নীড় পাতা » পাহাড়ের রাজনীতি » রাঙামাটির বিএনপি নেতা লে.কর্ণেল (অব:) মনীষ দেওয়ান : ‘কারো এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য আমি বিএনপিতে আসি নাই’

রাঙামাটির বিএনপি নেতা লে.কর্ণেল (অব:) মনীষ দেওয়ান : ‘কারো এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য আমি বিএনপিতে আসি নাই’

Rangamati-manish-dewan‘অন্য অনেকের মতো বিশেষ কারো এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য আমি বিএনপিতে আসি নাই,পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ী-বাঙালি সবাইকে সাথে নিয়ে স্বপ্নের পার্বত্য রাঙামাটিকে উন্নয়ন,সম্প্রীতি আর ভালোবাসার বন্ধনে স্বপ্নের রাঙামাটি হিসেবে এগিয়ে নেয়ার জন্যই,একজন সত্যিকারের বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী হিসেবেই আমি বিএনপিতে এসেছি,স্বপ্ন দেখি পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে বিএনপি’কে নেতৃত্ব দেয়ার।’-এইভাবেই নিজের বিএনপিকে যোগদানের কারণ সম্পর্কে জানালেন রাঙামাটি বিএনপিতে বছর তিনেক আগে যোগ দেয়া সাবেক সামরিক কর্মকর্তা ও বীর মুক্তিযোদ্ধা লেঃ কর্ণেল (অব.) মনীষ দেওয়ান। মাত্র বছর তিনেক আগে বিএনপিতে যোগ দিলেও বর্তমানে তাকে ঘিরেই তৈরি হয়েছে রাঙামাটি বিএনপির একটি শক্তিশালি বলয়।
সম্প্রতি তার রাঙামাটিস্থ সিদ্ধিভবন এলাকার বাসভবনে এই প্রতিবেদককে দেয়া এক সাক্ষাতকারে নিজের বিএনপিতে যোগদান,স্থানীয় বিএনপির রাজনীতি,পার্বত্য চট্টগ্রাম ইস্যুতে নিজের অবস্থান আর রাজনীতি নিয়ে নিজস্ব স্বপ্নের কথা জানালেন জাতীয়তাবাদী দলের এই নেতা।
পার্বত্য চট্টগ্রামের সংকট প্রসঙ্গে তিনি বলেন,পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে আমার ব্যক্তিগত কোন পলিসি নেই। কেন্দ্রীয় বিএনপি যে অবস্থান নিবে,যেহেতু দল করি সেহেতু দলের অবস্থানই আমার অবস্থান। তবে ব্যক্তিগতভাবে আমি চাইবো,পাহাড়ে যেনো একজন পাহাড়ী-একজন বাঙালীরও রক্ত না ঝড়ে। কারণ পার্বত্যবাসি পাহাড়ী বাঙালী সবাই শান্তি চায়,কেউ সন্ত্রাস,রক্ত,অশান্তি,চাঁদাবাজি এইসব চায়না। জানালেন,ভালোবাসা,আস্থা,আলোচনার মাধ্যমেই পার্বত্য সমস্যার স্থায়ী সমাধান করতে হবে। দুর করতে হবে পারস্পরিক অবিশ্বাস,সবার মাঝে আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে।

