নীড় পাতা » ব্রেকিং » রাঙামাটি প্রেসক্লাবের বৃত্ত ভাঙবে কবে?

পেশাদার সাংবাদিকদের ক্ষোভ, সমঝোতার প্রস্তাব জেলা প্রশাসকের

রাঙামাটি প্রেসক্লাবের বৃত্ত ভাঙবে কবে?

দীর্ঘ দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে নতুন সদস্য পদ সংগ্রহ করছে না রাঙামাটি প্রেসক্লাব। বরাবরই স্থানীয় সাংবাদিকদের অভিযোগ, প্রেসক্লাবের বর্তমান কমিটির সদস্যদের মধ্যে ভিন্নমত থাকায় নতুন করে সদস্য সংগ্রহের উদ্যোগ নিতে পারছেন না সাংবাদিকদের এই অভিভাবক সংগঠনটি। অন্যদিকে বর্তমান ১৩ জন সদস্যের মধ্যে অনেকেই এখন সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত নন, এদের কেউ অসুস্থ, কেউ ব্যবসায় আবার কেউবা অন্যান্য পেশায় জড়িত, নেই সক্রিয় সাংবাদিকতায়! বর্তমান কমিটির সদস্যের অধিকাংশই বয়সে প্রবীণ হওয়ায় মাঠপর্যায়ে তাদের উপস্থিত থাকাও সম্ভব হচ্ছে না। প্রেসক্লাবে সদস্য সংগ্রহ নিয়ে রাঙামাটির সাংবাদিকদের মধ্যে ক্ষোভের কমতি নেই। বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠনের অফিস বা চায়ের দোকানে সাংবাদিকদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুই থাকে রাঙামাটি প্রেসক্লাবের সদস্যপদ। সর্বশেষ গতকাল সোমবার রাঙামাটি জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে আয়োজিত এক সভায় এই আলোচনার আর ক্ষোভেরই যেনো বিস্ফোরন হলো।

অনেকেই এখন সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত নন, এদের কেউ অসুস্থ, কেউ ব্যবসায় আবার কেউবা অন্যান্য পেশায় জড়িত, নেই সক্রিয় সাংবাদিকতায়! বর্তমান কমিটির সদস্যের অধিকাংশই বয়সে প্রবীণ হওয়ায় মাঠপর্যায়ে তাদের উপস্থিত থাকাও সম্ভব হচ্ছে না।

সরকারের ‘৩৩৩’ সেবা সম্পর্কে গণমাধ্যমকর্মীদের অবহিত করতে আয়োজিত এক সভায় রাঙামাটির জেলা প্রশাসক একেএম মামুনুর রশিদ রাঙামাটি প্রেসক্লাবের সদস্যপদ প্রসঙ্গে কথা তুললেই আলোচনার ঝড় উঠে পুরো মিলনায়তনজুড়ে। এসময় প্রেসক্লাব সদস্য ও প্রেসক্লাবের সদস্য নন এমন সাংবাদিকরাও কথার ফুলজুড়িতে ফোটাতে থাকেন। তবে জেলা প্রশাসক রাঙামাটি প্রেসক্লাবে নতুন সদস্য সংগ্রহের ব্যাপারে বর্তমান নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলাপ করবেন এবং নতুন সদস্য হতে আগ্রহীদের মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানান।

নতুন সদস্যপদ প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসক বলেন, রাঙামাটির প্রেসক্লাবের সদস্য সংখ্যা বাড়নোর দরকার। এটি আমার ব্যক্তিগত মতামত। ’ তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি এই গুরুত্বপূর্ণ সাংবাদিক সংগঠনে নবীন সাংবাদিকদের সুযোগ দেয়া উচিত।’

জেলা প্রশাসক বলেন, এই গুরুত্বপূর্ণ সাংবাদিক সংগঠনে নবীন সাংবাদিকদের সুযোগ দেয়া উচিত।

জেলা প্রশাসকের এই মতামতের জবাবে ও নিজেদের অবস্থানের পক্ষে বক্তব্য রাখেন রাঙামাটি প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি ও দৈনিক গিরিদর্পণ সম্পাদক একেএম মকছুদ আহমদ। তিনি বলেন, রাঙামাটি প্রেসক্লাব, চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব এবং জাতীয় প্রেসক্লাবের সাথে মিল রেখে গঠনতন্ত্র প্রণয়ন করেছে। যেটা কিছুটা কঠিন । ফলে চাইলেও সহসাই সদস্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয়না। যেমন রাঙামাটি প্রেসক্লাবের সদস্য হতে গেলে তিন বছরে নিজের নামে যেকোনো পত্রিকায় কমপক্ষে ৯০টি নিউজ ছাপাতে হবে। সাংবাদিকের নিয়োগপত্র থাকতে হবে, বেতন পেতে হবে। এমন বেশ কিছু নিয়ম রয়েছে। সাংবাদিকরাতো ঠিকমত বেতন পান না। আমি নিজেও দৈনিক ইত্তেফাকে তিনবছর যাবৎ বেতন পাচ্ছিনা। রাঙামাটির সাংবাদিকরা যে বেতন পায় তা দিয়ে কিছুই হয় না।’

