নীড় পাতা » ফিচার » খোলা জানালা » রাজনৈতিক বিতর্কে যেনো মিইয়ে না যায় পাহাড়ের প্রত্যাশিত শিক্ষা উন্নয়ন

রাজনৈতিক বিতর্কে যেনো মিইয়ে না যায় পাহাড়ের প্রত্যাশিত শিক্ষা উন্নয়ন

বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ; রাজনৈতিক বিতর্ক আর সংঘাতের এক লীলাভূমি হয়ে আছে যেনো, পার্বত্য চট্টগ্রাম। এখানকার ভূ-রাজনৈতিক ও জন-নিরাপত্তা, প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদ, ক্ষমতা কাঠামোর কর্তৃত্ব, পর্যটন এবং সরকারী- বেসরকারী (এনজিও) উন্নয়ন নিয়ে বির্তকের শেষ নেই।
জবাবদিহিতার ঘাটতি আর বিচারহীনতার সংস্কৃতির সুযোগে এই জনপর কিছু রাজনৈতিক নেতা ও জনপ্রতিনিধিরা রীতিমতো ‘ফ্রাংকেনষ্টাইন’-এ পরিণত হয়েছেন। তার ওপর অবৈধ অস্ত্র, টেন্ডারবাজি এবং ভয়াবহ চাঁদাবাজি; এই অঞ্চলের তরুণ সমাজকে ক্রমশঃ অর্থনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে।
শুধু তাই নয়, জবাবদিহিতার প্রতি চরম দায়বদ্ধতাহীন থাকতে দেখা যায়, প্রায় সবক’টি সরকারী প্রতিষ্ঠান, বিভাগ এবং সেসবের প্রধান কর্তা ব্যক্তিদের। ফলে পাহাড়ে দেশের স্বাধীনতা উত্তর সময়ে যে বিপুল পরিমাণ সরকারী অর্থ ও খাদ্যশষ্য বরাদ্দ দেয়া হয়েছে, তার সিকিভাগেরও সুফল সাধারণ জনগণ ভোগ করতে পারেননি।
পাহাড়ে সরকারী চাকরিতে আসা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বড়ো একটি অংশ দখল-বেদখল করেছেন, এখানকার হাজার হাজার একর সরকারী খাসভূমি। এবং বদলী হয়ে যাবার সময় বৈধ-অবৈধ পন্থায় নিয়ে গেছেন হাজার হাজার ট্রাক আসবাবপত্র।

বিশ্ববিদ্যালয় অনেক বড়ো বিষয়। মেডিকেল কলেজ তো হতে পারে। এখন দেখি সেখানেও একটি বড়ো বিতর্ক দাঁড়িয়ে গেছে। জাতীয় ও আঞ্চলিক দলের কয়েক নেতার হুংকারে মনে হচ্ছে, এটিও শেষতক যাত্রাপালায় রুপ নেবার শংকা তৈরী হতে চলেছে। বিরোধীতার খাতিরে বিরোধীতা করে উচ্চশিক্ষার একটি সরকারী সুযোগ থেকে মানুষকে বঞ্চিত করার কোন মানে তো খুঁজে পাচ্ছিনা।