বিএনপিতে যোগদান প্রসঙ্গে তিনি বলেন,আমি এই দেশের জন্য যুদ্ধ করেছি,দীর্ঘদিন সামরিক বাহিনীতে থেকে দেশপ্রেমে উজ্জীবিত থেকেই নিজের উপর অর্পিত দায়িত্ব পালণ করেছি,আজ চাকুরি জীবন শেষে দেশের জন্য আরো কিছু করতে চাই। আমার এখন ব্যক্তিগত জীবনে কিছুই চাওয়া পাওয়ার নাই,কোন পিছুটান নেই। দেশ,জাতি আর সমাজের জন্যই বাকী জীবনটা উৎসর্গ করতে চাই।
তার যোগদানের মাধ্যমে জেলা বিএনপিতে দুটি ধারা সৃষ্টি হওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন,এটা ঠিক আমি যোগ দেয়ার পর দলে দুটি ধারা তৈরি হয়েছে। তবে দলের বেশিরভাগ সহযোগি সংগঠন এবং নেতাকর্মীই আমার সাথেই আছে। দলে দুটি ধারা তৈরি হওয়ার পেছনে বর্তমান নেতৃত্বকে দায়ি করে তিনি বলেন,কিছু স্বার্থান্বেষী মহলের কারণেই এটা হয়েছে। বর্তমান জেলা নেতৃত্বের সঠিক দিকনির্দেশনার অভাব এবং নেতৃত্বের অদক্ষতার কারণে সংকট তৈরি হয়েছে। তবে ধীরে ধীরে এই সংকট কেটে যাচ্ছে মন্তব্য করেন তিনি।

অন্য অনেকের মতো বিশেষ কারো এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য আমি বিএনপিতে আসি নাই,পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ী-বাঙালি সবাইকে সাথে নিয়ে স্বপ্নের পার্বত্য রাঙামাটিকে উন্নয়ন,সম্প্রীতি আর ভালোবাসার বন্ধনে স্বপ্নের রাঙামাটি হিসেবে এগিয়ে নেয়ার জন্যই,একজন সত্যিকারের বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী হিসেবেই আমি বিএনপিতে এসেছি,স্বপ্ন দেখি পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে বিএনপি’কে নেতৃত্ব দেয়ার।

বিএনপির বর্তমান জেলা নেতৃত্বের একাংশের সাথে তার দুরত্ব সৃষ্টি হওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন,একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে যে কারো রাজনীতি করার,বিএনপি করার অধিকার আছে। দেশনেত্রীর হাত ধরেই আমি বিএনপিে যোগ দিয়েছি,এখন কেউ যদি এখানে আমাকে প্রতিপক্ষ মনে করে সেটা তার ব্যক্তিগত সমস্যা,এ দায়তো আমার নয়। তবে আমি নিজেকে কারো প্রতিপক্ষ বা পথের কাটা মনে করিনা।
দলের যেসব নেতাকর্মী তার কাছ থেকে দুরে আছেন,তাদের প্রসঙ্গে তিনি বলেন,তারা হয়তো ভুল বুঝে দূরে সরে আছে,তারা বেশিরভাগই কোনদিন আমার কাছেই আসেনি। আমার বিশ্বাস তারা আমার কাছে আসলে,আমার সাথে কথা বললে তাদেরও ভুল ভাঙবে,দুরত্ব কমে যাবে। ভুলে গেলে চলবেনা,আমরা সবাই একই আদর্শে বিশ্বাসী বলেই একই দলের কর্মী হতে পেরেছি। আমাদের ঐক্য ও সংহতি ভীষণ প্রয়োজন।

নির্বাচনে মনোনয়ন পাওয়ার ব্যাপারে নিজের আশাবাদের কথা জানিয়ে তিনি বলেন,বিএনপি নির্বাচনমুখী দল। দল যাকে মনোনয়ন দিলে বিজয়ী হতে পারবে,তাকেই মনোনয়ন দিবে। দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এই ব্যাপারে যাকে যোগ্য এবং অগ্রণী মনে করবে তাকেই নেতৃত্ব দিবে,এব্যাপারে নেতৃত্বের উপর আমার সম্পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস আছে।
নির্বাচনী বোর্ডে অন্য প্রার্থীদের মতো নিজের যোগ্যতা তুলে ধরবেন জানিয়ে তিনি বলেন,একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে,পার্বত্য চট্টগ্রামে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পতাকা উত্তোলনকারি হিসেবে,একজন সাবেক সেনাকর্মকর্তা হিসেবে এবং জিয়া পরিবারের সাথে দীর্ঘদিনের সম্পৃক্ততার কারণে আমার বিশ্বাস দল আমাকে মনোনয়ন দিবে। একই সাথে দলের অধিকাংশ নেতাকর্মী ও সহযোগি সংগঠনের কমিটি নিজের সাথে আছে বলেও জানালেন তিনি। তবে বাকী যারা আপাততঃ তার বিপক্ষে আছেন,তারাও সবাই একদিন নিজেদের ভুল বুঝে কাছে আসবে জানিয়ে তিনি বলেন,ঐক্যবদ্ধ বিএনপি অনেকে বেশি শক্তিশালী হবে।

দল মনোনয়ন না দিলে কি করবেন,এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন,দল যাকে নির্বাচনে বিজয়ের জন্য নির্ভরযোগ্য মনে করবে তাকেই মনোনয়ন দিবে এবং যাকেই দিক তার প্রতি আমার সমর্থন থাকবে। আমিতো মনোনয়নের জন্য,মন্ত্রী-এমপি বা জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান হওয়ার জন্য দল করতে আসি নাই। বিএনপির প্রতি ভালোবাসা আর জাতীয়তাবাদী আদর্শের প্রতি আকর্ষনের কারণেই দলে যোগ দিয়েছি।
বিএনপিতে যোগদানের প্রেক্ষাপট বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন,ক্যাডেট জীবনে সাঈদ ইস্কান্দার (খালেদা জিয়ার ভাই ) ছিলো আমার সহপাঠী। তখনতো পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে বাঙালী অফিসার ছিলো অনেক কম। আমরা ক্যাডেটেই শুনেছিলাম আমাদের বন্ধু সাঈদ এর ভগ্নিপতি ক্যাপ্টেন জিয়া সেনাবাহিনী কর্মরত আছেন। পরে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে সেই জিয়ার সাথে রামগড়ে একই ফ্রন্টে যুদ্ধ করার সৌভাগ্য হয় আমার। মুক্তিযুদ্ধের সময় আমার বয়স ছিলো ১৯ বছর। সাঈদের বন্ধু আমি আর জিয়া তার ভগ্নিপতি,তাই তখন মেজর জিয়ার সাথে আমার হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক তখনই তৈরি হয়। আর সাঈদের সাথে তো মৃত্যুর আগ মুহুর্ত পর্যন্ত গভীর বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিলো,তার পরিবার অনেকটা আমার নিজের পরিবারের মতোই।

পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল সম্পর্কে তিনি বলেন,আমি মনে করি যার যে দাবি আছে তা জাতীয় দলগুলোর মাধ্যমেই আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান হতে পারে। আঞ্চলিক রাজনীতি নয়,জাতীয় রাজনীতির ¯্রােতধারার সাথে সম্পৃক্ত হয়েই পাহাড়ের সমস্যা সমাধান করতে হবে। পার্বত্যবাসীর উন্নয়ন চাইলে আঞ্চলিক নয়,মূলধারার জাতীয় রাজনীতির মাধ্যমেই তা সম্ভব।
পাহাড়ে জাতীয়তাবাদের সংকট প্রসঙ্গে তিনি বলেন,জুম্ম জাতীয়তাবাদ আর বাঙালি জাতীয়তাদের মধ্যে যে বৈপরীত্ব বা সংকট তার সমাধানই হচ্ছে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ। দুই জাতিগোষ্ঠীর ভিন্ন জাতীয়তাবাদ স্বাভাবিক হলেও তা পাহাড়ে সাংঘর্ষিক হয়ে উঠে। তাই শহীদ জিয়ার বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের বিকাশই পার্বত্য সমস্যার সমাধান এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থানীয় জাতীয়তবাদ নির্ভর রাজনীতির সংকটের সমাধান করতে পারে।

