নীড় পাতা » ফিচার » খোলা জানালা » মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা : একটি যুগান্তকারী অধ্যায়ের সূচনা

মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা : একটি যুগান্তকারী অধ্যায়ের সূচনা

‘নানান দেশের নানান ভাষা
বিনা স্বদেশী ভাষা
মিটে কি আশা’
প্রখ্যাত কবি রামনিধি গুপ্তের এই পংক্তিমালার মাধ্যমে মাতৃভাষার অপরিসীম গুরুত্ব ও অকৃত্রিম ভালবাসার কথা প্রকাশ পায়। আপন ভাষায় যেভাবে মনের ভাব প্রকাশ করা সম্ভব তা অন্য ভাষায় কোনভাবেই সম্ভব নয়। ১৯৫২ সালের ভাষাযুদ্ধ ও শহীদদের রক্তদান শাসকগোষ্ঠীর চাপিয়ে দেয়া ভাষার বিরুদ্ধে পৃথিবী জুড়ে আত্মত্যাগের অনন্য এক নজির। এর মাধ্যমে তৎকালীন বৃহৎ বাংলাভাষীরা শাসক গোষ্ঠীর চাপিয়ে দেয়া ভাষা উর্দুর বিরুদ্ধে নিজ ভাষায় কথা বলার ও বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার অধিকার আদায়ের আন্দোলন করেছিলেন। এটি শুধু উর্দুর বিরুদ্ধে বাংলা নয় সকল ভাষার প্রতি স্বীকৃতি ও সম্মান। সকল মানুষেরই তার নিজ মায়ের ভাষায় কথা বলার অধিকারের স্বীকৃতি।

বাংলাদেশে বিভিন্ন জেলায় ৪৫টি জনগোষ্ঠীর প্রায় ৩০ লক্ষ মানুষ রয়েছে। দেশের জাতিসত্ত্বাসমূহ ৩৩টি ভাষায় কথা বলে। জনগোষ্ঠীগুলো প্রায় সাতটি বর্ণমালায় লেখাপড়া, সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চা করে থাকে। আদিবাসী শিশুদের মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা লাভের কথা রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃত রয়েছে। ১৯৯৭ সালের ২রা ডিসেম্বর ঐতিহাসিক পার্বত্য শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর পার্বত্য চট্টগ্রামের এইসব জনগোষ্ঠির শিক্ষার্থীদের মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা লাভের পথ প্রশস্ত হয়। সম্পাদিত পার্বত্য চুক্তিতে মোট ৪টি খন্ডে ৭৮টি ধারা রয়েছে। এর “খ” খন্ডের ৩৩ নং ধারার (খ)-২ উপ-অনুচ্ছেদে সুস্পষ্টভাবে ‘মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা লাভের’ কথা বলা হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন আঞ্চলিক, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আইন ও সনদে ভিন্ন ভাষা-ভাষীদের মাতৃভাষায় শিক্ষা লাভের অধিকারের কথা বলা হয়। ১৯৯৮ সালের রাঙামাটি ঘোষণা পত্র, ২০০৫ সালে গৃহীত দারিদ্র বিমোচন কৌশল পত্র এবং সর্বশেষ তাৎপর্যপূর্ণ ২০১১ সালে প্রণীত জাতীয় শিক্ষা নীতিতে মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা লাভের কথা বলা হয়েছে। ২০১৩ সালে সরকার প্রথম মাতৃভাষায় পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নের ব্যাপারে উদ্যোগ গ্রহণ করে ও ২০১৪ সালে শিক্ষার্থীদের হাতে বই তুলে দেওয়ার টার্গেট নির্ধারণ করে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে একটি জাতীয় কমিটিও গঠন করা হয়। পরবর্তীতে এসব জনগোষ্ঠির প্রতিনিধিবৃন্দের সাথে ধারাবাহিক মতবিনিময় ও মতামতের প্রেক্ষিতে তিনটি ধাপে কার্যক্রম বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। কিন্তু বিভিন্ন কারণে বারবার টার্গেট নির্ধারনের পরও যথাসময়ে এর বাস্তবায়ন পিছিয়ে যায় । ১ম ধাপে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, গারো, সান্তাল(সাঁওতাল এর আরেকটি ব্যবহৃত রূপ) ও সাদ্রি ভাষায়; ২য় ধাপে তঞ্চঙ্গ্যা, ম্রো, বম, মনিপুরী (বিষ্ণুপ্রিয়া), মনিপুরী (মৈতৈ), ও খাসিয়া এবং ৩য় ধাপে কোচ, উড়–ক, রাখাইন, খুমি, চাক ও খিয়াং ভাষায় পাঠ্য-পুস্তক প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়া হয়। যদিও বর্ণমালা নির্ধারণ জটিলতার কারণে সিদ্ধান্ত নিতে না পারায় সান্তাল জনগোষ্ঠীর বই ছাপা কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে। এর মধ্যে এনসিটিবি, টেকনিক্যাল কমিটি ও সংশ্লিষ্ট ভাষার জনগোষ্ঠীর বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিবর্গের সমন্বয়ে গঠিত কমিটি পাঠ্যপুস্তকের কন্টেন্ট র্নিধারণ করে। তবে পার্বত্য জনগোষ্ঠির মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষার উদ্যোগ এটি প্রথম নয়। বেসরকারিভাবে অনেক আগে বিভিন্ন সংস্থা বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী নিয়ে মাতৃভাষায় শিক্ষা কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে। পার্বত্য চট্টগ্রামে ২০০৮ সালে সেভ দি চিলড্রেন ও ইউএনডিপি’র সহযোগিতায় স্থানীয় উন্নয়ন সংস্থা জাবারাং , সাস, তৈমু প্রায় ১১২টি বিদ্যালয়ে মাল্টি-লিংগুয়াল এডুকেশন(এমএলই) শিক্ষা কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে। যদিও ২০১৩ সালে প্রকল্প মেয়াদ শেষ হওয়ায় এর কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।
অত্যন্ত সুখের বিষয় হলো, মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী জনাব নুরুল ইসলাম নাহিদ গত ৫ ডিসেম্বর ঢাকায় পাঠ্যপুস্তক ছাপা কার্যক্রমের অগ্রগতি পরিদর্শনে গিয়ে বলেন, ২০১৭ শিক্ষা বর্ষ হতে ৫টি জনগোষ্ঠীর (চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, গারো ও সাঁদ্রি) প্রায় ২৮ হাজার বই ছাপার কাজ শেষ পর্যায়ে। এটি দেশের ইতিহাসে একটি অত্যন্ত যুগান্তকারী ও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। সরকারের পাশাপাশি দীর্ঘদিন যারা এ কার্যক্রমের পাশে ছিলেন তারাও ধন্যবাদ প্রাপ্য। তবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এখনও অনেকগুলো চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। কোন জেলায় কতগুলো স্কুলে, কোন কোন স্কুলে এ কার্যক্রম বাস্তবায়ন হবে তা সম্ভবত এখনও চুড়ান্ত হয়নি। কোন জনগোষ্ঠীর কতজন শিক্ষার্থী এর আওতায় আসবে তাও র্নিধারণ করা দরকার। একটি শ্রেণীতে একাধিক ভাষা-ভাষী শিক্ষার্থী থাকলে সে সব ক্ষেত্রে কি কৌশলে পাঠদান হবে তাও এপ্রোচ করা দরকার। আমার প্রস্তাবনায়,পূর্বে মাতৃভাষায় শিক্ষা কার্যক্রম বাস্তবায়ন হয়েছে এমন বিদ্যালয়গুলো অগ্রাধিকার দিলে বাস্তবায়ন সহজ হবে। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এ বিষয়ের উপর যথাসংখ্যক যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। ২০১৭ সালে নতুন বছরের শুরুতে বই বিতরণ হলেও স্বল্প সময়ে এসব আয়োজন কিভাবে সম্পন্ন করা যাবে তাও এক বিরাট প্রশ্ন থেকে যায়। এ ব্যাপারে যত দ্রুত সম্ভব সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের নিয়ে সমন্বয় সভা করে কর্মপরিকল্পনা ঠিক করতে হবে। পার্বত্য জেলা পরিষদগুলোকে এ ব্যাপারে অবশ্যই লিডিং রোল প্লে করতে হবে। এনসিটিবি তাদের কাজ করেছে এখন দায়িত্ব বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষের। সকল পক্ষ যেমন মন্ত্রণালয়, এনসিটিবি, পার্বত্য জেলা পরিষদ, প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগ, বিশেষজ্ঞ, এনজিও প্রতিনিধি, সাংবাদিক, মাঠ পর্যায়ের বাস্তবায়ন কারী কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করতে হবে। তা না হলে এসব আয়োজন বাস্তবতার মূখ দেখবে না। পাশাপাশি ১ম ধাপের কার্যক্রম শুরু করে বসে থাকলে হবে না। অতীতের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে এখনই পরবর্তী ধাপের কার্যক্রম শুরু করা প্রয়োজন। অনেক জনগোষ্ঠীর নির্দিষ্ট লিপি বা বর্ণমালা নেই। সেই জনগোষ্ঠীর অধিকাংশের মতামত নিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে প্রচেষ্ঠা নিতে হবে। তা না হলে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীরা আরও পিছিয়ে যাবে। শিক্ষা জীবনের শুরুতে একজন শিক্ষার্থীর অবশ্যই তার মাতৃভাষায় শুরু হওয়া উচিত। তাতে যেমনি পড়ালেখা বুঝতে সহজ হবে, মনের ভাব আদান প্রদানে সহায়ক হবে তেমনি ভবিষ্যৎ শিক্ষা জীবনের ভিত শক্ত হবে। একজন ভাল শিক্ষিত মানুষ একটি সুশিক্ষিত সমাজ ও জাতি গঠনে ভূমিকা রাখবে। মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম হারিয়ে যেতে বসা সাহিত্য,সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রক্ষার্থে বিরাট ভূমিকা পালন করবে নিঃসন্দেহে।

লেখকঃ মৃণাল কান্তি তঞ্চঙ্গ্যা, সমাজকর্মী ও রাজনীতিক, রাঙামাটি পার্বত্য জেলা। ইমেইলঃ tanchangya.cht@gmail.com

Micro Web Technology

আরো দেখুন

নানিয়ারচর সেতু : এক সেতুতেই দুর্গমতা ঘুচছে তিন উপজেলার

কাপ্তাই হ্রদ সৃষ্টির ৬০ বছর পর এক নানিয়ারচর সেতুতেই স্বপ্ন বুনছে রাঙামাটি জেলার দুর্গম তিন …

One comment

  1. তথ্য সমৃদ্ধ লেখা।তবে একটা তথ্য সংশোধনী-জাবারাং ও সেভ ব্য চিলড্রেন ২০০৬ সালের দিকে খাগড়াছড়িতে মাতৃভাষা ভিত্তিক বহুভাষিক শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করে। শুরুতে তা সরকারের প্রবল বাধার মুখে পড়ে, যা আজকে সরকার-ই তা বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে আগামী ২০১৭ থেকে..। এ ক্ষেত্রে সেভ ব্য চিলড্রেন ও জাবারাং কে স্বরণ করা দরকার।

Leave a Reply

%d bloggers like this: