নীড় পাতা » খাগড়াছড়ি » মৌলিক সুবিধাবঞ্চিত রামগড়ের গারোরা

মৌলিক সুবিধাবঞ্চিত রামগড়ের গারোরা

পাহাড়ে গারোদের কষ্টের জীবন। খাগড়াছড়ির রামগড়ে দীর্ঘ বছর ধরে বসবাস করলেও নেই তাদের মৌলিক কোন সুবিধা। পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি পরবর্তী পাহাড়ে এখানকার পাহাড়ি নৃ-গোষ্ঠীদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ঘটলেও গারোরা বঞ্চিতই রয়ে গেল। ভিটেমাটি ছাড়াও এখানকার গারোদের জন্য নেই সরকারি কোন ধরণের সুযোগ সুবিধা। অভাব অনটনের পাশাপাশি অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে জীবনযাপন তাদের। নেই তাদের মাতৃভাষায় পাঠদানের পাঠ্যপুস্তকও। পরিবারের প্রধানরা দিনমজুরি করে কোন রকম সংসারের হাল টানলেও করোনায় থাবা পড়েছে সেখানেও। দুশ্চিন্তার ভাঁজ গারোদের প্রতিটি ঘরে। এর মাঝেও ছেলে-মেয়েরা পড়া লেখা করলেও চাকুরি না জুটায় ঘরবন্দি থাকছে তাদের শিক্ষার স্বীকৃতি।

পাহাড়ি জেলা খাগড়াছড়িতে চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা ছাড়াও রয়েছে গারো সম্প্রদায়ের বসবাস। ১৯৭৯ সাল থেকে জেলার রামগড়ের দারোগা পাড়ায় বসবাস করে আসছে গারো জনগোষ্ঠীর মানুষ। সমতল থেকে এসে এখানেই বসতি করেন তারা। পাহাড়ের এই সময়ে সবচেয়ে কম পরিবার ও জনসংখ্যার জনগোষ্ঠী রামগড়ের গারোরা। সীমান্তবর্তী রামগড়ে পরিবার পরিজন নিয়ে থাকছেন দীর্ঘ ৪ দশক ধরে। অনেকেই এখন বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছে। আবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম বেড়ে উঠছে এখানেই। পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি পরবর্তী পাহাড়ের ক্ষুদ্র নৃ-তাত্বিকদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জীবনমান উন্নয়নসহ পাহাড়ের উন্নয়নে নানামুখী কর্মকা- বাস্তবায়ন করছে সরকার। এর সুফলও ভোগ করছে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীসহ অন্যান্য নৃ-গোষ্ঠীর মানুষ। এছাড়া বর্তমান সরকার পাহাড়ের এ অধিবাসীদের এগিয়ে নিতে প্রত্যন্ত ও দুর্গম এলাকাতে অবকাঠামোগত উন্নয়ন ত্বরান্বিত করে যাচ্ছে। তাতে বদলেছে দৃশ্যপট, এলাকার চিত্র ও সামাজিক অবস্থান। কিন্তু বদলায়নি চার দশক ধরে বসবাস করা ২৩টি গারো পরিবারের শতাধিক মানুষের ভাগ্য।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বৃষ্টির পানিতে মাটি ও টিনের ঘরগুলো স্যাঁতস্যাতে হয়ে আছে। কাঁদামাখা উঠোনে ছোট্ট শিশুরা খেলছে। কাজ না থাকায় পরিবারের প্রধানরা এখন অনেকটা ঘরেই সময় কাটাচ্ছে। সবার চোখেমুখে অভাব অনটনের পাশাপাশি নিত্যদিনের নানামুখী সংকটের দুশ্চিন্তা। এরমধ্যে মৌলিক অধিকারের অন্যতম মাথা গোজার ঠাঁই ভিটেমাটি হারানোর শঙ্কা তাদের। যেখানে দিনমজুর করেই চলে তাদের দৈনন্দিন সংসার সেখানে টাকার অভাবে এখনও ভূমির অধিকারটুকু নিশ্চিত করতে পারেনি তারা। শুধু তাই নয়, বর্তমান সরকারের মেয়াদে পাহাড়ের স্ব-স্ব মাতৃভাষা পাঠদানের বই পুস্তক পেয়েছে চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর শিশুরা। কিন্তু গারোদের শিশুরা এখান থেকেও বঞ্চিত। তাদের নেই খেলাধুলার জায়গা। স্যাতঁস্যাতে অপরিচ্ছন্ন উঠোনে খেলাধুলা করে গারো সমাজের শিশুরা। এছড়াও পরিবারের অভাব অনটনের মাঝেও কয়েক ছেলে মেয়ে পড়ালেখা করলেও তাদের ভাগ্য জুটেনা সরকারি চাকরি। নেই কোনধরণের সুযোগও।

