নীড় পাতা » ফিচার » খোলা জানালা » মূল্যবান (!) সেগুনের কাছে মূল্যহীন প্রকৃতি ও পরিবেশ !

মূল্যবান (!) সেগুনের কাছে মূল্যহীন প্রকৃতি ও পরিবেশ !

segun-picসেগুন গাছ পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের কাছে অতি মূল্যবান। এই গাছ বিক্রি করে পাহাড়ি জোত মালিকরা কেউ কেউ লাখপতি হয়েছেন আবার এই গাছের ব্যবসা করে পাহাড়ি ও বাঙালি উভয় সম্প্রদায়ের অনেকে কোটিপতি হয়েছেন। এই গাছের বিক্রি ও ব্যবসায়ে মোটা অংকের টাকা আয় হওয়ায় অধিকাংশ পাহাড়ি এখন সেগুন চাষের দিকে ঝুঁকেছে আগের যেকোন সময় থেকেই এখন বেশি মাত্রায়। প্রায় প্রতিটি পাহাড়ির বাড়ির পাশেই এখন রয়েছে সেগুন গাছ। যাদের বেশি পরিমাণ জায়গা রয়েছে তারাতো একরের পর একর জমিতেই লাগিয়েছে সেই মহামুল্যবান (!) সেগুন। সেগুনের সুবাধে ৭-৮ বছরের মধ্যে কোটিপতি হওয়া এখন কোনো ব্যপারই নয় এই পাহাড়ে। আর এর পেছনে যাদুর মত কাজ করে সেগুন গাছ। বুদ্ধিজীবি, রাজনীতিক, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, ঠিকাদার, প্রকৌশলী, ক্রীড়াবিদ, জনপ্রতিনিধি কার নেই সেগুন বাগান পার্বত্য চট্টগ্রামে।
সম্প্রতি রাঙামাটি পার্বত্য জেলার জুরাছড়ি, লংগদু, বরকল, রাঙামাটি সদরের বন্দুকভাঙা এলাকায় ঘুরতে গিয়ে চোখে পড়েছে বিপন্ন প্রকৃতির করুণচিত্র। একরের পর একর জুড়ে পাহাড়ি জমিতে লাগানো হয়েছে সেগুন গাছ। ফাল্গুন চৈত্রের দিকে পাতা ঝরে গিয়েছে সেগুন গাছের। চৈত্রের প্রচন্ড খরায় যখন প্রকৃতি ও পরিবেশ বিপর্যস্ত ঠিক সেসময়ই মরার ওপর খাড়ার ঘা। ঝরা সেগুন পাতায় আগুন লেগে দাউ দাউ করে পুড়ে গেছে সেগুন বাগানের আশেপাশের বনজঙ্গল। বন্দুকভাঙা ,বরকল, লংগদুতে একরের পর একর বনজঙ্গল পুড়ে গেছে জুমের আগুন ও সেগুনের আগুনে। শুকিয়ে গেছে ছড়াছড়ির পানি। মরে গেছে হাজারে হাজারে প্রাণীকুল । হুমকির মুখে পড়েছে জীববৈচিত্র্য। বর্তমানে এসব পাতাবিহীন সেগুনগাছ অত্যন্ত শ্রীহীন হয়ে দাড়িয়ে আছে উচু-নীচু পাহাড় গুলোতে। segun-01
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে জুম চাষের পরই বসিয়ে দেয়া হয় সেগুন চারা। সেগুনগাছ প্রকৃতি ও পরিবেশের বড় ক্ষতিকর তা জানা সত্বেও লাগানো হচ্ছে। এলাকায় যারা সচেতন ও মুরুব্বী হিসেবে পরিচিত তারাই এখন বেশি বেশি সেগুন গাছ লাগায়। রাঙামাটির বিশিষ্ট ব্যক্তিদের অনেকেই বিশাল বিশাল সেগুন বাগানের মালিক। প্রকৃতি কিংবা পরিবেশের কি হবে না হবে এসব বিষয় ভাবার সময় তাদের নেই কিংবা নয়। পরিবেশবাদী অনেক সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান পার্বত্য চট্টগ্রামে কাজ করলেও কর্মশালা, সেমিনার আলোচনা সভার মধ্যেই কার্যক্রম সীমাবদ্ধ বলে প্রতীয়মান হয়। এই সেগুনের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টিতে এসব সংগঠনের এখন থেকেই মাঠে নামা উচিত। আর বসে থাকার সময় নেই। এভাবে চলতে থাকলে আগামী এক দশকের মধ্যেই পাহাড়ের সব পানির উৎস ছড়াছড়ি শুকিয়ে যাবে এবং জীব বৈচিত্র্য ধ্বংস হয়ে যাবে। কোটিপতি হওয়ার স্বপ্নে বিভোর পাহাড়ি মানুষগুলো বছরের পর বছর যদি পরবর্তী প্রজন্মের আর্থিক স্বচ্ছলতার কথা ভেবে কেবল সেগুন গাছ লাগাতেই থাকে তাহলে কয়েক বছওে মহা বির্পযয় নেমে আসতে বাধ্য। প্রশ্ন হচ্ছে প্রজন্মের জন্য কি আমরা শুধু টাকা পয়সা ধন সম্পদ বাড়ি-গাড়ি কেবল রেখে যাবো। তাদের কি আর অন্য কোনো কিছুই লাগবে না। নিশ্চয়ই লাগবে। একটি সুন্দর জীবনের জন্য সুন্দর ও মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশ চাই। এই পরিবেশ পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তের মানুষের জন্যই অতীব গুরুত্বপুর্ণ।
সেগুনের ক্ষতিকর প্রভাব বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে একদিন এক ভদ্রলোক তার একটা চমৎকার অভিজ্ঞতার কথা বলেছিলেন। তিনি জানালেন সেগুন গাছ লাগানো যায় তবে সেগুনের সাথে জমিতে বাঁশ লাগানো দরকার। বাঁশ লাগালে ভারসাম্য কিছুটা রক্ষা করা সম্ভব হয়। ভদ্রলোকের অভিজ্ঞতা যদি সত্যি সত্যিই কার্যকরী হলে আমরা সেটা চেষ্টা করে দেখতে পারি। প্রতিটি সেগুন গাছের পাশেই একটি বাঁশের চারা আমরা লাগাতে পারি। অথবা এর চেয়েও উৎকৃষ্ট উপায় আমরা বের করতে পারি কি না সকলকে ভাবতে হবে। যেসব সেগুন গাছ লাগানো হয়েছে সেগুলোতো আর কেউ কেটে ফেলতে চাইবে না।
পাহাড়ের গ্রামে গ্রামে এখন খাবার পানির তীব্র সংকট। সর্বত্র পানির জন্য হাহাকার। কোথায় গেলে এক কলস খাবার পানি পাবো এই চিন্তা নিয়ে ছড়া থেকে ছড়ায় দৌড়াচ্ছে পাহাড়ি গৃহবধুরা। কখনও পানি মেলে, কখনো মেলে না। শুধু খাবার পানিই নয় গৃহাস্থলী কাজে ব্যবহার্য্য পানির সংকটও চরমে। গ্রামের আশেপাশের ছড়াছড়ি গুলো শুকিয়ে গেছে সেগুনের দহনে। আগেকার দিনের সেই .ছায়া-সুনিবিড় শান্তির নীড়, পাহাড়ি প্রকৃতি আর নেই। নেই সেই সুনিবিড় প্রকৃতির পাশে বসবাসকারী সহজ সরল মানব সন্তানেরাও। তারা এখন আধুনিক পুজিবাদের ছোঁয়ায় মায়াচ্ছন্ন। যেভাবেই টাকা আসুক আমি পেতে চাই! এমন দৃষ্টিভঙ্গি এখন দৃঢ়তর হচ্ছে পাহাড়েও। তাই দ্রুত প্রসারিত হচ্ছে আমাদের অনাগত প্রজন্মের নিরাপদ আবাসভুমির জন্য ক্ষতিকর ও পরিবেশের জন্য ভয়াবহ হুমকি বর্তমান সময়ের মহামুল্যবান! সেগুন বাগান। হায় প্রজন্ম, হায় প্রকৃতি !
হায়রে সর্বগ্রাসী পুঁজি, বিবেক তো বহু আগেই ছিনতাই করেছো। এখন দয়া করে প্রকৃতি ও পরিবেশকে রেহাই দাও। আমাদের অনাগত প্রজন্ম বিবেকবান কিংবা বিবেকহীন যাই হোক না কেন যেনো সবুজ শ্যামল মায়াময় প্রকৃতির নির্মল ছোঁয়া তারা অনুভব করতে পারে।

Micro Web Technology

আরো দেখুন

বেইলি সেতু ভেঙে রাঙামাটি-বান্দরবান সড়ক যোগাযোগ বন্ধ

রাঙামাটির রাজস্থলী উপজেলায় রাঙামাটি-বান্দরবান প্রধান সড়কের সিনামা হল এলাকার বেইলি সেতু ভেঙে পাথর বোঝাই ট্রাক …

Leave a Reply