নীড় পাতা » পাহাড়ের সংবাদ » বৈসুর সীমানা ছাড়িয়ে বানিজ্যপাঠ

বৈসুর সীমানা ছাড়িয়ে বানিজ্যপাঠ

দক্ষিণা বাতাস দূর থেকে লাউড স্পিকারের গানকে ভাসিয়ে নিয়ে আসছে কানে। কখনো ‘চিরদিনই তুমি যে আমার যুগে যুগে আমি তোমারই’ অথবা ‘আই এম এ ডিস্কো ড্যান্সার’। তথাকথিত আধুনিকতার পিঠে সওয়ার হয়ে দ্রুত অগ্রসরমান একটি শহরতলির ত্রিপুরা গ্রামে আমার প্রথম পর্যায়ে দেখা বৈসুর অভিজ্ঞতা ছিল এটি। সরস্বতী পূজো১ কি বৈসু উদযাপনের প্যান্ডেল কোন কিছু আয়োজন করলেই সমকালীন সময়ের জনপ্রিয় ছায়াছবির গানগুলো এভাবে লাউড স্পিকার ফাটিয়ে কানের খুব কাছে পৌঁছে যেতো সহসা। এ বছরও হয়তোবা আমাদের বৈসুর প্যান্ডেলগুলোতে বাজবে হাল আমলের সিনেমার গান ‘লুঙ্গি ড্যান্স লুঙ্গি ড্যান্স’ অথবা ‘হানড্রেড পার্সেন্ট লাভ লাভ’ কিংবা ‘মে তেরা আগল ভাগল হে’। গ্রামের পাঠশালার চৌকাঠ পেরিয়ে প্রাইমারি স্কুলের পাঠ চুকিয়ে গ্রামে ফেলে আসা মা—বাবা ছোট ভাইবোন কিংবা বাল্যবন্ধুদের ছেড়ে অশ্র“সজল চোখে দ্রুত ধাবমান একটি ছোট্ট শহরের এক কোণে এভাবে নিজেকে আবিস্কার করি আমি। অচেনা জগৎ, অচেনা সব মুখের সাথে অজানা ভাষা অচেনা সংস্কৃতির মুখোমুখি এসে দাঁড়াই আমি। আমার মতো অনেক গ্রাম্য কিশোরকে হয়তো এভাবেই বাস্তবতাকে চিনতে হয়। যেখানে কেবল ভিন ভাষা কিংবা ভিন্ন সংস্কৃতি নয়, নিজের ভাষা সংস্কৃতিকেও কেমন যেন অচেনা অচেনা লাগে। মারমা তো কিছু বুঝতামই না— সে না হয় ঠিক আছে। কিন্তু যে ভাষাটিকে আমি শিশু শ্রেণীসহ দীর্ঘ ছয়টি বছর মুখস্থ করেছি সেই বাংলা, কিংবা তার খুব কাছাকাছি দুইটি ভাষা চাকমা ও চাটগাঁইয়া অথবা এই অঞ্চলের লিঙ্গুয়া—ফ্রাঙ্কা বাংলা—চাটগাঁইয়ার মিশ্রন২ সবকিছু কেমন যেন গোলমেলে মনে হতো আমার কাছে। গায়ে জ্বর হয়েছে। ছুটি চাওয়ার জন্য যে দরখাস্ত লেখবো তারও শক্তি নেই। এরকম ক্রিটিক্যাল সময়ে একমাত্র উপায় যখন মুখের ভাষা, তখনই ফ্যাসাদ বেঁধে যেতো। স্যারের কাছে ছুটি চাইতে গিয়ে নানা কায়দা কসরত করেও তাঁকে বোঝাতে পারতাম না যে আমার গায়ে জ্বর হয়েছে। শেষে অনেক জোড়াতালি দিয়ে হয়তো বলতাম, ‘তোমারতুন জর অইয়ে’। এখন আর মনে নেই এই তিন শব্দের আবেদনে স্যার আমাকে ছুটি দিতেন কিনা। অন্যের ভাষা অন্যের সংস্কৃতি অন্যের আচার ব্যবহার তো যে কোন আগন্তুকের কাছে অচেনা লাগতেই পারে। কিন্তু নিজের ভাষা—সংস্কৃতি? হ্যাঁ নিজের ভাষা সংস্কৃতিও আমার কাছে নতুন রূপে ধরা দিতে থাকে। দেখতাম শহরের পাড়ায় ব্যবহৃত অনেক কক্বরক্ শব্দ আমি বুঝতাম না অথবা আমি কিছু একটা বললে প্রতিবেশীরা হাসাহাসি করতো, ক্লাসের ত্রিপুরা বন্ধুরাও রসিয়ে রসিয়ে আমার কক্বরক্ শব্দগুলো নিয়ে ঠাট্টা মশকরা করতো। গ্রামের বৈসুতে আমরা ছোট্টরা ঢোল বাজিয়ে ‘কীর্তন কীর্তন’ খেলতাম। বড়োদের আসর থেকে শুনে শুনে মুখস্থ করা গানগুলো গ্রামে ঘুরে ঘুরে গাইতাম। বড়োরা মজা করে আমাদের এই কীর্তি দেখতেন আর পকেট হাতড়িয়ে কিংবা পানের বাটায় জমিয়ে রাখা নিজস্ব ব্যাংক থেকে কিছু কয়েন দিয়ে দিতেন। চার আনা, আট আনা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ এক টাকাপর্যন্ত পাওয়া যেতো। টাকাগুলো দিয়ে আমরা আদৌ কী করতাম, তার কিছুই আর স্মৃতিতে নেই। তবে সেই টাকার দিকে যে আমাদের কারোর কোন প্রকার বাড়তি আগ্রহ ছিল না বুকে হাত রেখে এখনো বলতে পারি। বিপরীতে আমি যখন আমার শৈশবের গ্রামটিকে পেছনে ফেলে শহরে আসি তখন দেখি অন্য রূপ। আমাদের থেকে দুই—তিন বছরের বড়োরা, গ্রামের দাদা—কাকা—মামারা বৈসুর রাতে বগলে ক্যাসেট বাজিয়ে হেলিয়ে দুলিয়ে (ঐ বয়সেই তারা মদ খেতেন কিনা জানা হয়নি) বেড়াতেন। অষ্টম—নবম শ্রেণীতে পড়–য়া ঐ দাদারা তাদের বড়োদের কোন রকম নিয়ন্ত্রণে ছিলেন বলে মনে হতো না। মনে হতো আমাদের থেকে কতো স্বাধীন তারা!
এই শহরে আসার আগে আমার বৈসুর দিনগুলো কিন্তু এমনটি ছিল না। প্রতি বছরের এক একটি বৈসু হতো আমাদের বারোটি মাস ধরে অপেক্ষার শেষ দিন। হারি বৈসুর দিন খুব ভোরে ওঠার প্রতিযোগিতা চলতো গ্রামের শিশু সমাজে। ক্লাস থ্রী থেকে ফাইভ পর্যন্ত সময়টাই আমার কাছে মনে হয় আমার জীবনের স্বর্ণযুগ। সন্ধ্যায় পড়তে বসতাম গৃহশিক্ষকের কাছে। কতো অচেনা গল্প, ছড়া, কবিতা নিজের মতো করে কল্পনার রঙ মেখে মুখস্থ করতাম। কারণ এসব গল্প, ছড়া, কবিতায় ব্যবহৃত অধিকাংশ শব্দেরই অর্থ জানতাম না আমরা। পরীক্ষা থাকলে ভোরেও উঠে পড়তে বসতে হতো। শীতকাল হলে সকালে আগুনের পাশে বসে কতো কি পুড়িয়ে খেতাম! আমার একটা অভ্যাস ছিল। বাবার কাছে সেটি ছিল আমার ‘দুষ্টুমি’। বেলা থাকতে ছুটি হলে অথবা স্কুল ছুটির দিন হলেই গ্রামের পাশের জঙ্গলে বন্ধুরা মিলে ঘুরে বেড়াতাম আমরা। আমার বন্ধুদের সাধারণ ঝোঁক ছিল পাখির বাসা খুঁজে পাখির ছানা ধরা বা ডিম সংগ্রহ করা। অথবা ‘আসার’ গাছ নামের একটি গাছের ফল সংগ্রহ করা, যা ছোট বাঁশের চোঙা দিয়ে তৈরি এক ধরণের ‘খেলনা অস্ত্রের’ গুলি হিসেবে ব্যবহার করা যায়৩। আমার আগ্রহ ছিল ভিন্ন। আমি জঙ্গলময় খুঁজে বেড়াতাম গাছের ছোট ডালপালার চেহারা—সুরত। কোন ডালটি দেখতে ইংরেজি ‘এ’ অক্ষরের মতো বা তার কাছাকাছি, কোন ডালটিকে একটু চেঁছে নিলে লাঙ্গলের মতো দেখাবে, কোনটি দেখতে ঠিক সনাতন ধর্মের মহামন্ত্র ‘ওঁ’ এর মতো। আমরা যারা সেই জঙ্গলে নিয়মিত যেতাম, হারি বৈসুর সকালে আমরাই গ্রামের বন্ধুদের নেতৃত্ব দিতাম সে আমরা পাখির ‘ডিম খোঁজা’ বন্ধু হই কিংবা ‘গাছের ডালে ওঁ খোঁজা’ বন্ধু। কারণ সেই জঙ্গলের প্রতিটি গাছের চেহারা, গন্ধ, ফল, ফুল, উচ্চতা আমাদের মুখস্থ ছিল। মহানন্দে আমাদের কিশোরবাহিনী সুগন্ধি সব ফুল তুলে এনে খুব সকালে আমাদের পাড়া থেকে প্রায় এক কিলোমিটারের কাছাকাছি নিচে অবস্থিত ছড়ায় যেতাম। কারণ আমাদের পাড়া একটি উঁচু পাহাড়ের উপর অবস্থিত। ছড়ায় গিয়ে গঙ্গাদেবীর স্তুতি করে প্রাণভরে আর্শীবাদ চাইতাম। কি কি আশীর্বাদ চাইতাম তার কোনটিই আজ আর মনে নেই। সম্ভবত মূখ্য চাওয়া ছিল পড়ালেখা যাতে ভালো হয়। ছড়া থেকে ফিরেই আমরা পেতাম আমাদের বড়োজনরা ছোট্ট কাইস্লিং—এ সাজিয়ে রাখতেন ধান। সেই ধানভরা কাইস্লিং (কোমড়ে বেঁধে নেওয়া যায় এমন এক ঝুড়ি) কোমড়ে বেঁধে নিয়ে গ্রামময় ঘুরে ঘুরে মুরগি ছানাগুলোকে খাবার দিতাম। এতে আমাদের কি পূণ্য হয়, জানতাম না। তবে আনন্দে আমরা এক প্রকার নেচে নেচেই ঘুরে বেড়াতাম। আমাদের শহরের বা শহরতলির শিশুরা কি এই আনন্দ পায়? জানি না। এই প্রশ্নের উত্তর আমার জানা নেই। কারণ ক্লাস সিক্স থেকে আমার গ্রামের সাথে আমার সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার পর থেকে আমি কখনো নিজেও তা করার সুযোগ পাইনি, কাউকে করতেও দেখিনি। কারণ সম্ভবত এই বৈসুর সময়গুলোতে অথবা কাছাকাছি সময়ে হয়তো বা আমাদের পরীক্ষা থাকতো। ধারণা করি এই কারণে আমার গ্রামে যাওয়া হতো না হয়তোবা। হারি বৈসুর আগের দিন গ্রামের শিশুরা ছড়ায় লাইন করে দাঁড়িয়ে বাংলা সাবান দিয়ে পাথরের উপর ঘষে ঘষে দুনিয়ার ময়লা জমে থাকা শার্ট প্যান্ট নিজেরাই ধূয়ে নিতাম। শৈশবে দেখা আমাদের গ্রামের বৈসুর সময়ে গরয়ার দল আসতো বৈসুমা বা তারপরের দিন তথা বাংলা নববর্ষের দিনে। আমরা দল বেঁধে ঘুরে ঘুরে গরয়া নাচ দেখতাম। আমাদের গ্রামের সবার উঠোনে গরয়ার দল নৃত্য পরিবেশন করলেও মাত্র দুইটি পরিবারের উঠোনে গরয়ার বিগ্রহ স্থাপন করা হতো অর্থাৎ মাটিতে পুঁতে ঠিকভাবে বসিয়ে তাকে ঘিরে নাচা হতো। তাঁরা নাকি মাল্যধারী ব্যক্তি। আমাদের ঠাকুরদাদা গ্রামের মাথা এমনকি এলাকার সকলের উপদেষ্টা। কেউ নির্বাচনে দাঁড়ালে কিংবা বড়ো কোন সামাজিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করলে তাঁর মতামত না নিয়ে কিছুই করতো না। কিন্তু আমাদের উঠোনে কোনদিন গরয়ার বিগ্রহটি স্থাপন করা হতো না। খড়্গ দা’টিকে মাটির উপর রেখে তার উপর গরয়া বিগ্রহ একজন খেরেবাই বা গরয়া দলের সদস্য ধরে রাখতো অর্থাৎ মাটিতে তা স্পর্শ করতে পারতো না। তাকে ঘিরেই গরয়ার দল নাচতো। তখন বড়োদের আলোচনা করতে শুনতাম, দেনদাক দফার লোকেরা গরয়া দলে নাচতে পারে না এবং গরয়ার বিগ্রহও স্থাপন করতে পারে না। তাদের মধ্যে কেবল মাল্যধারীরাই তা পারেন। বৈসুর সময়ে আমাদের প্রিয় খাদ্য ছিল পাঁচন ও নানা ধরণের পিঠা। মাঝে মধ্যে কীর্তনদল আসতো আশপাশের বিভিন্ন গ্রাম থেকে। তারা কেউই অবস্থান করতো না। ঘুরে ঘুরে নাম বিলিয়ে চাঁদা তুলে চলে যেতো অন্য পাড়ার দিকে। আমাদের গ্রামের প্রায় সব পুরুষই আধ্যাত্মিক গান গাইতে পারতো। যে কোনদিন স্কুলের চৌকাঠ মাড়ায়নি কিংবা একটি অক্ষরও শিখেনি সে—ও দরাজ কণ্ঠে গাইতো মিলনের গান, বিচ্ছেদের গান, দেহতত্ত্ব কতো কি! যে কোন গানই মুখস্থ জানতো না সেও কণ্ঠ মিলাতে পারতো মূল গায়কের গানের পিছনে গাওয়া সমবেত পুনরাবৃত্তিতে। যে তাও করতে পারতো না সে অন্তত জুড়িটা, কাঁসাটা, বাঁশিটা কিংবা মাদলটা বাজাতে জানতো। কখনও কখনও পাশের পাড়া থেকে লোক সঙ্গীত শিল্পী চলে আসতো। ত্রিপুরাদের নানা দফার মধ্যে কেবল নাইতং, দেনদাক ও কেওয়া এই তিন দফা বা গোত্রের সাথেই আমরা ছোটকালে বেশি পরিচিত ছিলাম। লোক সঙ্গীতে অপ্রতিদ্বন্দ্বী ছিল নাইতং গায়েন কবিরা। মুখে মুখে তারা রচনা করে ফেলতো সময়ের নানা গান। তাদের লোকসঙ্গীত বা পালাগানগুলোতে যুবক—যুবতীর প্রেম, প্রাচীন নানা উপাখ্যান থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে মিজো, পাঠান ও মুক্তিযোদ্ধাদের ভূমিকা পর্যন্ত উঠে আসতো সাবলীলভাবে। অনেক সময় বৈসুর তিন দিন তিন রাত কেরোসিনের হ্যাজাক বাতি জ্বালিয়ে অনবরত চলতো পালাগান। গায়েন কবিদের হৃদয়স্পর্শী নানা বয়ান শুনে তাদের বর্ণনার সাথে তাল মিলিয়ে কখনো হাসি—তামাশা হতো, কখনো কেঁদে উঠতো দর্শকরা। কতো সদ্য বিধবা নারীকে গুমরে গুমরে কাঁদতে দেখেছি গানের এই আসরে! কখনো কখনো এই গানের আসর থেকেই উধাও হয়ে যেতো কোন প্রেমিক যুগল। তিনদিন কিংবা সাতদিনের মাথায় গিয়েই হয়তো জানা যেতো তারা পালিয়ে ঘর বেঁধেছে। লোকগীতিগুলোর মূল চরিত্র লালমতি, রাইবতি, হেমন্ত, সুমন্ত, দংসিদর্প নারান নানা গ্রাম ঘুরে বেড়াতো মানুষের মুখে মুখে।
এখন মোরগের ডাকের পরিবর্তে মোবাইল ফোনের এলার্ম ঘড়ির ডাকেই অধিকাংশ গৃহী মানুষের ঘুম ভাঙ্গে। চাখৈ গুদকের চেয়ে স্যুপ কারি পোলাও কোর্মা—ই প্রিয় আমাদের। মানুষ ও প্রকৃতির মিথস্ক্রিয়া একটি অবধারিত বাস্তবতা। প্রকৃতির গাছ ফুল পাখি আকাশ বাতাস পাহাড় জুম ক্ষেত জুমের পাশ দিয়ে ছুটে চলা চঞ্চল ঝরনা সবকিছুর সাথে আমাদের সম্পর্ক মা ও সন্তানের মতো। আমাদের খাইয়ে পরিয়ে বাঁচিয়ে রাখে প্রকৃতির এসব উপাদান। কিন্তু আমরা ক’জনইবা তাদের এই অবদানকে স্বীকার করি! প্রকৃতির এই অকৃত্রিম দান আমাদের জীবন ও সংস্কৃতির মূল উৎস। আমাদের ভাবনা কাঠামো ও সামাজিক মূল্যবোধ সবকিছুই প্রকৃতির কাছে ঋণগ্রস্ত। কিন্তু এসব প্রাকৃতিক উপাদান কি এখন সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের নিয়ন্ত্রনে আছে? আকাশ, মাটি, পাহাড়, ঝরনা, গাছ গাছালি, পশু—পাখি কোন কিছুই সর্বগ্রাসী বিকিকিনির আগ্রাসন থেকে মুক্ত নয়। মুক্ত নয় মানুষের ভাবনা কাঠামো কিংবা তার মানবিক মূল্যবোধ। সবকিছুই খুব দ্রুতগতিতে অসৎ মানুষের নিয়ন্ত্রনে চলে যাচ্ছে। আজ গাছ, বাঁশ, পাহাড়, মাটি নিয়ে যেমন রাজনীতি হয়, তেমনি হয় বৈসু নিয়ে, বিজু নিয়ে, সাংগ্রাইং নিয়ে, বিষু বিহু নিয়ে, গরয়া নৃত্য নিয়ে, পাংখুং নিয়ে, জুম নৃত্য, পানি ছিটানোর খেলা নিয়ে কিংবা কের পূজা নিয়ে। এখন বানিজ্য ও রাজনীতি যেন সমার্থক। রাজনীতির রঙ্গমঞ্চ যেমন অর্থশালী, বিত্তবান আর চতুর ব্যবসায়ীদের পূর্ণাঙ্গ নেতৃত্বে চলে, তেমনি সহসা ভবের হাটে কেনাবেচা হয় মানুষের মগজ আর অস্থিমজ্জা। সংস্কৃতি পরিবর্তনশীল। গ্রহণ আর বর্জনের মাধ্যমে পারিপার্শ্বিক পরিবেশ ও প্রতিবেশের সাথে অভিযোজনের মধ্য দিয়ে প্রতিনিয়ত এগিয়ে চলে সংস্কৃতি। সংস্কৃতি কখনো এক জায়গায় থেমে থাকে না। তবে হাল আমলের পরিবর্তনগুলো যেন স্বাভাবিকতার চেয়ে একটু বেশিই দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে। পাগলা ঘোড়ার পিঠে চড়ে দুর্বার গতিতে ছুটে চলা এই অসুর সময়ে কোন সংস্কৃতির মৌলিকতা বজায় রাখা এতো বেশি সহজ নয়। পূঁজিকেন্দ্রিক ভোগবাদের সর্বগ্রাসী বাণিজ্যের পসরায় তাই আজ শোভা পায় কচি কাঠের স্তুপ থেকে শুরু করে মানুষের বিবেক পর্যন্ত। উ™£ান্ত এই সময়ে ভাড়ায় পাওয়া যায় মানুষের মন, শরীর, প্রেম, ভালোবাসা। তার মধ্যে সবচেয়ে সস্তা বিকিকিনির বস্তু হলো মানুষের মুখের জবান আর মাথার মগজ।
এখন আর আগের সেই বৈসু নেই, নেই লোক গায়েন কবি। বসে না আর আগের মতো কোন লোক সঙ্গীতের আসর। কারণ সকলে নিজের আখের গোছানোর কাজেই বেশি ব্যস্ত। বাণিজ্যিক এই সময়ের দৃষ্টিতে সমাজ সংস্কৃতির নামে সময় নষ্ট করে নিজের আর্থিক ক্ষতি ডেকে আনা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। কারণ এখন সময়কে মাপা হয় অর্থ দিয়ে। তবে আশার কথা হলো নতুন প্রজন্মের মধ্যেও অনেকে এখন নিজের সমাজ সংস্কৃতি নিয়ে ভাবছে। চেষ্টা করছে নানা উপায়ে নিজেদের সংস্কৃৃতিকে টিকিয়ে রাখার ও বিকাশ ঘটানোর। নিজের সংস্কৃতি যদি নিজেরা ব্যবহার ও চর্চা না করে, তাহলে সে সংস্কৃতির বিকাশ কখনো সম্ভব হয় না। ভোগবাদী মানুষের কাছে সংস্কৃতি কেবল একটি মনোরঞ্জনের উপায় মাত্র। সংস্কৃতি বিষয়ক এই প্রাচীন ধারণার ব্যবচ্ছেদ ঘটানো এখন সময়ের দাবি। ভাঙতে হবে সকল মিথ। মনোরঞ্জনের সীমানা ছাড়িয়ে সংস্কৃতি বিষয়ক আমাদের ভাবনা কাঠামোকে প্রয়োজন অনুসারে পুনর্নিমাণ করতে হবে। তবেই তরান্বিত হবে আমাদের সংস্কৃতির যথাযথ বিকাশ। কারণ সুষ্ঠু সংস্কৃতির নিয়ত চর্চাই সমাজ বিনির্মাণের সবচেয়ে উত্তম উপায়।

Micro Web Technology

আরো দেখুন

লংগদুতে ডেঙ্গু প্রতিরোধে বিএনপি’র প্রচারপত্র বিতরণ

রাঙামাটির লংগদু উপজেলায় ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়া প্রতিরোধে জনসচেতনতামূক প্রচারণা ও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার …

Leave a Reply