তিন পার্বত্য জেলার যেকোন একটি উপজেলাকে নিয়ে ছোট-খাটো একটি গবেষণা পরিচালনা করলে হয়তো সরকারী লোকদের ভূমি আগ্রাসন আর বন আগ্রাসনের চিত্রটি আরো ভালোভবে তুলে ধরা সম্ভব হতো।
দেশের একটি বিশেষায়িত অনগ্রসর জনপদে যদি সরকারের নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের-ই দৃষ্টিভঙ্গী এমনটাই হয়, তাহলে সে অঞ্চলের গণ-মানুষের উন্নয়ন কতোটা নিশ্চিত হয়েছে; সে প্রশ্নের উত্তর প্রাপ্তি অবশ্যই সময় সাপেক্ষ।
দীর্ঘদিন এই অঞ্চলে সুশাসন ও মানবাধিকারের অভাব বিদ্যমান ছিলো, ছিলো যুদ্ধ এবং ভ্রাতৃঘাতি সংঘাত। সেসব অপ-ইতিহাসের প্রেতাত্মা টিকে আছে এখনো। ফলে এখানকার রাজনীতি, আর্থ-সামাজিক পরিবেশ, গণ-মানুষের ক্ষমতায়ন এবং মৌলিক অধিকারের উন্নয়ন; কোনটাই প্রত্যাশাকে ছুঁয়ে যেতে পারেনি।
সব সরকারের সময়েই জাতীয় ও আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের বাকপটু তার্কিকদের বাহাসে মিঁইয়ে যায়, সব জনগুরুত্বপূর্ন উন্নয়ন এজেন্ডা। আর এই সুযোগে সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীরা হাসিল করে নেন, নিজেদের স্বার্থ। তিন পার্বত্য জেলার মোট জনসংখ্যার নগণ্য একটি অংশ বাদ দিলে প্রায় সব জনপদ, জনগোষ্ঠি এবং মানুষ, জীবনমানের দিক থেকে এখনো অনেক পিছিয়ে।
‘খাদ্য-বস্ত্র-শিক্ষা-স্বাস্থ্য-বাসস্থান’র মতো সংবিধান স্বীকৃত মৌলিক অধিকার থেকে এই অঞ্চলের লাখো মানুষ; এখনো লাখো মাইল দূরে। কোথায় সুপেয় পানি, কোথায় বিদ্যুৎ, কোথায় খাদ্য নিরাপত্তা, কোথায় বিনোদন; এ যেনো এক অপরুপ রুপকথার মতোই শোনায়।
সেই যে বলছিলাম, বাহাসের কথা। মাঝে মাঝে মনে হয়, বাহাস-ই যেনো এই অঞ্চলের বড়ো উন্নয়ন এজেন্ডা। একটি অবিরাম যাত্রাপালাও পাহাড়ে চলছে বিগত প্রায় দেড়যুগ ধরে। কেউ বলেন ‘কথিত’, কেউ বলেন ‘ঐতিহাসিক’ আবার কেউবা ‘সাদা-কালো’। সেই চলমান ‘পার্বত্যচুক্তি’ নামের যাত্রাপালা কবে শেষ হবে, আমরা কেউ-ই জানিনা?
সেই বাহাসের খপ্পড়ে পড়েছে এবার, রাঙ্গামাটিতে সদ্য চালু হওয়া একটি মেডিকেল কলেজ’র ভর্তি প্রক্রিয়া। এর আগেও ‘রাঙ্গামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়’ নিয়ে একটি জমকালো রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর আমরা উপভোগ করেছিলাম। মাঝে মধ্যে সেই বিশ্ববিদ্যালয় ইস্যূটি মাথাচাড়া দিয়ে উঠলেও সমাধানের গন্তব্য খুঁজে পাননি কেউ। আদৌ সেই বিশ্ববিদ্যালয় আলো’র মুখ দেখবে কীনা, সেটিও যথেষ্ট সন্দেহময়।
একটি বিশ্ববিদ্যালয় হোক, এটি বোধয় সবাই-ই চান। বিশ্ববিদ্যালয়টির রুপরেখা, গতি-প্রকৃতি এবং কার্য-পরিধি নিয়ে অবশ্যই বির্তক হতে পারে। যে অঞ্চলে বিশ্ববিদ্যালয় হবে, যে অঞ্চলের মেধাবী শিক্ষার্থীরা সেখানে পড়বে, সেসব ষ্টেক হোল্ডারদের মতামত নেয়াও জরুরী। প্রতিবেশী ভারত এবং সার্কভূক্ত নেপাল-শ্রীলংকার রাজনৈতিক সমস্যাকবলিত জনপদেও বিশ্ববিদ্যালয় হয়েছে।
এ সর্ম্পকে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করে অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য ভারতের ‘সেভেন সিস্টার’ অথবা নেপাল ও শ্রীলংকাতে পাঠালেও তো একটি সমাধানসূত্র মিলতে পারে। পাহাড়ের উন্নয়নের জন্য কত টাকাই তো বিদেশ ভ্রমণে ব্যয় হচ্ছে। পার্বত্য এলাকার তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারী থেকে মন্ত্রণালয়ের পদস্থ কর্মকর্তা-কর্মচারী, সবাই তো বিদেশ ঘুরছেন!
সরকারের সদিচ্ছা থাকলে বিশ্ববিদ্যালয়-মেডিকেল কলেজ ইস্যূতে একটি গণ-শুনানীও তো হতে পারে। বিশেষ অঞ্চল বিবেচনা করলেও তিন পার্বত্য জেলার এমন জ্ঞানী ও অভিজ্ঞ বাসিন্দা আছেন, যাঁরা দেশে-বিদেশে সুখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ে-কলেজে দক্ষতার সাথে শিক্ষকতা করছেন। তাঁদের মতামত এবং অর্জিত ও বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত অভিজ্ঞতা উপেক্ষিত থাকবে কেনো?
আমার মনে প্রশ্ন জাগে, ‘বিশ্ববিদ্যালয় হবে, বিশ্ববিদ্যালয় হবেনা’; এমন বিতর্কের ক্ষেত্র তৈরী করে নেতা ও জনপ্রতিনিধিরা কী মজা পাচ্ছেন?
সে যাক, বিশ্ববিদ্যালয় অনেক বড়ো বিষয়। মেডিকেল কলেজ তো হতে পারে। এখন দেখি সেখানেও একটি বড়ো বিতর্ক দাঁড়িয়ে গেছে। জাতীয় ও আঞ্চলিক দলের কয়েক নেতার হুংকারে মনে হচ্ছে, এটিও শেষতক যাত্রাপালায় রুপ নেবার শংকা তৈরী হতে চলেছে। বিরোধীতার খাতিরে বিরোধীতা করে উচ্চশিক্ষার একটি সরকারী সুযোগ থেকে মানুষকে বঞ্চিত করার কোন মানে তো খুঁজে পাচ্ছিনা। তবে এ কথা তো অনস্বীকার্য্য যে, পাহাড়ের সবকটি সরকারী স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পর্যাপ্ত চিকিৎসক যেমন নিশ্চিত করতে পারেনি সরকার, একইভাবে নিশ্চিত করতে পারেনি সুযোগ-সুবিধাও। এ্যাম্বুলেন্স, নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ বা সার্বক্ষণিক জেনারেটর, ইসিজি-এক্সরে, প্যাথলজি-আল্ট্রা সনোগ্রাম কোনটাই পর্যাপ্ত নয়। জেলাসদর থেকে ইউনিয়ন স্বাস্থ্য সেবাকেন্দ্র; পার্বত্যাঞ্চলের সবখানে নেই আর নেই।
হয়তো সেই ঘাটতি আর সংকট পূরণের লক্ষ্যে সরকার, পাহাড়ে একটি মেডিকেল কলেজ স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে। আমি পাহাড়ের একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে এই উদ্যোগকে অশেষ স্বাগত জানায়।
কিন্তু সরকার যেহেতু জনগণের কাছে দায়বদ্ধ তাই এই মেডিকেল কলেজ স্থাপনের যৌক্তিকতা এবং অর্নিবার্য্যতার বিষয়টিও জনগণের কাছে পরিস্কার তুলে ধরতে পারে। যাতে মেডিকেল কলেজ স্থাপনের ইস্যূতে জনমত বিকশিত হতে পারে।
পেছনে গিয়েই যদি বলি, তিন পার্বত্য জেলার বিপুল সংখ্যক ছেলে-মেয়ে প্রতিবছর দেশে ও বিদেশে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় এবং মেডেকেলসহ অন্যান্য কলেজে ভর্তি হচ্ছেন। ব্যয়বহুল ও বাণিজ্যিক এই উচ্চশিক্ষা সবার জন্য সমান প্রযোজ্য নয়।
আবার পাহাড়ে যে ক’টি সরকারী হাইস্কুল ও কলেজ রয়েছে, সেগুলির অবস্থাও খুব একটা ভালো নয়। বছরের পর বছর এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক সংকট, বিজ্ঞানাগারের উপকরণ সংকট, আবাসন, যানবাহন সংকট লেগেই আছে। দরিদ্র ও নি¤œবিত্ত পরিবারের ছেলেমেয়েরাই এসব প্রতিষ্ঠানে পড়ছেন।
মেডিকেল বা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের সাথে এই বিষয়গুলিও প্রয়োজনীয়।
কিন্তু পাহাড়ের নেতা ও জনপ্রতিনিধিরা একবারের জন্যও সেদিকে চোখ বুলাচ্ছেন না। পার্বত্য শান্তিচুক্তি উত্তর সময়ে সরকারী ও দাতা গোষ্ঠির অর্থায়নে একটি বিশেষ ‘এলিট’ শ্রেণী গড়ে উঠেছে। পার্বত্য এলাকায় যাঁদের বিশালাকার বাগান আর বিলাসবহুল বাড়ী দৃশ্যমান হলেও এঁদের কারোর-ই ছেলে বা মেয়ে পার্বত্য এলাকার কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়েন না। তাঁরা শুধু পাহাড়ের সাধারণ মানুষের মাথার ওপর ক্ষুর বুলাতেই মজা পান। এই অপ-রাজনীতিই তাঁদের বড়ো ব্যবসা। এই অপ-শক্তিকে মোকাবিলা করার সামর্থ্য অবশ্যই সরকারের আছে। আছে, পাহাড়ের সাধারণ মানুষেরও।
এই চিহ্নিত শক্তিধর রাজনৈতিক নেতা ও জনপ্রতিধিদের অর্থ-বিত্তের উৎস নিয়ে সরকার কোন জবাবদিহিতা চান না বলেই তাঁরা সরকারের সবক’টি উদ্যোগকে বিতর্কের মাঠে ছুঁড়ে ফেলেন। তাঁদের কারো হলফনামা আমাদের জানা হলেও কারো হলফনামা অদৃশ্যই রয়ে গেলো।
একটি দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতৃত্বদানকারী এবং অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ বিনির্মাণে দায়বদ্ধ রাজনৈতিক দল হিসেবে ‘আওয়ামীলীগ’কে পার্বত্য এলাকায় উচ্চ শিক্ষা বিস্তারের দায় নিতেই হবে।
সেক্ষেত্রে পরিস্থিতি মোকাবেলায় পার্বত্য এলাকা থেকে নির্বাচিত জনপ্রতিধিরা ব্যর্থ হলে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিরাও বিরোধীতাকারীদের সাথে যৌক্তিক সংলাপে যেতে পারেন। কারণ, একটি কার্যকর সংলাপ যতো দ্রুত সমাধানের পথ বাতলে দিতে পারবে, বিপরীত দিকে বাহাসের অপ-রাজনীতি সাধারণ মানুষকে অনেক বেশী দুর্ভোগে ফেলবে।
আজকে যদি পাহাড়ে যে কেউ একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় বা মেডিকেল কলেজ স্থাপনে আগ্রহী হোন, সেটি তো আমরা কেউ-ই ঠেকাতো পারবো না। তাই যাঁরা পার্বত্যাঞ্চলে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন প্রক্রিয়ার মতো মেডিকেল কলেজ স্থাপন প্রক্রিয়ার বিরোধীতা করছেন, তাঁদেরকে উচ্চ শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণের ভয়াবহতা সর্ম্পকেও সজাগ হতে হবে।

প্রদীপ চৌধুরী : পাহাড়ের সংবাদকর্মী

লেখায় প্রকাশিত মতামত একান্তই লেখকের নিজস্ব বক্তব্য

Micro Web Technology

আরো দেখুন

নানিয়ারচর সেতু : এক সেতুতেই দুর্গমতা ঘুচছে তিন উপজেলার

কাপ্তাই হ্রদ সৃষ্টির ৬০ বছর পর এক নানিয়ারচর সেতুতেই স্বপ্ন বুনছে রাঙামাটি জেলার দুর্গম তিন …

Leave a Reply