নীড় পাতা » ফিচার » পর্বতকন্যা » ‘রাঙামাটিকে দেশ সেরা পর্যটন শহর হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব’

‘রাঙামাটিকে দেশ সেরা পর্যটন শহর হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব’

01‘গত বাইশ বছর ধরেই দেশের প্রধানমন্ত্রী নারী,পররাষ্ট্র,স্বরাষ্ট্র ও কৃষির মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রনালয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন নারীরা,সুতরাং একদিন নিজ যোগ্যতা ও কর্মদক্ষতায় আমিও ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশ(আইজিপি) হওয়ার স্বপ্ন দেখি। হয়তো স্বপ্ন সত্যি হবে, নয়তো হবেনা,কিন্তু এর জন্য যে প্রচন্ড ইচ্ছেবোধ,যোগ্যতা এবং পরিশ্রম করার মানসিকতা দরকার,তা আমার রয়েছে। সময়ই বলে দেবে,আমার এই স্বপ্ন পূরণ হবে কিনা।’-এইভাবেই নিজের স্বপ্ন আর সম্ভাবনার গল্প বলছিলেন রাঙামাটির পুলিশ সুপার আমেনা বেগম।
লক্ষীপুর জেলার ভবানীগজ্ঞের মোজাম্মেল হক আর জাহানারা বেগমের পাঁচ সন্তানের মধ্যে চতুর্থ আমেনা। ছোটবেলা থেকেই মেধাবী মেয়েটি চট্টগ্রাম কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এমএ পাশ করেন।

পুলিশে চাকুরি করবেন এমন ইচ্ছে কখনোই ছিলোনা। কিন্তু বরাবরই ভাবনায় ছিলো ভিন্ন কিছু করার প্রবল আকাংখা। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষে যখন চাকুরি খোঁজা শুরু করলেন সেই সময়কার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আমেনা বেগম জানালেন-সেই সময় বিসিএস এর সার্কুলারে পুলিশ বিভাগের ক্ষেত্রে মেয়েদের আবেদন করার দরকার নেই,এমন একটি লাইন লেখা থাকতো। কারণ ১৯৮৮ থেকে ১৯৯৬ পর্যন্ত সময়টায় অজ্ঞাত কারণে পুলিশে নারী কর্মকর্তা নিয়োগ বন্ধ ছিলো। কিন্তু ১৯৯৭ সালে ১৮ তম বিসিএসে এসে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে আর এই শর্তটি ছিলোনা। কি মনে করে আমিও বিসিএস এর আবেদন ফরমে পুলিশ’কেই পছন্দের তালিকায় শীর্ষে রেখেছিলাম। কাকতালীয়ভাবে সেই বিসিএস এ আমি উত্তীর্ণ হই। আমরা মোট ৮ জন নারী এএসপি পদে সেই সময় যোগদান করি। ১৯৯৯ সালের ২৫ জানুয়ারি পুলিশে যোগদান করি আমি। সেই থেকে শুরু পথচলা।

বর্ণময় কর্মজীবন : চাকুরী জীবনের অধিকাংশ সময় কাটিয়েছেন চট্টগ্রাম মেট্টোপলিটন পুলিশ এবং পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোতেই। চট্টগ্রাম শহরেই বাবার বাড়ী ও শ্বশুড় বাড়ী। ৯৯ সালে চাকুরিতে যোগদানের পরই বিয়ের পিঁড়িতে বসেন তিনি। চাকুরির কারণে একাধিকবার গিয়েছেন দেশের বাইরেও। ২০১২ সালে আইজেনআওয়ার ফেলো অর্জন করা আমেনা বেগম ২০০৯ সালে আন্তর্জাতিক এসোসিয়েশন অফ উইমেন পুলিশ এর এশীয় অঞ্চলের সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করছেন। ২০১৩ সালে দায়িত্ব পালনের মেয়াদ শেষে তিনি আবারো নিজ কর্মযোগ্যতার আরো তিনবছরের জন্য ২০১৬ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালনের জন্য পুননির্বাচিত হন। এই দায়িত্ব পালন কালেই ২০১২ সালের ৬ ও ৭ মার্চ তিনি বাংলাদেশে সফলভাবে আয়োজন করেন এশিয়া রিজিয়ন উইমেন পুলিশ কনফারেন্স এর,যাতে এশিয়ার ১১ টি দেশের পুলিশ কর্মকর্তারা অংশ নেন,ছিলেন বাংলাদেশের ২০০ নারী পুলিশ কর্মকর্তাও। ২০০৭ সালে রাঙামাটি জেলায় অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এবং ভারপ্রাপ্ত পুলিশ সুপারের দায়িত্ব পালন করে যাওয়ার পর সম্প্রতি তিনি আবারো রাঙামাটিতে বদলী হয়ে এলেন পূর্ণাঙ্গ দায়িত্ব পালনে,পুলিশ সুপার হিসেবে।02

মানসিক শক্তিতে জয় করেছেন প্রতিবন্ধকতা : পুলিশে চাকুরি করার ক্ষেত্রে একজন নারীর নিজের ‘মানসিক বাধা’ ছাড়া আর কোন বাধা আছে বলে মনে করেননা আমেনা বেগম। তার বিশ্বাস,একজন নারী পুলিশ কর্মকর্তাকে যেভাবে বাংলাদেশের সাধারন মানুষ ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করে তা অবিশ্বাস্য। পাকিস্তানে যা কল্পনাই করা যায়না। যেকোন মেয়ে যদি নিজের এই মানসিক বাধা কে অতিক্রম করতে পারে তাহলে তার জন্য পুলিশে চাকুরি খুবই আকর্ষণীয় ও চ্যালেজ্ঞিং হবে বলে মনে করেন তিনি। নিজের কর্মজীবন শুরুর দিকের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন,সেই সময় আমার খুব ইচ্ছে করতো অপরাধ-বিভাগে কাজ করার,কিন্তু নারী হিসেবে আমি হয়তো কাজটি ভালোভাবে পারবোনা,এই ধারণার কারণে আমাকে কাজ করার সুযোগ কম দেয়া হতো,কিন্তু পরে নিজের দক্ষতায়,মেধায় আমি যখন প্রমাণ করতে পেরেছি,একজন পুরুষ সহকর্মীর তুলনায় আমি কোনদিকেই কম যোগ্যতাসম্পন্ন নয়,তখনই সব বাধা কেটে গেছে।

আমার খুব ইচ্ছে করতো অপরাধ-বিভাগে কাজ করার,কিন্তু নারী হিসেবে আমি হয়তো কাজটি ভালোভাবে পারবোনা,এই ধারণার কারণে আমাকে কাজ করার সুযোগ কম দেয়া হতো,কিন্তু পরে নিজের দক্ষতায়,মেধায় আমি যখন প্রমাণ করতে পেরেছি,একজন পুরুষ সহকর্মীর তুলনায় আমি কোনদিকেই কম যোগ্যতাসম্পন্ন নয়,তখনই সব বাধা কেটে গেছে।

নিজের সেরা কাজ : দীর্ঘ চৌদ্দ বছরের কর্মজীবনে সাফল্যের ঢালি কম নয় তার। তবে সবচে বড় অর্জন হিসেবে এখনো যেটিকে মনে করেন,সেটি হলো চট্টগ্রাম শহরে ঈভটিজিং প্রতিরোধে সিএমপির উদ্যোগে কাজ করতে পারাকে। শুধুমাত্র ৩৭৩ একটি কোড নাম্বার ব্যবহার করে অন্ততঃ ২৫০ টি ঈভটিজিং এর ঘটনার প্রতিরোধ ও সমস্যার সুরাহা করতে পেরেছেন বলে জানালেন তিনি।

পরিবারের জন্য ভালোবাসা : আমেনা বেগম বলেন, অনেকেই অনুযোগ করেন পুলিশে চাকুরি করলে পরিবারকে সময় দেয়া যায়না,এটা আমি মানিনা। অন্য যেকোন চাকুরী করলে যেমন নিয়ম মেনে চলতে হয়,পুলিশ বিভাগও তাই,ব্যতিক্রম কিছু এখানে নেই। এখানেও অখন্ড অবসর আছে,আছে পরিবারকে দেয়ার মতো পর্যাপ্ত সময়। তবে এর পুরোটাই নিজের উপর নির্ভর করে বলে জানান তিনি। নিজের অবসরের সময়গুলো পরিবারের জন্য বরাদ্দ রাখেন জানিয়ে তিনি বলেন,প্রত্যেকেই যদি তার কর্মজীবন আর অবসর সময়কে যথাযথভাবে ব্যবহার করেন তাহলে পরিবার বঞ্জিত হয়না কোনভাবেই। পারিবারিক জীবনকে সুন্দর ও সহজ করতে তাই কাজের সময় এবং অবসরের সময়কে সঠিক ব্যবহারে উপর জোর দিলেন তিনি। নিজেও কাজের অবসরে পরিবারকে পর্যাপ্ত সময় দিতে পারেন বলে জানালেন। নিজে রুটিনমাফিক জীবনযাপন করেন বলেও জানান তিনি।

মিডিয়াবান্ধব পুলিশ কর্মকর্তা : সচরাচর বলা হয়ে থাকে,পুলিশ এবং সাংবাদিকদের সম্পর্ক বরাবরই বৈরি। কিন্তু আমেনা বেগম প্রচলিত এই ধারণাকে ভুল প্রমাণ করেছেন। গুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ এই দুই পেশার মধ্যে কী সত্যিকারের সমন্বয় প্রয়োজন এবং সেই সমন্বয়কে কাজে লাগিয়ে কিভাবে যেকোন কঠিন কাজকে সহজ করে তোলা যায় তার দৃষ্টান্ত আমেনা বেগম। জানালেন,আমার কর্মজীবনে সাংবাদিকদের যে সহযোগিতা পেয়েছি তা অতুলনীয়। তাদের সাথে পজিটিভ সম্পর্ক আমার কাজকেই সফল করতে সহযোগিতা করেছে। অনেক বড় বড় সাফল্যও আমি পেয়েছি সাংবাদিকদের দেয়া তথ্য ও সহযোগিতায়।03

নারীর জন্য মমতা : একজন নারী পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে অন্য সাধারন নারী বা ভিকটিমরা সহজেই তাকে আস্থায় নিয়ে নিজের সমস্যার কথা খুলে বলে এবং সমস্যাটির সমাধান হবে বলেও বিশ্বাস করে,জানালেন আমেনা বেগম। বললেন,আমাদের সামাজিক বাস্তবতায় একজন নারীর অনেক সমস্যা,যা সে একজন পুরুষ কর্মকর্তার কাছে বলতে পারেনা। তাই যখন আমাকে বা একজন নারীকে সে পুলিশ হিসেবে পায় স্বভাবতই যে আপন করে নেয় এবং নিজের সব কিছু খোলামেলা আলোচনা করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। এতে সমস্যার সুরাহা করা সহজ হয়। আর নারী অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো একজন নারী পুলিশ কর্মকর্তাকে অনেক বেশি আপন মনে করে বলেও জানান তিনি।

রাঙামাটি নিয়ে ভাবনা : পাঁচ বছর আগে রাঙামাটিতে দায়িত্ব পালন করে যাওয়া আমেনা বেগম মনে করেন,এই অপরূপ সুন্দর শহরটি ক্রমশ ঘিজ্ঞির শহরে পরিণত হয়ে তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য হারাচ্ছে। আবার পরিকল্পনামতো উন্নয়ন কর্মকান্ড না হওয়ায় পর্যটন শহর হিসেবে যে সম্ভাবনা ছিলো তাও ঠিকভাবে বিকশিত হচ্ছেনা বলে মনে করেন তিনি। এই সংকটের জন্য পার্বত্যাঞ্চলের ভূমি নিয়ে বহুমাত্রিক সমস্যা এবং উন্নয়ন কর্মকান্ড পরিচালনায় বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতিকেও সমস্যা বলে মনে করেন তিনি। তবে সকলের প্রচেষ্টায় রাঙামাটিকে দেশের অন্যতম সেরা পর্যটন শহর হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব বলে এখনো বিশ্বাস তার। আর এই প্রচেষ্টায় নিজেও অংশ নিবেন এবং ভূমিকা রাখবেন এমন প্রত্যয়ের কথাও জানালেন আমেনা বেগম।04

Micro Web Technology

আরো দেখুন

‘হাতির মাথা সিঁড়ি’ পর্যটকদের নতুন আকর্ষণ

দেশের অধিকাংশ পর্যটন স্পটই প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট। যেগুলো সময়ে সময়ে পর্যটকদের জন্য আধুনিকায়ন করা হয়। তবে …

One comment

  1. Thanks, Dosto@ Fazle Alahi, Sir er interview publish korar jonyo.

Leave a Reply

%d bloggers like this: