ভাড়া বেড়েছে,সেবা বাড়েনি

lanche-coverপার্বত্য জেলা রাঙামাটিকে ঘিরে থাকা ৭০০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের বিশাল কাপ্তাই হ্রদের বুক ছিড়েই নিত্যদিন আসা যাওয়া করতে হয় জেলার অন্তত: ছয়টি উপজেলায় বসবাসকরা কয়েকলক্ষ মানুষকে।

জেলার গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসা-বানিজ্যও চলে এই পথে। আর এইজন্য নৌপথে চলাচলে সেই মান্দাতার আমলের লঞ্চ ও বোটই একমাত্র ভরসা। মাঝে মাঝে যাত্রীবাহি এসব লঞ্চের কাঠ পরিবর্তন ও রং করেই চকচকে রাখা হলেও ইঞ্চিনেও লাগেনি আধুনিকতার ছোঁয়া। ফলে প্রচন্ড শব্দের আর ধীর গতির লঞ্চেই এই পথে যোগাযোগ করতে হয় লোকজনদের। দ্রুত গতি সম্পন্ন ও আধুনিক কোনো ইঞ্চিন বসানোরও তেমন একটা আভাসও পাওয়া যাচ্ছেনা।

মারিশ্যা,লংগদু ও বিভিন্ন উপজেলায় যেতে পঞ্চাশ বছর আগেও যে পরিমান সময় ব্যয় করতে হয়েছিলো আধুনিক সময়ে এসেও একই সময়ই ব্যয় করতে হচ্ছে যাত্রীদের। অথচ দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরে সময়ের সাথে সাথে ভাড়া বেড়েছে বহুগুন। কিন্তু বাড়েনি সেবার মান। এই দীর্ঘ সময়েও এই পথে যাত্রীসেবার মান না বাড়ায় ক্ষোভ জানান সাধারন যাত্রী ও ব্যবসায়ীরা।

ষাটের দশকে কাপ্তাই বাধের ফলে সৃষ্ট বিশাল এই লেকের ছয়টি উদ্দেশ্যের মধ্যে অভ্যন্তরীন নৌ-যোগাযোগও ছিল অন্যতম। পঞ্চাশ বছরের অধিক সময়কাল অতিক্রম হয়েছে এই লেকের। লেকের তীর ঘেঁষে গড়ে উঠেছে বসতি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। এসবের বর্জ্য আর পাহাড়ি ঢলে এর তলদেশে জমেছে পলি। লেকের পানি বদ্ধ হলেও বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ক্রমাগত পানি ছাড়ার কারণে বছরের তিন চারমাস সময় শুষ্কই থাকে। এসময় লেকের মাঝখানে জেগে উঠে অসংখ্য ছোট-বড় চর। আর এই সময় নৌ চলাচলে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। জেলার সাথে বাঘাইছড়ি, লংগদু, জুরাছড়ি, নানিয়ারচর, বরকল ও বিলাইছড়ি উপজেলার যোগাযোগ করতে হয় নৌ-পথে। শুষ্ক মৌসুমে এসব উপজেলার সাথে যোগাযোগ অত্যন্ত কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে।

বাঘাইছড়ি উপজেলার আবদুল বারী ও আবদুল জলিল জলিল জানান, বছরের এই সময়টাতে জেলা শহরের সাথে যোগাযোগ করাটা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। ছয়ঘন্টার পথ পাড়ি দিতে সময় লাগে দশ ঘন্টারও বেশি।

লংগদু উপজেলার জাহিদ হোসেন ও রেজাউল জানান, লংগদু থেকে রাঙামাটি আসতে সময় লাগে তিন ঘন্টা। কিন্তু শুষ্ক মৌসুমে লেকের মধ্যখানে বিভিন্নস্থানে চর জেগে উঠার কারণে একদিকে সময় যেমন বেশি লাগে। পাশাপাশি ভোগান্তিও পোহাতে হয় চরমভাবে।

স্বাধীনতার পর থেকেই লংগদুতে বসবাসকারি এবং নিয়মিত লঞ্চযাত্রী ওবায়েদ মিয়া বলেন, বছর বছর লঞ্চ ভাড়া বাড়ে কিন্তু লঞ্চের চেহারা বদলায়নি,বাড়েনা যাত্রী সুবিধাও।

ব্যবসায়ী আবুল কালাম ও বিপ্লব চাকমা জানান, বিগত চল্লিশ বছরের অধিক সময় ধরে এই পথ দিয়ে ব্যবসা-বানিজ্য করে আসছি। সময়ের সাথে সাথে অনেক কিছুরই পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে এই পথে যাত্রী সেবার মান বাড়েনি। সেই পুরনো আমলের লঞ্চ-বোটই এই পথে চলাচলে ও একমাত্র ভরসা। চল্লিশ বছর ধরেই দেখছি একই ধরনের লঞ্চ আর বোট। ভালো ইঞ্চিন বসানো হলে গতিও বাড়তো। কিন্তু এসব নিয়ে কেউ তেমন একটা চিন্তা করেন বলে মনে হয়না।

রাঙামাটি থেকে ছেড়ে যাওয়া লঞ্চ সার্ভিসের সুপারভাইজার মোঃ রফিক জানান, প্রতিদিন সকালে রাঙামাটি লঞ্চঘাট থেকে ছয়টি উপজেলার বাস ছাড়ে। কিন্তু শুষ্ক মৌসুমে লেকে পানি কম থাকায় নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেনা লঞ্চগুলো। ফলে যাত্রীদের অনেক বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হয়।

মারিশ্যাগামি বিরতীহীন সার্ভিসের সারেং আবুল কালাম জানান, চারদশক ধরে এই পথে লঞ্চ চলাচল করছি। বছরের এই সময়টাতে লঞ্চ চলাচলে খুবই কষ্ট হয়। সাবধানতা অবলম্বন করেই লঞ্চ চালাতে হয়। কোনো মতে যদি একবার লঞ্চ চরে আটকে যায় তবে তা ছাড়ানো খুবই কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে।

রাঙামাটি লঞ্চ মালিক সমিতির সহ-সভাপতি মাঈনুদ্দিন সেলিম জানান, জেলার অভ্যন্তরীন উপজেলার সাথে যোগাযোগে ৪৭ টির মতো বৈধ লাইসেন্সধারী লঞ্চ চলাচল করে। শুষ্ক মৌসুমে লঞ্চগুলো নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছুতে পারেনা। মারিশ্যার দূরত্ব একশো কিলোমিটার। কিন্তু পুরো পথ যেতে পারেনা। পঞ্চাশ কিঃমিঃ গিয়েই আটকে যায়। ফলে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয় যাত্রীদের। এধরনের সমস্যা প্রায় সকল উপজেলার ক্ষেত্রেই ঘটে। শীঘ্রই হ্রদে ড্রেজিং করা জরুরী বলে মন্তব্য করেন তিনি।

পঞ্চাশ বছরেও লঞ্চের আধুনিকায়ন না হওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, লঞ্চগুলো স্টিল বডির নয়,কাঠের বডি। প্রতি দুই বছর অন্তর অন্তর এসব কাঠ পরিবর্তন করা হয়। যুগের সাথে তাল মিলিয়েই এসব পরিবর্তন করা হয়ে থাকে। তবে তিনি এসব লঞ্চকে আধুনিক বলেও মন্তব্য করেন।

Micro Web Technology

আরো দেখুন

কারাতে ফেডারেশনের ব্ল্যাক বেল্ট প্রাপ্তদের সংবর্ধনা

বাংলাদেশ কারাতে ফেডারেশন হতে ২০২১ সালে ব্ল্যাক বেল্ট বিজয়ী রাঙামাটির কারাতে খেলোয়াড়দের সংবধর্না দিয়েছে রাঙামাটি …

Leave a Reply

%d bloggers like this: