নীড় পাতা » ফিচার » খোলা জানালা » রাঙামাটির পর্যটন শিল্প বিকাশে কিছু প্রস্তাবনা

রাঙামাটির পর্যটন শিল্প বিকাশে কিছু প্রস্তাবনা

lalit-01সরকারি দলিল দস্তাবেজ এ ক্ষুদ্র এই গ্রামটির নাম পাওয়া গেলেও বল্টুগাছ মোনপাড়া এখনও একটি অপরিচিত নাম। রাঙামাটি শহরের অদুরে বৌদ্ধ সাধক বনভান্তের জন্মস্থান বড়াদাম। ঠিক তার পশ্চিমে অবস্থিত উত্তর-দক্ষিণে প্রসরিত রাম পাহাড় ও ফুরমোন পর্বতসারির একটি পর্বত চুড়ায় অবস্থিত তঞ্চঙ্গ্যা জনগোষ্টী অধ্যূষিত পাহাড়ি গ্রাম এটি। চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যা ভাষায় পর্বত বা উচুঁ পাহাড়কে যথাক্রমে মোন ও মোইন বলা হয়। বল্টুগাছ মোন এর উপর অবস্থিত বলেই ঐ গ্রামের নাম হয়েছে বল্টুগাছ মোনপাড়া। গ্রামের নামকরণের যে ইতিহাস সেটা জানা গেলো গ্রামের কার্বারীর কাছ থেকে। চাকমারা যে গাছ কে “তেল চ’ গাছ” বলে তঞ্চঙ্গ্যারা তাকে “বেল চ’ গাছ” বলে অভিহিত করে। এককালে এ রকম একটি গাছের অস্তিত্ব ছিল ঐ মোন এলাকায়। কালের স্রোতে ঐ ‘‘তেল চ’ গাছ’’ বা ‘‘বেল চ’ গাছ’ শব্দের অপভ্রংশ ‘বল চু গাছ’> থেকেই একে বারেই ‘বল্টু গাছ’ হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত ঐ ‘বল্টু গাছ’ শব্দ থেকেই মোনের নাম ‘বল্টু গাছ মোন’ হয়ে যায়।

সেই গাছটার আয়তন ও উচ্চতা এতোটাই বিশাল ছিল যে, প্রাপ্ত বয়স্ক চার জন মানুষ হাতে-হাত ধরে জড়িয়ে নিলেও নাকি বিস্তৃতি কুলাতো না। ঐ গাছে যতসব ভয়ঙ্কর ভুত-প্রেতাত্মাদের আবাস ছিল লোকশ্রুতি আছে। দিনের বেলায়ও নাকি সেই গাছের উপর থেকে কি যেনো অজানা শব্দ চলে আসতো লোকালয়ে। একদিন পার্শ্ববতী এক গ্রামের এক দুষ্টু ও নির্ভীক স্বভাবের মারমা পুরুষ এই গাছটিকে কেটে মাটিতে ফেলে দিলে পাহাড়ি খাদে আড়াআড়ি করে পড়ে যায়। কর্তীত গাছের একপাশে দাড়ালে নাকি অন্য পাশ থেকে কাউকে দেখা যেতো না। এমন বিশাল আকৃতির ছিল গাছটি। পরে রোদ-বৃষ্টিতে ভিজে গাছে ধীরে ধীরে পচন ধরে এবং এক পর্যায়ে নিঃচিহ্ন হয়ে যায়। তবে নামটা রয়ে যায় স্থানীয়দের মুখে মুখে এবং এ ভাবেই ঐ মোনের নামকরণ হয় বল্টুগাছ মোন ।

