নীড় পাতা » ফিচার » খোলা জানালা » মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসের তাৎপর্য

মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসের তাৎপর্য

Daud‘হুব্বুল ওয়াতান মিনাল ঈমান’ এর অর্থ হলো- দেশপ্রেম ঈমানের অঙ্গ। ইসলামি চিন্তাবিদরা মনে করেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লামের এই বানীর মাধ্যমে মূলত: প্রত্যেকটি বান্দার ঈমান মজবুত করার কথাই বলা হয়েছে। মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসের তাৎপর্য এই বানীতেই নিহিত রয়েছে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতাকারী, মানবতার শত্র“ এবং স্বাধীনতার চেতনা পরিপন্থিদের জন্য হাদিস শরীফের এটি একটি ইঙ্গিতও বটে।
কতিপয় ইসলাম নামধারী, পবিত্র কোরআন-সুন্নাহর অপব্যাখ্যাকারী বাংলাদেশের স্বাধীনতার সরাসরি বিরোধীতা করে। তারা ধর্মের নানা অপব্যাখ্যার মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধকে বিতর্কিত করার প্রচেষ্টায় রত আছে। কেবল মুখেই নয়; মানবতা বিরোধী নানা অপকর্মের দ্বারাও তারা স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বিপক্ষে অবস্থান গ্রহন করেছিল। সেজন্যই আজকের ছোট্ট প্রবন্ধে ইমানী দায়িত্ববোধ থেকে দু‘চারটি কথা তুলে ধরতে চাই।
২শ বছর ব্রিটিশ শাসনের পর প্রায় দু‘যুগ ধরে পাকিস্থানী শাসন-শোষনে নিপীড়িত, নির্যাতিত এবং অধিকার বঞ্চিত, এদেশের মানুষের আর হারানোর মত কিছুই বাকি ছিলনা। যারা মুখের ভাষাও কেড়ে নিতে চেয়েছিল; তাদের কাছে স্বাধীনতার মূল্যই বা কি থাকতে পারে। তাই তো ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতেই নিরাপরাধ জনগনের ওপর আছড়ে পড়েছিল শকুনরা। এক রাতেই রক্তে রঞ্জিত হয়ে যায় বাংলার মাটি।
২৫ মার্চ রাত দেড়টায় বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে পাক সেনাবাহিনী। গ্রেফতারের আগেই বঙ্গবন্ধু পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলস ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষনা’ বার্তাটি পাঠান। সেখানে তিনি বলেন, ‘আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন।’ তৎকালীন আওয়ামীলীগ নেতা এমএ হান্নান ২৬ মার্চ সর্ব প্রথম বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষনাটি চট্টগ্রাম বেতারে পাঠ করে শোনান। দেশ-বিদেশে সর্বাধিক প্রচারের উদ্দেশে মেজর জিয়াউর রহমান (শহীদ প্রেসিডেন্ট) পরপর তিনদিন চট্টগ্রাম বেতারের মাধ্যমে ‘স্বাধীনতার ঘোষনা’ বার্তাটি স্বকন্ঠে জানিয়ে দেন। এরপর মুক্তিযোদ্ধারা আরো অনুপ্রানিত হন। মুক্তিযুদ্ধের দামামা শানিত হয়।
নিজ দেশের প্রতি ভালোবাসার টান, এটাই স্বাভাবিক। স্বাধীনতার ঘোষনা শুনে দেশপ্রেমের সুধা পান করে এদেশের কৃষক, শ্রমিক, দিনমজুর, ছাত্র-শিক্ষক, পেশাজীবীরা নিজ নিজ অবস্থান হতে সাধ্যমত যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়লেন। ৭ মার্চ ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে জনসমুদ্রে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ডাক দিয়েছিলেন। সেই দিনের আহবানে প্রস্তত থাকা মুসলিম, হিন্দু, বাঙ্গালী-অবাঙ্গালী; জাতি, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে জনতা আর দেরি করেননি। যার যা কিছু ছিল, তাই নিয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামে নেমে পড়লেন।
অসম লড়াই হলেও বাংলার মানুষের পক্ষে ছিল বিশ্ব বিবেক। প্রতিবেশি দেশও এগিয়ে আসে। অনেকে দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রিত হন। সেখানেই যুদ্ধের প্রস্তুতি নেন তারা। কেবল পুরুষরাই নন; নারীরাও পিছিয়ে ছিলেন না। দেশের জন্য বহু নারী বিরঙ্গণা হন। সম্ভ্রম হারান আমার মা-বোনরা। মা হারিয়েছেন ছেলেকে, বোন হারিয়েছেন ভাইকে। স্ত্রী হারান প্রিয় স্বামীকে। পৃথিবীর ইতিহাসে দেশের জন্য এত ত্যাগ আর কোন জাতিই দেননি। ৩০ লাখ মানুষ শহীদ হন স্বাধীনতার জন্য। স্বাধীনতার ঠিক দু‘দিন আগেই পরিকল্পিতভাবে বাংলাদেশের সকল বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করে পাকবাহিনীর এদেশীয় দোসর আল বদর, আলশামসরা। প্রান উৎসর্গকারী সেসব বীর মুক্তিযোদ্ধাদেরকে আজ শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি।
সম্মানিত অংশগ্রহনকারীবৃন্দ, দীর্ঘ আলোচনা করে আপনাদের মূল্যবান সময়ের অপচয় করবোনা। তাছাড়া ব্যক্তিগতভাবে জানাশোনা কম থাকার কারনে খুব তথ্য-উপাত্ত সমৃদ্ধ কিছু জানানোর দু:সাহসও করছিনা। তবে একটি ঐতিহাসিক সত্য ঘটনা নিশ্চয়ই আপনাদের জানা থাকার কথা।
জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা আবুল আলা মওদুদী ১৯৪৩ সালে মাসিক “তরজমানুল কোরআন” ম্যাগাজিনের মাধ্যমে নিজেদের মতবাদ প্রচার করতে থাকেন। এই ম্যাগাজিনের ফেব্র“য়ারী সংখ্যায় এই মৌলভি পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরোধিতা করে লিখেছিলেন, পাকিস্তান নামক কোনো রাষ্ট্রের জন্ম হলে সেটা “আহাম্মকের বেহেশত” এবং “মুসলমানদের কাফেরানা রাষ্ট্র”। তখন যেমন পাকিস্তান স্বাধীনতার সরাসরি বিরোধীতা করেন দলটির প্রতিষ্ঠাতা; তেমনি বাংলাদেশ সৃষ্টিকালেও চরম বিরোধীতায় নামে এই স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠি।
মওদুদীর অনুসারীরা মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে দেশে বিদেশে অপপ্রচার শুরু করে। রাজাকার, আল বদর, আল শামস বাহিনী ছাড়াও জামাতে ইসলামী ও ছাত্র সংঘের (বর্তমানে ছাত্র শিবির) নেতাকর্মীরা সরাসরি মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিবাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে অংশ নেয়। পাকিস্তানী বাহিনীর সহযোগী হিসেবে দেশব্যাপী হত্যাযজ্ঞ, ধংসলীলাসহ চরম অমানবিক কার্যক্রমে সক্রিয় জড়িয়ে পড়ে। ফলে মুক্তিকামীরা স্বদেশীয় পাক দোসরদের কারনে পদে পদে বাঁধার সম্মুখিন হতে থাকেন। জামাতের নেতা গোলাম আযম, নিজামী, সাইদী, মুজাহিদসহ অনেকেই মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা, ঘরবাড়ীতে আগুন দেয়া, নারীর সম্ভ্রমহানি ও নির্যাতনের ঘটনায় নেতৃত্ব দেন।
১৯৫২ সালে জামাত নেতা গোলাম আজম ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহন করেন ঠিকই। কিন্তু ১৯৭০ সালে পশ্চিম পাকিস্তানের শুক্কুর শহরে এক সংবর্ধণা সভায় তিনি বলেন “উর্দূ পাক-ভারত উপমহাদেশের মানুষের সাধারণ ভাষা। ৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে অংশ নেয়া তার মারাতœক ভুল ছিলো। বাংলা ভাষা আন্দোলন মোটেও সঠিক কাজ হয়নি। তিনি এজন্য দুঃখিত।” সূত্র: দৈনিক আজাদ ২০ জুন ১৯৭০, সাপ্তাহিক গণশক্তি ২১ জুন ১৯৭০। এরপর থেকেই গোলাম আযম রাজাকার বাহিনীর নেতৃত্ব দেন।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসের তাৎপর্য আলোচনা করতে হলে নেপথ্য ইতিহাস তুলে ধরা ছাড়া কোন বিকল্প নেই। তাই স্বাধীনতা বিরোধীতাকারীদের মুখোশ উম্মোচন করা খুব দরকার ছিল। এখানে ‘ধর্ম আর ইসলাম’কে পুজি করে স্বার্থ আদায় করাই হলো এদের কাজ। প্রথমে পাকিস্তান সৃষ্টিকে নাপাকিস্থান বলে; পরে পাকিস্তানের পক্ষে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার বিরোধীতা করাটা তাদের মিশন মাত্র। প্রকৃত অর্থে মওদুদীবাদীরা যুগে যুগে সাম্রাজ্যবাদীদের ইচ্ছারই প্রতিফলন ঘটিয়ে আসছে। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করা তারই অংশ। স্বাধীনতার চুড়ান্ত মুহুর্তে পাকিস্তানের পক্ষে মার্কিনীদের সপ্তম নৌ বহর পাঠানোর কথা কারোরই ভূলে যাবার কথা নয়। যদিও অজানা কারনেই সেই বহর চট্টগ্রাম পর্যন্ত পৌছায়নি।
এ ধরনের ইতিহাস টানলে প্রবন্ধটি আরো বড়ই হতে থাকবে, ধৈয্যচ্যূতি ঘটাতে চাইনা। তবে আশার কথা হলো- সেই সব যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়েছে। না হয় জাতি হিসেবেও কলংকের বোঝা সইতে হত। কিন্তু যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কার্যক্রম শুরুর পর হতে জালাও-পোড়াও, খুন-খারাবি ও বিশৃংলখা দেখে তাদের স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন অপতৎপরতার কথা মনে পড়ে যায়।
১৯৭১ সালে ৯ মাসের মহান মুক্তিযুদ্ধে দেশের আপামর দেশপ্রেমিক জনগনের স্বত:স্পূর্ত অংশগ্রহন ছিল দুনিয়ার বুকে এক অনন্য উদাহারণ। দেশের মানুষের সার্বিক মুক্তি ও অধিকারের জন্য তখন স্বাধীনতা সংগ্রাম ছিল অনিবার্য বাস্তবতা।
লাখো শহীদের বিনিময়ে, হাজারো মা-বোনের ইজ্জতে পাওয়া ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা’ আজো ভুলুন্ঠিত পদে পদে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা অনেকটাই ¤্রয়িমান। জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দুরুত্বের সুযোগে স্বাধীনতা বিরোধীদের দম্ভ দেখে লজ্জা পেতে হয়। সেজন্য নতুন প্রজন্মের শিশুরাও ভাবতে পারছেনা এ কেমন স্বাধীনতার সুফল! এছাড়া রাষ্ট্রীয় দূর্বলতার সুযোগে অতীতে জঙ্গিবাদী গোষ্ঠির উত্থান ঘটে। স্বাধীনতা বিরোধী শক্তির ছত্রছায়ায় তারা আমাদের মত উদার ইসলামী রাষ্ট্রে শক্তি সঞ্চয় করে ২০০৫ সালে একই সঙ্গে ৬৪ জেলায় বোমা হামলা ঘটিয়েছে। এছাড়াও রন্ধ্রে রন্ধ্রে অনিয়ম, দূর্নীতি, অন্যায়-অবিচারের প্রচলিত ধারার স্বপ্ন দেখেননি মুক্তিযোদ্ধারা। তবে কী হতাশায় ডুববে আগামীর ভবিষ্যত; নাকি এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ?
আমি আশাবাদী মানুষ হিসেবে দৃঢতার সাথে বলতে পারি, অবশ্যই স্বাধীনতার ৪৩ বছরে অনেক এগিয়েছে বাংলাদেশ। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হচ্ছে। বিশ্বকাপ ক্রিকেট হচ্ছে বাংলাদেশের মাটিতে। গলফে বিশ্ব সেরাদের তালিকায় আমাদের সোনার ছেলেরা। দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্র সত্বেও পোষাক শিল্পে নেতৃত্ব দিচ্ছি আমরাই। জ্ঞান-বিজ্ঞানে অগ্রসর হচ্ছে দেশ। জাতীয় প্রবৃদ্ধি বেড়েছে। মধ্যম আয়ের দেশে পরিনত হতে খুব দেরি নেই আমাদের সামনে। আরো হাজারো সম্ভাবনা এগিয়ে নেবে আমাদের বাংলাদেশকে।
মোদ্দা কথায় বলতে চাই, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে একটি সুখী, সমৃদ্ধশালী, ক্ষুধা-দারিদ্রমুক্ত তথ্য প্রযুক্তি নির্ভর বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হলেই কেবল মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসের তাৎপর্য আরো বিস্তৃত হতে পারে।

লেখক : আবু দাউদ, সাংবাদিক, abudaud2007@yahoo.com

Micro Web Technology

আরো দেখুন

জনপ্রিয় হচ্ছে ‘তৈলাফাং’ ঝর্ণা

করোনার প্রভাবে দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল খাগড়াছড়ির পর্যটন ও বিনোদনকেন্দ্র। তবে টানা বন্ধের পর এখন খুলেছে …

Leave a Reply