকার ঘোষণা দিয়েছিলেন। অদ্ভুদ এ বৈপরীত্য কেন……আমাদের কি এতটুকু চক্ষুলজ্ঝাও অবশিষ্ট নেই। আমরা কি এতটাই অসহায় হয়ে পড়েছি ব্যক্তিস্বার্থের কাছে যেখানে আত্নমর্যাদা ধর্ষিত হয়। ঐদিন এক ভদ্রলোক কথা প্রসঙ্গে বললেন, আমরা কথায় কথায় নোংরা খাবারের জন্য হোটেল-রেস্টুরেন্টের বদনাম করি, কিন্তু তার প্রতিবাদসরুপ আমরা কি হোটেলে খাওয়া বন্ধ করেছি…..না করিনি, আর করিনি বলেই হোটেলগুলি এত অনিয়ম, জেল-জরিমানার পরও চলছে বহাল তবিয়তে। কারণ আর কিছুই নয়, আমরাই তাদের টিকিয়ে রেখেছি। কারণ আমরা অনিয়ম ও লোকদেখানো এমন এক আদর্শ জগতের মধ্যে বসবাস করছি যেখানে মূল্যবোধের প্রশ্ন ভীষণ মূল্যহীন, ন্যায়-অন্যায়, উচিত-অনুচিতের ফারাকটা এতটাই কাছাকাছি চলে এসেছে যে আমরা তা ধারণ করার বোধটুকুও হারাতে চলেছি। সেখানে নিজস্ব সত্ত্বা, স্বকীয়তা, আত্নমর্যাদা নিতান্তই মর্যাদাহীন। সেদিন অনেক কষ্টে জানতে পেরেছি আমার অতি পরিচিত একজন রাবিপ্রবি’র শিক্ষক হয়েছেন। তাঁকে আমি সাধুবাদ জানাই, তার হয়তো বিবেকের দায় ছিল, অস্বস্তি ছিল, তাই তিনি এতবড় সুসংবাদ এভাবে চেপে গেছেন। তবে আজকে যারা চাকরি নিয়ে এভাবে খুল্লামখুল্লা মহড়া দিচ্ছেন তাদের দেখে শুধু অবাক হই। জঙ্গিবাদের কিন্তু একটি প্রকাশিত রূপ আছে যা সুবিধাবাদের নেই। ক্যান্সারের মত এটি ধীরে ধীরে আমাদের নৈতিকতার জায়গাটাকে নিঃশেষ করে চলেছে। কাকে ছেড়ে কার কথা বলি, যেখানে গোটা সমাজ-দেশ আক্রান্ত এই ব্যাধিতে। জেনে হোক না জেনে হোক, মূল্যবোধের যে তলানিতে গিয়ে আমরা নামছি, বাইরেরটা চকচকে হলেও ভেতরটা ভীষণ অন্ধকার।

অর্ণব
১৩/০৭/১৬

লেখক : উন্নয়ন কর্মী এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী (লেখাটি তার ফেসবুক ওয়াল থেকে নেয়া)।

(লেখায় প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব)

Micro Web Technology

আরো দেখুন

স্বাস্থ্য বিভাগকে সুরক্ষা সামগ্রী দিলো রাঙামাটি রেড ক্রিসেন্ট

নভেল করোনাভাইরাসের (কভিড-১৯) সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে রাঙামাটির ১২টি সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য কেন্দ্রসমূহে স্বাস্থ্য …

Leave a Reply