পাহাড়ে সশস্ত্র সংঘাত প্রসঙ্গে তিনি বলেন,নানাপক্ষের নানান দাবি থাকবে,গণতান্ত্রিক সমাজে তা থাককেই পারে। কিন্তু সব সমস্যার সমাধান হতে হবে আলোচনার মাধ্যমে। এই আধুনিক সময়ে এসে অস্ত্র দিয়ে দাবি আদায় করা সম্ভব নয়,এটা সবাইকে বুঝতে হবে।
তিনি নির্বাচনে দাঁড়ালে পাহাড়ের উন্নয়ন ও শান্তির স্বার্থে পাহাড়ের পাহাড়ী বাঙালী সবগুলো পক্ষই তাকে সমর্থন দেব এমন আশাবাদের কথা জানালেন তিনি।
বর্তমানে রাঙামাটি বিএনপিতে সত্যিকারের জাতীয়তাবাদী চেতনায় বিশ্বাসী নেতৃত্বে অভাব আছে জানিয়ে তিনি বলেন,আমার বিশ্বাস এই শূণ্যতা আমি পূরণ করতে পারব।
বর্তমান জেলা বিএনপির সভাপতি এডভোকেট দীপেন দেওয়ান সম্পর্কে তার মূল্যায়ন জানতে চাইলে তিনি বলেন,এটা আমি নয়,দলের নেতাকর্মীরাই মূল্যায়ন করবে। কারণ নেতাকর্মীরাই দলের প্রাণ,তারাই নেতাদের সবচে ভালো মূল্যায়ন করতে পারবে। আমি তাকে নিয়ে ব্যক্তিগতভাবে কোন মন্তব্য করতে চাইনা।
সাবেক সেনাকর্মকর্তা মণীষ দেওয়ান স্বাধীন বাংলাদেশে রাঙামাটি পার্বত্য জেলায় প্রথম পুলিশ সুপার স্বর্গীয় বিমলেশ্বর দেওয়ানের পুত্র,মা পিঙ্গলা দেওয়ান ছিলেন গৃহিনী। চারভাই এক বোনের মধ্যে তিনি সবার বড়। রাজশাহী ক্যাডেট কলেজের চাত্র মনীষ দেওয়ান ১৯৬৫ সালে ক্যাডেক কলেজে ভর্তি হন। পরে মুক্তিযুদ্ধে সাফল্যের সহিত অংশগ্রহণের পর ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কমিশন লাভ করেন। ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত তিনি সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন,চাকুরির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই তিনি স্বেচ্ছা অবসর নেন। তার আরেক ভাই ডাঃ সুমেধ দেওয়ান বিখ্যাত চক্ষু চিকিৎসক,আরেক ভাই অটিল দেওয়ান জাতিসংঘ উন্নয়ন সহায়তা কর্মসূচী (ইউএনডিপি)তে কর্মরত,আরেক ভাই প্রকৌশলী সুশীল দেওয়ান ও একমাত্র বোন মোনালিসা দেওয়ান আমেরিকা প্রবাসী। ব্যক্তিগত জীবনে মনীষ দেওয়ানের দুই সন্তান। ছেলে রাজনিশ দেওয়ান জার্মানী উচ্চ শিক্ষারত আর মেয়ে পুষ্পিতা দেওয়ান স্বামী সন্তানসহ আমেরিকা প্রবাসি। মনীষ দেওয়ান বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ১৯৭১ সালের ১৭ ডিসেম্বর রাঙামাটি শহরের পুরাতন কোর্ট বিল্ডিং মাঠে পার্বত্য চট্টগ্রামে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পতাকা উত্তোলনকারি হিসেবেও পরিচিত। স্বপ্ন দেখেন বিএনপির পতাকা উুঁচ করে পাহাড়ে নেতৃত্ব দেয়ার।

Micro Web Technology

আরো দেখুন

পিসিপি’র সংবাদ সম্মেলনে কর্মসূচি ঘোষণা

দেশে অনগ্রসর জাতিগোষ্ঠীর জন্য প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর সরকারি চাকুরীতে সংরক্ষিত ৫% কোটা পুনর্বহালের দাবিতে …

One comment

  1. Sir go ahead , we r always be with u to fulfill the dream of developing the hill tracts of Rangamati as well as our country..

Leave a Reply

%d bloggers like this: