নীড় পাতা » ফিচার » খোলা জানালা » মাতৃভাষায় শিক্ষা কার্যক্রম আদৌ বাস্তবায়ন হবে কি?

মাতৃভাষায় শিক্ষা কার্যক্রম আদৌ বাস্তবায়ন হবে কি?

পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরের (১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর) পরবর্তী পরিস্থিতিতে শিক্ষিত পাহাড়িদের আশা দানা বেঁধেছিল যে, স্ব স্ব ভাষা ও বর্ণমালা জানা থাকলে তারা চাকরি পাবে অন্তত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে। পার্বত্য চুক্তির ‘খ’ খণ্ডের ৩৩নং অনুচ্ছেদের খ(২)নং উপ-অনুচ্ছেদে মাতৃভাষার মাধমে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণের বিষয়টি উল্লেখ থাকায় এমনতর প্রত্যাশা থাকা স্বাভাবিক। পরে এ বিষয়টি পার্বত্য জেলা পরিষদ আইনেও যুক্ত হয়। তখন বিশেষত চাকমা সম্প্রদায়ের শিক্ষিতদের মধ্যে চাকমা বর্ণমালা শেখার হিড়িক পড়ে।
রাঙ্গামাটিতে এ দৃশ্য আমি সচক্ষে অবলোকন করেছিলাম। হিরণ মোহন কম্পিউটার ও রিসার্চ সেন্টার নামের একটি প্রতিষ্ঠান চাকমা বর্ণমালা শেখানোর কাজে লিপ্ত থেকে উল্লেখ্য বিষয়ে যথেষ্ট টাকা আয় করেছিল। সে সময়ে চাকমা বর্ণমালা শেখা যুবক-যুবতীদের মধ্য থেকে পরবর্তী সময়ে কতজন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চাকরি পেয়েছিলেন সে তথ্য আমাদের জানা নেই। তবে এটি বলতে পারি যে, আমাদের ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঁচ শতাধিক শিক্ষককে চাকমা ভাষা ও বর্ণমালার উপর যে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছিল তাদের মধ্যে পূর্ব থেকে চাকমা বর্ণমালা জানে এমন একজন শিক্ষককেও আমরা পাই নি। এ বাস্তবতা অন্যভাষীদের ক্ষেত্রেও সমভাবে প্রযোজ্য হতে পারে। এ যদি বাস্তবতা হয়ে থাকে তাহলে চাকমা বর্ণমালা শিখে যারা চাকরি পাওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন তাদের মধ্যে নিজস্ব বর্ণমালা শেখার কোনো গুরুত্ব থাকে নি।
এভাবেই স্বজাতির মধ্যে চাকমা বর্ণমালাসহ অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর বর্ণমালাসমূহ যুগে যুগে অবহেলিত থেকে যাচ্ছে। কারণ নিজস্ব বর্ণমালার চর্চা ও প্রয়োগের কোনো ক্ষেত্র অদ্যাবধি নেই।
অন্যদিকে পাহাড়ি ভাষাগুলো কথ্যরূপের মধ্যেই বেঁচে আছে। কিন্তু কথ্যরূপে কোনো ভাষাকে দীর্ঘকাল জীবিত রাখা ও তার মৌলিকত্ব রক্ষা করা সম্ভব নয়। এজন্য পাঠ্যপুস্তক স্ব ভাষায় রচিত হলে শিক্ষার্থীদের কাছে সহজবোধ্য হবে। পাশাপাশি ভাষা সুরক্ষা ও সাবলীল হবে।
১৯৯৯ সালের শেষের দিকে একুশে ফেব্রুয়ারি যখন শহীদ দিবসের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মর্যাদা লাভ করে তখন মাতৃভাষায় শিক্ষা গ্রহণের বিষয়টি আরো জোরালো হয়। ২০১০ সালে প্রণীত জাতীয় শিক্ষা নীতিতেও পাহাড়ি শিশুদের মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কিন্তু মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া এখনো আমরা দেখতে পেলাম না। যে মাহাত্মকে ঘিরে একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছিল সে মাহাত্মের ভিত্তি আমাদের দেশেই গড়ে ওঠতে কালক্ষেপণ হবে-এটি বোধয় গ্রহণযোগ্য ও যুক্তিযুক্ত হতে পারে না। অথচ পৃথিবীতে ভাষার জন্য প্রাণউৎসর্গকারী দেশের নাগরিক হিসেবে আমাদের গর্বের শেষ নেই।
বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের বিগত শাসনামলের শেষ দিকে মাতৃভাষায় শিক্ষাদানের বিষয়টি গুরুত্ব দেয়া হয়েছিল। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে জাতীয় কমিটি গঠনসহ তদবিষয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছিল। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে-৫টি ভাষায় (চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, সাদ্রি ও গারো) প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণি থেকে ৩য় শ্রেণি পর্যন্ত মাতৃভাষায় শিক্ষাদান, ২০১৪ খ্রি: থেকে শিক্ষাকার্যক্রম শুরু করা, পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নের জন্য ভাষাভিত্তিক লেখক নির্বাচন, ভাষাগত ব্রিফিং ও শিক্ষক প্রশিক্ষণ সংক্রান্ত কমিটি গঠন ইত্যাদি।
প্রসঙ্গত যে, গত ২৫.৫.২০১৩ তারিখে রাঙ্গামাটির এক সভায় সাবেক প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী মো: মোতাহার হোসেন ২০১৪ সাল থেকে মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করার কথা ঘোষণা করেছিলেন।
গত বছরের জুলাই মাসে অনুষ্ঠিত এক সভায় পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন, সভা ও প্রশিক্ষণের জন্য ৬২ লক্ষ ২২ হাজার টাকার সম্ভাব্য একটি বাজেট প্রণয়ন পূর্বক বরাদ্দ চাওয়া হয়েছিল। অতিসমপ্রতি গণস্বাক্ষরতা অভিযান নামক বেসরকারি সংস্থার আয়োজনে এমএলই (মাল্টি লিঙ্গুয়াল এডুকেশন) ফোরামের ‘পহর’ নামক প্রচারপত্রের উপর এক আলোচনা সভায় যোগদান করার সুযোগ আমার হয়েছে। এ সভায় জানতে পারি যে, বরাদ্দের অভাবে নাকি চলতি শিক্ষাবর্ষ থেকে মাতৃভাষায় শিক্ষা কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় নি। কী তাজ্জব ব্যাপার ! সামান্য পরিমাণ বরাদ্দের কারণে একটি মহৎ কার্যক্রম বাস্তবায়িত হবে না এটি বোধহয় গ্রহণযোগ্য নয়। অর্থ বরাদ্দের বিষয়টি নেহাৎ ঠুনকো যুক্তি বলে মনে হয়। এ বিষয়ে যে ধরনের হেতু থাকুক না কেন আমরা কার্যক্রমের সাথে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে আন্তরিকতার অভাব ও অনীহা রয়েছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।
সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের ঘোষণা সত্বেও ২০১৪-তে এসে আলোচ্য কার্যক্রমটি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় অগ্রগতি তো হলোই না বরং আশ্বার্যান্বিত হতে হয় এই কারণে যে, পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নের জন্য ভাষাভিত্তিক লেখক নির্বাচন প্রক্রিয়াটি শেষ করা হলো শিক্ষাবর্ষ শুরুর প্রায় ৩মাস পরে।
আমরা আরো হতাশ হই, যখন শুনি চলতি ২০১৪ সালের গত আট মাসে এ বিষয়ে কোনো অগ্রগতি নেই। লেখক নির্বাচন ব্যতীত সকল কার্যক্রম স্তিমিত হয়ে পড়ে রয়েছে। এমনকি নির্বাচিত লেখকদের সাথে পরিচিতিপর্ব পর্যন্ত করা হয় নি।
এমন অবস্থায় এ কার্যক্রমটি আদৌ বাস্তবায়ন হবে কি না প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
প্রসঙ্গত যে, চাকমা ভাষার লেখক নির্বাচন প্রক্রিয়াটিও ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। লেখকদলে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন এমন কারো কারোর লেখনির দক্ষতা এবং খোদ চাকমা বর্ণমালা ভালভাবে না জানার প্রশ্নও উত্থাপিত হচ্ছে। জাতীয় পর্যায়ে সর্বোপরি পাঠ্যপুস্তক রচনার মত গুরুত্বপূর্ণ কাজে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া উচিত। নচেৎ ভবিষ্যতে পাঠ্যপুস্তকের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নের কাজ অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ অধিকন্তু দুরূহও বটে। শিক্ষা উপকরণ মানসম্পন্ন না হলে শিশুর প্রতিভা বিকাশে প্রভাব পড়ে। আমরা চাই মাতৃভাষায় অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরা মেধাবী হয়ে গড়ে ওঠুক। এজন্য তাদের প্রতিভা বিকাশে উৎকৃষ্ট পাঠ্য উপকরণ ও দক্ষ শিক্ষকের কোনো বিকল্প নেই। এতিট ভাবার অবকাশ নেই যে, উপকরণ তৈরি করে চাকমা শিক্ষার্থীদের জন্য চাকমা শিক্ষক, মারমা শিক্ষার্থীদের জন্য মারমা শিক্ষক এবং ত্রিপুরা শিক্ষার্থীদের জন্য ত্রিপুরা শিক্ষক সংযুক্ত করে দিলেই পাঠ কার্যক্রম যথারীতি চলবে।
মনে রাখতে হবে-চাকমা ও মারমাদের নিজস্ব বর্ণমালা থাকলেও এগুলোর ব্যবহার অধিকাংশের জানা নেই। ত্রিপুরারা তাদের ভাষার ধ্বনিগুলোকে পরীক্ষা করে রোমান হরফে তাদের ভাষার লিখন কাজ শুরু করেছেন। এ প্রক্রিয়া অত্যন্ত সামপ্রতিক।
এজন্য মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করতে হলে সর্বাগ্রে শিক্ষকদেরকে দীর্ঘমেয়াদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
কিন্তু আগামী ২০১৫ সাল থেকে মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করতে হলে যে সময় রয়েছে তার মধ্যে নতুন পাঠ্যউপকরণ তৈরি পূর্বক মুদ্রণ প্রক্রিয়া সম্পন্নকরণ, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, বিদ্যালয় নির্বাচন ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ কাজ সুসম্পন্ন করা কঠিন হবে। সবদিক বিবেচনায় প্রশ্ন জাগে-আগামী ২০১৫ শিক্ষাবর্ষ থেকে এ মহৎ কার্যক্রমটির বাস্তবায়ন করা আদৌ কি সম্ভব হবে ?
পরিশেষে বলা যায়, পাহাড়িদের মাতৃভাষা চর্চা যেমনি তার মৌলিক অধিকার তেমনি তাদের স্বভাষায় শিক্ষাগ্রহণও অন্যতম অধিকার। এ অধিকার তাদের জন্মগত নয় বরঞ্চ পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন প্রণয়ন হওয়ার পর থেকে এখন আইনি অধিকারও বটে।
কাজেই আইনি অধিকার থেকে তাদেরকে বঞ্চিত করা কোনোভাবে সমীচীন নয়। আমরা আলোচ্য কর্মসূচিটির বাস্তবায়নের দৃশ্যমান অগ্রগতি সহসা দেখতে পাবো এই প্রত্যাশা করছি।

লেখক : গবেষণা কর্মকর্তা, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট, রাঙ্গামাটি ও সদস্য, বাংলাদেশ চাকমা ল্যাঙ্গুয়েজ কাউন্সিল।

( দৈনিক সুপ্রভাত বাংলাদেশ পত্রিকায় ১২ সেপ্টেম্বর’২০১৪ তারিখে প্রকাশিত  এ লেখাটি সুপ্রভাত এর বিশেষ কৃতজ্ঞতাসহ  পাহাড়টোয়েন্টিফোর ডট কম এর পাঠকদের জন্য প্রকাশ করা হলো )

Micro Web Technology

আরো দেখুন

স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার আহ্বান কুজেন্দ্রের

কভিড-১৯ মহামারী উত্তরণে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে প্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রীর ইফতার সামগ্রী বিতরণ করেছে খাগড়াছড়ি পার্বত্য …

Leave a Reply