নীড় পাতা » খাগড়াছড়ি » ওয়াদুদ ভুঁইয়ার মুখোমুখি

ওয়াদুদ ভুঁইয়ার মুখোমুখি

wadud2

পার্বত্য রাজনীতির রহস্যময় চরিত্র তিনি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই ছাত্রদল নেতা পড়াশুনা শেষে নিজ জেলা খাগড়াছড়ি ফিরে হয়ে যান সেখানকার জাতীয়তাবাদী রাজনীতির প্রাণপুরুষ। খেয়ালী জীবনযাপন,সৌখিনতা আর সাংগঠনিক দক্ষতার কারণে যতটা আলোচিত, নানান কর্মকান্ডের কারণে সমানভাবে বিতর্কিতও তিনি। পাহাড়ে পুনর্বাসিত বাঙালীদের মধ্যে অসম্ভব জনপ্রিয় এই রাজনীতিবিদকে পাহাড়ীদের অনেকেই ‘পাহাড়ী বিদ্বেষী’ হিসেবেও মূল্যায়ন করেন। কিন্তু তা মানতে নারাজ তার সমর্থক,শুভানুধ্যায়ীরা। সম্প্রতি পাহাড় টোয়েন্টিফোরকে দেয়া এক বিশেষ সাক্ষাতকারে পার্বত্য রাজনীতির নানান দিক সম্পর্কে খোলামেলা আলোচনা করেছেন তিনি।

কবে ফিরছেন খাগড়াছড়িতে- সাক্ষাতকারের শুরুতেই এমন প্রশ্নের জবাবে ওয়াদুদ ভূইয়া বলেন, আমি খাগড়াছড়িতে প্রায়ই যাতায়াত করি। থাকতে দেয়না সরকার বা স্থানীয় প্রশাসন। ফেরার কোন বিষয় নাই,ফেরাতো হয়ে গেছে আরো বহু আগেই,থাকা হয়না শুধু। নিয়মিত থাকা যদি বলেন সেটা যেকোন সময় হতে পারে,এটা পরিবেশ পরিস্থিতির উপর নির্ভর করবে। এটা কালকেও হতে পারে,আবার এক সপ্তাহ পনের দিন বা একমাস পরেও হতে পারে। এটা নির্ভর করছে আমার ব্যাপারে এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের ব্যাপারে বর্তমান সরকারের দৃষ্টিভঙ্গীর উপরে।

খাগড়াছড়ি বিএনপিতে বিরোধ সম্পর্কে তিনি বলেন, খাগড়াছড়ি বিএনপিতে কোন বিভক্তি নাই। একটা বড় দলেতো অনেকেই নমিনেশন চাইতে পারে,এটা কোন দোষের না। একজন রাজনৈতিক নেতা,আমলা,ব্যবসায়ী যেকেউই তা চায়। সেই হিসেবে সমীরণ দেওয়ানও মনোনয়ন চাইতেই পারেন,এটা তেমন কিছু না এবং তার সাথে আমাদের কোন বিরোধও নাই। সে দলের কোন পর্যায়ে সেইভাবে সম্পৃক্ত না। খাগড়াছড়ি বিএনপিতে কোন বিরোধ নেই দাবি করে তিনি বলেন, আমাদের জেলায় কোন বিভক্তি নাই,আমি দলের সভাপতি,সবাই আমার নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ। ওনি মনোনয়ন চাইছেন,ওনার সাথে অরাজনৈতিক কিছু লোক আছে। এটা তেমন কোন সমস্যা না। দলে কোন বিভক্তি নাই।

পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি সম্পর্কে চুক্তির শুরু থেকেই বিরোধীতা করা এই নেতা বলেন, পার্বত্য চুক্তির কারণে পার্বত্যাঞ্চলের পাহাড়ী বাঙালী সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইউপিডিএফ এর জন্ম হয়েছে। পাহাড়ী-পাহাড়ী খুনোখুনি হচ্ছে। আমি শুরু থেকেই বলেছি,এখনো বলছি,এই চুক্তির দ্বারা পার্বত্য এলাকার পাহাড়ী বাঙালী কারোই মঙ্গল আসবেনা। এই কারণে হাইকোর্টও এই চুক্তির মূল কাঠামোটাই বাতিল করে দিয়েছে,এখন এটি সুপ্রীম কোর্টের আপীল বিভাগে আছে। সুতরাং চুক্তিটি এখন আছে এটা বলা যায়না। অর্থাৎ আমি শুরু থেকেই যা বলে আসছি হাইকোর্টের রায়েরও তাই প্রমাণিত হয়েছে। কোন সরকার এই রায় মানলো কি মানলোনা তাতে আমার কিছু যায় আসেনা। আমার দাবি,আন্দোলন,যুক্তি, হাইকোর্টও সমর্থন করেছে,এটাও একটি অর্জন।

পাহাড়ে বাঙালী আন্দোলন সম্পর্কে তিনি বলেন, পাহাড়ে বাঙালী আন্দোলনে যোগ্য,ত্যাগী এবং সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নেতৃত্বের অভাব আছে,এখানে নেতৃত্ব ওইভাবে গড়েও উঠে নাই। আবার অনেকে সরকারের সাথে আঁতাত করে চলে, আবার কেউ কেউ সরকারের রোষানলে পড়ার ভয়ে এই আন্দোলন থেকে দূরেও থাকে। আবার অনেক নেতা আছে যারা বিভিন্ন জায়গা থেকে সুযোগ সুবিধা পেতে চায়। কিন্তু সুবিধা সুবিধা পেতে গেলেতো এই জাতীয় অধিকার আন্দোলন সম্ভব না,এইজন্য অনেকে এই আন্দোলন করতে পারেনা কিন্তু সংগঠনের ব্যানার থেকেও দূরে থাকতে চায়না। কারণ ব্যানারের পেছনে থাকলে বিভিন্ন স্থানে তারা মূল্যায়ন পায়। ফলে ব্যানারের পেছনে থেকে সুবিধা আদায়ের সুযোগ থেকে যেমন কেউ কেউ নিজেকে বঞ্চিত করতে চায়না,তেমনি আবার সুবিধা বঞ্চিত হওয়ার শংকায় আন্দোলনেও নামেনা। তার উপর বাঙালীরা তো এমনিতেই পাহাড়ে পিছিয়ে আছে,শিক্ষায়,চাকুরিতে,ব্যবসায়। ফলে সাংগঠনিক নেতৃত্বেরও বিকাশও সেইভাবে হয় নাই,কারণ সাংগঠনিক নেতৃত্বের বিকাশ একদিনে হয়না। আমি মনে করি এরপরেও যা আছে মন্দ নয়। আজকে না হয় কালকে হবে। আর স্বার্থরক্ষার বিরোধের কারণেই নেতৃত্বের বিরোধ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

পার্বত্য বাঙালী ছাত্র পরিষদকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, এটা সত্য যে,জামাত-শিবিরের কারণে এই সংগঠন এগোতে পারে নাই। তারা নানাভাবে বিতর্কিত হয়েছে। সবসময়ই জামাত শিবিরের নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার কারনে এই সংগঠন ও বাঙালী আন্দোলনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে তাদের গ্রহণযোগ্যতা নেই। অথচ বাঙালী আন্দোলন হওয়ার কথা সার্বজনীন। কিন্তু তারা ব্যক্তি বা গোষ্ঠী স্বার্থের উর্ধ্বে উঠতে না পারায়, আন্দোলনের বদলে নিজস্ব রাজনৈতিক আদর্শের ট্যাবলেট খাওয়ানোর অপচেষ্টার কারণে তারা নিজেদের গ্রহণযোগ্যতাই হারিয়েছে।photo-02

সমঅধিকার আন্দোলনের কয়েকজন নেতা সম্পর্কে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন,সব সমাজে কিছু সুবিধাভোগী থাকে। এরা অনেকে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গী দেখে এবং সুবিধা নেয়ার প্রবণতার কারণে নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছে । কিন্তু কে গেলো আর কোথায় গেলো, এতে সংগঠনের কিছুই হয়না।