দৈনিক গিরিদর্পণ সম্পাদকের নিউজ ছাপা সংক্রান্ত বক্তব্যের কড়া জবাব দেন বৈশাখী টেলিভিশনের রাঙামাটি প্রতিনিধি মো. কামাল উদ্দিন। তিনি বলেন, রাঙামাটি প্রেসক্লাবে এমনও সদস্য আছেন যাদের বিগত দশ বছরেও কোনো নিউজ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়নি। তাহলে আমার প্রশ্ন হলো- তিনি কিভাবে প্রেসক্লাবের সদস্য থাকেন?’ এর জবাবে মকছুদ আহমদ বলেন, এটারও একটি নিয়ম আছে। কতদিন নিউজ না আসলে সদস্যপদ স্থগিত হবে।

যাদের বিগত দশ বছরেও কোনো নিউজ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়নি। তাহলে আমার প্রশ্ন হলো- তিনি কিভাবে প্রেসক্লাবের সদস্য থাকেন?

সভায় রাঙামাটি প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ও দৈনিক সংগ্রাম পত্রিকার রাঙামাটি প্রতিনিধি মো. আনোয়ার আল হক জানান, প্রেসক্লাবের সদস্য সংগ্রহ খোলা রয়েছে। যে কেউ চাইলে আবেদন করতে পারেন। আমরা আগেও সদস্য সংগ্রহের জন্য পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়েছি। কিন্তু কেউ আবেদন করছেন না।’

প্রেসক্লাব সাধারণ সম্পাদকের বক্তব্যের জবাবে দৈনিক গিরিদর্পণের বার্তা সম্পাদক ও বাংলাভিশনের রাঙামাটি প্রতিনিধি নন্দন দেবনাথ বলেন, জেলা প্রশাসক স্যার আপনি যে বললেন, রাঙামাটি শিশু পার্কের সামনে শিশুদের খেলার সরঞ্জাম দেখে শিশুরা গেইটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে কখন গেইট খোলা হবে। তেমনিভাবে রাঙামাটি প্রেসক্লাব খোলা আছে, কিন্তু প্রবেশের দরজা বন্ধ। প্রেসক্লাবের ১৪ সদস্যের ১৪ রকম মত। একজন যদি কোনো প্রস্তাবে বাধা দেয় তখন আর কেউ সেদিকে যায় না। সকলের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, প্রেসক্লাবের সদস্যরা যখন দেহত্যাগ করবেন; তখনই অন্যরা সদস্য হতে পারবেন।’ এসময় উপস্থিত সাংবাদিকরা প্রায় সবাই একযোগে হেসে উঠেন।

রাঙামাটি প্রেসক্লাব খোলা আছে, কিন্তু প্রবেশের দরজা বন্ধ। প্রেসক্লাবের ১৪ সদস্যের ১৪ রকম মত। একজন যদি কোনো প্রস্তাবে বাধা দেয় তখন আর কেউ সেদিকে যায় না। সকলের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, প্রেসক্লাবের সদস্যরা যখন দেহত্যাগ করবেন; তখনই অন্যরা সদস্য হতে পারবেন।’ এসময় উপস্থিত সাংবাদিকরা প্রায় সবাই একযোগে হেসে উঠেন।

সময় টেলিভিশনের রাঙামাটি প্রতিনিধি ও দৈনিক পার্বত্য চট্টগ্রাম এর নগর সম্পাদক হেফাজত সবুজ দৈনিক গিরিদর্পণ সম্পাদক একেএম মকছুদ আহমদের বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, আমি মকছুদ ভাইয়ের কথার তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি। তিনি প্রায়শই বলেন, রাঙামাটির গণমাধ্যমকর্মীরা বেতন পাননা। আমি এখানেই অন্তত ২০-৩০জনকে দেখিয়ে দিতে পারব, যারা মাসের ১ থেকে ৫ তারিখের মধ্যেই অফিসের বেতন পেয়ে যান। তাই আমাদের সম্মানহানি হয় এমন কথা আমাদের পরিহার করা উত্তম বলে আমি মনে করি। তার পাশাপাশি আমি সহকর্মী নন্দনের বক্তব্যের সাথে একমত। রাঙামাটি প্রেসক্লাবের বর্তমান সদস্যরা যেদিন জান্নাত বা স্বর্গবাসী হবেন, সেদিনই আমাদের প্রেসক্লাবের সদস্য হওয়ার সৌভাগ্য হবে।’

রাঙামাটি রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি ও দৈনিক যুগান্তরের রাঙামাটি প্রতিনিধি সুশীল প্রসাদ চাকমা বলেন, আমি মনে করি, রাঙামাটি প্রেসক্লাব গুটি কয়েকজনের জন্য তৈরি করা হয়নি। এটি রাঙামাটির সকল সাংবাদিকদের জন্য। অবিলম্বে প্রেসক্লাবের সদস্য সংগ্রহ কার্যক্রম চালু করা উচিত।

রাঙামাটি প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি এসএম শামসুল আলম নিজেও বলেন, প্রেসক্লাবের সদস্য হতে না পেরে রাঙামাটিতে সাতটি সংগঠন গড়ে ওঠেছে। রাঙামাটি প্রেসক্লাবের বাইরে যারা আছেন, তাদের কীভাবে সদস্য পদ দেয়া যায় সে বিষয়ে জেলা প্রশাসক মহোদয় আপনি প্রেসক্লাবের সভাপতি-সম্পাদকের সাথে কথা বলে বিষয়টি সমাধান করবেন। এই বিষয়ে আপনাকে মধ্যস্ততা করার আহ্বান জানাচ্ছি। আমরাও চাই রাঙামাটির সকল সাংবাদিক, সকল সংগঠন বিলুপ্ত করে একই ছাদের নীচে চলে আসুক।’

প্রেসক্লাবের সদস্য হতে না পেরে রাঙামাটিতে সাতটি সংগঠন গড়ে ওঠেছে। আমরাও চাই রাঙামাটির সকল সাংবাদিক, সকল সংগঠন বিলুপ্ত করে একই ছাদের নীচে চলে আসুক।

সভায় উপস্থিত বক্তৃতা করা সাংবাদিকদের দাবির প্রেক্ষিতে শেষে জেলা প্রশাসক একেএম মামুনুর রশিদ রাঙামাটি প্রেসক্লাবের সদস্য সংগ্রহ চালু করার বিষয়ে প্রেসক্লাব সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের সাথে কথা বলে সমস্যাটি সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন। জেলায় সরকারের এই সর্বোচ্চ কর্মকর্তা এই সময় সাংবাদিকদের সমস্যাটি খতিয়ে দেখে সুরাহা করার চেষ্টা করবেন জানিয়ে, অচিরেই এই সংকটের সমাধান হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

প্রসঙ্গত, ১৯৯২ সালে রাঙামাটি প্রেসক্লাবের সর্বশেষ সদস্য হন, দৈনিক সংগ্রাম পত্রিকার রাঙামাটি প্রতিনিধি ও দৈনিক রাঙামাটির সম্পাদক আনোয়ার আল হক। একসময় ১৭ জন সদস্য থাকলেও ৩ জনের মৃত্যু,১ জনকে অব্যাহতির কারণে প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান সদস্য সংখ্যা ১৩ জন। এর মধ্যে প্রথম আলোর প্রতিনিধি হরিকিশোর চাকমা দুর্ঘটনাজনিতকারণে গত তিন বছর ধরে অনুপস্থিত সাংবাদিকতায়। আবার বর্তমানের যারা আছেন এদের মধ্যে অর্ধেকেরও বেশিজন এখন আর পেশায় সক্রিয় নন। অথচ রাঙামাটিতে কর্মরত প্রায় অর্ধশতাধিক সাংবাদিক,এদের মধ্যে মূলধারার ও গুরুত্বপূর্ণ গণমাধ্যমের সাংবাদিকদের অন্তত ২৫ জনের কেউই এই ক্লাবের সদস্য নয় ! মজার ব্যাপার হলো এটিএন ছাড়া আর কোন টিভি চ্যানেলের সাংবাদিকও সদস্য নয় এই ক্লাবের। জাতীয় দৈনিকগুলোর মধ্যে কালেরকন্ঠ, যুগান্তর, সমকাল, প্রথম আলো ও ডেইলি ষ্টারসহ গুরুত্বপূর্ণ পত্রিকার সব সাংবাদিক, এমনকি দেশের একটি জাতীয় অনলাইন নিউজ পোর্টালের সাংবাদিকও এই ক্লাবের সদস্য হতে পারেনি !

তবুও অজ্ঞাত কারণে ক্লাবটিতে বাড়ছে না বা বাড়ানো হচ্ছেনা সদস্য। কিন্তু ঠিক কি কারণে সদস্য বাড়ানো হচ্ছে না রাঙামাটি প্রেসক্লাবের, সেটি রাঙামাটিবাসির কাছে বরাবরই এক রহস্য ! এই রহস্যের বৃত্ত ভাঙবে কবে কিংবা আদৌ ভাঙবে কিনা সেটাই এখন দেখার বিষয়।

Micro Web Technology

আরো দেখুন

দীঘিনালায় কৃষকের কাছ থেকে ধান কেনায় অনিয়ম

খাগড়াছড়ির দীঘিনালায় কৃষকের কাছ থেকে ন্যায্যমূল্যে ধান ক্রয়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। গত সোমবার উপজেলার মেরুং …

Leave a Reply