কথা হয় বয়স্ক বৃদ্ধা রিজিনা মারাখ ও রেখোনা চামগো’র সঙ্গে। অনেকটা আক্ষেপ নিয়ে তারা বলেন, করোনায় এতো এতো মানুষ সহায়তা পেলো আমাদের ভাগ্যে এক কেজি চালও জুটেনি। আশপাশের অনেকেই সরকারি সুযোগ সুবিধা পান। কিন্তু কেউই আমাদের খোঁজ নেয়না। দিনমজুরি করে চলে তাদের সংসার। করোনা পরিস্থিতিতে এখন আর কাজে যেতে পারেনা। আবার অনেকেই বয়সের কারনে কাজকর্ম করতে পারেননা। মাঝে মধ্যে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কাছে গেলে আজ নয়, কাল যাওয়ার কথা বলে। তারপরও থেমে নেই জীবনযুদ্ধ। পরিবার চালাতে খুব হিমশিম খেতে হচ্ছে। তাই সরকারিভাবে কোন ধরণের সুযোগ সুবিধা পেলে আপতত অভাব অনটনটাই হয়তো দূর হতো তাদের।

দিনে এনে দিনে খাওয়ার সংসারে কেউ কেউ তাদের ছেলে মেয়েদের পড়া লেখা করাচ্ছেন। উদ্দেশ্য সবার মতোই। বড় হয়ে সংসারের হাল ধরতে হবে। কিন্তু এখানেও কোন ধরণের সুযোগ সুবিধা না পাওয়ায় উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করা ছেলে নিয়ে দুশ্চিন্তা ভার করেছে সীমা চাঙমার। তিনি বলেন, তার এক ছেলে এইচএসসি পাশ করে ঘরে বসে আছে। আর অন্য এক ছেলে ডিগ্রি দ্বিতীয় বর্ষে। পরীক্ষা দিতে পারছেনা করোনা পরিস্থিতিতে। পড়ালেখার পাশাপাশি চাকরি করার বিষয়ে জানতে চাইলে সীমা চাঙমা বলেন, টাকা ছাড়া চাকরি হয়না। তাই যেখানে খেতেই কষ্ট হয়, সেখানে চাকরির জন্য টাকা কোথায় পাবো? বলেন, সুযোগ সুবিধা সর্ম্পকে না জানায় কোথাও যাওয়াও হয়না তাদের।

স্কুল পড়–য়া ড্যানিয়েল চামুগো, পন্না চাকমা ও কবিতা চামগো জানান, তাদের মাতৃভাষার বই সম্পর্কে তারা জানেন না। কিন্তু তাদের অন্য সহপাঠীরা স্কুলে স্ব-স্ব মাতৃভাষায় বই নিয়ে স্কুলে যাচ্ছে পড়ছে। নিজস্ব ভাষাও শিখতে না পারায় একধরণের কষ্টের কথা জানান তারা। তারা বলেন, তাদের খেলাধুলার জন্য পর্যাপ্ত জায়গা নেই। শুষ্ক মৌসুমে বাড়ির উঠোন পরিস্কার থাকলেও বর্ষাকালে তা থাকেনা। তাদের ছোট ছোট ভাইবোনেরা স্যাঁতস্যাতে উঠোনেই খেলা করে। পাহাড়ের অন্যান্য জনগোষ্ঠীর মতো তাদের যেন মাতৃভাষায় পাঠদানের বই দেয়া হয় এজন্য সরকারে কাছে দাবি জানিয়েছেন স্কুল পড়–য়া ড্যানিয়েল চামুগো, পন্না চাকমা ও কবিতা চামগো।

