নীড় পাতা » পাহাড়ের সংবাদ » রাণী কালিন্দী : পার্বত্য চট্টগ্রামে নারী নেতৃত্বের এক পথিকৃৎ

রাণী কালিন্দী : পার্বত্য চট্টগ্রামে নারী নেতৃত্বের এক পথিকৃৎ

আমাদের দেশে সম্পত্তির উপর নারীর সমান উত্তরাধিকারের বিষয়টি সবসময় স্পর্শকাতর ইস্যু হিসেবে দেখা হয়ে থাকে। কারণ সম্পত্তির সাথে নারীর ক্ষমতায়নের একটি যোগসূত্র রয়েছে। সংবিধানে নারী—পুরুষের সাম্যের কথা বলা হলেও বাস্তবিক অর্থে এ সাম্যের চর্চা আমাদের দেশে কমই প্রয়োগ করা হয়ে থাকে। বাংলাদেশে প্রচলিত পিতৃতান্ত্রিক সমাজ কাঠামোর ছায়া পার্বত্য চট্টগ্রামের সমাজব্যবস্থায়ও স্পষ্টত দৃশ্যমান। তাই পার্বত্য চট্টগ্রামের সমাজব্যবস্থা বাংলাদেশের পুরুষতান্ত্রিক রাষ্ট্র তথা সমাজব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন কোন অংশ নয়।
আমরা জানি, বৃটিশ আমল থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামের শাসনব্যবস্থা এদেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে সবসময় পৃথক। এ অঞ্চলে দেশে প্রচলিত প্রশাসনিক কাঠামো ব্যবস্থার সাথে কিছু ঐতিহ্যগত প্রথাব্যবস্থাও বিদ্যমান রয়েছে। যেমন— প্রথাগত প্রতিষ্ঠান হিসেবে রাজা, হেডম্যান, কার্বারীরা এখনও সামাজিক বিচার আচার ও ভূমি ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছেন। এসব প্রথাগত প্রতিষ্ঠানে পুরুষের আধিপত্য প্রবলভাবে বিদ্যমান। কিন্তু তদসত্ত্বেও পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসে নারী নেতৃত্বের নজির রয়েছে।
উপমহাদেশে মহীয়সী নারীদের বীরত্ব গাঁথা কিংবা সমাজে মহীয়সীদের অবদানের কথা বলতে গেলে আমাদের চোখে প্রথমেই ভেসে ওঠে নবাব ফয়জুন্নেসা, বেগম রোকেয়া, প্রীতিলতা, বেগম সুফিয়া কামালদের মুখ। কিন্তু তাঁদের জন্মেরও পূর্বে পার্বত্য চট্টগ্রামে আরেক মহীয়সী নারীর কথা ক’জনই বা জানেন, যাঁর ব্যক্তিত্ব ও দোর্দণ্ড প্রতাপের কাছে ইংরেজ সরকারের ঝানু প্রশাসকও পরাস্ত হয়েছিলেন!
পার্বত্য চট্টগ্রামে ক্ষমতার ময়দানে পাহাড়ি নারীর পদচারণা শুরু হয়েছিলো ঊনবিংশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে। আজ থেকে প্রায় পৌনে দু’শ বছর আগে পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা রাজ্য শাসন শুরু করেছিলেন এক তেজস্বিনী নারী, তিনি হলেন চাকমা রাজা ধরম বক্স খাঁ’র স্ত্রী ‘রাণী কালিন্দী’। ১৮৩২ সালে রাজা ধরম বক্স খাঁর মৃত্যু হলে অপুত্রক রাজার উত্তরাধিকারী হিসেবে ইংরেজ কোম্পানী তৃতীয় রাণীর একমাত্র কন্যা মেনকা ওরফে চিকনবীকে রাজ্যভার প্রদান করেন। কিন্তু প্রথমা রাণী কালিন্দীর প্রবল আপত্তির মুখে সেই সিদ্ধান্ত স্থগিত করে ইংরেজ কোম্পানী কোর্ট অব ওয়ার্ডের দ্বারা ১৮৩৫ সাল পর্যন্ত শুকলাল দেওয়ানকে রাজ্যের ম্যানেজারের পদে আসীন করে। রাণী কালিন্দী আইনী লড়াই করে অবশেষে ১৮৪৪ সালে পুরোপুরিভাবে তাঁর মৃত স্বামীর যাবতীয় সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হিসেবে আইনগত স্বীকৃতি লাভ করেন। তবে আইনগত অধিকার লাভের পূর্বে মূলত: রাণী কালিন্দীই নেপথ্যে থেকে রাজ্য শাসন করেছিলেন বলে জানা যায়। সেই অর্থে রাজা ধরম বক্স খাঁর মৃত্যুর পর থেকে রাজ্য শাসনে রাণী কালিন্দীর স্পষ্টত প্রভাব ছিল।
রাস্তাঘাট বিহীন দূর্ভেদ্য ও দুর্গম পার্বত্য এলাকায় ঊনিশ শতকের প্রথমদিকে সাধারণ এক চাকমা জুমিয়া পরিবারে জন্মেছিলেন কালাবি চাকমা। চাকমা রাজা ধরম বক্স খাঁ’র সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে এ কালাবি চাকমাই ‘কালিন্দী রাণী’ হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। রাণী কালিন্দী প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত না হলেও বৈষয়িক বুদ্ধি কিংবা রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক দূরদর্শিতায় যথেষ্ট প্রাজ্ঞ ছিলেন। শুধু তাই নয়, তিনি তাঁর শাসনামলে বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় ক্ষেত্রে বিভিন্ন অবদান রেখে যে দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছিলেন তা আজও পার্বত্য চট্টগ্রাম ও চট্টগ্রামে অবিস্মরণীয় হয়ে আছে। তিনি বৌদ্ধ ধর্মকে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা এবং প্রচারের জন্য চট্টগ্রামের রাজানগরস্থ বর্তমান মহামুনি বৌদ্ধ মন্দিরটি স্থাপন করেন (বাংলা ১২৭৩ সনে)। এ বৌদ্ধ মন্দিরকে ঘিরে প্রতি বছর ‘মহামুনি’ মেলারও প্রবর্তন করেছিলেন রাণী কালিন্দী, যেটি আজও ‘উৎসব’ হিসেবে উদ্যাপিত হয়ে থাকে।
তৎকালীন সময়ে ‘বৌদ্ধ রঞ্জিকা’ প্রকাশেও রাণী কালিন্দীর বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। বৌদ্ধ ধর্ম ছাড়াও হিন্দু ও মুসলিম ধর্মের প্রতি তাঁর অগাধ শ্রদ্ধা ও ভক্তি ছিল। তৎকালীন রাজধানী রাজানগরে হিন্দুদের জন্য মন্দির ও মুসলমানদের জন্য মসজিদ নির্মাণের জন্য রাজভান্ডার হতে খরচ নির্বাহের ব্যবস্থাও করেছিলেন।
চাকমা রাজাদের মধ্যে রাণী কালিন্দীর শাসনকালটি ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও উল্লেখযোগ্য। কারণ রাণী কালিন্দীর আমলেই বৃটিশরা পার্বত্য চট্টগ্রামের উপর প্রত্যক্ষ আধিপত্য স্থাপন করে। ১৮৬০ সালের আগ পর্যন্ত চট্টগ্রাম থেকেই দূর্গম পার্বত্য অঞ্চলের শাসনকার্য পরিচালিত হত। ফলে বাস্তবিক অর্থে প্রত্যক্ষ বৃটিশ শাসন এই অঞ্চলে ছিলো না। ১৮৬১ সালের পর হতে পার্বত্য চট্টগ্রামে অস্থায়ীভাবে বিভিন্ন সময়ে কয়েকজন সুপারিন্টেন্ডেন্ট নিয়োগ পেলেও মূলতঃ ১৮৬৬ সাল হতে ক্যাপ্টেন টি,এইচ, লুইন শাসনকর্তা হিসেবে আর্বিভূত হন। ক্যাপ্টেন লুইন ১৮৬৯ সালের ১লা জানুয়ারী চন্দ্রঘোনা হতে রাঙ্গামাটিতে প্রশাসনিক হেড কোয়ার্টারকে স্থানান্তর করেন। ক্যাপ্টেন লুইনের মূল উদ্দেশ্য ছিল— নতুন রাজ্যে বৃটিশদের স্থায়ী অধিকার ও প্রাধান্য বিস্তার করা। অপরদিকে, পার্বত্য চট্টগ্রামের তৎকালীন শাসক রাণী কালিন্দী ছিলেন বৃটিশদের এ পদক্ষেপের ঘোর বিরোধী। কাজেই অচিরেই ঝানু কূটকৌশলী লুইনের সাথে তেজস্বিনী রাণী কালিন্দীর বিরোধ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
ক্যাপ্টেন লুইন শুরু থেকে রাণী কালিন্দীর প্রতি সন্দিহান ছিলেন। লুইনের ধারণা ছিলো— একজন অশিক্ষিত, বিধবা রমনীর পক্ষে কিভাবে রাজ্যের শাসন পরিচালনা করা সম্ভব! তাইতো সুচতুর ও ধূর্ত লুইন নানাভাবে রাণী কালিন্দীর ক্ষমতাকে খর্ব ও তাঁকে অপদস্ত করার চেষ্টায় লিপ্ত ছিলেন। কিন্তু রাণী কালিন্দী ছিলেন বুদ্ধিমতী, নিষ্ঠাবান, সদালাপী ও অতিথি পরায়ণ। ফলে রাজ্য শাসনের ক্ষেত্রে তাঁর এসব গুণাবলী তাঁকে অনেক বেশী সুরক্ষিত ও নিরাপদ রেখেছিলো। রাণী কালিন্দীর ক্ষমতা হ্রাস করার লক্ষ্যে ক্যাপ্টেন লুইন পার্বত্য এলাকার এক একটি উপত্যাকা ভূমিকে প্রতিপত্তিশালী দেওয়ানদেরকে চিরস্থায়ীভাবে বন্দোবস্ত গ্রহণের জন্য প্রলুব্ধ করতেন। কিন্তু রাণী কালিন্দীর প্রতি আনুগত্য স্বীকার করে তারা কেউ এ প্রস্তাবে সম্মত হননি। এছাড়া তৎকালীন সময়ে রাজ্যে এমন কোন প্রতিদ্বন্দ্বী দেওয়ান বা সর্দ্দার ছিল না যারা সিংহাসনে বসে নিরাপদে রাজত্ব চালাবেন। কারণ সেই সময়ে দেওয়ান বা সর্দ্দারগণ আধিপত্য নিয়ে নিজেদের মধ্যে কলহে মত্ত ছিল।
এমনকি রাণী কালিন্দীকে সামাজিকভাবে এবং প্রজা সাধারণের কাছে হেয় প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যে ক্যাপ্টেন লুইন রাণীর সাথে সাক্ষাতের প্রস্তাব দেন। যেহেতু তৎকালীন সমাজব্যবস্থা রক্ষণশীল ছিলো তাই সামাজিক মর্যাদা রক্ষার্থে পর্দা প্রথা মেনে চলা হতো। রাণী ক্যাপ্টেন লুইনের এ প্রস্তাবে সাড়া না দেওয়ায় লুইন ক্ষুব্দ হয়ে কয়েকশ সৈন্য—সামন্ত নিয়ে তৎকালীন রাজধানী রাঙ্গুনিয়ায় উপস্থিত হলে হিন্দু, মুসলমান, চাকমা নির্বিশেষে স্থানীয় সকল প্রজাগণ ক্যাপ্টেন লুইনকে প্রতিহত করে পিছু হটিয়ে দেয়। মূলতঃ রাণী কালিন্দীর অসাম্প্রদায়িক মনোভাবের কারনে তৎকালীন সময়ে পাহাড়ি—বাঙালি সকলের কাছে রাণীর গ্রহণযোগ্যতা ছিল তুলনাহীন। রাণীর উদারতা ও বিচক্ষণতা এবং প্রজা সাধারণের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার কারণে ধূর্ত ক্যাপ্টেন লুইনের শত ষড়যন্ত্রের পরেও তিনি দৃঢ়তার সাথে সকল পরিস্থিতি মোকাবেলা করে প্রায় তিন দশক রাজ্য শাসন করেছিলেন।
অবশেষে রাণী কালিন্দীকে যখন কোনভাবে পরাস্ত করা যাচ্ছিল না তখন ক্যাপ্টেন লুইন চাকমা রাজ্যকে শাসনের সুবিধার অজুহাত দেখিয়ে দুই ভাগে ভাগ করার প্রস্তাব করে প্রাদেশিক গভর্ণরের কাছে রিপোর্ট দেন। যার ফলশ্র“তিতে ১৮৮১ সালে ১লা সেপ্টেম্বর ইংরেজরা পার্বত্য চট্টগ্রামকে তিনটি সার্কেলে (চাকমা, বোমাং ও মং সার্কেল) ভাগ করে দেয়।
রাণী কালিন্দী ১৮৪৪ থেকে ১৮৭৩ সাল পর্যন্ত প্রায় তিন দশক দক্ষতার সাথে দোর্দণ্ড প্রতাপে রাজ্য শাসন করেছিলেন। এই মহীয়সী নারী ১৮৭৩ সালের ২২ সেপ্টেম্বরে মৃত্যুবরণ করেন। তেজস্বিনী রাণী কালিন্দীর শাসন দূর্গম পাহাড়ি এলাকার পশ্চাদপদ সংস্কারাচ্ছন্ন সমাজে যেন উল্কার মত উদয় হয়েছিল। তাঁর মৃত্যুর পর পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি সমাজ ব্যবস্থায় নারী প্রতিনিধিত্বের সূর্য্য দীর্ঘদিন অস্তমিত ছিল।
এছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসে নারী শাসনের উল্লেখযোগ্য আরেকটি নজির হলো— মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক মং সার্কেলের রাজা ‘রাজা মংপ্র“ সাইন’ এর মৃত্যুর পর রাণী নীহার দেবী ১৯৮৪ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত শাসক হিসেবে মং সার্কেলের দায়িত্বে ছিলেন। তিনি তাঁর দায়িত্বকালীন সময়টি দক্ষতার সাথে পরিচালনা করেছিলেন। তাঁর সময়েই স্থানীয়দের শিক্ষার সুযোগ বাড়ানোর লক্ষ্যে খাগড়াছড়ি জেলা মানিকছড়িতে নিজ নামে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন, যেটি বর্তমানে ‘রাণী নীহারদেবী সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়’ নামে পরিচিতি লাভ করেছে। এছাড়া সাধারণ জনগণের ব্যবসা—বাণিজ্যের সুবিধার্থে মানিকছড়িতে ‘রাণীর হাট’ নামে একটি বাজার প্রতিষ্ঠা করেন যেটি বর্তমানে ‘তিনটহরী বাজার’ নামে পরিচিত। রাণী নীহার দেবীর দায়িত্বকাল সংক্ষিপ্ত হলেও তাঁর অবদানের কথা মানিকছড়ির সাধারণ জনগণের মুখে মুখে এখনও ফিরে।
তাই আমাদের সবার প্রত্যাশা থাকবে, বর্তমান দিনে পাহাড়ের আনাচে—কানাচে এমনতর শৌর্য বীর্যের অধিকারী তেজস্বী ও সাহসী রমণীর আর্বিভাব ঘটুক, যাঁরা সব ধরণের নিপীড়নের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে রুদ্র প্রতাপে। অন্যদিকে, পাহাড়ের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন বিচক্ষণতার সাথে অটুট রাখতে সক্ষম হবে।

Micro Web Technology

আরো দেখুন

লংগদুতে ডেঙ্গু প্রতিরোধে বিএনপি’র প্রচারপত্র বিতরণ

রাঙামাটির লংগদু উপজেলায় ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়া প্রতিরোধে জনসচেতনতামূক প্রচারণা ও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার …

Leave a Reply