মোনের উপর এ গ্রামের গোড়াপত্তন হয়েছিল বলেই গ্রামের নাম হয় বল্টুগাছ মোনপাড়া। ছোট-বড় মোট ১৮ টি পরিবার এবং ৯০ জনের সদস্য নিয়ে এই পার্বতী গ্রামের। স্কুল, মন্দির, রাস্তাঘাট, বিদ্যুৎ কোনটাই নেই এখানে। তবে প্রকৃতির অবারিত সৌন্দয্যর জৌলুশ এবং মেহনতি মানুষের সারল্যর কমতি নেই এখানে। শুকনো মৌসুমে খাবার ও ব্যবহার্য পানি সংগ্রহে কিছুটা সংকট থাকলেও বর্ষাকালে মোটামুটি পানি পাওয়া যায়। শুধু কষ্ট করে নীচের ঝিরিতে নামতে হয়। গ্রামে কোন বিদ্যলয় না থাকায় স্কুলগামী শিশুদের উপস্থিতিও কম চোখে পড়েছে কেননা যারা অবস্থা সম্পন্ন তাদের ছেলে মেয়েরা গ্রাম ছেড়ে রাঙামটি বা বান্দরবানের কোন আতœীয়ের সাথে থেকে বা অন্যকোনভাবে পড়াশোনা করছে এমনটাই জানা গেলো গ্রামবাসীদের সাথে আলোচনায়। গ্রামের সকলেই জুমিয়া; জুম কিংবা আদা-হলুদের চাষবাদ করেই তারা জীবিকা নির্বাহ করে। পর্বত শিখরে উৎপাদিত কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণে তাদের এক বিশাল সমস্যা। আড়াই-তিন ঘন্টার বন্ধুর পাহাড়িয়া পথ পাড়ি দিয়ে কাপ্তাই উপজেলার দেবতাছড়ি কিংবা রাঙ্গামাটি সদর উপজেলার রইন্যাছড়ির হয়ে মানিকছড়ি মুখ পর্যন্ত কাধে করে ঐ সকল পণ্য বহন করাটা যে কতো বিশাল ঝামেলা তা আর বলার লাগে না। কাজেই এদের বাগান-ক্ষেত খামার ইত্যাদি থাকলেও বেচা-বিক্রির জো অত্যন্ত কম। পরিবহণের অসুবিধার কারণেই নাকি গ্রামবাসী বিলাতি ধনিয়ার বীজ উৎপাদনেই বেশী আগ্রহী। ভারী শরীর নিয়ে মানুষ যেখানে বেকায়দায়; মালমাল বহণ করে যাওয়া-আসা যে কি আপদ সেখানে না গেলে বুঝবার নয়! তারপরও বল্টুগাছ মোন পাড়ার মানুষকে তা পারতে হয় জীবনের তাগিদে। খাড়া পাহাড়িয়া পথ পাড়ি দেওয়ার কালে সাংবাদিক হরি কিশোর চাকমার ‘‘তোমাদের গ্রামে কি কোন মোটা মানুষ আছে’ এমন প্রশ্নের উত্তরে জনৈক যুবক হেসে জবাব দিয়েছিল ‘না’।

গ্রামের পথ ধরে এ বাড়ি থেকে ঐ বাড়ি যেতে গেলে নাকে কিছুটা গন্ধ লাগে কারণ ওরা পায়খানা ঘর ব্যবহার করে ঠিকই তবে তা শতভাগ স্যানিটাইজ নয়। ব্যবহার করতে যেয়ে দেখা গেছে গ্রামের মহাজনের পায়খানা ঘর ছাড়া বাকিদের সবারই পায়খানা ঘর গুলো কিছুটা রুগ্ন; অপরিচ্ছন্ন এবং বেড়াগুলো উইপোকার আক্রমণে হতাহত। মশা-মাছি সহজেই গর্তের ভিতর যাওয়া আসা করতে পারছে বলেই হয়তো এমন দূর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। এ গ্রামে বিদ্যুৎ সংযোগ নেই তো কি হয়েছে; সন্ধ্যা হলেই এখানে ঘরে ঘরে জ্বলে উঠে সৌর বিদ্যূতের আলো। আধার ভেদকরে এই সৌর বিদ্যূতের আলো আর শুক্ল পক্ষের রুপালী চাঁদ নীরবতা ভাঙিয়ে রাত জেগে গল্পে মেতে থাকার ব্যাকুলতা বাড়িয়ে যায় এই পর্বতীয়া গ্রামে।

