নীড় পাতা » পাহাড়ে নির্বাচনের হাওয়া » যেসব কারণে হেরে গেলেন দীপংকর

যেসব কারণে হেরে গেলেন দীপংকর

dipankar-cover-02আওয়ামী লীগের সর্বশেষ সরকারের পার্বত্য প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা দীপংকর তালুকদার সর্বদলীয় সরকারেও একই দায়িত্ব পালন করছেন। ১৯৯১ সাল থেকে তিনবারের নির্বাচন এই নেতা এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সারাদেশে আওয়ামীলীগের নিরঙ্কুশ বিজয়ের মধ্যেও পরাজিত হয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির কেন্দ্রীয় সহসভাপতি ঊষাতন তালুকদারের কাছে। ভোটের ব্যবধান ১৮,৮৫২। উষাতনের ৯৬ হাজার ২৩৭ ভোটের বিপরীতে দীপংকর পেয়েছেন ৭৭ হাজার ৩৮৫ ভোট। ২০০৮ সালের নির্বাচনে ১ লক্ষ ১৫ হাজার ভোট পেয়ে বিজয়ী দীপংকর এবার বিএনপির অংশগ্রহণ না থাকা সত্ত্বেও ভোটের হিসেব মার খেলেন কেনো এনিয়ে চলছে নানান জল্পনা কল্পনা।

তবে আওয়ামী লীগের দীর্ঘ দুগ ধরে রাঙামাটির রাজনীতির একচ্ছত্র অধিপতি ‘দাদা’ দীপংকর তালুকদারের পরাজয়ের কারণ বিশ্লেষন করতে গিয়ে বেরিয়ে এসেছে নানা উপসর্গ। পরাজয়ের কারণ হিসেবে কেউ আত্মকেন্দ্রিক দীপংকরের অতি অহংকার,কেউবা দলীয় নেতাকর্মীদের অবমূল্যায়ন করাকে দায়ী করেছেন। দীপংকর তালুকদার দীর্ঘ সময় ধরে এমপি,মন্ত্রী থাকার কারণে নেতাকর্মীদের সাথে খুবই বাজে ব্যবহার করতেন বলে অভিযোগ আছে। গণমাধ্যমকর্মীদের সাথেও তার সুসম্পর্ক ছিলোনা,তার দুই ব্যক্তিগত সহকারীর কারণেও সাধারন নেতাকর্মী ও ভুক্তভোগীরা তার কাছে ঘেঁষতে পারতোনা। তার ব্যক্তিকেন্দ্রীক রাজনীতির কারণে তিনি যোগ্য ও মেধাবী নেতাদের মূল্যায়ন না করে অযোগ্য চাটুকারদের নিয়েই রাজনীতি করতেন,ফলে দলের ত্যাগি ও পরীক্ষিত নেতাকর্মীরা তার কাছ থেকে অনেক দূরে সরে গেছে,যাদের নির্বাচনের মাঠেও ঠিকমতো নামানো যায়নি,চেষ্টাও করা হয়নি।

দীপংকর তালুকদারের মাধ্যমে গত পাঁচ বছরে কোটিপতি হয়েছেন এমন অসংখ্য নব্য আওয়ামী লীগারকেও ভোটের মাঠে দেখা যায়নি। ভোটের মাঠে ছিলোনা আওয়ামীলীগের চাকমা জনগোষ্ঠীর নেতারাও। আবার আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতাদের মধ্যে পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান নিখিল কুমার চাকমার নানিয়ারচর উপজেলা,বৃষকেতু ও কেরল চাকমার বাঘাইছড়ি,অভিলাষ তঞ্চঙ্গ্যার বিলাইছড়ি,সন্তোষ কুমার চাকমার বরকলেও নৌকার ভরাডুবি’ই এর বড় প্রমাণ। অথচ এই কয়েকজন নেতা গত কয়েকবছরে কোটি কোটি টাকার উন্নয়ন বরাদ্দ পেয়েছেন ওইসব এলাকার জন্য। আওয়ামী লীগের মারমা ও ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর নেতারা আন্তরিকভাবে দলের জন্য কাজ করলেও চাকমা জনগোষ্ঠীর নেতাদের মাঠে দেখা যায়নি বলে অভিযোগ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের। দুই মারমা নেতা কাপ্তাইয়ের অংসুচাইন চৌধুরী এবং কাউখালির অংশুই প্রু চৌধুরী নিজেদের এলাকায় নৌকার পক্ষে ব্যাপক ভোট সংগ্রহ করতে সক্ষম হলেও বাকী উপজেলাগুলোতে তা হয়নি। এমনিক বাঙালী অধ্যুষিত লংগদু উপজেলায়ও উল্লেখযোগ্য ভোটের ব্যবধার তৈরি করতে পারেনি নৌকা। নির্বাচনের পরদিনই দলীয় কার্যাল্েযয় তাই নেতাকর্মীদের ক্ষোভের মুখে পড়েছেন খোদ জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও সদস্যরা।

এবারের নির্বাচনে সারাদেশে বিএনপি নির্বাচন বর্জন করলেও রাঙামাটিতে বিএনপির অবস্থান ছিলো রহস্যে ঘেরা। বিএনপির একটি অংশ প্রকাশ্যে নির্বাচন বর্জন করলেও ভেতরে ভেতরে হাতি প্রতীকের পক্ষে ভোট দেয়া ও জনমতকে প্রভাবিত করার কাজ করার অভিযোগ করছেন খোদ দলটির নেতাকর্মীরা। রাঙামাটি জেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক ও পৌর মেয়র সাইফুল ইসলাম ভূট্টোও অভিযোগ স্বীকার করে নিয়ে বলেছেন,আমরাও শুনেছি আমাদের দলের সভাপতি এবং কিছু কিছু নেতা ব্যক্তিগত ঋণশোধের জন্য হাতির পক্ষে কাজ করেছে,আমরা বিষয়টি খোঁজ খবর নিচ্ছি,অভিযোগ প্রমাণিত হলে দলীয় ফোরামে বিষয়টি আলোচিত হবে এবং দলীয় নির্দেশনা অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে দল অবশ্যই সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিবে। অন্যদিকে রাঙামাটি জেলা যুবলীগের সাধারন সম্পাদক নুর মোহাম্মদ কাজলও সরাসরি অভিযোগের আঙ্গুল তুলেছেন বিএনপির দিকে। তিনি অভিযোগ করেছেন,বিএনপির সভাপতি ও তার গ্রুপের নেতাকর্মীরা হাতির পক্ষে সরাসরি কাজ করেছে,তারা পাহাড়ী বিএনপি কর্মীদের সবাইকে ভোটকেন্দ্রে পাঠালেও বাঙালী বিএনপি নেতাকর্মীদের ভোট দিতে দেননি ‘বর্জন’ এর কথা বলে। বিএনপি’র ডাবল স্ট্যান্ডার্ড এর কারণে ভোটের মাঠের ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে বলেও দাবি তার।

এবারের নির্বাচনে অন্যতম ইস্যু ছিলো পার্বত্য শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন। চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে সরকারের দাবি আর পাহাড়ী আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর দাবির মধ্যে যে ফারাক তা প্রভাবিত করেছে পাহাড়ী তরুন ভোটারদের। পাহাড়ী তরুন ভোটাররা দীপংকর তালুকদারের বিরুদ্ধেই অবস্থান নিয়েছে,এমনটাই জানালেন বেশ কিছু তরুন। এছাড়া পার্বত্য রাজনীতির জটিল মেরুকরণের কারণে দীপংকর তালুকদারকে পাহাড়ীদের একটি বড় অংশ ‘বাঙালীপ্রেমি’ হিসেবে চিহ্নিত করে থাকে,তারা বিভিন্নস্থানে দীপংকর তালুকদারকে ‘মোঃ দীপংকর’ নামেও প্রচার চালায়। পার্বত্য চুক্তি,আভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু তালিকা ও ভূমি বিরোধ ইস্যু’র জন্য দীপংকর তালুকদারকে দুষে থাকেন তারা,যার প্রভাবে সাধারন পাহাড়ী ভোটারদের বড় অংশটি,বিশেষ করে চাকমা জনগোষ্ঠী এবার একযোগে দীপংকরকে বয়কট করে। আবার এবারের নির্বাচনের হলফনামায় দীপংকরের বিপুল সম্পদ আর অর্থের তালিকা হতাশ করে তরুন ভোটারদের। তারা এইসব অনিয়মের জবাবও দিয়েছেন ব্যালটের মাধ্যমে। পাহাড়ী একাধিক নেতার সাথে কথা বললে তারা জানান,পাহাড়ের মানুষ তার(দীপংকরের) উদ্ধ্যত্বের জবাব দিয়েছে ব্যালটের মাধ্যমে।

বিজয়ী উষাতন তালুকদারের প্রধান নির্বাচনী এজেন্ট ও তরুন নেতা উদয়ন ত্রিপুরা বলেন, যে আশা আকাংখা নিয়ে পাহাড়ের মানুষ বারবার দীপংকর তালুকদারকে নির্বাচিত করেছে,তিনি তার কাজের মাধ্যমে তাদের আশার প্রতিফলন ঘটাতে ব্যর্থ হয়েছেন। এছাড়া তার ও দলের দুর্নীতি,দলীয়করণ,পাহাড়ের অব্যাহত সন্ত্রাস,পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন না করার কারণে পাহাড়ী-বাঙালী সবাই তার উপর ক্ষুদ্ধ ছিলো,তারই প্রতিফলন ঘটেছে ভোটে।

আওয়ামী লীগের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীদের সাথে কথা বললে তারা জানিয়েছেন,দীপংকর তালুকদার পরাজিত হননি,তাকে পরাজিত করা হয়েছে। তারা বলছেন,দীপংকর তালুকদার হেরে গেছেন মূলতঃ পাহাড়ী ভোটার অধ্যুষিত বিলাইছড়ি,বরকল,জুড়াছড়ি,রাজস্থলী এবং বাঘাইছড়িতে। এই চারটি উপজেলায় হাতি’র বিশাল ভোটের বিপরীতে নৌকার ভোট ছিলো একেবারেই সামান্য,একটি কেন্দ্রেতো নৌকা কোন ভোটই পায়নি। তারা অভিযোগ করেন,জনসংহতি সমিতির সশস্ত্র ক্যাডাররা এই চারটি উপজেলার নীরব ভোট র‌্যাগিং করেছে,সাধারন মানুষকে ভোট দিতে বাধ্য করেছে। এই চারটি উপজেলার অন্ততঃ ৪২-৪৩ টি কেন্দ্রে নৌকা প্রতীকের এজেন্টদের নির্বাচনের আগেই এলাকা ছাড়তে বাধ্য করা হয় বলেও অভিযোগ করেছেন তারা।

রাঙামাটি জেলা আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক মোঃ মুছা মাতব্বর জানিয়েছেন,তারা কিভাবে জিতেছে এটা পাহাড়ের সাধারন মানুষ জানে। অস্ত্রের মুখে মানুষকে জিম্মি করে এইভাবে জয়লাভে কোন কৃতিত্ব নেই। তিনি বলেন,শহরের যেখানে ভোটের হার এতো কম,সেখানে দুর্গম পাহাড়ে ৮০-৯০ শতাংশ ভোট অবিশ্বাস্য। সেখানে ভোটের নামে অস্ত্রের খেলা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

দীপংরের পরাজয়ে ফ্যাক্টর ছিলো জনসংহতির অন্য দুই প্রতিপক্ষ জনসংহতি সমিতি (এমএনলারমা) ও ইউপিডিএফ। ইউপিডিএফ এবার নির্বাচনে প্রার্থী দিলেও তারা জনসংহতি(এমএনলারমা)কে সমর্থন দিয়ে সবাই খাগড়াছড়ি চলে যায় দলীয় প্রধান প্রসিত বিকাশ খীসার পক্ষে কাজ করতে। ফলে তারা দৃশ্যতঃ জনসংহতি(এমএনলারমা)কে সমর্থন দিলেও বাস্তবে মাঠ ফেলে চলে যাওয়ায় সাধারন ভোটাররা অনেকটা নিজেদের ইচ্ছেতেই ভোট দিয়েছেন,ফলে ইউপিডিএফ অধ্যুষিত এলাকাগুলোতেও উষাতন প্রচুর ভোট পেয়েছেন। জানা গেছে,নীরবে তা উষাতনকে সমর্থনও দিয়েছেন। আর জনসংহতি(এমএনলারমা) ২০০৮ সালের নির্বাচনে দীপংকরকে সমর্থন দিলেও এবার তাদের আস্থায় আনতে পারেননি দীপংকর। ফলে তাদের পাওয়া ২৪ হাজার ৩৫২ ভোটও উষাতন আর দীপংকরের মধ্যে ব্যবধান গড়ে দেয়। এছাড়া ‘প্রয়োজনীয় প্রার্থী’ আবছার আলীকেও আস্থায় আনতে পারেননি দীপংকর,কিংবা আনার চেষ্টাও করেননি। ফলে দীপংকরের বাক্স থেকে বেরিয়ে যায় আবছার আলীর পাওয়া আরো ৫ হাজার ৩৯৫ ভোট।

দীপংকরের পরাজয়ের আরেক অন্যতম কারণ ‘অতি আত্মবিশ্বাস’। এই ‘ওভার কনফিডেন্ট’ এবং জনসংহতিকে ভোটের রাজনীতিতে প্রতিপক্ষ হিসেবে গুরুত্ব না দেয়াও অন্যতম কারণ। দলীয় নেতাকর্মীদের একটি অংশ এতো বেশি আত্মবিশ্বাসী ছিলো যে,নিজেদের কর্মীদেওর মাঠে নামাতে পারেনি তারা। এমনকি আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক হিসেবে পরিচিত হিন্দু ও বড়ুয়া ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে নেয়ার ব্যাপারে কোন আগ্রহই ছিলোনা তাদের,ভোটারদের দেয়নি ভোটার কার্ডও। ফলে নিশ্চিত এসব ভোট হারায় দলটি। প্রচার প্রচারণায় গতি আনতে পারেনি দলটি। জেলা আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন নেতা জানিয়েছেন,দলের পৌর এলাকায় প্রচারের দায়িত্ব যাকে দেয়া হয়েছে,সে কারো সাথে সমন্বয় করেনি, আবার জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান গত পাঁচ বছর উন্নয়নের সব দায়িত্ব পালন করায় ধারণা করা হয়েছিলো পাহাড়ী এলাকার এর পজিটিভ প্রভাব পড়বে,কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি।

এবারের নির্বাচনে অন্যতম নিয়ামক ছিলো সাম্প্রদায়িক প্রচারণা। অসাম্প্রদায়িক রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচিত দীপংকর তালুকদার এবার হঠাৎ করেই কিছুটা আগ্রাসী বক্তব্য দেয়া শুরু করেন,ব্যক্তিগতভাবে কটাক্ষ করেন উষাতন তালুকদারের প্রতিও। বিপরীতে স্বল্পভাষী উষাতন ছিলেন কৌশলী,তিনি পাল্টা কটাক্ষ না করে কৌশলী অবস্থান নেয়ায়, পাহাড়ীরা ভোটাররা ক্ষুদ্ধ হয় দীপংকরের উপরই। আবার জাতীয় রাজনীতির প্রভাবের কারণে ভোটকেন্দ্রে স্বাভাবিক ভোটারদের অনুপস্থিতিও দীপংকরের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে উঠে।

রাঙামাটির প্রবীন সাংবাদিক সুনীল কান্তি দে বলেন,দীপংকরের পরাজয়ের অসংখ্য কারণ যেমন আছে,আবার উষাতনের জয়েরও অনেক কারণ আছে। এসব কারণ না খুঁজে এখন সবাই মিলে পাহাড়ী-বাঙালী ঐক্যবদ্ধভাবে যেনো এগিয়ে যেতে পারে,সমৃদ্ধির পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রতিষ্ঠিত হয়,পাহাড়ে অসাম্প্রদায়িক,গনতান্ত্রিক রাজনীতির চর্চা যেনো হয়,সেই চেষ্টাই করতে হবে বিজয়ী এবং বিজিত উভয়কেই। এতে বিজয়ীর দায়িত্বই বেশি। কারণ তার অতীত জীবন আর ভবিষ্যত দুটো দুই মেরুর,এ দুয়ের মধ্যে সুতো গাঁথতে হবে,সমন্বয় হতে হবে। এতে আমাদের সবারই লাভ হবে।

Micro Web Technology

আরো দেখুন

লংগদুতে মাছের পোনা অবমুক্ত

রাঙামাটির কাপ্তাই হ্রদে কার্প জাতীয় মাছের উৎপাদন ও বংশবৃদ্ধির লক্ষে লংগদুতে পোনা অবমুক্ত করা হয়েছে। …

Leave a Reply

%d bloggers like this: