যা দেখলাম, যা বুঝলাম…

bsl-flagপাঁচ বছর পর গত ২জুন রাঙামাটি জেলা ছাত্রলীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সম্মেলনে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। সম্মেলন শেষে কাক্সিক্ষত কাউন্সিল অনুষ্ঠানের কথা ছিলো। কিন্তু কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ একটি বৈঠক বসেই কোনো কিছু না বলেই বিকাল চারটার মধ্যেই রাঙামাটি ত্যাগ করেন। জানা যায়, সন্ধ্যা ছয়টায় তাদের চট্টগ্রামে বিমানবন্দর থেকে ঢাকায় যাওয়ার কথা ছিলো এবং শেষ পর্যন্ত তাঁরা সেই মোতাবেক কোনো কাউন্সিল না করেই রাঙামাটি ত্যাগ করেন। এরপর অপেক্ষা… পরদিন সকালে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হাজি মুছা মাতব্বর নতুন সভাপতি, সহ-সভাপতি, সম্পাদক, সাংগঠনিক সম্পাদকসহ জাতীয় পরিষদের এক সদস্যের নাম ঘোষণা করেন। এরপর সভাপতি পদপ্রত্যাশী সমর্থকরা বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠে। এসময় বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা আওয়ামী লীগ অফিসের চেয়ার, জানালা কাচ ভাঙচুর করেন। পরে যুবলীগের বেশ কিছু নেতৃবৃন্দ, স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতাসহ সাবেক ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতাকর্মী মিলে বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীদের ধাওয়া দিলে তারা পিছু হটে যান। পরে সভাপতি প্রার্থীরা বিকেলে সংবাদ সম্মেলন করে সভাপতি আব্দুর জব্বার সুজনের বিরুদ্ধে পাহাড়সম অভিযোগ উত্থাপন করে, অবিলম্বে সভাপতি পদে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। আপাতত এই হলো ২০১৫ সালের ছাত্রলীগের সম্মেলনের সামমর্ম।

