নীড় পাতা » ব্রেকিং » ব্যবসায়ীদের দাবি উপেক্ষা করে কাপ্তাই হ্রদের মাছ আহরণ

করোনাভাইরাস সংক্রমণ ঝুঁকি

ব্যবসায়ীদের দাবি উপেক্ষা করে কাপ্তাই হ্রদের মাছ আহরণ

নভেল করোনাভাইরাসের (কভিড-১৯) প্রভাবে স্থবির হয়ে পড়েছে গোটা দেশ। এর প্রভাব পড়েছে পার্বত্য জেলা রাঙামাটিতেও। জেলা জুড়ে বন্ধ রয়েছে দোকানপাটসহ বিভিন্ন ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান। এমতাঅবস্থায় কাপ্তাই হ্রদের জেলে ও শ্রমিকদের মধ্যে করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে কাপ্তাই হ্রদের মাছ আহরণ বন্ধের দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ী নেতারা। তবে তা উপেক্ষা করেই চলছে কাপ্তাই হ্রদের নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠান বিএফডিসির আহরণ।

ব্যবসায়ী নেতাদের দাবি, যেহেতু স্বাভাবিকভাবে প্রতিবছরই কাপ্তাই হ্রদে কার্প জাতীয় মাছের বংশবৃদ্ধি, হ্রদে অবমুক্ত করা পোনা মাছের সুষম বৃদ্ধি, মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন নিশ্চিতকরাসহ হ্রদের প্রাকৃতিক পরিবেশে মৎস্য সম্পদ বৃদ্ধির সহায়ক হিসাবে ১ মে থেকে ৩০ জুলাই পর্যন্ত তিন মাস মাছ শিকারে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়। যেহেতু করোনার এই আপদকালীন সময়ে মাছ আহরণের নিষেধাজ্ঞা এগিয়ে দিলে খাতসংশ্লিষ্ট শ্রমিক-কর্মচারী, ব্যবসায়ী ও জেলেরা করোনা সংক্রমণ ঝুঁকি এড়াতে পারবেন। কিন্তু ব্যবসায়ীদের দাবি উপেক্ষা মাছ আহরণের সিদ্ধান্তেই অনড় রয়েছে বিএফডিসি কর্তৃপক্ষ।

স্থানীয়দের অভিযোগ, করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি নিয়ে প্রত্যহ ঢাকা-চট্টগ্রামে যাতায়াত করছে রাঙামাটি বিএফডিসির মাছ পরিবহনের গাড়িসহ অন্যান্য জরুরি পরিবহন। আবার এসব গাড়িতে করেই প্রশাসনের ‘চোখ ফাঁকি’ দিয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজন প্রবেশ করছে রাঙামাটিতেই। অন্যদিকে জরুরি পরিবহনে কর্মরত চালক-সহকারীরাও বিভিন্ন এলাকার মানুষজনের সঙ্গে বাধ্য হয়ে মেলামেশা করছেন। এতে করে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকিতে রয়েছে রাঙামাটি।

বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশন (বিএফডিসি) রাঙামাটি কেন্দ্র পরিদর্শন করে দেখা গেছে, প্রতিদিন সকাল ও বিকালে শতাধিক ইঞ্জিনচালিত নৌকায় করে হ্রদের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে জেলেরা মাছ নিয়ে আসছে শহরের বিএফডিসি অবতরণ ঘাটে। সেই মাছ ওজন মাপা, শুষ্ক পরিশোধসহ সংশ্লিষ্ট হিসেব শেষে ট্রাকে করে নেওয়া হচ্ছে ঢাকা ও চট্টগ্রামে। এরমধ্যে বেশিরভাগই ট্রাকই ঢাকাগামী। বিএফডিসি রাঙামাটির আওতাধীন অন্য দুই কেন্দ্র কাপ্তাই ও মহালছড়ি উপজেলা কেন্দ্রেরও একই চিত্র বলে জানা গেছে।

