মাতৃভাষায় শিক্ষা বিষয়ে জাতীয় সেমিনার

IMG_7282-(FILEminimizer)‘মালদ্বীপের শিশুরা তাদের মাতৃভাষা জানতো না। বর্তমানে তাদের রাষ্ট্রীয়ভাবে নিজস্ব ভাষা শিক্ষার ব্যবস্থা করেন। ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, সকলের নিজের মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা অর্জনের অধিকার রয়েছে। আজকে চাকমা’রা সবচেয়ে উন্নত এবং শিক্ষিত। কিন্তু নিজেরাই তাদের মাতৃভাষায় পড়তে লিখতে জানেনা। তাহলে এই উদ্যোগ কতদূর এগুবে সেটা নিয়ে আমার সন্দেহ হচ্ছে। ‘এমএলই ফোরাম’ এর সদস্যরা সরকারকে যদি আরেকটু চাপে রাখেন তাহলে আমাদের কাজ দ্রুত হবে। শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, পরবর্তী ক্লাসের জন্য পুস্তক রচনার কাজ শুরু করা ইত্যাদি বিষয় এখন থেকেই শুরু করতে হবে। সরকারের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অনেক উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান নিজেরা নিজেরা কাজ করে, কিন্তু অর্থ বরাদ্দ শেষ হলে তারা সরকারকে সেটা নিতে বলে। কিন্তু এটা এভাবে সম্ভব হয়না। সরকারকে জানিয়ে করলে সরকার সেটি বিবেচনায় রাখে।’
‘আদিবাসী শিশুদের মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা চালুকরণ : বর্তমান প্রেক্ষিত ও করণীয়’- শীর্ষক জাতীয় সেমিনারে এসব কথা বলেছেন ড. জ্ঞানেন্দ্র নাথ বিশ্বাস।
বুধবার সকালে রাজধানীর আজিমুর রহমান মিলনায়তনে বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম ও কাপেং ফাউন্ডেশন এর যৌথ উদ্যোগে এবং মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন-এর সহযোগিতায় এই সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়।

বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ফজলে হোসেন বাদশা, এমপি ও সভাপতি, আদিবাসী বিষয়ক সংসদীয় ককাস। সম্মানিত অতিথিবৃন্দ হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ড. জ্ঞানেন্দ্র নাথ বিশ্বাস, অতিরিক্ত সচিব, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ডা. শামীম ইমাম, পরিচালক, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন।
সম্মানিত আলোচকবৃন্দ হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অধ্যাপক ড. নারায়ণ চন্দ্র পাল, চেয়ারম্যন, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড; প্রিয়জ্যোতি খীসা, যুগ্ম সচিব, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়; অধ্যাপক ড. সৌরভ সিকদার, ভাষাতত্ত্ব বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; তপন কুমার দাশ, উপ-পরিচালক, গণ স্বাক্ষরতা অভিযান; ওয়াসিউর রহমান তন্ময়, প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন।

সেমিনারের মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা, নির্বাহী পরিচালক, জাবারাং কল্যাণ সমিতি ও শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন পল্লব চাকমা, নির্বাহী পরিচালক, কাপেং ফাউন্ডেশন।

ফজলে হোসেন বাদশা এমপি বলেন, আদিবাসীদের মাতৃভাষায় শিক্ষা আন্দোলনের সাথে আমি প্রায় ২৪ বছর ধরে জড়িয়ে আছি। বৈচিত্র্যপূর্ণ সমাজ যে প্রকৃত সমাজ সেটা নিয়ে এখনো কিছু মানুষ খুব মেনে নিতে পারেনা। সাঁওতালদের মাতৃভাষায় শিক্ষা কার্যক্রম স্থগিত হয়ে আছে ভেবে মনটা খুব খারাপ লাগে। মাতৃভাষায় শিক্ষা আদিবাসী ছেলেমেয়েদের উচ্চ শিক্ষা অর্জনে সহায়তা করে। আমরা আদিবাসীদের ভাষাকে গলা টিপে ধরার যে চেষ্টা করছি তাতে করে পাকিস্তানি ধ্যান ধারনার মিল পাওয়া যাচ্ছে। তাহলে কি আমরা পাকিস্তানি হয়ে যাচ্ছি। রোমান এবং বাংলা বর্ণমালা’কে পাশাপাশি রেখে সাঁওতালদের জন্য পাঠ্যপুস্তক রচনা করতে হবে, কেননা সাঁওতালদের বাদ দিয়ে আদিবাসীদের মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম খুব বেশী প্রশংসার দাবি রাখবে না।

অধ্যাপক ড. নারায়ন চন্দ্র পাল বলেন, এমএলই এবং এনসিটিবি যৌথভাবে কাজ করছে এবং সেটি প্রায় শেষ। ২০১৬ সালে আমরা অবশ্যই আদিবাসী শিশুদের হাতে নতুন বই তুলে দিতে পারবো। কিন্তু প্রাক-প্রাথমিক পর্যায় শেষ করার পরে শিশুরা প্রথম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হবে। সেটির পুস্তক রচনা করার ব্যাপারটিও এখন থেকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
ডা. শামীম ইমাম বলেন, মাতৃভাষায় শিক্ষা গ্রহণের ব্যাপারটি একটি আন্দোলন। আমরা এর একটি পর্যায়ে আছি, আমাদের সামনে আরো পথ বাকি আছে। সরকারী কিছু সীমাবদ্ধতা আছে তবে এর পাশাপাশি কিছু শর্তও অনেক সময় শিক্ষার ক্ষেত্রে বাধা হয়। আমরা ২০১২ সাল থেকে কাঠামোবদ্ধ কার্যক্রম শুরু করেছি। মাতৃভাষায় শিক্ষা কার্যক্রম শুধু সেমিনার, ওয়ার্কশপ নয়। সহযোগী সংস্থাগুলো পাশে আছে। প্রাথমিক স্তরের বই বিনামূল্যে বিতরণের একটি উৎসব হয়ে থাকে। এরপর দেখা যায় শিক্ষার্থীরা বাজার থেকে একটি গাইড বই কিনে আনতে বাধ্য হয়।
অধ্যাপক ড.সৌরভ সিকদার বলেন, জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ এর মধ্য দিয়ে যে আমাদের গন্তব্য তৈরী হয়েছিল সেদিকে আমরা অগ্রসর হচ্ছি। প্রাক-প্রাথমিক এর জন্য বই তৈরির কাজও প্রায় শেষ। কোন ভাষায় কত জন শিক্ষক প্রয়োজন সে জন্য শিক্ষদের চাহিদা নিরূপণ করতে হবে। শিক্ষক নিয়োগে সমস্যা হতে পারে। তবে সেটি শুরু করতে হবে। শিক্ষক প্রশিক্ষণ হয়নি। কোন কোন বিদ্যালয়ে মাতৃভাষায় মিক্ষা কার্যক্রম হবে সেটিও নির্ধারিত হয়নি। দ্বিতীয় পর্যায়ে সাঁওতালি ভাষা যেন বাদ না যায় তার জন্য এখন থেকে কাজ করতে হবে। একইসাথে দুই বর্ণমালায় শিক্ষা কার্যক্রম চালু করাটা বিজ্ঞান ভিত্তিক হবেনা।
তপন কুমার দাশ বলেন, আদিবাসী শিশুদের মাতৃভাষায় শিক্ষা চালুর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কোন সন্দেহ নেই। তবে উচ্চ পর্যায়ের বেশ কিছু নীতিনির্ধারকরা এখনো মনে করে এটির প্রয়োজন নেই। প্রি-প্রাইমারী চালু করতে এখনো যে অবস্থা তাতে প্রথম, দি¦তীয়, তৃতীয় পর্যায়ের স্কুল শুরু করতে হলে অনেক সময়ের প্রয়োজন। পিডিপি-৩ এসব ক্ষেত্রে কোন কাজ করতে না পারায় সে টাকা ফেরত দিতে হয়েছে। তবে শিক্ষা ক্ষেত্রে বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। আদিবাসীদের মাতৃভাষায় শিক্ষা কার্যক্রমকে এগিয়ে নিতে আমরা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও সরকারকে সাহায্য করবে। এবং মন্ত্রণালয়ের যে কমিটি সেটিকে গতিশীল করা প্রয়োজন।
প্রিয়জ্যোতি খীসা বলেন, সরকার খুবই আন্তরিক। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় পরিদর্শনের সময় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসীদের শিশুদের মাতৃভাষায় শিক্ষার নির্দেশ দিয়েছেন। পার্বত্য চট্টগ্রাম মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে আন্তরিকতার সাথে কাজ করছে।
ওয়াসিউর রহমান তন্ময় বলেন, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের সহায়তায় তিন পার্বত্য জেলায় ৩৩৭টি বিদ্যালয়ে প্রায় ২৪ হাজার ৪২৬ জন ছেলেমেয়ের শিক্ষা চলছে। এর মধ্যে ৬৬টি স্কুলে ৫,৫৯৫ শিক্ষার্থীর মাতৃভাষায় শিক্ষা কার্যক্রম চলছে। মাতৃভাষা শিক্ষা নাকি মাতৃভাষায় শিক্ষা নিয়ে এখনো আমাদের দ্বন্দ্ব আছে। আয়বর্ধনমূলক কাজের সাথে সম্পৃক্ত করতে পারলে পরবর্তীতে তারা নিজেরোই এনজিওদের অর্থায়নে পরিচালিত স্কুলগুলো পরবর্তীতে চালাতে পারবে। কারণ এনজিওরা নিশ্চয় সারাজীবন অর্থায়ন করবেনা।
মুক্ত আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন বাসদের রাজেকুজ্জামান রতন, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মঙ্গল কুমার চাকমা, হ্যাপি দেওয়ান (সেভ দ্যা চিলড্রেন), নিখিল চাকমা (মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন)। মঙ্গল কুমার চাকমা বলেন, বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেছেন ১১টি আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর ভাষার মাতৃভাষা কার্যক্রম শুরু হয়েছে। অথচ মথুরা ত্রিপুরার তথ্য মতে এখনো ৫টি ভাষার শিক্ষাও শুরু হয়নি।

Micro Web Technology

আরো দেখুন

কারাতে ফেডারেশনের ব্ল্যাক বেল্ট প্রাপ্তদের সংবর্ধনা

বাংলাদেশ কারাতে ফেডারেশন হতে ২০২১ সালে ব্ল্যাক বেল্ট বিজয়ী রাঙামাটির কারাতে খেলোয়াড়দের সংবধর্না দিয়েছে রাঙামাটি …

Leave a Reply