নীড় পাতা » পাহাড়ের সংবাদ » বৃক্ষের বুক চিড়ে তরল সোনা

বৃক্ষের বুক চিড়ে তরল সোনা

rabar-01পাহাড়ের বুকে চাষি ব্যস্ত তরল সাদা সোনা আহরণে। ভোরেই হাজির হয়ে গাছের বুকে চিহ্ন এঁকে দিতে হয়। সেই ক্ষত চিহ্ন থেকে বের হয় সোনা। সেই সোনা সংগ্রহে তাঁর নিচে বসাতে হয় পাত্র। যা অনেকটা খেজুর রস সংগ্রহের মতো। কিন্তু এটি সেই খেজুর রসের গল্প নয়, এটি বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাবাবের কাঁচামাল সংগ্রহ। ভোরে বসিয়ে দেওয়া পাত্রে দিনভর ফোঁটা ফোঁটা তরল সোনা বের হতে থাকে। যা ‘সাদা সোনা’ বলে এই অঞ্চলে খ্যাত। এই রস প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে রাবার তৈরি করা হয়। আর এই অঞ্চলে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের রাবার প্রকল্পের মাধ্যমে এই তরল সোনা এখানকার জনসাধারণের আর্থিক সচ্ছলতা এনেছে।

১৯৭৮ সালে ইউএনডিপি ও এডিবির বিশেষজ্ঞগণ পার্বত্য চট্টগ্রামের মৃত্তিকার ওপর এক সমীক্ষা চালান। তারা প্রমাণ করেন যে, এসব অশ্রেণিভুক্ত পাহাড় জমি প্রাকৃতিক রাবার চাষের অনুকূল। পাহাড়ের ফল চাষোপযোগী অশ্রেণিভুক্ত পাহাড় জমির আয়তন ৯.৫ লক্ষ একর। তার মধ্যে ১.৭০ লক্ষ একর রাবার চাষের উপযোগী। এই মূল্যায়নে ১৯৮৪ সালে এডিবি’র অর্থায়নে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড একটি প্রকল্পের মাধ্যমে আট হাজার একর রাবার বাগান গড়ে তোলে। পরে সরকারি অর্থায়নে ১৯৯৪-৯৫ অর্থবছরে আরো চার হাজার একর রাবার বাগানসহ মোট বারো হাজার একর বাগান অশ্রেণিভুক্ত পাহাড়ে গড়ে তোলে। এরপর উক্ত প্রকল্প রাবার বাগান ব্যবস্থাপনা ইউনিট নামে কাঁচা রাবার সীট উৎপাদন করছে। এছাড়া ব্যক্তিবিশেষের উদ্যোগেও পাহাড়ি জমিতে রাবার বাগান গড়ে তোলা হয়েছে। বর্তমানে উন্নয়ন বোর্ড বছরে প্রায় ২৫০ মেট্রিক টন রাবার উৎপাদন করছে। বর্তমানে বাংলাদেশে ২০ হাজার মে.টনেরও বেশি দেশীয় রাবারের চাহিদা থাকলেও বিএফআইডিসি, সিএইচটিডিবি ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান মিলে বছরে উৎপাদন করছে ১২ হাজার মে.টন। এতে চাহিদার অর্ধেকের মতো রাবার বিদেশ থেকে আমদানি করতে হচ্ছে।

তিন পার্বত্য অঞ্চল বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির প্রায় সাড়ে তিন হাজার পরিবার এই পেশার ওপর নির্ভরশীল। পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের উঁচু ভূমি বন্দোবস্তকরণ প্রকল্পের আওতায় একেকটি পরিবারকে ৬ একর ২৫ শতক করে জায়গা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে রাবার প্লান্ট করার জন্য। সেই রাবার প্ল্যান্টে গাছ থেকে কষ সংগ্রহ করার জন্য প্লাস্টিকের ছোট ছোট পাত্র বসাতে হয়। তারপর ফোঁটায় ফোঁটায় জমা হওয়া কষ সংগ্রহ করে বড় পাত্রে ভরা হয়। কষভর্তি পাত্রগুলো কাঁধে করে কয়েক কিলোমিটার উঁচু-নিচু পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে চলাচলের মূল পথ ধরে নিয়ে যেতে হয় নিকটস্থ কারখানায়। সেখানে প্রতিদিনের জমা দেওয়া কষ ওজন করে মূল কষের পরিমাণ নির্ধারণ করে মাস শেষে শ্রমিকদের মজুরি দেওয়া হয়।

রাবার প্লান্টার ও উঁচু ভূমি বন্দোবস্তকরণ প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড প্রতিষ্ঠার পর ১৯৮৩ সালে ভূমিহীন আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন প্রকল্প (বহুমুখী) উঁচু ভূমি বন্দোবস্ত প্রকল্পের মাধ্যমে ৪ একর রাবার চাষ, ২ একর ফলের বাগান ও ২৫ শতক ভূমি বসতভিটার জন্য বন্দোবস্ত দেওয়া হয়। তিন পার্বত্য অঞ্চলের চেঙ্গী, মাইনী, দীঘিনালা, ভাইবোনছড়া, মারিশ্যা, বাঘাইছড়ি, মাটিরাঙা ও কাচালং উপত্যকায় প্রকল্প গ্রাম (যৌথ খামার) সৃষ্টি করে ৩ হাজার ৩০০ পরিবারকে পুনর্বাসন করা হয়। প্রকল্পের অধীনে ১৩ হাজার ২০০ একর রাবার বাগান রয়েছে। রাবার প্রক্রিয়াজাত করার জন্য খাগড়াছড়ির দীঘিনালায় বিদ্যুৎ চালিত একটি, হস্তচালিত দুটি; মাটিরাঙায় বিদ্যুৎ চালিত একটি, হস্তচালিত একটি; খাগড়াছড়ি সদরে বিদ্যুৎ চালিত একটি; বাঘাইছড়িতে বিদ্যুৎ চালিত একটি ও বান্দরবানে বিদ্যুৎ চালিত একটি ও হস্তচালিত একটি- মোট নয়টি রাবার প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা রয়েছে। বাগান থেকে সংগ্রহ করা কষ প্রক্রিয়াজাত করে দৈনিক গড়ে ৪ মেট্রিক টন মাসে প্রায় ১২০ মেট্রিক টন রাবার শিট উৎপাদন করা হয়। উৎপাদিত এ রাবার দরপত্রের মাধ্যমে বিক্রি করা হয়। রাবার বিক্রির ৬০ শতাংশ পান রাবার প্লান্টার, আর ৪০ শতাংশ পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড। ৪০ শতাংশের টাকা দিয়ে উঁচু ভূমি বন্দোবস্তকরণ প্রকল্পের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন দেওয়া হয়।

Micro Web Technology

আরো দেখুন

লংগদুতে ডেঙ্গু প্রতিরোধে বিএনপি’র প্রচারপত্র বিতরণ

রাঙামাটির লংগদু উপজেলায় ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়া প্রতিরোধে জনসচেতনতামূক প্রচারণা ও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার …

Leave a Reply