এ গ্রামের পাশের সর্বোচ্চ চুড়াটি উচ্চতায় ফুরমোন চুড়ার চেয়ে কোন অংশে কম হবে না। আধুনিক যন্ত্রপাতি সাথে থাকলে এর উচ্চ মেপে নেওয়া যেতো। সাজেক এর রুইলুই, বান্দরবানের নীলাচল কিংবা নীলগিরি, খাগড়াছড়ির আলুটিলা ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য পর্যটন কেন্দ্রগুলোর মতো সৌন্দরয্যের দিক থেকে কোন অংশে কম হবে না বল্টুগাছ মোন ও আশ-পাশের এলাকা সমূহ। একটু নিবিড় করে ভাবতে গেলেই ধরা পড়বে এই পর্বত সারির নৈসর্গীক সৌন্দয্যের সুপ্ত সম্ভাবনা। এই মোনের উপর থেকে উপভোগ করা যায় বিশালতায় ভরা নয়নাভিরাম কাপ্তাই হ্রদ’র জলরাশির সৌন্দয্য। শুভলং, বরকল, জুরাছড়ি ও বিলাইছড়ির পর্বতসারি এবং পশ্চিমে প্রসারিত গুমাইবিল ও ইছামতি ভ্যালী তথা রাঙ্গামাটির কাউখালী উপজেলা ও চট্টগ্রাম জেলার রাঙ্গুনিয়া উপজেলার বিস্তৃত জনপদ। বলা বাহুল্য যে, এখান থেকে রাঙ্গামাটি, কাপ্তাই এবং চট্টগ্রাম বিভাগীয় শহর চমৎকারভাবেই চোখে দেখা যায়। রাতের বেলায় রাঙ্গামাটি শহরকে তো একেবারেই মায়ের কোলে আশ্রিত শিশুর মতোই মনে হয় এই স্থান থেকে।

ছোট-বড় ঝিড়ি-ঝর্ণা আর নানা প্রকার বুনো গাছপালা আর বন্য পশু-পাখিতে ভরপুর এই পর্বতসারি। শরতের মনোমুগ্ধকর নীলআকাশ আর মেঘদের আলতো পরশ এখানে জুড়িয়ে দেয় মনপ্রাণ। মেঘ দেখার জন্য আপনার দুরে আর কোথাও ছুটে যাওয়ার প্রয়োজন পড়বে না। আপনার আমার সাধের লেকসিটির কাছেই অবস্থিত বল্টুগাছ মোন এ গেলে মেঘরাজ্যের দুয়ারের কড়া নাড়তে পারবেন খুব সহজেই।

lalit-02
ছবিতে লেখক

রাঙ্গামাটি সদর উপজেলা চেয়ারম্যান অরুন কান্তি চাকমা ভ্রমনদলের নেতৃত্বদান এবং সার্বিক পৃষ্টপোষকতা না দিলে সাম্প্রতিক এ ভ্রমন সম্ভবই হতো না। মূলত তাঁর প্রস্তাবেই এই মোন ঘুরে আসার পরিকল্পনা নেওয়া হয়। ঘরের কাজ ফেলে কষ্ট করে এতোগুলো মানুষকে রান্নাবান্না করে খাওয়ানো এখানকার নারী-পুরুষদের মনোমুগ্ধকর আতিথেয়তার কথা কি করে ভুলা যায়? মোট ২১ জনের সফরকারী দলের মধ্যে সাংবাদিক হরি কিশোর চাকমা ও সংশ্লিষ্ট ইউপি চেয়ারম্যান বিশ্বজিৎ চাকমাসহ জনপ্রতিনিধি, ছাত্র, সমাজকর্মী, ব্যাংকার এবং ইউএনডিপির কর্মকর্তাও ছিলো আমাদের সে দলে। কাপ্তাই উপজেলার দেবতাছড়ি গ্রাম হয়ে পদব্রজে ঐ গ্রামে যাওয়া এবং একই ভাবে অন্যপথে রাঙ্গামাটি সদর উপজেলার মগবান ইউনিয়নের রইন্যাছড়ি গ্রাম হয়ে শহরে ফেরার এই ভ্রমনটা ছিল নানা চাঞ্চল্যতায় ভরা। পাহাড় হাঁটতে হাঁটতে ঈষৎ খুনসুটি, কিংবা মুঠোফোনে গান বাজিয়ে শোনা অথবা সাথে থাকা নানান মডেলের ক্যামরা তাক করে পাখি- কীট-পতঙ্গের ছবি শিকার করা এসবের কোনটারই কমতিই ছিলনা সেই ভ্রমণে। আকাশটা মেঘলা ছিল বলে যাওয়া-আসার পথ হাটতে গিয়ে হয়তো খুব বেশী উত্তাপ সইতে হয়নি ঠিকই কিন্ত পিচ্ছিল মেঠোপথ মাড়াতে সাময়িকভাবে তিন পদযুক্ত প্রাণীতে রুপান্তরিত হতে হয়েছে আমাদের প্রত্যেককেই। সফরের প্রথম দিন ছিল পূর্ণিমার রাত; সময়-অসময়ের হিসাব মিলিয়ে সন্ধ্যে বেলায় হিমেল চাকমার নেতৃত্বে কয়েকজন যুবকের ‘ঘিলে কাঙাড়া’ ধরে নিয়ে আসার মিশন এবং তৎক্ষণাত রান্না করে মিলেমিশে খাওয়ার মধ্য দিয়েই যে উল্রাস আমাদের মনের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছিল তা বারবার বল্টুগাছ মোন পাড়ায় বেড়াতে না গেলে নিভবে কিভাবে?

সমাজ ভিত্তিক পর্যটনের একটি আদর্শ স্থান হতে পারে এ গ্রামটি। পৃষ্টপোষকতা পাওয়া গেলে হয়তো এটা করা খুব একটা কষ্টকর হতো না। তবে রাঙ্গামাটি শহর এবং কাপ্তাই এর সাথে সংযুক্ত করার জন্য এখানকার যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটাতে হবে সবার আগে। বর্তমানে কাপ্তাই উপজেলার দেবতাছড়ি গ্রাম এবং রাঙ্গামাটি সদর উপজেলার রইন্যাছড়ি গ্রাম থেকে থেকে উঁচু-নীচু মেঠো পথে ৩ ঘ্টার পথ পায়ে হেটে যাওয়া ছাড়া আর কোন উপায় নেই। বিদ্যুৎ পরিষেবা অনেকটা হাতের নাগালের কাছেই এসে গেছে। তিন কিলোমিটার দুরের ডলুছড়ি মোনপাড়া পর্যন্ত বিদ্যুতের লাইন ও সেবা সরবরাহ আছে বলে জানা গেছে। সেখান থেকে সম্প্রসারণ লাইন দিয়ে এ গ্রামে সহজেই বিদ্যূৎ সরবরাহ করা সময়ের ব্যাপার মাত্র। আমার দেখায় যা মনে হয়েছে; অদুর ভবিষ্যতে ঐ গ্রাম এবং আশ-পাশের এলাকাকে পর্যটন জোন হিসেবে গড়ে তোলার বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। প্রাকৃতিক সম্পদের যে সমাহার থাকলে একটি স্থানের প্রতি পর্যটকদের আকৃষ্ট করা যায় তার চেয়ে কয়েকগুণ রুপ-লাবণ্য রয়েছে ঐ বল্টুগাছ মোন এর। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্তমানের ট্রেন্ড তথা পর্যটনের নামে ভুমি দখল-বেদখল এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে অধিগ্রহনের এই কালে তা কি করে জনসম্মুখে নিয়ে আসি সেটাই একটা ভাবনার বিষয়; কখন আবার নানা অভিধায় পড়ে নানা মহলের তুলোধুণা খেতে হয়।

পার্বত্য চট্টগ্রামের অর্থনীতির প্রাধান তিনটি পণ্য যথাঃ বাঁশ, গাছ ও মাছ এর সমাহার ক্রমান্বয়ে হ্রাসপেতে চলেছে। কৃষিখাতে পর্যাপ্ত উৎপাদন হলেও ফসল বাজারজাতকরণ ও কৃষির ব্যবস্থার আধুনিকীকরণের অভাবে এ খাতের উৎপাদন ব্যবস্থা দিনদিন অবনতির পথে। ফলে মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থার দ্রুত পরিবর্তন খুব একটা লক্ষ্য করা যায় না। এখন নতুন করে প্রবৃদ্ধির উপায় এবং উপযোগী কোন খাত খুজে বের করার সময় এসে গেছে। এখানকার ভূ-প্রাকৃতিক ও মানবীয় বিষয়গুলো বিবেচনায় নিলে দেখা যাবে যে পর্যটন একটি সম্ভাবনাময়ী খাত কিন্তু প্রয়োজনীয় উদ্যোগ, পৃষ্টপোষকতা এবং নির্দেশনার অভাবে এ খাতটি বিকশিত হতে পারছেনা কিছু কৌশলগত কারণে। পর্যটন শিল্পের বিকাশের কথা বলে রাষ্ট্রীয়ভাবে ভুমি অধিগ্রহণ, সামরিক-বেসামরিক আমলা ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালীদের অনুকুলে দরিদ্রদের দলিলঅভূক্ত ভুমির লীজ প্রদান, অবকাঠামোগত দূর্বলতা এবং স্থানীয়দের দ্বারা পরিচালিত পর্যটনখাতের ব্যবসা-বাণিজ্যে সরকারী পৃষ্টপোষকতার অভাব এবং পর্যটন শিল্প সংক্রান্ত নীতিমালা ও আইন প্রণয়নে স্থানীয় প্রাসঙ্গিকতাকে আমলে না নেয়া এবং এ সকল আইন ও নীতিমালা বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় স্থানীয়দের সংযুক্তকরণের অভাবই এখাতটি বিকশিত হতে না পারার প্রধান কারণ। স্থানীয়দের বারংবার আপত্তির মুখে সরকারীভাবে ভূমি অধিগ্রহণের পদক্ষেপসমূহ এ অঞ্চলে পর্যটন শিল্প খাতের বিকাশকে একটি বির্তকিত ইস্যূতে পরিণত করে চলেছে। এ অবস্থার বেশীদিন চললে একটি সম্ভাবনাময়ী শিল্পখাতের বিকাশ অংকুরেই বিনষ্ট হবে; তাতে কোন সন্দেহ নেই। অন্যদিকে জাতীয় পযর্টন নীতিমালা-২০১০ তে যে সকল পর্যটন সম্ভাবনাময় স্থানে এখনও পর্যটন সুবিধা গড়ে উঠেনি সে সকল এলাকার পর্যটন বিকাশে সরকারের প্রাথমিক বিনিয়োগ প্রদানের মাধ্যমে সেবরকারি খাতকে উৎসাহিতকরণের কথা বলা হয়েছে। অতএব, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের মতামত সাপেক্ষে সরকার বা পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কাছে চাইলে জেলা পরিষদ উন্নয়ন প্রস্তাব পাঠাতে পারে। এ ক্ষেত্রে জেলা পরিষদ স্বল্প মেয়াদী এবং দীর্ঘমেয়াদী ২টি ধাপে পর্যটন শিল্প বিকাশের ধারা এগিয়ে নিতে পারে। এ দুটি ধাপে সম্ভাব্য যে সকল কাজগুলো অর্ন্তভূক্ত হতে পারে তা হলোঃ
১ম পর্যায়ঃ প্রস্তুতি পর্ব।
ক)বল্টুগাছ মোনপাড়াকে সমাজ ভিত্তিক পর্যটন গ্রাম হিসেবে নির্বাচন, উন্নয়ন এবং অনুদান সহায়তার মাধ্যমে ক্ষুদ্র পরিসরে অবকাঠামে উন্নয়ন
খ) গ্রামবাসীর পর্যটন বিষয়ক ধ্যান-ধারণা গঠন/পরিবর্তন এবং প্রশিক্ষণ ও ক্রসভিজিটের মাধ্যমে সক্ষমতা বৃদ্ধিকরণ
গ)কাপ্তাই-রাঙ্গামাটি সংযোগ সড়কের মানিকছড়ি মুখ এলাকা থেকে বল্টুগাছ মোন পর্যন্ত রোপওয়ে (উড়ালপথ) নির্মাণ করে গ্রামবাসী ও পর্যটক মহলের অভিগম্যতা বৃদ্ধি করণ।
২য় পর্যায়ঃ পর্যটন শিল্প নিবিড় করণঃ
ক) বিশেষজ্ঞ দ্বারা ফুরোমোনের পাদদেশ থেকে রামপাহাড় পর্যন্ত পর্বতসারিকে বিশেষ পর্যটন অঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলার সম্ভাব্যতা যাচাইকরণ।
খ) সম্ভাব্যতা সমীক্ষার আলোকে ঐ অঞ্চলকে রাঙামাটি জেলার বিশেষ পর্যটন অঞ্চলরুপে ঘোষণাকরণ ও ভুমির মালিকদের (রেকডীয়+দখলীয়) মালিকানা নিশ্চিতকরণ।
গ) ভুমির মালিকদের (রেকডীয়+দখলীয়) সম্মতির ভিত্তিতে যথাযথ অংশীদারিত্বের শর্তে পর্যটন খাতে বিনিয়োগে আগ্রহী স্থানীয় উদ্যোক্তাদের নিকট থেকে আগ্রহ প্রকাশ প্রস্তাবনা আহবান
ঘ)ভুমির মালিক ও স্থানীয় উদ্যোক্তাদের যৌথ প্রস্তাবনা ও চাহিদার আলোকে অনুদান বা ব্যাংক ঋণের মাধ্যমে পূজি সরবরাহ ও সরকার-বেসরকারী উদ্যোক্তাদের সমন্বয়ে অবকাঠামো উন্নয়ন।
গোটা পর্যটন শিল্পের শ্রী বৃদ্ধি এবং বল্টুগাছ মোন এলাকায় যাতায়াত সহজতর করণের লক্ষ্যে রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ নিজ উদ্যোগে বা অন্য কারওর সহায়তায় কাপ্তাই-রাঙ্গামাটি সংযোগ সড়কের মানিকছড়ি মুখ এলাকা থেকে বল্টুগাছ মোন পর্যন্ত রোপওয়ে (উড়ালপথ) নির্মাণ করতে পারলে বিনিয়োগ থেকে প্রাপ্ত আয় দিয়ে তার রাজস্ব বাড়াতে পারে। আমার বিশ্বাস, দ্রুততম সময়ে উড়ালপথ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন সম্ভব হলে রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের রাজস্ব আয়ের অন্যতম উপায় হিসেবে এটি যেমন সমাদৃত হবে; ঠিক তেমনই এই উড়ালপথকে রাঙ্গামাটির সৌন্দর্য্যের অন্যতম আইকন হিসেবে দাড় করিয়ে দেশী-বিদেশী পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা সম্ভব হবে।

সূচনালগ্নে সমাজভিত্তিক পর্যটনের আবহ সৃষ্টির মাধ্যেমে ধীরে ধীরে পর্যটন ধারণার জনপ্রিয় করণ, অভীষ্ট জনগোষ্ঠীর কারিগরী দক্ষতা, প্রয়োজনীয় পুঁজি সহায়তা এবং অংশীজনদের সাথে যোগাযোগ বাড়ানোর যাবতীয় উদ্যোগ গ্রহণ জেলা পরিষদকেই করতে হবে। প্রয়োজন হলে স্থানীয় বেসরকারী সংগঠনগুলোর মাধ্যমে জনগোষ্ঠীর সক্ষমতাবৃদ্ধি এবং সমাবেশন করার কাজে নিয়োজিত করা যেতে পারে। জানামতে কয়েকটি স্থানীয় বেসরকারী স্চেচ্ছাসেবী সংগঠন ইতিমধ্যে নিজেদের সাধ্যমতে পর্যটনখাতে কার্যক্রম চালিয়ে নিচ্ছে যার মধ্যে স্ট্র্যাটেজিক এ্যাকশন্স সোসাইটি (সাস) অন্যতম।

সরকার এবং এখানকার জনপ্রতিনিধিত্বশীল প্রতিষ্ঠান সমূহের মধ্যে প্রয়োজনীয় আলোচনা এবং ঐক্যমত্যের ভিত্তিতে প্রস্তাবিত এলাকাকে রাঙামাটির পর্যটন জোন হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষে একটি সমন্বিত পর্যটন শিল্প প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় তবে সেটিই হবে দেশের সর্বোচ্চ উচ্চতায় অবস্থিত পরিকল্পিত অবকাশ যাপন অঞ্চল। কিন্তু তা হতে হবে সুপরিকল্পিতভাবে এবং স্থানীয় মানুষগুলোর যথাযথ অংশগ্রহণ ও নেতৃত্বেই। জেলা পরিষদই এই কর্মকান্ডের নেতৃত্ত্ব দেবে। সরকার উদ্যোক্তাদের ব্যাংক ঋণপাওয়ার শর্তগুলো সহজ করে দিলে স্থানীয় উদ্যোক্তা তৈরী হতে পারে। অত্যাধুনিক সম্বলিত হোটেল, রেস্তোরা বিনোদন কেন্দ্র সবই হতে পারে এ অঞ্চলে। পিছিয়ে পড়া, দৃষ্টির আড়ালে থাকা একটি অঞ্চলকে আধুনিকতার মাপকাঠিতে এগিয়ে নিতে সব মহলের দৃষ্টি আকষর্ণ করা এখন সময়ের দাবী। অধিকন্তু সরকারী-বেসরকারী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে রাষ্ট্রীয় নীতি ও কৌশলের পরিবর্তনের জন্য লবিং করাও কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সরকারী-বেসরকারী অংশীদারিত্বের মাধ্যমে এলাকাটার সুপরিকল্পিত উন্নয়ন সম্ভব হলে যুব সমাজের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রাজস্ব আয়ের মাধ্যমে জেলার উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে এবং গোটা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর একটা আসল কাজে হাত দেওয়া সম্ভব হতো বলে আমি মনে করি।

[ লেখক একজন তরুন সমাজকর্মী, গবেষক এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে দায়িত্বশীল পর্যটন শিল্প বিকাশ বিষয়ে প্রাবন্ধিক ও উদ্যোক্তা)

Micro Web Technology

আরো দেখুন

দীঘিনালায় কৃষকের কাছ থেকে ধান কেনায় অনিয়ম

খাগড়াছড়ির দীঘিনালায় কৃষকের কাছ থেকে ন্যায্যমূল্যে ধান ক্রয়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। গত সোমবার উপজেলার মেরুং …

Leave a Reply