বিএফডিসি’র তথ্য মতে, অন্যান্য সময়ে যেখানে প্রতিদিন রাঙামাটিতে বিএফডিসি’র তিন কেন্দ্র থেকে গড়ে ১৮-২০ টন মাছ আহরণ করা হতো। সেখানে এখন গড়ে আহরণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮-১০ টনে। পুরো রাঙামাটি জেলায় সরকারি তালিকাভুক্ত প্রায় ২২ হাজার জেলে রয়েছে; এ খাতের ওপর নির্ভরশীল জেলার শতাধিক ব্যবসায়ী। আবার একজন ব্যবসায়ীর অধীনে কাজ করেন ৫-৮ শ্রমিক।

বিএফডিসির কয়েকজন শ্রমিক জানিয়েছেন, সকাল থেকেই এখানে কাজ করতে হচ্ছে। কাজের কারণে অনেকেই সঙ্গেই মিশতে হয়। আবার এখানকার গাড়িগুলো বিভিন্ন জায়গায় যাওয়া-আসা করে। আবার এসব গাড়িগুলোর চালক-সহকারীদের সঙ্গেও আমাদের মেলামেশা করতে হয়। যেহেতু করোনা একটা সংক্রমণ রোগ, সেহেতু লোকজনের সঙ্গে মেলামেশা করা উচিত নয়, তবুও বাধ্য হয়ে করতে হচ্ছে।

রাঙামাটি মৎস্য ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক উদয়ন বড়ুয়া জানিয়েছেন, শনিবার বিএফডিসির ব্যবস্থাপক আমাদের ডেকেছিলেন। আমরা তাকে স্পষ্টভাবেই বলেছি, এই কঠিন সময়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া অসম্ভব। আমরা পরামর্শ দিয়েছি, যেহেতু ১ মে থেকে স্বাভাবিকভাবেই বন্ধ থাকে, সেই বন্ধটি ১৫ দিন এগিয়ে নিয়ে এসে এই ১৫ এপ্রিল থেকেই বন্ধ করে দেয়ার জন্য এবং খোলার সময় ১৫ দিন আগে খোলার জন্য। কিন্তু তিনি রাজী হচ্ছেন না। বরং আমাদের বলছেন ট্রাক চালকদের পৃথকভাবে থাকার জন্য একটি রুমের ব্যবস্থা করতে। আমরা প্রশাসনের কাছে অনুরোধ করছি, রাঙ্গামাটিবাসীর স্বার্থেই যেনো এখনই মাছ আহরণ বন্ধ করে দেয়া হয়।

কাপ্তাই হ্রদ মৎস্য ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মো. কবির বলেন, এসময়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ব্যবসা করার তো কোন মানেই হয়না। আমরাও চাই বিএফডিসি মৎস আহরণ এখনই বন্ধ করুক। কিন্তু ওনারা নিজেদের লাভের বিষয়টি চিন্তা করে বন্ধ করতে চাইছেন না। অযথা আমরা রাঙামাটিবাসীর গালাগালি ও অপবাদ শুনতেছি। আমরা টাকা পয়সা দিয়ে কি করব, জীবনই যদি না বাঁচে। আমরাও চাইনা আমাদের কারণে কারো মৃত্যুর ঝুঁকি তৈরি হোক।

জেলার বিশিষ্ট মৎস্য ব্যবসায়ী মো. মাহাফুজ বলেন, এই সময়ে ফিসারি খোলা রাখার কোন মানেই হয়না। জীবনের চেয়ে তো ব্যবসা বড় হতে পারেনা। কিন্তু বন্ধের সিদ্ধান্ত তো আমরা নিতে পারিনা, বিএফডিসিকেই নিতে হবে। এমনিতে এখন হ্রদে মাছ নেই, আবার যা মাছ পাচ্ছি, তাও বিক্রি করতে পারছিনা। এতে আমাদেরও ক্ষতি হচ্ছে আবার জেলার মানুষের জীবনও ঝুঁকিতে রয়েছে।

