নীড় পাতা » ব্রেকিং » রাঙামাটিতে পাহাড় কেটে সড়ক সম্প্রসারণ !

রাঙামাটিতে পাহাড় কেটে সড়ক সম্প্রসারণ !

এক পাশে সবুজের উঁচু-নিচু ‘বিছানা’, অন্য পাশে কাপ্তাই হ্রদের আকাশনীল জলরাশি। চোখে ধরা দেয় অনন্য এক ছবি, যেন শিল্পীর তুলিতে আঁকা চিত্রকর্ম। অপরূপা রাঙামাটির আসামবস্তি-কাপ্তাইয়ের ১৮ কিলোমিটার দূরত্বের পুরো সড়কটি ছয় মাস আগেও ছিল এমন মুগ্ধতায় ভরা। স্থানীয়রা ভালোবেসে এর নাম দিয়েছে ‘মুগ্ধতার সড়ক’। ফলে পার্বত্য এই শহরে বেড়াতে আসা পর্যটকদের অনিবার্য গন্তব্য হয়ে ওঠে এই রাঙামাটি-কাপ্তাই নতুন সড়ক।

তবে সড়ক সম্প্রসারণের নামে রাস্তার দুই পাশ থেকে দেদার কাটা হয়েছে অসংখ্য ছোট-বড় পাহাড়। এতে সৌন্দর্য যেমন হারিয়েছে, তেমনি জীববৈচিত্র্যও পড়েছে হুমকির মুখে। পাহাড় কর্তনে পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমতির প্রয়োজন থাকলেও এক্ষেত্রে নেয়া হয়নি সেই অনুমোদনও। সড়ক সম্প্রসারণের নামে এভাবে পাহাড় কাটার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দোষীদের শাস্তির দাবি জানিয়েছে সুশীল সমাজ। রাঙামাটি-কাপ্তাই ১৮ কিলোমিটার সড়কটি সম্প্রসারণে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ৩২ কোটি টাকা। তবে শেষ ছয় মাসে সড়কটি হারিয়েছে নান্দনিকতা। ১২ ফুট চওড়া সড়কটিকে অপ্রয়োজনে ১৮ ফুট করতে গিয়ে কেড়ে নেওয়া হয়েছে প্রাকৃতিক সৌন্দয পুরো সড়কে এমন অন্তত ১০০ পাহাড়ে পড়েছে ‘স্কেভেটরের কোপ’। সড়কের পাশে ড্রেন, বাথরুম, বসার স্থান নির্মাণের জন্য প্রকল্পের কাজ শুরু করে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ (এলজিইডি)। আর তাতেই খসে পড়তে থাকে সড়কের চেনা রূপ।

সড়কটির একপাশে সবুজ পাহাড় আর অন্যপাশে কাপ্তাই হ্রদের নীল জলরাশি এলাকাবাসীর যেমন প্রিয় তেমনি এর আকর্ষণেই রাঙামাটি আকর্ষণী পর্যটন কেন্দ্র। এই সড়কটি সেই আকর্ষণ আরও বাড়িয়েছে। যা দেখে বিমোহিত হত পর্যটকরা। সড়কের দুই পাশে সারি সারি পাহাড়। সেই পাহাড় ও হ্রদের সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতিদিনই এই সড়কে ভিড় করে হাজারো পর্যটক। তবে মুগ্ধতা ছড়ানো সেই সড়কের সৌন্দর্য্যে পড়েছে স্ক্যাভেটরের কোপ। সম্প্রতি এলজিইডি’র উদ্যোগে রাস্তাটি সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেয়ার পর কাটা হয়েছে শ’খানেক পাহাড়। এতে যেমন প্রকৃতির সৌন্দর্য হানি হয়েছে, তেমনি পাহাড় কাটায় পরিবেশ পড়েছে হুমকিতে। আবার কোথাও কোথাও অপ্রয়োজনীয় ভাবে এবং অপরিকল্পিতভাবে পাহাড় কাটায় বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ধসের শঙ্কা তৈরি হয়েছে। অপ্রয়োজনীয়ভাবে পাহাড় কাটার কারণে ক্ষোভ জানালেন স্থানীয়রা।

আসাববস্তি-কাপ্তাই সড়কের বড়াদম এলাকার চা দোকানী ইন্দ্রবালা চাকমা অভিযোগ করে বলেন, আমার পাহাড়টিতে বালু থাকায় ঠিকাদার আমাকে একটি টিনের ঘর ও চায়ের দোকানটি নতুন করে তুলে দিবে বলে থাকার ঘরটি অর্ধেক তুলে দিয়ে পুরো পাহাড়টি কেটে নিয়ে গেছে এখন আর ফোন ধরে না। দিবে দিবে বলে শুধু ঘুরাচ্ছে আমাকে। একই এলাকার বাসিন্দা মঙ্গল কুমার চাকমা বলেন, যেভাবে পাহাড় কাটা হয়েছে আগামী বর্ষাতে আবরো পাহাড় ধসের শঙ্কা তৈরি হয়েছে। পাহাড়টি স্লোভ করে না কাটলে বৃষ্টিতে পাহাড়ের মাটি ধসে আসবে।

আসাববস্তি-কাপ্তাই সড়কে সিএনজি অটোরিকশাচালক মো. খোরশেদ আলম ও জগৎ চাকমা বলেন, যারা পাহাড় কাটছে তারা আরও বিপদ করলো মনে হয়। যেভাবে পাহাড়ের মাটি কাটেছে বর্ষা মৌসুমে মাটি ভেঙে রাস্তায় পড়লে রাস্তা বন্ধ থাকবে আবার যদি গড়ির ওপরে পড়ে তাহলে তো জীবন শেষ হয়ে যাবে। পাহাড় কাটার নিয়ম না থাকলেও এগুলো কিভাবে করলো? অপরাধ তো করেছে তাই দ্রুত সময়ের মধ্যে নিরাপদ সড়ক তৈরির জন্য স্লোভ করার দাবি জানাচ্ছি।

রাঙামাটির পরিবেশবদী সংগঠন গ্লোবাল ভিলেজের নির্বাহী পরিচালক ফজলে এলাহী বলেন, সড়ক উন্নয়নের নামে দেদারছে কাটা হচ্ছে পাহাড়, যেখানে কোন নিয়ম মানা হয়নি। আমি যতটুকু জেনেছি পাহাড় কাটা ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদনও ছিল না। যারাই এই কাজে জড়িত থাকুক না কেন তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওযা না হলে পাহাড় কাটার প্রবণতা বন্ধ হবে না।

দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির (দুপ্রক) রাঙামাটি জেলা সভাপতি ওমর ফারুক বলেন, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও অর্থনৈতিক দিক থেকে আসামবস্তি-কাপ্তাই সড়কটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই সড়কটির উন্নয়ন হউক এটি আমরা চাই কিন্তু উন্নয়নের নামে যেভাবে পাহাড় কাটা হচ্ছে সেটা কোন ভাবেই কাম্য না। এই ব্যপারে সংশ্লিষ্ট কৃতপক্ষকে আরো যত্নশীল হওয়ার অনুরোধ করবো।

প্রবীন সাংবাদিক সুনীল কান্তি দে বলেন, পাহাড়ে যে কোন উন্নয়ন অবশ্যই প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু আগে ভেবে দেখেতে হবে সড়কটি সম্প্রসারণে মতো জায়গা আছে কিনা এবং একই সাথে যারা সড়কটি সম্প্রসারণে নামে পাহাড় কাটছেন তাদের পাহাড় কাটার অনুমতি আছে কিনা। পাহাড় কাটা একটি অপরাধ সেটি সরকারি কাজেই হোক বা ব্যক্তিমালিকানীই হউক। এই কাজটা যারা করছে শুধু তাদের লাভের জন্যই কাজটি করছে।

সড়কটি নির্মাণের কাজটি করছেন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান রাঙামাটি ট্রেডার্স। সড়ক নির্মাণে পাহাড় কেটে বালু ব্যবহারের অভিযোগ পাওয়া গেছে এই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। পাহাড় কাটার কথা স্বীকার করে বলেন প্রয়োজন ছাড়া কোন পাহাড় কাটা হয়নি বলে জানিয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান রাঙামাটি ট্রেডার্স এর পরিচালক নিজাম মিশু আরও বলেন, রাস্তা সম্প্রসারণে জন্য কিছু পাহাড় কাটা পড়েছে একই সাথে ব্যক্তি উদ্যোগে ব্যক্তি মালিকানা জায়গাও রিসোর্ট বা বাড়ি তৈরির কাজে অনেকে পাহাড় কেটেছে তার দায় তো আমরা নিতে পারি না।

পাহাড় কাটার বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমতির প্রয়োজন থাকলেও ২৪ ফুট সড়ক সম্প্রসারণে অনুমোদনের প্রয়োজন নেই বলে জানালেন স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের (এলজিইডি) রাঙামাটি সদর উপজেলা প্রকৌশলী ফয়জুর রাজ্জাক বলেন, যে ছোটখাটো পাহাড় কাটা পড়েছে আমরা মনে করেছি তার জন্য অনুমতির প্রয়োজন নাই। কেউ যদি ব্যক্তিগতভাবে পাহাড় কেটে থাকে তার জন্য তো আমরা দায় নিতে পারি না।

তিনি বলেন, যারা ব্যক্তিগতভাবে পাহাড় কাটছে তারা অর্থনৈতিকভাবে সবল না, একটা স্ক্যাভেটর ওই স্থানে নিতে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকার প্রয়োজন। এখন আমাদের ঠিকাদারের স্ক্যাভেটর তারা ওখানে পেয়ে ওদের তেল খরচ দিয়ে এভাবে কিছু পাহাড় কাটা হয়েছে।

Micro Web Technology

আরো দেখুন

স্বাস্থ্য বিভাগকে সুরক্ষা সামগ্রী দিলো রাঙামাটি রেড ক্রিসেন্ট

নভেল করোনাভাইরাসের (কভিড-১৯) সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে রাঙামাটির ১২টি সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য কেন্দ্রসমূহে স্বাস্থ্য …

Leave a Reply