আমরা বুঝতে পেরেছি, এবার ছাত্রলীগ কাউন্সিলে যে খেলা চলেছে তা ছিলো পর্দার অন্তরালে। এক যুব নেতার নেতৃত্বে এই খেলা হয়েছে বলে জানা যায়। ছাত্রলীগের সভাপতি ও সম্পাদক পদপ্রত্যাশীরা যখন রাঙামাটি জেলা চষে বেড়াচ্ছে, ঠিক তখন এই নেতা কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের নেতৃবৃন্দকে কৌশলে তাঁর সমর্থক প্রার্থীর পক্ষে নিয়ে আসে। তাই কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের রাঙামাটি ত্যাগের সময়কালই বলে দেয়, আগে থেকে নির্ধারিতই ছিলো এখানে কাউন্সিল হবে না, শুধুমাত্র সিলেকশন কমিটি দেওয়া হবে। এবং সেই মোতাবেক সম্মেলন শেষে বিদায়ী জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি ও সম্পাদকবিহীন ‘দাদা’ দীপংকর তালুকদারের বাসায় একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। যাতে রাঙামাটি আওয়ামী লীগের সভাপতি, সম্পাদক, কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের নেতৃবৃন্দ ও জেলার যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবকলীগের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলো। এবং সেই বৈঠকে নির্ধারিত হয় জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি, সহ-সভাপতি, সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদকের নাম।
তবে সভাপতি হিসেবে আব্দুর জব্বার সুজনের নাম প্রকাশের পর তাকে নিয়ে সবচে বেশি বিতর্ক দেখা দেয়। অন্যান্য সভাপতি পদপ্রার্থীরা তার বিরুদ্ধে অছাত্র, বিতর্কিত, জামায়াত-শিবিরের সাথে সম্পৃক্ততা, সাম্প্রদায়িক রাজনীতিসহ আরো বেশ কিছু অভিযোগ উত্থাপন করেন। তারা আরো অভিযোগ করেন, জেলা ছাত্রলীগ কমিটিকে সিভি জমা দেওয়ার কথা থাকলেও তিনি সিভি জমা দেননি। তাই সভাপতি পদে সরাসরি ভোট আয়োজনের দাবি জানানো হয়। আবার তার পাল্টা জবাব হিসেবে সুজনের ঘনিষ্ঠ হিসেবে দাবিদার কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি সুলতান মাহমুদ চৌধুরী বাপ্পা তার পক্ষে একটি বিবৃতি পাঠিয়ে অভিযোগ মিথ্যা বলে দাবি করা হয়। তিনি দাবি করেন, ‘সুজন ২০০০ সালে বাঘাইছড়ি উপজেলার কাচালং স্কুলে ৯ম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত অবস্থায় বাংলাদেশ ছাত্রলীগ কাচালং স্কুলের নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক হয়। ২০০৩ সালে রাঙামাটি জেলা ছাত্রলীগ অনুমোদিত বাঘাইছড়ি উপজেলা ছাত্রলীগের স্কুল ও ছাত্রবিষয়ক সম্পাদকের পদে মনোনীত হয়। এসএসসি পাশের পর ২০০৫-২০০৬ শিক্ষাবর্ষে রাঙামাটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে এইচএসসি ১ম বর্ষে ভর্তি হয়। ২০০৬ সনে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ রাঙামাটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ শাখার সিনিয়র সদস্য পদে মনোনীত হয়। ২০০৯-২০১০ শিক্ষাবর্ষে বিবিএ অনার্স হিসাব বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়। ২০১০ সালে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ রাঙামাটি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক পদে নির্বাচিত হয়।’ তাই সুজনকে জামায়াত-শিবিরের এজেন্ট হিসেবে যে অভিযোগ করা হয়, তা মূলত ‘ভূয়া অভিযোগ’ বলে দাবি করা হয়। এছাড়া সিভি জমাদানের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সাবেক জেলা ছাত্রলীগ একটি দপ্তর গঠন করে। কিন্তু কিছু অপপ্রচারকারী ও ষড়যন্ত্রকারীদের চক্রান্তের ভয়ে আব্দুল জব্বার সুজন নিজের জীবন বৃত্তান্ত বাংলাদেশ ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কার্যকরী সংসদের দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের দপ্তরে জমা দিয়ে আসেন। যা জেলা ছাত্রলীগের নেতৃবৃন্দরা জানতেন না। বাংলাদেশ ছাত্রলীগ রাঙামাটি জেলা শাখার সাবেক সভাপতি ছোট ভাইও রাঙামাটি জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি প্রার্থী ছিল। তা ছাড়া বিগত পাঁচ বছর সাবেক জেলা ছাত্রলীগের কমিটি সকল নেতৃবৃন্দদের মধ্যে সন্তোষজনক সমন্বয় ছিলো না। জেলা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সক্রিয়তা ঝিমিয়ে ছিল।’ তাই জীবনবৃত্তান্ত নিয়ে ষড়যন্ত্র না করার জন্য তিনি সরাসরি কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের কাছে জীবনবৃত্তান্ত জমা দিয়েছেন বলে জানানো হয়।
তবে যে প্রক্রিয়ায় এবার নতুন কমিটি ঘোষণা করা হলো, তা সবাইকে আশ্চর্য করেছে। জেলা ছাত্রলীগের সম্মেলন অথচ কোনো মতামতই প্রাধান্য পায়নি সদ্য বিদায়ী ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দদের। এক কথায় ছাত্রলীগের কোনো কিছুই করার মতো শক্তি ছিলো না। কেন্দ্র থেকে ছাত্রত্ব ও বয়স নিয়ে কোনো ‘কম্প্রোমাইজ’ হবে না বললেও কমিটি গঠনে ঠিকই ‘কম্প্রোমাইজ’ হয়েছে। কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি তার বন্ধুর পড়ালেখার ইতিবৃত্তে ২০০৯-২০১০ শিক্ষাবর্ষে বিবিএ অনার্স হিসাব বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হওয়ার খবর দিলেও বর্তমানে তার পড়ালেখা কি পর্যায়ে রয়েছে, তা জানান নি। এছাড়া অন্য সকল প্রার্থীরা সিভি জেলা ছাত্রলীগের দপ্তরকে জমা দিতে পারলেও কেন একজন সভাপতি প্রার্থী জেলা ছাত্রলীগের দপ্তরে সিভি জমা দিতে পারেনি, তা বোধগম্য নয়।
যাই হোক নতুন ছাত্রলীগ কমিটিকে মেনে নিক আর নাই নিক এই কমিটিই আগামী কয়েক বছর জেলা ছাত্রলীগের নেতৃত্ব দিবে। ইতোমধ্যে বৈধতার প্রশ্নে বেশ কিছু উপজেলার কমিটি নতুন কমিটিকে শুভেচ্ছা জানিয়েছে। কিছুদিনের মধ্যে অন্যান্য উপজেলার নেতৃবৃন্দও নতুন কমিটিকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বৈধতা দিবে।
তবে এই একটি সম্মেলন ঘিরে ছাত্রলীগের কমিটি গঠন নিয়ে যে ঐতিহ্য ভাঙ্গলো, তা হয়তো ভবিষ্যতে দলের জন্য ক্ষতির কারণ হিসেবে দাঁড়াবে। কারণ ভবিষ্যতে কেউ একজন জেলার সভাপতি কিংবা সম্পাদক হতে চাইলে তৃণমূলে কাজ না করেও ব্যক্তি পূজায় হয়তো বা মূল নেতৃত্বে চলে আসতে পারে। উচ্চ শিক্ষা না থাকলেও যে কেউ যে এখন মূল নেতৃত্বে আসতে পারে সবশেষ সম্মেলন তার বড় প্রমাণ। তাই দলে যারা উচ্চ শিক্ষিত, তারা এখন নিরবে দলের কর্মকা- থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেবে। একটি প্রগতিশীল ছাত্রসংগঠনের নেতৃত্ব যদি প্রতিক্রিয়াশীল কারোর মাধ্যমে কিংবা পরামর্শ নিয়ে চলে তাহলে সেই প্রগতিশীল দলের ভবিষ্যৎ খুবই অন্ধকার। ছাত্রলীগের অতীতের যে ইতিহাস। ভাষা আন্দোলন, স্বাধীনতা আন্দোলন. স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন, সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী আন্দোলন, শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে আন্দোলনে ছাত্রলীগের অতীত ইতিহাস খুবই সমৃদ্ধ। এই সমৃদ্ধ ইতিহাসকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে অবশ্যই প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীর ষড়যন্ত্র প্রতিহত করতে হবে।
এবার ছাত্রলীগের সম্মেলন ছাত্রলীগের নেতৃবৃন্দের চাইতেও যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবকলীগের তৎপরতা সবচে বেশি চোখে পড়ার মতো ছিলো। কাউন্সিলরদের ভোটের অধিকার কেড়ে নিয়ে নিজেদের প্রার্থীকে কমিটিতে আনতে তারা মরিয়া ছিলো। যেখানে পাশের জেলা খাগড়াছড়িতে ২৬ বছর পর হলেও ভোটের মাধ্যমে নেতা নির্বাচন করা হয়েছে, সেখানে কেন রাঙামাটিতে ভোটের আয়োজন করা হলো না তা অবশ্যই ভাববার বিষয়। ভোটবিহীন শেষ হলো রাঙামাটি জেলা ছাত্রলীগের আরেকটি সম্মেলন।
যাই হোক, ভোটে হোক আর কারো পর্দার আড়ালে তৎপরতায় হোক, যে কমিটি বর্তমানে ছাত্রলীগের নেতৃত্বে এসেছে, তাদের ওপরই এই এলাকার ভবিষ্যতে অনেক সফলতা-ব্যর্থতা নির্ভর করছে। তারা ছাত্রলীগের অতীতের ইতিহাস উপলব্ধি করে ছাত্রলীগকে আরো সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। এই এলাকার শিক্ষার্থীদের প্রগতিশীল রাজনীতি চর্চায় সংগঠনের নেতৃবৃন্দ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এটাই আশা করছি। অতীতে রাঙামাটি মেডিকেল কলেজ নিয়ে সাবেক কমিটি কম-বেশি মাঠে থেকে আন্দোলন করেছে, আশা করছি বর্তমান কমিটিও সামনে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস রাঙামাটিতে দ্রুত চালুর বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। আর ছাত্রলীগে গুপ্তভাবে ছাত্রশিবিরের যে কর্মকা- তা প্রতিহতেও সজাগ থাকবে বলে আশাপ্রকাশ করছি। সকল প্রকার সাম্প্রদায়িকতার মূলে আঘাত করে প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠন হিসেবে এই নতুন কমিটি পার্বত্যাঞ্চলে তার অর্পিত দায়িত্ব পালন করে যাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করছি।

লেখকঃ সংবাদকর্মী।

Micro Web Technology

আরো দেখুন

কারাতে ফেডারেশনের ব্ল্যাক বেল্ট প্রাপ্তদের সংবর্ধনা

বাংলাদেশ কারাতে ফেডারেশন হতে ২০২১ সালে ব্ল্যাক বেল্ট বিজয়ী রাঙামাটির কারাতে খেলোয়াড়দের সংবধর্না দিয়েছে রাঙামাটি …

Leave a Reply