রাঙামাটি পৌর নাগরিক অধিকার সংরক্ষণ কমিটির ভারপ্রাপ্ত সদস্য সচিব এম জিসান বখতেয়ার জানিয়েছেন, মাছ পরিবহনের গাড়িগুলো রাঙামাটি থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে যাওয়া-আসা করে। আবার গাড়িরচালক ও সহকারীদের সঙ্গে এ খাত সংশ্লিষ্টদের মধ্যে মেলামেশায় এক ধরণের জনসমাগম হয়ে থাকে। এতে করে রাঙামাটিও করোনা সংক্রমণের ঝুঁকিতে পড়ে। তাই আমি অনুরোধ করব সেহেতু ক’দিন পড়ে কাপ্তাই হ্রদে মাছ আহরণ নিষিদ্ধ হবে, সেহেতু আপদকালীন সময় বিবেচনা করে রাঙ্গামাটি থেকে বাহিরে মাছ পাঠানো আপাতত বন্ধ করা হোক।’

এই প্রসঙ্গে বিএফডিসি রাঙামাটির ব্যবস্থাপক লেফটেন্যান্ট কমান্ডার তৌহিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, ‘যে ট্রাক চালকরা প্রতিদিন মাছ নিয়ে ঢাকায় যাচ্ছেন তারা রাঙামাটিতে ফিরে আসার পর তাদের শরীরে এবং গাড়িতে প্রয়োজনীয় স্প্রে করা এবং তাদের পৃথকভাবে থাকার জন্য আমরা উদ্যোগ নিচ্ছি।’

মাছ আহরণ বন্ধ করার প্রসঙ্গে বিএফডিসি কমান্ডার বলেন, বিষয়টি আমাদের হাতে নেই, এটা সিদ্ধান্ত উপর থেকে আসতে হবে। আর এখন মাছ আহরণ বন্ধ হলে ঢাকায় মাছের চাহিদায় সংকট তৈরি হবে। হ্রদের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা শতাধিক জেলে, বোট চালকদের ও বিএফডিসি চত্বরে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করা পুরোপুরি সম্ভব না বলেই জানিয়েছেন তিনি।

রাঙামাটি জেলা প্রশাসক একেএম মামুনুর রশিদ জানিয়েছেন, বিএফডিসির মাছ পরিবহনের বিষয়টি আমাদেরও মাথায় রয়েছে। প্রশাসনিক আইন অনুযায়ী প্রয়োজনে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

প্রসঙ্গত, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সর্ববৃহৎ কৃত্রিম জলাধার রাঙামাটির কাপ্তাই হ্রদ। এটি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বদ্ধজলাশয়সমূহের মধ্যে সর্ববৃহৎও। কাপ্তাই হ্রদের আয়তন প্রায় ৬৮ হাজার ৮০০ হেক্টর। যা বাংলাদেশের পুকুরসমূহের মোট জলাশয়ের প্রায় ৩২ শতাংশ এবং অভ্যন্তরীণ মোট জলাশয়ের প্রায় ১৯ শতাংশ। ১৯৬১ সালে রাঙ্গামাটির কাপ্তাইয়ে কর্ণফুলী জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে এ হ্রদের সৃষ্টি হলেও এটি রাঙামাটিতে মৎস্য উৎপাদন ও স্থানীয় জনসাধারণের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে অবদান রেখে আসছে। অন্যদিকে মৎস্য উৎপাদনের মধ্যদিয়ে রাজস্ব আদায়েও ব্যাপক ভূমিকা রাখছে এই হ্রদটি। কাপ্তাই হ্রদে কার্প জাতীয় মাছের বংশবৃদ্ধি, হ্রদে অবমুক্ত করা পোনা মাছের সুষম বৃদ্ধি, মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন নিশ্চিতকরাসহ হ্রদের প্রাকৃতিক পরিবেশে মৎস্য সম্পদ বৃদ্ধির সহায়ক হিসাবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে প্রতিবছরের পহেলা মে থেকে ৩০ জুলাই পর্যন্ত কাপ্তাই হ্রদে তিন মাস মাছ শিকারে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়।

Micro Web Technology

আরো দেখুন

রাঙামাটিতে এক দিনেই ১১ জনের করোনা শনাক্ত

শীতের আবহে হঠাৎ করেই পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটি জেলায় করোনা সংক্রমণে উল্লম্ফন দেখা দিয়েছে। বিগত কয়েকদিনের …

Leave a Reply