নীড় পাতা » পাহাড়ের রাজনীতি » রাঙামাটি বিএনপির মৌসুমি পাখীরা!

রাঙামাটি বিএনপির মৌসুমি পাখীরা!

bnp_logoওনারা নানা সময় নানা কারণে নানান বাস্তবতায় বিএনপি‘তে এসেছেন,এখনো আসছেন,কিন্তু পরিবর্তিত বাস্তবতায় ওনারা আর বিএনপি করেন না ! তাই বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীরা ওনাদের আদর করে ডাকেন মৌসুমি পাখী।

কাপ্তাই হ্রদে প্রতি শীত মৌসুমে সাইবেরিয়া বা শীতপ্রধান দেশ থেকে আসা মৌসুমি পাখীরা আর আগের মতো আসেনা,হ্রদে তাই অতিথি মৌসুমি পাখীদের আকাল ইদানিং,কিন্তু পাহাড়ে জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে এই মৌসুমি পাখীদের আকাল ছিলোনা কোনকালেই।

সেই ১৯৯৭৮ সালে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আমলে প্রথম জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে যুক্ত হন সুবিমল দেওয়ান। মনোনীত হন রাষ্ট্রপতির উপদেষ্টাও। প্রবল প্রতাপ তার পাহাড়ে। গাড়ী দাবড়িয়ে বেড়ান নিশিদিন। জেলা বিএনপির সাধারন সম্পাদক,সভাপতিও হন। কিন্তু প্রেসিডেন্ট জিয়া নিহত হতেই তিনি যেনো আর থেকেও নেই বিএনপিতে ! তার সেই সময়কার সহকর্মী সিনিয়র এক বিএনপি নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,শহীদ জিয়ার মৃত্যুর পর সেই সময় পাহাড়ে বিএনপির বেহাল দশা। সভাপতি সুবিমল দেওয়ান রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয়,তাকে ডেকে আনতেও অনেক কষ্ট হতো,আসতেই চাইতেন না। তার অসহযোগিতায় দল একেবারে দুর্বল হয়ে পড়ে এই জেলায়। তবুও নেতৃত্ব শূণ্যতার কারণে দল তার বোঝা বহন করেছে দীর্ঘদিন। পরে নাজিমউদ্দিন ও জহির আহম্মেদ নেতৃত্ব নিলে সোজা হয়ে দাঁড়ায় বিএনপি। বাস্তবতা হলো সুবিমল দেওয়ানরা দলের সুসময়ের নেতা ছিলেন। বছরকয়েক আগে বয়বৃদ্ধ সুবিমল দেওয়ানের মৃত্যু হলেও তার দুইদশক আগে থেকেই তিনি আর বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন না।

২০০১ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র ২৮ দিন আগে বিএনপিতে যোগ দেন সাবেক পৌরসভা ও উপজেলা চেয়ারম্যান মনিস্বপন দেওয়ান। যোগদিয়েই দলীয় মনোনয়ন পেয়ে সংসদ সদস্য,পার্বত্য উপমন্ত্রী। কিন্তু দল ক্ষমতা ছাড়ার আগেই মনিস্বপন নাই ! তিনি বিএনপি ছেড়ে যোগ দেন অলি আহম্মেদের নেতৃত্বাধীন এলডিপি‘তে। অর্থা’ তিনি বিএনপি করেছেন শুধু ক্ষমতাসীন সময়টাতেই। এর মধ্যে দলের কোন দায়িত্বও নেননি। ২০০৩ সালে অনুষ্ঠিত জেলা সম্মেলনে নামমাত্র জেলা কমিটি সদস্য হয়েছেন শুধু। শুধুই কি মনিস্বপন ? তার সাথে দলবেঁধে বিএনপিতে আসেন কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ডীন ড. মানিক লাল দেওয়ান। এসেই রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পান। উপভোগ করেন পুরো মেয়াদ। কিন্তু দল ক্ষমতা হারাতেই তিনি আর নাই ! শুধু জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মানিকলাল দেওয়ানই নন। তার সময়কালে জেলা পরিষদের সদস্য অজিত তালুতদার,উষাহ্লা রোয়াজা কিংবা সুজিত তালুকদার জাপান‘রাও বিএনপির রাজনীতিতে এখন আর সেইভাবে সক্রিয় নন। অথচ দল ক্ষমতায় থাকতে এরাই ছিলেন দন্ডমুন্ডের কর্তা । নিজেরা কামিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। কিন্তু দল বিপাকে পড়লে তাদের হদিস নেই। বিএনপির জন্মলগ্ন থেকেই এইরকম অতিথি পাখী নেতাদের নিয়েই চলছে এই জেলায় বিএনপির কর্মকান্ড।
তবে ব্যতিক্রম যে নেই তা নয়। পারিজাত কুসুম চাকমা,রবীন্দ্র লাল চাকমা,দীপন তালুকদার‘রা দীর্ঘদিন ধরে এই জেলায় বিএনপির রাজনীতিতে নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং দিচ্ছেন। পারিজাত কুসুম চাকমা মৃত্যুবরণ করলেও রবীন্দ্রলাল ও দীপন তালুকদার এখনো সক্রিয় জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে। হালে সুবিমল দেওয়ানপুত্র দীপেন দেওয়ান সরকারি চাকুরি ছেড়ে এসে হাল ধরেছেন বিএনপির। দলে যোগ দেয়ার কিছুদিনের মধ্যেই জেলা বিএনপির সভাপতি মনোনিত হয়েছেন সরাসরি। শুধু তাই নয়,যোগ দেয়ার বছর তিনেকের মধ্যেই তিনি হয়েছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সহধর্ম বিষয়ক সম্পাদকও। দলের কোন ধরণের কার্যক্রমের সাথে সম্পৃক্ত না থেকেও তার স্ত্রী মৈত্রী চাকমা বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পেয়েছেন দলীয় মনোনয়ন। এখন তিনিও সক্রিয় দলে।
দীপেন দেওয়ানের হাত ধরে আরো অনেক পাহাড়ী যোগ দিয়েছেন বিএনপিতে। এদের অনেককে নেতাকর্মীরা আন্তরিকভাবে গ্রহণ করলেও আবার অনেককে নিয়ে রয়েছে সংশয়ও। তবে এইসব পাহাড়ী নেতাকর্মীরা মনে করেন,সময়েই সব সংশয়ের জবাব দিবে। তারা মনে করেন,বিএনপিকে ভালোবেসেইে তারা বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন। আর এক্ষেত্রে দীপেন দেওয়ানও কিছুটা দুর্ভাগা। তিনিই এখন পর্যন্ত একমাত্র পাহাড়ী বিএনপি নেতা যিনি দলে যোগ দিয়েই এখনো ক্ষমতার স্বাদ পাননি। এর জন্য তার দুর্ভাগ্যই মূলত দায়ি। বিগত নির্বাচনে নিবাচর্নী বিধিমালার কারণে তিনি নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি (যদিও নিজের বদলে স্ত্রীকে মনোনয়ন পাইয়ে দিয়েছেন) । আবার দল হিসেবে বিএনপিও পরাজিত হয়। ফলে দলে যোগ দিলেও এখনো ক্ষমতার স্বাদ না পেলেও ব্যক্তিগত লাভ তারও কম নয়। দলে যোগ দিয়েই সভাপতি পদ পাওয়া,নিজে মনোনয়ন না পেয়ে স্কুলশিক্ষিকা স্ত্রীকে দলীয় মনোনয়ন পাইয়ে দেয়া,নিজে কেন্দ্রীয় বিএনপির সহধর্ম বিষয়ক সম্পাদক নির্বাচিত হওয়াও তার জন্য কম অর্জন নয়।

রাঙামাটি জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক এডভোকেট সাইফুল ইসলাম বলেন,কিছু ব্যতিক্রম বাদে এদের বেশিরভাগই রাজনীতির মৌসুমী পাখী। এরা বিএনপির সুসময়ে থাকেন,দু”সময়ে নাই হয়ে যান। সুবিমল দেওয়ান থেকে শুরু করে বর্তমানের নেতৃত্ব সবাইকে নিয়েই নেতাকর্মীদের মধ্যে সংশয় ছিলো,সংশয় আছে। বর্তমান নেতৃত্বকে তার কাজ,বিশ্বাসযোগ্যতা আর দলের প্রতি ভালোবাসার মাধ্যমেই নিজেকে প্রমাণ করতে হবে,ভবিষ্যতের কর্মকান্ডই তাদের রাজনীতির ভবিষ্যত নির্ধারন করবে। তিনি বলেন, নেতাকর্মীরা আর কোন সুবিমল দেওয়ান,মনিস্বপন দেওয়ান বা মানিকলাল দেওয়ান চায়না। বর্তমানে যারা দলে যোগ দিয়েছেন এবং দিচ্ছেন তাদের নেতাকর্মীরা সতর্ক পর্যবেক্ষন করছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

পৌর মেয়র ও পৌর বিএনপির সভাপতি সাইফুল ইসলাম ভূট্টো বলেন,ওনারা আসেন,ওনারা ক্ষমতার হালুয়া রুটি ভোগ করেন,তারপর চলেও যান। আমরা বিএনপির নেতাকর্মীরা কিছু পাই আর না পাই,আমরা দল নিয়ে পড়ে থাকি। দলের সুসময়ের বন্ধু আর দু”সময়ের বন্ধু অবশ্যই চিনে নিতে হবে। বিষয়টি পারস্পরিক অবিশ্বাসের নয়,আমরা ঘর পোড়া গরু তাই সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয়তো পাবোই। তিনি বলেন,দেওয়ান,খীসা,তালুকদার সবার জন্যই বিএনপির দরজা খোলা ছিলো,এখনো আছে। তবে অতীতে আমরা যেসব ভুল করেছি সেসব ভবিষ্যতে আর করবোনা। অতীতের ভুল থেকেই আমরা শিক্ষা নিয়েছি। তাই মৌসুমি পাখী হয়ে যারা আসছেন,তাদেরও দলকে ভালোবাসতে হবে,কাজ আর যোগ্যতা দিয়ে নেতাকর্মীদের কাছে বিশ্বাসযোগ্যতা প্রমাণ করতে হবে। নতুবা বিএনপির নেতাকর্মীরা এখন আর সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে ভুল করবেনা।

 

Micro Web Technology

আরো দেখুন

বাঙালি ছাত্র পরিষদের প্রতিবাদ সমাবেশ

ছাদেকুল হত্যার বিচার ও পার্বত্য এলাকা থেকে সেনাবাহিনী প্রত্যাহারের ষড়যন্ত্রের প্রতিবাদ ও সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অপপ্রচারের …

Leave a Reply