পাহাড়ের আঞ্চলিক তিন রাজনৈতিক দল জেএসএস,ইউপিডিএফ ও জেএসএস সংস্কারপন্থীদের সম্পর্কে তিনি বলেন, ওরা ভুল পথে পরিচালিত হচ্ছে। ওদের কনসেপ্টটাই ভুল। জেএসএস এর জন্ম ৭২ সালে,মানে ৪০ বছর আগে। এই ৪০ বছরে তারা যে কর্মকান্ড আর আদর্শের কথা প্রচার করেছে,আজ এতোবছর পর এসে তাদের সেই আদর্শ,উদ্দেশ্য যে ভুল ও ব্যর্থ সেটাই প্রমাণিত হয়েছে। তারা পাহাড়ের পাহাড়ীদের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলো,তার কিছুই করতে পারে নাই। পাহাড়ী জনগনকে একরকম ধোঁকাই দিয়েছে। বরং তাদের গুটিকয়েক নেতা সরকারি প্রটোকল,বেতনভাতা নিয়ে আলিশান জীবনযাপন করছে। ৪০ বছরের আন্দোলনের ফসল হলো তাদের ১০/১২ জনের আলিশান জীবনযাপন। অনেকের পরিবার বিদেশেও থাকে, কিন্তু পাহাড়ের সাধারন নিরীহ পাহাড়ীদের জন্য তারা কিছু করতে পারে নাই। আমি বলব,গত ৪০ বছরের কর্মকান্ডই প্রমাণ করেছে,জেএসএস ও শান্তিবাহিনী সম্পূর্ণ ব্যর্থ এবং তাদের আদর্শ ছিলো ভুল।

অপরদিকে প্রায় পনের বছর হলো ইউপিডিএ এর জন্ম হয়েছে। পনের বছরে একটি বাচ্চাও ম্যাচিউরড হয়ে যায়। পনের বছর একটি সংগঠনের জন্যও কম বয়স নয়। গত পনের বছরে ইউপিডিএফ পাহাড়ের জনগণকে যে আশার বাণী শুনিয়ে আসছিলো তা আর জনগণ বিশ্বাস করতে পারেনা। কারণ,মূল ¯্রােতের বিরুদ্ধে ভুল কোন আদর্শ নিয়ে কোন মিথ্যা বিপ্লব সাধন হয়না। কারণ তারা বিপ্লবের নামে চাঁদাবাজি করছে। বিপ্লবের নামে তারা কিছু যুবকের কর্মসংস্থান হয়তো করেছে,যাদের বেতন দেয়া হয় চাঁদাবাজির টাকায়,অস্ত্র কেনা হয় সেই টাকায়। চাঁদাবাজির জন্য তারা অপহরণ করে,সেই টাকা দিয়ে পরিবার চালায়। ফলে তারা অবৈধ পন্থায় কিছু কর্মসংস্থান করেছে বলা যায়। এর বাইরে তাদের কোন অর্জন নাই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

জেএসএস,ইউপিড্ফি এবং সংস্কারপন্থী এদের মূল আদর্শ ও স্পিরিটটাই ভুল এবং তারা নিরীহ পাহাড়ীদের ধোঁকা দিয়ে বিপ্লবের নামে ভুল আন্দোলন চালাচ্ছে বলে মন্তব্য করে ওয়াদুদ ভূইয়া বলেন, পাহাড়ের নিরীহ নিরস্ত্র পাহাড়ীরা এদের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্তই হচ্ছে,তারা অপহৃত হচ্ছে,খুন হচ্ছে,জিম্মি হয়ে আছে এই তিনটি দলের কাছে। একজন সাধারন পাহাড়ী ঘরের মুরগী বিক্রি করলে ৫ টাকা,একবোঝা লাকড়ি বিক্রি করলে ১০ টাকা আর এক কানি জমি চাষ করতে ৫০০ টাকা,গাড়ী চালাতে কূপন নিয়ে চাঁদা দিয়ে চালাতে হয়। ফলে তারা আর এই সশস্ত্র গ্রুপগুলোর সাথে থাকতে চায়না। তারা এখন রাজনীতির মূল ¯্রােতধারায় সম্পৃক্ত হচ্ছে,জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে সম্পৃক্ত হচ্ছে। দিনে দিনে শিক্ষিত পাহাড়ী যুবকরা জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে মিশে যাচ্ছে,সশস্ত্র গ্রুপগুলো একা হয়ে যাচ্ছে,অসহায় হয়ে যাচ্ছে। একদিন তাদের তধাকথিত ভ্রান্ত বিপ্লব মরে যাবে।

photo-04শান্তি চুক্তির আগে ও পরের পার্বত্য চট্টগ্রামকে কিভাবে দেখেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, শান্তিচুক্তির আগে পার্বত্য এলাকায় একটি গ্রুপ হত্যা, অপহরণ, চাঁদাবাজি,সন্ত্রাস করতো,এখন তিনটা গ্রুপ এটা করছে। এক জায়গার বদলে এখন তিন গ্রুপকে চাঁদা দিতে হচ্ছে। জনগণ এখন তিনভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে,আইনশৃংখলা বাহিনীকেও তিনটি সশস্ত্র গ্রুপের দিকে পৃথকভাবে নজর দিতে হয়। সমস্যা আরো বেড়েছে। চুক্তির কারণে শান্তি স্থাপন তো দূরের কথা বরং শান্তি ও নিরাপত্তা আরো বিঘিœত হয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে অনলাইনে মিথ্যা অপপ্রচার চালানোর অভিযোগ করে ওয়াদুদ ভূঁইয়া বলেন,পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে পাহাড়ীদের একটি অংশ সারাবিশ্বে অপপ্রচার চালাচ্ছে, দেশবিরোধী তৎপরতা চালাচ্ছে। এই কারণে দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে,সেনাবাহিনীসহ আইনশৃংখলাবাহিনীর ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে। তাদের এই মিথ্যা প্রপাগান্ডা বেশ শক্তিশালী। তাদের কথাকথিত বিপ্লবকে শক্তিশালী করার জন্য তারা অপপ্রচার,মিথ্যা প্রচারকে মূল অবলম্বন করেছে। তাদের কাছে প্রচুর অবৈধ কালো টাকা যে আছে, তা এইসব প্রচারের মাধ্যমেই প্রমাণ হয়। চাঁদাবাজি আর বিদেশীরা যে তাদের টাকা দেয় বিভিন্নœ এনজিও তাদের টাকা দেয়,বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা তাদের টাকা দেয়। এইসব টাকার কারণেই তারা দেশে এবং বিদেশে এইসব অপপ্রচার নির্বিঘেœ চালাতে সক্ষম হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

ওয়াদুদ ভূঁইয়া বলেন, বিদেশীদের পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে বিশেষ আগ্রহ আচ্ছে। পার্বত্য এলাকার প্রাকৃতিক সম্পদকে কুক্ষিগত করার জন্য এবং ভূ-রাজনৈতিক দিক বিবেচনায় বাংলাদেশ তাদের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই তারা এটা নিয়ে নানান চক্রান্ত করছে,পার্বত্য এলাকার উপর তাদের লোলুপ দৃষ্টি আছে। এই কারণে তারা পাহাড়ের সশস্ত্র গ্রুপগুলোকে অর্থ,অস্ত্র এবং লজিস্টিক সাপোর্ট দিচ্ছে। প্রচার প্রচারণায়ও ইন্ধন দিচ্ছে।

পাহাড়ে আন্তর্জাতিক ও দেশি বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থার কাজের সমালোচনা করে এই নেতা বলেন,পাহাড়ে ইউএনডিপি,এডিবির কর্মকান্ডের কোন স্বচ্ছতা,জবাবদিহিতা বা তদারকি নাই। এদের কারণে পাহাড়ে প্রকৃত কোন উন্নয়ন হয় নাই। এইসব সংস্থার কর্মকর্তারা নিজেদের আখের গোচাচ্ছে। আন্তর্জাতিক নানান চক্রান্তের অংশ হিসেবেই তারা এখানে প্রচুর বিনিয়োগ করেছে,এটা এখানকার মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়নের জন্য যে করছে,তা কিন্তু না। ফলে এদের কর্মকান্ডে খুব একটা সুফল আসছেনা। এদের কারণে বিপদগামীরা হয়তো আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছে,কিছু কিছু লোক ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হচ্ছে,কুড়েঘরকে বিল্ডিং বানাচ্ছে। উন্নয়নের নামে কিছু মানুষের ব্যক্তিগত লাভ হলেও সাধারন পাহাড়ের মানুষের কোন লাভ হয়নি। এইসব প্রকল্পের উদ্দেশ্য সফল হয়নি বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন,- আমরা ক্ষমতায় গেলে আমাদের সরকারকে অতীতের মতো ভবিষ্যতেও যাচাই বাছাই করে সঠিক পরামর্শ দেয়ার চেষ্টা করবো।

গণমাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামের সঠিত তথ্য উঠে আসেনা অভিযোগ করে তিনি বলেন, আমাদের গণমাধ্যমের একটি অংশ বিদেশী ষড়যন্ত্রকারিদের দ্বারা প্রভাবিত। বিদেশীরা যেভাবে চায়,সেইভাবেই প্রচার প্রপাগান্ডায় অংশ নেয় কিছু মিডিয়া। আর কিছু কিছু গণমাধ্যমের লেখায় তথ্যের ঘাটতি দেখা যায়। আর কিছু গনমাধ্যম ক্রসচেক না করেই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সংবাদ প্রচার করে। অভিযোগ সত্যি না মিথ্যা,তাও চেক করে দেখেনা। আত্মপক্ষ সমর্থন করার সুযোগও দেয়না। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষেত্রে আমাদের দেশের মিডিয়ার বড় একটি বিভ্রান্ত এবং একপেশে সংবাদ পরিবেশন করে।

তার বিরুদ্ধে পার্বত্য এলাকার ‘গডফাদার’ প্রচারনা সম্পর্কে তিনি বলেন, এগুলো আমার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক পরশ্রীকাতরতা। যেহেতু আমি রাজনীতি করি,সবাইতো আমার পক্ষে থাকবেনা। রাজনৈতিক ভিন্ন মতাবলম্বীরা তো সমালোচনা করবেই। তারা যা প্রচার করে তা মিথ্যা এবং ভিত্তিহীন,একপেশে। আমার জনপ্রিয়তায় ঈর্ষান্বিত হয়ে এইসব অপপ্রচার চালানো হয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

তিনি বলেন, আমাকে গডফাদার বলার কোন মানেই নাই। আমারতো কোন সশস্ত্র সংগঠন ছিলোনা। আমিতো কাউকে থাপ্পড়ও দেই নাই। ইউপিডিএফ-জেএসএসতো হাজার হাজার মানুষকে মেরেছে এবং নিরাপত্তাবাহিনীর সাথে যুদ্ধ করছে। তাহলে সন্তু লারমা প্রসীত খীসা থাকতে আমি কেনো গডফাদার হবো ? ওরা আমার গ্রান্ডফাদার। ওরা থাকতে আমার মতো একজন গনতান্ত্রিক রাজনীতি করা ব্যক্তি কেনো গডফাদার হবে ? এটা তাদের সশস্ত্র সন্ত্রাস,অন্যায়গুলোকে চেপে রাখার জন্য আমাকে হাইলাইট করার চেষ্টা হচ্ছে গডফাদার হিসেবে। জেএসএস এবং ইউপিডিএফ এর সন্ত্রাসকে ঢেকে রাখার জন্যই আমাকে এইসব মিথ্যা অপবাদ দেয়া হয়েছে।

ওয়াদুদ ভূঁইয়া বলেন, এটা আমাকে বিতর্কিত করার চেষ্টা,যেনো পাহাড়ে যোগ্য এবং বিকল্প কোন নেতৃত্ব তৈরি না হয়। ওয়ান ইলেভেনর সরকারও তাদের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে বলে দাবি করে তিনি বলেন,সন্তু লামার বিরুদ্ধে ত্রিশ হাজার বাঙালীকে হত্যা করা,নিরাপত্তাবাহিনীর অনেককে হত্যার অভিযোগ আছে,কিন্তু তাকে গ্রেফতার করেনি। মনিস্বপন দেওয়ানের বিরুদ্ধে অনেক দুর্নীতির অভিযোগ ছিলো,অনেক পাহাড়ী নেতার বিরুদ্ধে সশস্ত্র কার্যক্রম পরিচালনা,চাঁদাবাজির অভিযোগ ছিলো, তাদেরকে গ্রেফতার করে নাই। অথচ একমাত্র বাঙালী নেতা হিসেবে আমাকেই গ্রেফতার করেছে। এতা বোঝা যায়,এটা যে পাহাড়ী নেতারাই চায়না,তা নয়,এটা আমাদের শাসকগোষ্ঠীরও কেউ কেউ চায়না। আন্তর্জাতিক নানা শক্তিও তা চায়না বলেই বাংলাদেশে তাদের যারা এজেন্ট, তারাও চায় না পাহাড়ে সশস্ত্র গ্রুপগুলোর বিকল্প কোন গনতান্ত্রিক নেতৃত্ব গড়ে উঠুক।

photoতিনি বলেন, ওয়ান ইলেভেনের সময় দেশের দুই প্রধান নেত্রী গ্রেফতার হলেও সন্তু লারমা গ্রেফতার হয়নি,সারাদেশে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করা হলেও পাহাড়ে অস্ত্র উদ্ধার অভিযানও চালানো হয়নি,তাহলে আমরা কি ধরে নিতে পারি ? যারা দুইনেত্রীকে গ্রেফতার করেছে,তাদের বিদেশী প্রভূরা চায়নি বলেই সন্তু লারমা গ্রেফতার হয়নি। যারা দুইনেত্রীকে গ্রেফতার করার বীরত্ব দেখাতে পারলো,তারা কেনো পাহাড়ে অস্ত্র উদ্ধার এবং সন্তু লারমাকে গ্রেফতার করতে পারলোনা ? এতে কি প্রতীয়মান হয় ? এতে প্রমাণ হয়,ওয়াণ ইলেভেনের সরকারের প্রভু এবং সন্তু লারমাদের প্রভুরা একই।

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তাকে প্রার্থী না করার বিনিময়ে বিএনপিকে জনসংহতির সমর্থন দেয়ার শর্তারোপের গুজব সম্পর্কে ওয়াদুদ ভূঁইয়া বলেন, জেএসএস এর শর্তারোপের কোন তথ্য আমার কাছে নেই। যেহেতু জেএসএস বাঙালী বিদ্বেষী রাজনীতি করে,যেহেতু প্রধান দুইদলের তিনজেলার ছয়জন এমপি প্রার্থীর মধ্যে আমি একজনই বাঙালী,সেই ক্ষেত্রে তারা আমার বিরোধীতা করতেই পারে। তবে এটা আমার একার দায়িত্ব নয়,এটা যারা দলের নেতৃত্ব দেয়,তাদেরই সিদ্ধান্ত নিতে হবে,তারা কি কোন বিশেষ সম্প্রদায় দিয়ে রাজনীতি পরিচালনা করবে কিনা । আমার যে অবদান দলের জন্য,যে ত্যাগ,যে সংগ্রাম সেই বিবেচনায় আমাকে দল বাদ দিতে পারবেনা এটা আমি জানি।
জেএসএস এর সমর্থণ জয় পরাজয়ে কোন ভুমিকা রাখবে কিনা এমন প্রশ্নেœর জবাবে তিনি বলেন, পাহাড়ে এখন আর জেএসএস কোন ফ্যাক্টরই না। এটা নির্ভর করবে জনগণের উপর। পাহাড়ী বাঙালী ভোটারদের উপর। এখন আর সাধারন পাহাড়ীরা জেএসএস ইউপিডিএফ এর কথা শোনেনা। এদের উপর জনগণ বিরক্ত,ক্ষুদ্ধ। কারণ এদের দ্বারা তারা যুগের পর যুগ নির্যাতিত। সাধারন উপহাজাতীয়রা আর জেএসএস ইউপিডিএফ এর কথায় ভোট দেবেনা। তাদের সামান্য কিছু সশস্ত্র সংগঠনের সদস্যরা হয়তো দিতে পারে,কিন্তু সাধারন মানুষ দিবেনা।

দল মনোনয়ন না দিলে কি করবেন এমন প্রশ্নের জবাবে ওয়াদুদ ভূঁইয়া বলেন, আমি বিশ্বাস করিনা দল আমাকে মনোনয়ন দিবেনা। আমি জানি দল আমাকেই মনোনয়ন দেবে,বিএনপি পাহাড়ে জন্ম দিয়েছি আমি। আমাকে বাদ দিবে এমনটা আমি আমার নেতানেত্রীর আচরণে মনে করিনা। তাদের আচরণ পজিটিভ। সুতরাং আমিই মনোনয়ন পাবো।

রাঙামাটি বিএনপির রাজনীতি সম্পর্কে তিনি বলেন, রাঙামাটি বিএনপিতে নেতৃত্ব বিকশিত হয়নি। ফলে একের পর পর এক নেতা এসেছেন আর গিয়েছেন,দলের কোন লাভ হয়নি। আরেকটি বিষয় পাহাড়ে বিএনপি ও আওয়ামী লীগে দুই দলেই জেএসএস থেকে বিশেষ এসাইনমেন্ট দিয়ে লোক পাঠানো হয়,তারা মূলতঃ দল করার আড়ালে জেএসএস এর এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে আসে। তাদের কারণে বিএনপি এবং আওয়ামী লীগ দুইদলই ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।

দীপেন দেওয়ান ও মনীষ দেওয়ান সম্পর্কে তিনি বলেন,দুইজনের মধ্যে দল যাকে যোগ্য ও বিজয়ী হতে পারবে মনে করবে তাকেই মনোনয়ন দিবে,আমার কিছু বলার নাই।
কিন্তু এই দুইজনের ব্যাপারে আমার ব্যক্তিগত যে মত তা হলো, দীপেন দেওয়ান সবসময় প্রচার করেন তিনি সরকারি চাকুরি ছেড়ে এসেছেন বিএনপির জন্য,এটা সত্য নয়। তিনি আসলে চাঁদপুরে তার সহকর্মীদের উপর জেএমবি’র বোমা হামলার পর ভয়ে সরকারি চাকুরি ছেড়ে দিয়েছেন,এর সাথে বিএনপিতে যোগদানের কোন সম্পর্ক নেই। বিএনপির জন্য তিনি চাকুরি ছাড়েন নাই। আর তার বিএনপি’তে আসার উদ্দেশ্য নিয়েও নানান প্রশ্ন আছে,আলোচনা আছে।
অন্যদিকে মনীষ দেওয়ান সাবেক সেনাকর্মকর্তা হিসেবে সার্বভৌম বাংলাদেশের প্রতি তার অগাধ শ্রদ্ধাবোধ রয়েছে। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তিনি পরিচিত,এই দেশের জন্য তিনি যুদ্ধ করেছেন। জিয়া পরিবারের সাথেও দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে তিনি জাতীয়তাবাদী ঘরানারই লোক। তার যোগদানে বিএনপি লাভবান হয়েছে। রাঙামাটি বিএনপির বেশিরভাগ নেতাকর্মীই তার সাথে রয়েছে বলে জানি।

পাহাড়ে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠায় কি করা উচিত,এমন প্রশ্নের জবাবে ওয়াদুদ ভ্ূঁইয়া বলেন, গত ৪০ বছরে প্রমাণ হয়ে গেছে ইন্সারজেন্সি-কাউন্টার ইন্টারসেন্সি,সংঘাত-সংঘর্ষ,হানাহানি-রক্তপাতের মাধ্যমে পাহাড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। ৪২ বছরে জেএসএস এর আদর্শ ও কৌশল ভুল প্রমাণিত হয়েছে। সুতরাং পার্বত্য এলাকার বাঙালী পাহাড়ী সবাইকে ভেদাভেদ ভুলে, আস্থা ও বিশ্বাসের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। অস্ত্র ফেলে দিয়ে জাতীয় রাজনীতির মূল  স্রোতধারায় যদি উপজাতীয়দের নিয়ে আসা যায় তাহলে আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলো দুর্বল হবে,তাদের শেকড় উপড়ে যাবে। তাইলেই এই অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে।

Micro Web Technology

আরো দেখুন

মহালছড়িতে পানিতে ডুবে ২ শিশুর মৃত্যু

খাগড়াছড়ির মহালছড়ি উপজেলার মনাটেক গ্রামে পানিতে ডুবে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সোমবার দুপুর আড়াইটায় মনাটেক …

Leave a Reply