গারোদের ধর্মীয় নেতা ফিলিপস হালদার জানান, বসবাসরত গারোরা খ্রিস্টান ধর্মাবলাম্বী হওয়ায় তাদের জন্য স্থানীয় চার্চের সহযোগিতায় ঘর তৈরি করে দেয়া হয়েছে। তবে কেনা জায়গা রেজিষ্ট্রি করতে না পারায় তা হারানোর শঙ্কা করছেন তিনি। বাসস্থানের এ জায়গাটুকু হারিয়ে ফেললে কোথাই ঠিকানা বা মাথা গোঁজার ঠাঁই হবে তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন তিনি। বর্তমান সরকারের মেয়াদে পাহাড়ে উন্নয়নের নানা উদাহারণ দিয়ে গারোদের এমন অবস্থায় সুযোগ সুবিধা নিশ্চিতের সুদৃষ্টি কামনা করেছেন তিনি।

এদিকে অন্যান্য ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের মত করেই গারোদের আর্থ-সামাজিক ও শিক্ষার উন্নয়নে কাজ করার কথা বলছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও পার্বত্য জেলা পরিষদ। বৃহৎ পরিসরে পরিকল্পনা করে নাগরিক সুবিধা নিশ্চিতে কাজ করবে তারা। রামগড় উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান বিশ্ব প্রদীপ কার্বারি বলেন, আর্থ-সামাজিক ও কর্মসংস্থানের উন্নয়নের জন্য কাজ করছেন বর্তমান সরকার। তারই ধারাবাহিকতায় ২৩টি গারো পরিবারের ভাগ্যন্নোয়নে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও সহায়তা করা হচ্ছে তাদের। প্রাপ্তপ্রশিক্ষণকে কাজে লাগিয়ে গারোরা তাদের ভাগ্যোন্নয়ন করতে বলছেন তিনি। তবে দীর্ঘমেয়াদি কোন ধরণের পরিকল্পনা বা তাদের নানাবিধ সমস্যা সমাধানে কোন ধরণের উদ্যোগ গ্রহণের কথা জানাননি উপজেলা চেয়ারম্যান।

খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্য ও জেলার প্রবীণ ব্যক্তি মংক্যাচিং চৌধুরী বলেন, পার্বত্য জেলা পরিষদ পাহাড়ের সকল সম্প্রদায়ের আর্থ-সামাজিক নিশ্চিতের পাশাপাশি নাগরিকদের উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে। এখানকার সাওতাল ও গারোদেরও এ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। আগামীতে তাদের উন্নয়নের পাশাপাশি সামাজিক সুবিধা নিশ্চিতে কাজ করার কথা বলেছেন তিনি। তবে তা কবে নাগাদ বাস্তবায়ন হবে তা স্পষ্ট করে বলতে পারেননি তিনি। এছাড়া মাতৃভাষার পাঠদানের বই’য়ের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সরকারিভাবে থাকলে পরিষদের উদ্যোগে খোঁজখবর নেয়া হবে। এবং পাঠদান নিশ্চিতে মাতৃভাষার বই দেয়া হবে।

Micro Web Technology

আরো দেখুন

বিদ্যুৎ সুবিধাবঞ্চিত মহালছড়ি সদরের ২ গ্রামের মানুষ

আধুনিক প্রযুক্তির ক্রমবিকাশে পাল্টে যাচ্ছে দুনিয়া। প্রতিনিয়ত উদ্ভাবন হচ্ছে নতুন নতুন আবিষ্কার। মানুষের জনজীবনে পড়ছে …

Leave a Reply