নীড় পাতা » পাহাড়ের রাজনীতি » যেসব কারণে হেরে গেলেন সুদর্শন চাকমা

যেসব কারণে হেরে গেলেন সুদর্শন চাকমা

sudarshan-chakma-coverপার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মূল দল ছেড়ে যখন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি(এমএনলারমা) প্রতিষ্ঠিত হয়,তখন থেকেই দলটির অন্যতম নীতিনির্ধারক তিনি। সর্বশেষ উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পর বাঘাইছড়িকে পরিণত করেছিলেন দলটির অন্যতম শক্তিশালী ঘাঁটিতে। দীর্ঘদিন রাঙামাটি ছাড়া থাকলেও বাঘাইছড়িকে ঠিকই পরিণত করেছিলেন নিজেদের চারণভূমিতে। কিন্তু ১৫ মার্চের নির্বাচনে পরাজয়ের মধ্য দিয়ে নিজের সেই সাম্রাজ্যেরই যেনো পতন হলো সুদর্শন চাকমা’র। তার পরাজয়ে দেশের সবচে বড় উপজেলা বাঘাইছড়ির রাজনীতিতেও নয়া মেরুকরণের সূচনা করবে বলে ধারণা করছে স্থানীয় মানুষ। কিন্তু কেনো পরাজিত হলেন,বাঘাইছড়ির দোর্দন্ড প্রতাপশালি এই নেতা ? এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বেরিয়ে এসেছে নানান তথ্য।

ইউপিডিএফ এর সাথে বিরোধ :
পাহাড়ের রাজনীতিতে জনসংহতি(এমএনলারমা) এবং ইউপিডিএফ ভ্রাতৃপ্রতীম সংগঠন হিসেবেই পরিচিত। দুইদলেরই প্রধান শত্রু সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জনসংহতি সমিতি। সশস্ত্র রাজনীতিতেও তাই পক্ষ মূলত দুটিই। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে সাম্প্রতিক সময়ে ইউপিডিএফ আর জনসংহতি(এমএনলারমা)ও সম্পর্ক ভালো যাচ্ছিলোনা। জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে এই সংকট শুরু হলেও উপজেলা নির্বাচনে এসে তা প্রকট আকার ধারণ করে। নানিয়ারচরসহ কয়েকটি উপজেলার নির্বাচনেও দুদলের সম্পর্কের নেতিবাচক দিক চোখে পড়ে। এরই সর্বশেষ ফলাফল বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাচন। এখানে বিজয়ী জনসংহতি সমিতির বড়ঋষি চাকমা ভোট পেয়েছেন,১৯ হাজার ২৭২ ভোট। অন্যদিকে সুদর্শন চাকমা পেয়েছেন ১২ হাজার ২১৬ ভোট আর ইউপিডিএফ সমর্থিত বিশ্বজিদ চাকমা হারিহাপ্পা পেয়েছেন ৮ হাজার ৬১ ভোট। অর্থাৎ এই দুইজনের প্রাপ্ত ভোট যোগ হলে তা দাঁড়ায় ২০ হাজার ২৭৭ এবং বিজয়ী হন তারাই। কিন্তু বিরোধের কারণে একক প্রার্থী না দিয়ে পৃথক প্রার্থী দেয়ায় ভোটের হিসেবেই পিছিয়ে পড়ে তারা,যার সুবিধা নেয় বড়ঋষি চাকমা। আর ইউপিডিএফ নানিয়ারচরে পরাজয়ের প্রতিশোধ নিলো বাঘাইছড়িতে। সেই সাথে দলদুটির পরস্পরের মধ্যে যে ‘সন্দেহ’ ‘ অবিশ্বাস’ আর ‘প্রতিশোধপরায়নতা’ দেখা দিয়েছে,তা পাহাড়ের রাজনীতিকে কোথায় নিয়ে যায়, তাই এখন দেখার বিষয়।

প্রচার-অপপ্রচারsudarshan-liflet
নির্বাচনের আগে সুদর্শন চাকমার বিরুদ্ধে বেশ কিছু লিফলেট প্রকাশ করা হয় অজ্ঞাতসূত্র থেকে। এইসব লিফলেটের বক্তব্য সত্য কিংবা মিথ্যা যাই হোকনা কেনো,মানুষের মধ্যে এর বিরূপ প্রভাব পড়ে। নির্বাচনের আগেরদিন এর বিরুদ্ধে সাংবাদিক সম্মেলনও করেন তিনি এবং ঘটনার জন্য পৌর মেয়র আলমগীর কবিরের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনেন। মেয়রও পাল্টা সাংবাদিক সম্মেলন করেন। নির্বাচনের একদিন আগে এই কাঁদা ছোঁড়াছুড়িকে স্বাভাবিকভাবে নেয়নি ভোটাররা। আবার জনপ্রতিনিধি হয়েও ‘আন্ডারগ্রাউন্ডে সশস্ত্র ক্যাডার নিয়ন্ত্রন’ এবং ‘বিপুল অর্থবিত্তের মালিক হওয়ার’ প্রচার বা অপপ্রচারও ছিলো তার বিরুদ্ধে। এসব প্রচার-অপপ্রচারকে তিনি সফলভাবে মোকাবেলা করতে পারেননি।

‘অহংকারি’ ‘টেন্ডারবাজি’ ‘মি:কমিশন’
বিগত পাঁচ বছর চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালণ করা সুদর্শনকে স্থানীয়রা ‘অহংকারি’ হিসেবে অভিহিত করা শুরু করেন বছর দুয়েক আগে থেকেই। তার আচরণ এবং চলাফেরায় উদ্ব্যত্ব চলে এসেছে বলে মন্তব্য তাদের। একই সাথে গত পাঁচ বছর এই উপজেলার যাবতীয় উন্নয়ন কাজ ও ‘টেন্ডারবাজি’ নিয়ন্ত্রন করতেন সুদর্শন। ফলে তার উপর মানুষের একটি অংশ ক্ষুদ্ধ হয়ে ছিলো। অভিযোগ আছে,ইউপি চেয়ারম্যানদের উন্নয়ন বরাদ্দ থেকেও তিনি মোটা অংকের কমিশন নিতেন,ফলে ইউপি চেয়ারম্যানরাও এই সুযোগে ‘মি: কমিশন’ এর উপর প্রতিশোধ নিয়েছেন। তবে সুদর্শন এর ঘনিষ্ঠজনরা বরাবরই এইসব অভিযোগকে ভিত্তিহীন অপপ্রচার বলেই দাবি করে আসছেন।

স্থানীয় প্রশাসনের সাথে ‘দুরত্ব’ 
বেশ কিছু কারণে সাম্প্রতিক সময়ে স্থানীয় প্রশাসনের সাথে দুরত্ব তৈরি হয় সুদর্শনের। টেলিটকের ৫ কর্মচারী অপহরণ ঘটনাকে কেন্দ্র করেই এর সূত্রপাত বলে জানিয়েছে একাধিক সূত্র। সূত্রগুলোর দাবি,এই অপহরণ ঘটনার সাথে সুদর্শন এর সম্পর্কের যোগসাজশ বিষয়ে সন্দেহ হয় প্রশাসনের। কিন্তু রাষ্ট্রায়ত্ত্ব মোবাইল কোম্পানীর কর্মচারীদের উদ্ধারে সুদর্শনের সহযোগিতা না পাওয়ার ঘটনায় ক্ষুদ্ধ হয় প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ। পরে একটি গোয়েন্দা সংস্থার বিশেষ অভিযানে অপহৃতরা মুক্তি পেলেও প্রশাসন ঠিকই হিসেবে ছক কষে নেয় এবং তাদের আস্থা হারান সুদর্শন। ফলে প্রশাসনের বিগড়ে যাওয়া অংশটিকে আর আস্থায় আনতে পারেননি সুদর্শন। প্রয়োজনীয় মুহূর্তে প্রশাসনের ওই অংশটিও তাকে কোন সহযোগিতা করেনি।

ত্রিপল মার্ডার ইস্যু 
২১ নভেম্বর ২০১৩ তারিখ উপজেলার সিজক কলেজ এলাকায় সশস্ত্র হামলায় নিহত হন সন্তু লারমা সমর্থিত জনসংহতি সমিতির উপজেলা কমিটির সভাপতি শশাংকমিত্র চাকমা প্রীতিশ ও সাংগঠনিক সম্পাদক নন্দ কুমার চাকমা এবং যুথিষ্ঠির চাকমা। এই ঘটনার জন্য সুদর্শন ও তার দলকে দায়ী করা হয়ে থাকে এবং এই মামলার অন্যতম আসামীও সুদর্শন। ফলে সিজক এলাকার সাধারন মানুষের মানুষ তার বিরুদ্ধে ব্যালটের মাধ্যমে জবাব দেয়। কেন্দ্রভিত্তিক ভোটের হিসেবেও বিষয়টি বেশ পরিষ্কার হয়ে উঠেছে। একটি দলের সভাপতি ও সাংগঠনিক সম্পাদকের মৃতদেহের রক্তাক্ত সিঁড়ি পেরিয়ে তাই সাধারন মানুষের আবেগি ভোট সাধারন সম্পাদক বড়ঋষি চাকমার বিজয়ের পথকেই প্রশস্ত করেছে।

আলমগীর কবিরের সাথে বিরোধ
বাঘাইছড়ি পৌর মেয়র আলমগীর কবিরের সাথে বেশ কিছু বিষয় নিয়ে বিরোধ তৈরি হয় সুদর্শনের। এই বিরোধ নিরসনে স্থানীয় বিএনপি-আওয়ামী লীগ সহ বিশিষ্টজনরা বৈঠক করে দুইজনকে মিলিয়ে দেন এবং তারাও নিজেদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির অবসান হয়েছে বলে ঘোষণা দেন। কিন্তু মেয়র আলমগীর কবির,ঠিকই নির্বাচনকালে বড়ঋষির পক্ষে প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়ে সুদর্শনকে পরাজিত করতে মাঠে নামেন সরাসরি। মেয়র ও তার সমর্থকরা সুদর্শনকে পরাজিত করতে আদাজল খেয়ে মাঠে ছিলেন।

জনসংহতির মরিয়া প্রচেষ্টা
নানিয়ারচরে ‘শক্তিমান চাকমা’তে ঠেকাতে ব্যর্থ হওয়া সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জনসংহতি সমিতি বাঘাইছড়িতে তাদের আরেক অন্যতম প্রধান শত্রু ‘সুদর্শন চাকমা’কে ঠেকাতে মরিয়া হয়েই মাঠে নামে। সুদর্শনকে হারিয়ে বাঘাইছড়িতে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা এবং জনসংহতি(এমএনলারমা)ও সবচে শক্তিশালী দূর্ঘটি ভেঙ্গে দিতে নানান চক কষে এগোয় পাহাড়ের পুরোনো এই দলটি। তারা নির্বাচনে নানা কৌশলের আশ্রয় নেয়,প্রতিপক্ষদের মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টি,আদর্শিকভাবে ভিন্ন মেরুতে থাকা পৌর মেয়র আলমগীর কবিরকে যথাযথ ‘ব্যবহার’,স্থানীয় প্রশাসনের কাছে নিজেদের ‘আস্থাভাজন’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা’ সুদর্শন বিরোধী সবগুলো পক্ষকে জোটবদ্ধ করা,নিজেদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় প্রায় ৯৫-৯৮ শতাংশ ভোট সংগ্রহ,বিরোধী এলাকায়ও উল্লেখযোগ্য ভোট সংগ্রহ করে নির্বাচনের মাঠে চমক সৃষ্টি করে সদ্য জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী দলটি।

সুদর্শনের পরাজয়ে পাল্টে যাবে এখানকার আধিপত্যের রাজনীতি,বদলে যাবে প্রভাব বলয়। এনিয়ে শংকিত বাঘাইছড়িবাসী। বর্তমানে নির্বাচন কাজে নিয়োজিত সেনাবাহিনী ও বিজিবি মাঠে থাকায় আপাত: চুপসে থাকা তিন দলের সশস্ত্র গ্রুপই অস্ত্রে শান দিচ্ছে,প্রতিশোধে ঝাঁপিয়ে পড়তে,এমন খবর পাহাড়ী জনপদের সর্বত্র ছড়িয়ে দিয়েছে উদ্বেগ আর আতংক।

বদলে যাবে বাঘাইছড়ির ‘ভূগোল’
বাঘাইছড়িই পার্বত্য চট্টগ্রামের একমাত্র উপজেলা যেখানে সমান প্রভাববলয় নিয়েই অবস্থান করছিলো পাহাড়ের প্রবল প্রতিপক্ষ তিন আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল। বাঘাইছড়ি পৌর এলাকা,মারিশ্যা ইউনিয়ন বাঘাইছড়ি ইউনিয়নের কিছু অংশ,রূপকারি ইউনিয়নের অধিকাংশ এবং বঙ্গলতলি এলাকায় জনসংহতি সমিতি(এমএনলারমা)র একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রন, খেদারমারা,সারোয়াতলি,বাঘাইছড়ি ইউনিয়নের বেশ কিছু অংশে সন্তু লারমা সমর্থিত জনসংহতি সমিতির অবস্থান আর রূপকারি ইউনিয়ন,বঙ্গলতলি ও মারিশ্যার কিছু অংশ এবং সাজেক ইউনিয়নে ইউপিডিএফ এর এর সাংগঠনিক অবস্থান ছিলো এতোদিন। কিন্তু সুদর্শনের পরাজয়ে পাল্টে যাবে এখানকার আধিপত্যের রাজনীতি,বদলে যাবে প্রভাব বলয়। এনিয়ে শংকিত বাঘাইছড়িবাসী। বর্তমানে নির্বাচন কাজে নিয়োজিত সেনাবাহিনী ও বিজিবি মাঠে থাকায় আপাত: চুপসে থাকা তিন দলের সশস্ত্র গ্রুপই অস্ত্রে শান দিচ্ছে,প্রতিশোধে ঝাঁপিয়ে পড়তে,এমন খবর পাহাড়ী জনপদের সর্বত্র ছড়িয়ে দিয়েছে উদ্বেগ আর আতংক।

কি বলেন তারা :

নির্বাচনে পরাজয়ের কারণ জানতে চাইলে সুদর্শন চাকমা বলেন, ‘আমিতো পরাজিত হইনি,আমাকে হারানো হয়েছে।’ তিনি অভিযোগ করেন, দোসর,কংলাক,রুইলুই,সিজক এলাকার কেন্দ্রগুলোতে জোর করে যেভাবে ভোট সংগ্রহ করা হয়েছে,শতকরা ৯৮-৯৯% ভোট নেয়া হয়েছে,সেখানেই তো ভোটের পার্থক্য তৈরি হয়ে গেছে।

ইউপিডিএফ এর বাঘাইছড়ি ইউনিট সংগঠক সমশান্তি চাকমা বলেন,পাঁচবছর আগে যে প্রত্যাশা নিয়ে আমরা সুদর্শনকে নির্বাচিত করেছিলাম,সে আমাদের কোন প্রত্যাশাই পূরণ করতে পারেনি। উপজেলা সদরে আমাদের সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনায় সহযোগিতাতো করেইনি,বরং নানাভাবে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে। এমনকি এবার সে নির্বাচন করতে মাঠে নামলেও আমাদের কোন সহযোগিতাই চায়নি। ফলে স্বাভাবিক কারণেই আমরা বিশ্বজিতকে সমর্থন দিয়েছি।

বিজয়ী বড়ঋষি চাকমা বলেন, জনগণ স্বত:স্ফূর্তভাবে ভোট দেয়ায় আমি বিজয়ী হয়েছি। জনগণ মনে করেছে আমাকে নির্বাচিত করলে বাঘাইছড়ির উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি হবে,আমিও চেষ্টা করব সবাইকে সাথে নিয়ে কাজ করে এলাকার মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করতে।

Micro Web Technology

আরো দেখুন

রাঙামাটিতে পুলিশ কনস্টেবলের ‘আত্মহত্যা’, নেপথ্যে ‘প্রেম’

রাঙামাটিতে গলায় ফাঁস লাগানো অবস্থায় এক পুলিশ কনস্টেবলের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। সোমবার সকালে জেলা …

Leave a Reply