নীড় পাতা » করোনাভাইরাস আপডেট » রাঙামাটির করোনা সমন্বয় সভায় কি বলেছেন বিশিষ্টজনরা?

রাঙামাটির করোনা সমন্বয় সভায় কি বলেছেন বিশিষ্টজনরা?

বাংলাদেশ সরকার দেশজুড়ে করোনা নিয়ন্ত্রণ ও সৃষ্ট পরিস্থিতি মোকাবিলায় এবং ত্রাণ কার্যক্রম সমন্বয়ে ৬৪ জেলার জন্য ৬৪ জন সচিবকে নিয়োগ দিয়েছেন। এর মধ্যে পার্বত্য রাঙামাটি জেলার দায়িত্ব পেয়েছেন বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ’র নির্বাহী চেয়ারম্যান (সচিব) পবন চৌধুরী। শুক্রবার তিনি রাঙামাটির স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, দায়িত্বশীলদের সঙ্গে প্রথমবারের মতো সভায় মিলিত হয়ে, জানলেন, শুনলেন জেলার করোনা পরিস্থিতির সার্বিক চিত্র এবং পরামর্শ। কি পরামর্শ আর কি আলোচনাই বা করেছেন সেখানে রাঙামাটির নেতারা? কি বলেছেন প্রশাসনের দায়িত্বশীলরা? জবাবে প্রথম সভায় কি বলছেন সচিব পবন চৌধুরী? আমাদের পাঠকদের জন্য সেই সভার চুম্বক অংশ তুলে ধরেছেন পাহাড়ের প্রধান দৈনিক, পার্বত্য চট্টগ্রাম– এর সিটি এডিটর হেফাজত সবুজ

সমন্বয় সভায় রাঙামাটি জেলা প্রশাসক একেএম মামুনুর রশিদের সঞ্চালনায় রাখেন সভার প্রধান অতিথি রাঙামাটির সংসদ সদস্য দীপংকর তালুকদার। আরও বক্তব্য রাখেন, সেনাবাহিনী রাঙামাটি রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগ্রেডিয়ার জেনারেল মো. ইফতেখুর রহমান, রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান বৃষ কেতু চাকমা, জেলা পুলিশ সুপার আলমগীর কবীর, জেলা সিভিল সার্জন ডা. বিপাশ খীসা, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হাজী মুছা মাতাব্বর, রাঙামাটি পৌরসভার মেয়র আকবর হোসেন চৌধুরী, রাঙামাটি সদর উপজেলা চেয়ারম্যান শহীদুজ্জামান রোমান ও রাঙামাটি চেম্বার অব কর্মাস এন্ড ইন্ডাট্রি’র সভাপতি বেলায়েত হোসেন বেলাল।

সভায় রাঙামাটি চেম্বার অব কর্মাস এন্ড ইন্ডাট্রি’র সভাপতি বেলায়েত হোসেন বেলাল বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিভিন্নখাতের জন্য প্রণোদনার ঘোষণা দিয়েছেন, তাই আমাদের এখানে সে সকল ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা রয়েছে তাদের ঋণের সুদ মওকুফ করার জন্য দাবি জানাচ্ছি। রাঙামাটিতে একটি ইকোনোমিক জোন স্থাপনের আবেদন করে তিনি জায়গা হিসাবে কর্ণফুলী পেপার মিলের (কেপিএম) সাড়ে চারশ’ একর জায়গার কথা প্রস্তাব করেন। রাঙামাটি জেলায় ত্রাণ নিয়ে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না হওয়ায়, জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় প্রশাসনকে ধন্যবাদ জানান তিনি।

রাঙামাটি সদর উপজেলা চেয়ারম্যান শহীদুজ্জামান রোমান বলেন, রাঙামাটিতে সকলেই আন্তরিকতার সঙ্গে এই মহামারি মোকাবিলায় কাজ করে যাচ্ছে। তবে ত্রাণ বিতরণের ক্ষেত্রে আরও সমন্বয় করা গেলে কেউ ত্রাণহীন থাকবে না বলে মন্তব্য করে তিনি ব্যক্তিগত উদ্যোগে এক হাজার পাঁচশ মানুষকে ত্রাণ সজায়তা দিয়েছেনে বলে দাবি করেন। এছাড়াও ২৫ এপ্রিল ব্যক্তিগত তহবিল হতে সদর উপজেলার সকল ইমামদের খাদ্য সহায়তা প্রদান করবেন, এরপর যথাক্রমে মন্দিরের পুরোহিত ও ভান্তেদেরও এই সহায়তা প্রদান করবেন বলে সভায় অবহিত করেন তিনি।

রাঙামাটি পৌরসভার মেয়র আকবর হোসেন চৌধুরী জানিয়েছেন, করোনা মোকাবিলায় তার পৌরসভায় যাবতীয় কার্যক্রম লিখিত আকারে সভাকে অবহিত করা হয়েছে। পাশাপাশি আরও কি কি পদক্ষেপ নেয়া যায় সে ব্যাপারে পৌর পরিষদের সাথে আলোচনা চলছে। তিনি আরও বলেন, রাঙামাটি শহরকে করোনা মুক্ত রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাবেন।

রাঙামাটি জেলা আওয়ামীলীগ সাধারণ সম্পাদক হাজী মুছা মাতাব্বর বলেন, রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়ি, লংগদু, কাপ্তাই উপজেলায় আরও কিছু ত্রাণের প্রয়োজন রয়েছে। বিশেষ করে লংগদু উপজেলায় চাহিদা বেশি। তাই অন্তত এই উপজলায় আরও ত্রাণ সহায়তা প্রদানের দাবি জানান তিনি।

তিনি অভিযোগ করেন, সব চেয়ারম্যান, মেম্বার, কাউন্সিলর আওয়ামী লীগের নয়, তারা ত্রাণ বিতরণে দলীয় পরিচয়কে বিবেচনায় নিচ্ছে। ফলে সবাই এই সরকারের সুবিধা পাচ্ছে না। একমাত্র আওয়ামীলীগ সঠিকভাবে ত্রাণ বিতরণ করছে। তিনি আঞ্চলিক দলগুলোর ব্যাপারেও সবাইকে সতর্ক থাকার আহবান জানান।

জেলা সিভিল সার্জন ডা. বিপাশ খীসা বললেন,, আমাদের সকলের প্রচেষ্টায় রাঙামাটি এখনো করোনা মুক্ত আছে। আমাদের আরও সতর্ক হতে হবে।’

স্বাস্থ্য বিভাগের প্রস্তুতি প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য কর্মকর্তা বলেন, আমাদের অস্থায়ীভাবে ১৫০টি আইসোলেশন বেড প্রস্তুত আছে। শুধু করোনা রোগী পরিবহনের জন্য তিটি অ্যাম্বুলেন্স প্রস্তুত রাখা হয়েছে। সাথে নিরাপত্তা সামগ্রীও আছে।’ মাস্ক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জেলা প্রাণীসম্পদ অফিসে অত্যন্ত উন্নতমানের ৫শ’ এন ৯৫ মাস্ক, পিপিই আছে, হাসপাতালের জন্য সরকারি পিপিইও আছে।’

তিনি আরও বলেন, রাঙামাটি হাসপাতাল ৫০ বেডের সেখানে এক ‘ বেডের সেবা দেয়া হচ্ছে। আমাদের জনবলের সংকট আছে, সেটা আমরা মেডিকেল কলেজের শিক্ষকদের মাধ্যমে সমাধান করে নিচ্ছি।’

সাজেকের হাম পরিস্থিতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “হামের প্রাদুর্ভাব এলাকা এতোটাই দুর্গম যে, সেখানে সেবা পৌঁছানো আসলেই কঠিন, তথাপিও আমরা সেবা দিয়ে যাচ্ছি। এ কাজে সেনাবাহিনী ও বিজিবিও আমাদের সহায়তা করেছে।”

“ওইসব এলাকার জন্য আলাদাভাবে ভাবতে হবে। তা না হলে সেখানে স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করা প্রায় অসম্ভব। সেখানে কোন কমিউনিটি ক্লিনিকও নেই, স্বাস্থ্যকর্মীও অপ্রতুল, নেই ট্রিপল এসের পাড়া কেন্দ্র। ফলে কোনভাবেই তাদের সবা ও সচেতনতা বাড়ানো যাচ্ছ না। বিশেষ বরাদ্দ না দিলে সেখানে ক্লিনিক নির্মাণ সম্ভব নয়। একাধিকবার টেন্ডার দিয়েও কোন ঠিকাদার পাওয়া যায়নি। তাই এ ব্যাপরে বিশেষ নজর দেয়ার জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষকে অবহিত করার জন্য বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছি।”

পুলিশ সুপার আলমগীর কবীর বলেন, করোনা মোকাবিলায় পুলিশ বিভাগ শুরু থেকেই কাজ করে যাচ্ছে। সামাজিক দূরত্ব রক্ষার কাজের পাশাপাশি ত্রাণ কার্যক্রমও পালন করে যাচ্ছি। রাঙামাটি পুলিশ ও জেলা প্রশাসন নিম্নআয়ের মানুষ ও মধ্যবিত্তকে সহায়তা করে যাচ্ছে। পুলিশ ও জেলা প্রশাসন মধ্যবিত্তের জন্য ওয়েব সাইটের মাধ্যমে চাহিদা নিয়ে যাচাই করে নীরবে তাদের বাসায় ত্রাণ দিয়ে আসছে; এটা অব্যাহত থাকবে। আমাদের সহায়তা প্রদানের তালিকা জেলা প্রশাসন ও সেনাবাহিনীর নিকট প্রেরণ করা হয়, যাতে কেউ দুবার এ সহায়তা না পায়।

“সারা বিশ্বে যখন মানব জাতি হুমকির মুখে, তখন আমাদের এখানে আঞ্চলিক দলগুলো তাদের আধিপত্য বিস্তারের জন্য খুনের মত জঘন্য অপরাধ করে চলছে, এটা দুঃখজনক। এ ব্যাপারে আমরা সতর্ক আছি। আঞ্চলিক দলের দ্বন্দ্ব সংঘাত ছাড়া জেলার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি বেশ ভালো আছে” বলেও জানান জেলা পুলিশের এই শীর্ষ কর্তকর্তা।

সেনাবাহিনী রাঙামাটি রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগ্রেডিয়ার জেনারেল মো. ইফতেখুর রহমান বলেন, আমরা আমাদের উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশনা মোতাবেক সিভিল প্রশাসনকে সহায়তা প্রদান করে যাচ্ছি, পাশাপাশি নিজেদের রেশন সাশ্রয় করে কর্মহীন মানুষের মাঝে বিরতণ করে যাচ্ছি। সেনাবাহিনী বরাবরই দেশের ক্রান্তিকালে মানুষের পাশে এসে দাঁড়ায়, ভবিষ্যতেও এ ধারা অব্যাহত থাকবে।’

প্রধান অতিথির বক্তব্যে দীপংকর তালুকদার এমপি বলেন, রাঙামাটিতে করোনা মোকাবেলায় সবাই এক সাথে কাজ করে যাচ্ছে। সকলের প্রচেষ্টায় আমরা এখনো নিরাপদ আছি। দুর্গম এলাকায় খাদ্য সহায়তা প্রদানের ক্ষেত্র রাঙামাটিতে সকল জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসন বেশ কষ্ট করতে হচ্ছে। আমাদের জেলায় প্রচুর দুর্গম অঞ্চল রয়েছে। আমরা সকলে আপ্রাণ চেষ্টা করছি, যাতে সকলের ঘরে ঘরে সহায়তা প্রদান করা যায়।

“বেশ কিছু দুর্গম এলাকায় উন্নয়ন বোর্ডের পাড়া কেন্দ্রের মাধ্যমে ত্রাণ বিতরণ করা হবে। এ ব্যাপারে তাদের সাথে চূড়ান্ত আলোচনা শেষ হয়েছে। যে কোনদিন উন্নয়ন বোর্ড এ কার্যক্রম শুরু করবে। মাছের প্রজনন বৃদ্ধির লক্ষ্যে মে মাসেই কাপ্তাই হ্রদে মৎস্য আহরণ নিষিদ্ধ হবে। ভিজিএফ কার্ডধারী জেলেরা যাতে এবার খাদ্য সহায়তা থেকে বঞ্চিত না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে “ বলেও জানান দীপংকর।

এসময় রাঙামাটি জেলা প্রশাসক একেএম মামুনুর রশিদ বলেছেন, এবার আগেই ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রনালয়ে চাহিদা প্রেরণ করা হলে মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারে মৎস্য ও প্রাণী সম্পদ মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করতে পরামর্শ দিলে সেখানেও পত্র ও ফোনে সচিব মহোদয়ে সাথে যোগাযোগ করা হয়েছে। সেখান থেকে এক প্রকার নিশ্চয়তা পাওয়া গেছে, আশা করি এবার জেলেরা বঞ্চিত হবে না। তারপরও উপজেলা নির্বাহী অফিসারদের নির্দেশ দেয়া আছে উক্ত সহায়তা না আসা পর্যন্ত জেলেদের যাতে করোনা সাহায়তা ফান্ড থেকে খাদ্য সহায়তা প্রদান করা হয়।

এসময় দীপংকর তালুকদার আশ্বস্ত করেন তিনি উক্ত মন্ত্রনালয়ের মন্ত্রীর সাথে কথা বলে বিষয়টি আরও নিশ্চিত করবেন।

সভাপতির বক্তব্যে রাঙামাটি জেলার ত্রাণ পরিবীক্ষণ কমিটির প্রধান ও বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ নির্বাহী চেয়ারম্যান (সচিব) পবন চৌধুরী রাঙামাটির করোনা পরিস্থিতির প্রস্তুতি নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, করোনা পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবেলায় দ্রুত কর্মপরিকল্পনা তৈরি করে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে প্রেরণ করুন এবং সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী সংকট উত্তরণে সকলকে একসাথে কাজ করতে হবে। কোনো কোনো বিভাগে কেমন ক্ষতি হচ্ছে সেগুলো সঠিকভাবে নিরূপন করে উত্তরণের উপায় নির্ধারণ করার উপর জোর দেন তিনি।

বিশেষ ইকোনোমিক জোন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, চাইলেই এমন ইকোনোমি জোন করা যায় না, কারণ কেউ কারো জায়গা ছাড়তে চায়না। অতীতেও এমন অনেক উদ্যোগ নেয়া কয়েছিল। কিন্তু কর্তৃপক্ষ জায়গা না ছাড়াতে, সেগুলো আর আলোর মুখ দেখেনি।

তিনি আরও বলেন, এ অঞ্চলের জন্য তো আরও কঠিন। বিগত সময়ের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, তৎকালীন পার্বত্য সচিব নব বিক্রম কিশোর ত্রিপুরা এমন একটি ইকোনোমিক জোনের জন্য প্রচেষ্টা করেছিলেন, সব ঠিক হয়ে গিয়েছিল। এমনকি কি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও অনুমোদন দিয়েছিলেন, সেখানে শর্ত ছিল, এখানে এই জোনে শুধুমাত্র পাহাড়ি জনগণই নিয়োগ পাবে এবং কাজও করবে তার। আমার মতো কোনো বাঙালি থাকবে না। তারপরও আঞ্চলিক দুটি দলের অমত ও প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে আপত্তিপত্র যাওয়ায় সে প্রকল্প ভেস্তে গেছে।’

Micro Web Technology

আরো দেখুন

লামায় ২৫৭ মসজিদে প্রধানমন্ত্রীর অনুদান প্রদান

করোনাকালীন সময়ে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে ঈদ উপহার ১২ লাখ ৮৫ হাজার টাকা পেলেন বান্দরবানের লামা …

Leave a Reply