নীড় পাতা » ফিচার » খোলা জানালা » রিজওয়ানা আপা’র স্বামীকে অপহরণ : এই উদ্বেগ রাখবো কোথায়?

রিজওয়ানা আপা’র স্বামীকে অপহরণ : এই উদ্বেগ রাখবো কোথায়?

Rezwana-Hasanবুধবার দুপুরে খবরটি শোনার পরই মনটা ভারী হয়ে উঠলো। প্রিয় স্বদেশকে কেমন জানি অচেনা মনে হলো। অবচেতনে রাষ্ট্র আর দেশকে মনে হয়, গালি দিয়েছিলাম। উদ্বেগ-উৎকন্ঠা আর আশংকায় নিজেকে খুব অসহায় লাগছিলো। বুকটা যেনো ধড়পড় করছিলো।
মনের পর্দায়, চোখের সামনে বার বার প্রিয় ও শ্রদ্ধেয় রিজওয়ানা আপা’র প্রতিবাদ ও সাহসদীপ্ত চেহারাটা ভেসে উঠছিলো। প্রচন্ড একাকীত্বকে সঙ্গী করে দিনভর কাটিয়েছি, উদ্বেগঘন সময়।
দেশের ও বিশ্বের প্রায় সব মিডিয়াতেই রিজওয়ানা হাসানের স্বামী আবু বকর সিদ্দিক (এবি)-র নিষ্ঠুর অপহরণের খবরটি ফলাও করে প্রচার পাচ্ছে।
উৎসবমুখর সময়ে এমন একটি দুঃসংবাদ তো যে কোন সাধারণ মানুষের জন্যই মাথায় বাজ পড়ার মতো। কী এমন অপরাধ করেছেন, রিজওয়ানা আপা বা তাঁর প্রিয় এবি?
এখন থেকে প্রায় একযুগ আগে শ্রদ্ধেয় মাহফুজউল্লাহ্’র সূত্রে রিজওয়ানা আপা’র সাথে পরিচয়। পরিচয় ঘটেছিলো প্রিয় এবি’র সাথেও। পরিবেশ আন্দোলনের নগণ্য একজন কর্মী হয়েছি, রিজওয়ানা আপা’র হাত ধরেই। তাঁর সাথে বেশী বেশী ঘনিষ্ঠতার সুযোগটা ঘটিয়েছেন, সাবেক ছাত্রনেতা এবং রিজওয়ানা আপা’র সহকর্মী এডভোকেট ইকবাল কবির লিটন। প্রিয় লিটন ভাই।
খাগড়াছড়িতে পরিবেশ ইস্যুতে মৃদু আন্দোলন গড়ে উঠার পেছনে লিটন ভাইয়ের অসামান্য শ্রম আর রিজওয়ানা আপার ঐকান্তিকতা ভোলার মতো নয়। শুধু তাই নয়, পরিবেশ আন্দোলনের বাইরেও খাগড়াছড়িতে ভোক্তা অধিকার আন্দোলন, নাগরিক আন্দোলন, বিতর্ক চর্চা, নারী অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং বন ও ভূমির ওপর আদিবাসীদের অধিকার নিশ্চিতে মনোযোগী এক অসাধারণ প্রেরণাদাত্রী রিজওয়ানা আপা।
প্রয়াত মোহিউদ্দিন ফারুক; বেলা’র (বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি) প্রতিষ্ঠাতা। তাঁরই হাত ধরে দেশের ৫৬ হাজার বর্গমাইল জুড়ে পরিবেশ-প্রতিবেশ এবং প্রকৃতি সুরক্ষার আন্দোলনে রিজওয়ানা আপা; নিজেকে সর্মপিত করেছেন। রাজ্যের সকল সুখ-অভিলাষ বিসর্জন দিয়ে তিনি জীবনবাজি রেখে রুখে দাঁড়িয়েছেন, পরিবেশ বিনাশী সকল অপকর্ম আর পরিবেশ অপরাধীদের বিরুদ্ধে। সেই প্রতিকূল ¯্রােতে দুই দশক পথ পাড়ি দিয়েছেন, প্রচন্ড মনোবল আর সাহসের সাথেই।
প্রিয় এবি এবং রিজওয়ানা আপার সাথে; আমার এক ধরনের অপত্য ¯েœহের সর্ম্পকই গড়ে উঠেছে। তিনি যখন ঢাকার বাইরে চট্টগ্রাম অথবা পার্বত্য চট্টগ্রামের কোন বিষয় নিয়ে ভাবেন, তখন আমাকে অন্ততঃ একবার ফোন দেবেন-ই। বেলা’র পার্বত্য চট্টগ্রাম সর্ম্পকিত কোন সেমিনার-সিম্পোজিয়াম অথবা কর্মশালা করবেন; আমার অপ্রয়োজনীয় অংশগ্রহণ তিনি নিশ্চিত করবেন-ই। বেলা’র কতো কর্মসুচীতে আমি অংশ নিয়েছি তা, এ মুর্হুতে হলফ করে বলা কঠিন।rezwana-cry
একসময় বেলা’র চট্টগ্রামের চান্দগাঁও আবাসিক এলাকায় একটি অফিস ছিলো, সেই ছোট্ট অতিথিশালাটি যেনো আমার জন্যই বরাদ্দ ছিলো। সেই অফিসেই প্রথমবার প্রিয় এবি’র সাথে পরিচয় ঘটেছিলো। রিজওয়ানা আপা, অনেকবার খাগড়াছড়ি-রাঙ্গামাটি-বান্দরবান আসলেও সম্ভবত প্রিয় এবি; একবারই খাগড়াছড়ি এসেছিলেন। কিন্তু তাও তাঁর নিজের খরচে এবং নিজস্ব ব্যবস্থাপনায়। একই সময়ে রিজওয়ানা আপা, খাগড়াছড়িতে থাকলেও প্রতিষ্ঠানের অর্থে প্রিয় স্বামী’র ব্যয়ভার তিনি বহন করতে অপারগতা প্রকাশ করেছিলেন। শুধু তাই নয়, তিনি স্বামী নিয়ে এসেছেন অথবা তাঁর স্বামী এসেছেন; এই বিষয়টিই তিনি প্রকাশ করতে বিন¤্র বোধ করেছিলেন। এই হলো, অসামান্য নিরহংকার রিজওয়ানা হাসানের ব্যক্তিত্বের বড়ো চিত্র।
‘বেলা’ দেশের পরিবেশ আন্দোলনের অমিত এক বাতিঘর। যে বাতিঘরের শিখায় প্রজ্জলিত প্রিয় স্বদেশের পরিবেশ আন্দোলন। যার ছায়া টিকরে পড়েছে, পাহাড়ে-মধুপুরে-সিলেটে-দিনাজপুরে অথবা টাঙ্গাইল-নারায়ণগঞ্জেও। শিল্পদুষণ, পাহাড়কাটা, নগরদুষণ, নদী-ছড়া-জলাভূমি সুরক্ষা অথবা ভারতের সা¤্রাজ্যবাদী টিপাইমুখ বাঁধ; সবখানেই প্রতিবাদেও প্রাচীর গড়েছেন, প্রিয় রিজওয়ানা আপাই।
আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অবিচ্ছেদ্য অংশই ছিলো, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও পরিবেশগত বিপর্যয়মুক্ত নিরাপদ এক বাংলাদেশ গড়ে তোলা। দেশ স্বাধীনের পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু, তাঁর অসংখ্য বক্তব্য-বিবৃতিতে পরিবেশ সুরক্ষার আওয়াজ তুলেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর অনেক পরে মোহিউদ্দিন ফারুক, উচ্চ আদালতে জনস্বার্থ মামলা করার মাধ্যমে দেশবাসীকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন, পরিবেশগত বিপর্যয় চোখে সহজে দৃশ্যমান না হলেও এটির প্রভাব ভয়ংকর হতে বাধ্য। তিনি স্বল্প আয়ু নিয়ে পরপারে যাবার পর তাঁরই কনিষ্ঠতম সহকর্মী রিজওয়ানা হাসান, হাল ধরেন বেলা’র।
রাজনীতি কিংবা ক্ষমতার মোহ অথবা বৈষয়িকভাবে স্বচ্ছল হবার অবারিত সুযোগ থাকার পরও রিজওয়ানা আপা, সবকিছুকে পেছনে ফেলে জীবনের ব্রত হিসেবে নিয়েছেন; পরিবেশগত অপরাধমুক্ত এক বাংলাদেশের। তাঁর কাছে, অর্থ-বিত্ত, বিলাসিতা, নগদ আপোষের প্রস্তাব; সবকিছুই ধরা সহজ হলেও স্বভাবগত প্রতিবাদী অবস্থান থেকে তিনি বিন্দুমাত্র পিছপা হননি।
আর তাই তাঁকে প্রিয় এবি’র অপহরণের দৃশ্য অবলোকন করতে হচ্ছে আজ। এই বেদনার ভার কতো কঠিন, তা একমাত্র রিজওয়ানা আপাই বুঝতে পারছেন। আমরা যাঁরা তাঁর শ্রম আর আন্তরিকতায় অনেক বেশী স্বার্থ হাসিল করেছি, তাঁদের পক্ষে এই দুঃখের ভার কতোটা ভারী তা অনুমান করা কঠিন।
তবুও সারাদেশের তরুণতম পরিবেশ আন্দোলনের কর্মীদের কাছে, এই অসহনীয় অপরাধের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান জানাচ্ছি।
পরিশেষে বলতে চাই, আঁচল পেতে দাও মা, এই উদ্বেগ তোমার কোলেই শোভা পাবে; হয়তো।

প্রদীপ চৌধুরী : পাহাড়ের সংবাদকর্মী

( খোলা জানালা বিভাগে প্রকাশিত সকল মন্তব্য প্রতিবেদন,অভিমত ও মতামত এর দায় একান্তই লেখকের, এর সাথে পাহাড় টোয়েন্টিফোর ডট তম এর সম্পাদকীয় নীতিমালার কোন সম্পর্ক নেই)

Micro Web Technology

আরো দেখুন

নারীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় অবদান রাখবে কিশোরী ক্লাব

রাঙামাটির বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (এনজিও) প্রোগ্রেসিভের বাস্তবায়নে ‘আমাদের জীবন, আমাদের স্বাস্থ্য, আমাদের ভবিষ্যৎ’ এই প্রকল্পের …

২ comments

  1. যুদ্ধাপরাধী আত্মগোপনে থাকা প্রয়াত সাবেক প্রতিমন্ত্রী রাজাকার সৈয়দ মহিবুল হাসানের কন্যা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ।হবিগঞ্জের চুনারুঘাট-বাহুবলের কুখ্যাত রাজাকার তার বাবা সৈয়দ মহিবুল হাসানের কলঙ্কিত । পরিবেশবাদী হয়েও বাবার ‘৭১-এর অন্ধকার জীবনের ছায়ায় হত্যা, লুণ্ঠন, ধর্ষণের ইতিহাস আড়াল করে। সে তোর আপা হয় কেমনে— শালা তবে তুই ও কি….

    • রাজধানী যখন নোংরা, আবর্জনায় ভরপুর তখন নিশ্চুপ রিজওয়ানা পরিবেশ বিষয়ে কতটা লড়াই করছেন তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। জামায়াত ও হেফাজতে ইসলাম যখন গাছ কেটে সাবাড় করে দেয় তখন চুপসে থাকা পরিবেশ কর্মী বিভিন্ন সময় মাঠ-জলাশয়সহ নানা ইস্যুতে সোচ্চার হয়ে ওঠেন কার স্বার্থে?
      প্রদীপ চৌধুরী কে নিয়ে ও আমাদের সন্দেহ হয়.. কে এই প্রদীপ চৌধুরী ?

Leave a Reply

%d bloggers like this: