নীড় পাতা » ফিচার » স্কুলবেলা » বুলেট ভাইয়ের হাইজাম্প

বুলেট ভাইয়ের হাইজাম্প

hijamp-6বুলেট ভাই ঠিক করেছে এবার খেলোয়াড় হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। স্কুলের ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় সবগুলো ইভেন্টে অংশ নেবে, সবাইকে হারাবে। হারিয়ে জানিয়ে দেবে এতদিন তাকে নিয়ে যারা তুচ্ছাতাচ্ছিল্য করেছে তারা সব মুর্খ এবং আহাম্মক। প্রতিযোগিতা শেষে সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার হাতে নিয়ে কীভাবে ছবির জন্য পোজ দেবে সেই প্র্যাকটিসও হয়ে গেছে। ঠিক হয়েছে ছবিটা তুলব আমি। এবং জাহাঙ্গীর ছবিঘর থেকে সেটা ফ্রেম করা হবে।
বুলেট ভাই অবশ্য নিশ্চিত হতে পারছে না। সেরা খেলোয়াড় হওয়া নিয়ে নয়। আমার ছবি তোলা নিয়ে। বলল, “তুই ছবিটা ঠিকঠাক তুলতে পারবি তো? নইলে বল, শহর থেকে বড় ক্যামেরাম্যান নিয়ে আসি। আমার মামাতো ভাই জহির খুব ভালো ছবি তুলতে পারে। না পারলে বল!”
“আমি পারব।”, আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলি। ছবি তোলার ছ-ও জানি না বটে, কিন্তু বুলেট ভাই সেরা খেলোয়াড় হতে পারলে আমি ছবি তুলতে পারব না কেন?
“আমি অবশ্য ভরসা পাচ্ছি না। সব কাজে গোলমাল পাকানো তো তোর অভ্যাস।”
“বললাম তো আমি পারব।”
“আমার সন্দেহ আছে, কিন্তু কী আর করা যাবে, চাচ্ছিস যখন। আমি আবার নতুন প্রতিভা বিকাশের পক্ষে। আমি যদি তোদের সুযোগ না দেই তাহলে দেবেটা কে?!”
“তাও তো ঠিক।”
“তাহলে সেই কথাই রইল।”
“কী কথা?”
“তুই আজ থেকেই ছবি তোলা প্র্যাকটিস শুরু করে দে।”
“কিন’ আমার তো ক্যামেরা নেই।”
“তা তোদের আছে-টা কী? শুধু মুখ ছাড়া তো আর কিছু দেখি না।”
আমার আরও অনেক কিছু আছে। বলার মতো আছে বহু কিছু, কিন্তু বেশি বললে বুলেট ভাই ক্ষেপে যেতে পারে। ক্ষেপে গিয়ে হয়ত আমাদের বাদ দিয়ে একা একাই খেলোয়াড় হতে নামবে। এটা তো আমরা জানিই যে সে একা কোনো কাজ পারে না। কাজেই তার সঙ্গে থাকতে হবে। গোলমালটা সামাল দিতে হবে। তাছাড়া খুব আকর্ষণীয় কিছু ব্যাপারও সে ঘটাবে নিশ্চিত। সেটা কাছ থেকে দেখার লোভও আছে।
তাই বুলেট ভাই-র শত আঁকাবাঁকা কথা সত্বেও আমি রাজি। ‘আমি কিছু পারি না’ ‘কিছু জানি না’ এসব মেনে নিতেও আপত্তি করি না।
সেদিন বিকালেই বুলেট ভাই বাসায় হাজির। আমি তখন বাজারের টাকার হিসাব মেলাচ্ছিলাম। মুরগীর মাংসের কেজি এখন ১৩০ টাকা, এখান থেকে সর্বোচ্চ কত টাকা মেরে দিলে ঝুঁকি নেই সেই জটিল অংকটা করছি। তখন বুলেট ভাইয়ের হানা।
“এই বোকারাম করছিস কী?”
“কিছু টাকা যোগাড়ের চেষ্টা করছি।”
“টাকা কেন?”
“আরে তুমি সেরা খেলোয়াড় হবে। তারপর আমাদের একটা সংবর্ধনা সভার আয়োজন করতে হবে না! স্কুল তো তোমাকে ১২০ টাকা দামের একটা শিল্ড দিয়েই দায়িত্ব শেষ করে ফেলবে।”
“ভালো। খুব ভালো। তোর বুদ্ধি খুলে যাচ্ছে। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে আমি তোর নাম বদলে দেব।”
“বদলে কী রাখবে?”
“বোকারাম থেকে বুদ্ধিরাম।”
“সেটা তো আগেও বলেছিলে। কিন্তু কথা রাখোনি।”
“আগে আর এখন কী এক হল! তোদের এজন্য কোনো উন্নতি হবে না। খালি অতীত নিয়ে পড়ে থাকিস। ভবিষ্যত ভাবতে হবে। এই জাতির উন্নতি হয় না কেন জানিস! খালি পুরনো কাসুন্দি ঘাঁটে।”
“ঠিক আছে এখন থেকে নতুন কাসুন্দি ঘাঁটব।”
“কাজ শুরু করেছিস?”
“কী?”
“ঐ যে ছবি তোলা প্র্যাকটিস। একা তো কোনো কাজ পারিস না। আয় আমি তোকে দেখিয়ে দেই।”
“কিন্তু ক্যামেরা!”
“সেটাও আছে।”
বুলেট ভাই তার পকেট থেকে ছোট্ট একটা ক্যামেরা বের করল।
আমি কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই বলল, “খবরদার প্রশ্ন নয়। এদেশের কেউ কোনো কথার উত্তর দিতে চায় না। খালি প্রশ্ন।”
“কিন’ ক্যামেরা!”
“ধর। এই যে এটাকে বলে শাটার। এভাবে ধরে টিপ দিবি। দাঁড়া এখনই না। আমি গিয়ে জায়গামতো দাঁড়াই। দাঁড়া হাতটা তুলি।”
“বুলেট ভাই হাতটা তুলল। আমাদের ঘরের একটা ফুলদানি নিয়ে সেটাকেই ট্রফি মনে করে দারুণ একটা পোজও দিল। এটা পোস্টার হলে দারুণ মানাত।”
কিছুক্ষণ প্র্যাকটিসের পর চলে যেতে যেতে বলল, “ক্যামেরাটা লুকিয়ে রাখবি। আর যখন কেউ থাকবে না তখন প্র্যাকটিস করবি। মনে রাখিস, এটা যোগাড় করতে আমার অনেক কষ্ট হয়েছে।”
“কিন্তু কার ক্যামেরা?”
“প্রশ্ন নয়। কাজ।”
আমি আর কথা বাড়ালাম না। একটা ক্যামেরা কয়েকদিন আমার জিম্মায় থাকবে-এটা এতই আনন্দের ব্যাপার যে কথা বাড়ালে যদি ক্যামেরার আসল মালিক বেরিয়ে যায়। যদি জানা যায় ক্যামেরাটা চুরি করে আনা! তারচেয়ে চুপ থাকাই ভালো। সমস্যা একটাই- কাউকে গল্পটা বলা যাবে না! এই নিয়ে গর্ব করা যাবে না।
বুলেট ভাই চলে গেলে আমি বারবার ক্যামেরাটা দেখলাম। অকারণে দুটো-একটা টিপ দিলাম। আর খেয়াল করলাম আমার ঘরে দামী জিনিস লুকানোর কোনো জায়গা নেই। ভরসার কথা এটাই যে এই ঘরে কেউ খুব একটা আসে না। তাই খাটের নীচে পুরনো বই রাখার ট্রাংকে লুকিয়ে চলে খেলাম মাঠে। মাঠে গিয়ে খেলার ফাঁকে বারবার মনে পড়তে থাকল ক্যামেরাটার কথা। কেউ নিয়ে যায়নি তো! এমনিতে আমার চেষ্টা থাকে খেলা যতক্ষণ সম্ভব গড়ানো, মাগরেবের আজান পড়লে আমি বলি, “মুয়াজজিন ভুল করে আগে আজান দিয়ে ফেলেছে। আরও কিছুক্ষণ খেলি। আরেকটা ওভার খেলা যাবে।” কিন্তু আজ আমি বারবার অপেক্ষা করতে থাকলাম, কখন আজান দেবে? মুয়াজজিন সাহেব কি আজান দিতে ভুলে গেলেন নাকি? দুর!
বুলেট ভাই ফেরার পথে ফিসফিস করে বলল, “গিয়েই একটু প্র্যাকটিস করবি! আমি ভেবে দেখলাম শুধু সেরা খেলোয়াড় হওয়ার পরের ছবিটা তুললে হবে না। ওটা তো সবাই তুলবে। তুই খেলা চলাকালীন ছবিও তুলবি। ধর, আমি দৌড়াচ্ছি, লাফ দিচ্ছি-এসব ছবিও থাকতে হবে। পুরস্কার পেয়ে দেঁতো হাসি হাসছে-এসব ছবির দিন শেষ। এখন চাই লাইভলি ছবি। ছবিতে প্রাণ থাকতে হবে।”

বুলেট ভাই নাম লেখাল সবগুলো ইভেন্টে। ১০০ মিটার থেকে শুরু করে ১৫০০ মিটার। হাইজাম্প, লংজাম্পও বাদ দিল না। ভেবেছিলাম গেমস টিচার আশরাফ স্যার হা-রে-রে-রে করে উঠবেন, কিন্তু তিনি নির্বিকার। বললেন, “এটা খুব ভালো কথা যে আমাদের কেউ একজন সাহস করে সবগুলো ইভেন্টে নাম লেখাচ্ছে। খেলায় জিততে সাহস লাগে না, অংশ নিতে সাহস লাগে!”
“ব্যাপার কী!”
বুলেট ভাই বলল, “স্যারের সঙ্গে কাল আমার কথা হয়েছে।”
“কী কথা?”
স্যারকে মনে করিয়ে দিয়েছি গতবারের কথা।
তা সেটা মনে হলে স্যারের অবশ্য আপত্তি করার কথা নয়। গতবার পর্যন্তু বুলেট ভাই ছিল দর্শক। দর্শক হয়ে যে যন্ত্রণা করেছেন স্যার সেটার ভয়েই এবার তাকে খেলোয়াড় হিসেবে মেনে নিয়েছেন। গতবার প্রতিযোগিতার দিন বুলেট ভাই একটা পুরনো টিন নিয়ে এসেছিল মাঠে, সঙ্গে একটা কাঠের টুকরা। তারপর সারাদিন টিনে কাঠ পিটিয়ে যেসব গান গেয়েছিল তার একটা ছিল আশরাফ স্যারকে নিয়ে। একটা হিন্দি গানের প্যারোডিতে আশরাফ স্যারের নাম এসেছিল। স্যার হাঁটেন নাচের ভঙ্গি করে, তার দিকে সুষ্পষ্ট ইঙ্গিত করে গাওয়া গান, শুনে তিনি ক্ষেপে আগুন হয়ে গিয়েছিলেন। হেড স্যারকে গিয়ে বললেন, “স্যার এই ফেল্টুটাকে এবার স্কুল থেকে বের না করে দিলে আমি থাকব না।”
গানটা এত চমৎকার হয়েছিল যে আমি খেয়াল করেছি হেড স্যারও মুচকি-মুচকি হেসেছেন। স্যার তাই ঠাণ্ডা মাথায় বললেন, “এত রাগ করলে হবে আশরাফ সাহেব। এটা তো একটা প্রতিভার ব্যাপার!”
“আমাকে ব্যঙ্গ করে গান গাইছে আর এর মধ্যে আপনি প্রতিভা দেখলেন!”
“আপনাকে ব্যঙ্গ করছে কোথায়? গানে যেরকম বলল, একজন স্যার কিছুই পারেন না, খালি চাপা মারেন, আপনি কি সেরকম নাকি?”
পৌরনীতির দেলোয়ার স্যার ঠোঁট উল্টিয়ে বলেন, “এরকম হলে তো আপনাকেই বহিষ্কার করা উচিত।”
এরপর আর আশরাফ স্যার কথা বাড়াননি। কিন্তু কথাটা তার মাথায় রয়ে গেছে। কাজেই এবার বুলেট ভাই যখন দৌড়াতে চায় তখন তো তার খুশিই হওয়ার কথা। খেলোয়াড় হলে নিশ্চয়ই টিন বাজিয়ে গান গাইতে পারবে না। তাকে দৌড়াতে হবে। আর সেটা ঠিকঠাক না পারলে তার শাসনের সুযোগ আছে। স্যার তাই রাজি। সব ইভেন্টেই বুলেট ভাই অংশ নেবে। দৌড়-লাফ-ধাপ-ঝাঁপ সবকিছুতে।

প্রথম ইভেন্ট ছিল হাইজাম্প। হাইজাম্পের নিয়মটা হলো একেবারে শুরুতে একটা ন্যুনতম উচ্চতা ঠিক করে দেয়া হয়, যেটা সব প্রতিযোগী পেরোতে পারার কথা। উচ্চতাটা ঠিক হয়েছিল ৪ ফুট। বুলেট ভাই আপত্তি করে বলল, “৪ ফুট তো বাচ্চাদের উচ্চতা। আমাদের শুরু হোক সাড়ে ৪ ফুট থেকে।”
কিন্তু অন্যরা তাতে রাজি নয়। বুলেট ভাইও সাড়ে ৪ ফুটের নীচের উচ্চতায় লাফ দিয়ে নিজেকে বাচ্চাদের স্তরে নামাতে রাজি নয়।
আশরাফ স্যার বুলেট ভাইয়ের পক্ষ নিয়ে বেশ হম্বিতম্বি করলেন। “কিচ্ছু পারে না” “বানরের দল”- বলে গালাগালিও করলেন কিছু। পরে ঠিক হল, অন্যরা ৪ ফুট থেকেই লাফানো শুরু করবে, বুলেট ভাই শুরু করবেন সাড়ে ৪ ফুট থেকে।
বুলেট ভাই আমাদের দিকে তাকিয়ে জয়ের হাসি হাসল।

আমরা তখন এর ভেতরের ব্যাপারটা ধরতে পারলাম না। পারলাম একটু পরে। যখন দেখলাম সাড়ে ৪ ফুট আসতে আসতেই ১০ প্রতিযোগীর ৮ জন বাদ পড়ে গেছে। মানে সাড়ে ৪ ফুটের জন্য লাফ দেবে দুজন। এর একজন ক্লাস টেনের রহিম ভাই, বুলেট ভাইয়ের এক বছর জুনিয়র, কিন্তু বুলেট ভাই ক্লাস সিক্স থেকে প্রতি বছর একবার করে ফেল করায় রহিম ভাই টেনে, বুলেট ভাই এখনও আমাদের সঙ্গে ক্লাস এইটে।
চরম উত্তেজনা। একটা লাফ দিয়েই বুলেট ভাই স্কুলের হাইজাম্প চ্যাম্পিয়ন হয়ে যাবে। আমরা হাততালি দিচ্ছি আকাশ-বাতাস ফাটিয়ে। ঠিক হলো, প্রথমে রহিম ভাই জাম্প দেবে। মানে সে যদি না পারে এবং তার পরের লাফে বুলেট ভাই পেরিয়ে যায় তাহলে বুলেট ভাই-ই সেরা।
রহিম ভাই দৌড় শুরু করল। দেখলাম তার ক্লাসমেটরা ছাড়া সবাই তার বিরুদ্ধে। বুলেট ভাই ফেল করে বটে, স্যারদের বিপাকে ফেলে, তবু তার আকার-প্রকারে যে একটা আকর্ষণীয় ব্যাপার আছে সেজন্য আজ সবাই বুলেট ভাইয়ের পক্ষে।
রহিম ভাই লাফ দিল। আর পেরোনোর সময় পায়ে লেগে জাম্পের ওপরের বারটা পড়ে গেল। তার মানে সে পেরোতে পারেনি।
এবার বুলেট ভাই। লাফ দিয়ে পেরোলেই হয়।
বুলেট ভাইয়ের খেলোয়াড়ি প্রতিভার সঙ্গে আমাদের কোনো পরিচয় নেই। ফুটবলে যার-তার পায়ে লাথি মারে বলে তাকে আমরা রেফারি বানিয়ে দিয়েছি, ক্রিকেটে সে আম্পায়ার, কোনো মাঠেই তাকে কোনো কৃতিত্ব দেখাতে দেখিনি, তাছাড়া যে শরীর তা খেলার উপযুক্ত নয় একটুও, তবু কেন যেন ভরসা পাই। বুলেট ভাইয়ের মধ্যে তো এমন অনেক কিছু আছে যা কোনো না কোনো সময় আমরা প্রথম আবিষ্কার করি। হয়ত সে পারবে। না হলে এমন আত্মবিশ্বাসে আমাকে ক্যামেরা দিয়েছে কেন? নিশ্চয়ই পারবে। স্কুলের স্যাররা পর্যন্তু তার হয়ে হাততালি দিচ্ছেন।
বুলেট ভাই দৌড় শুরু করল। খুবই হাস্যকর ভঙ্গির দৌড়। হাইজাম্প বা লংজাম্প দিতে হলে একটা সময় এসে দৌড়ের গতি বাড়াতে হয়, তার জোরেই দূরত্ব পেরোয় সবাই, কিন্তু বুলেট ভাই যেন জগিং করছে এমন হেলে-দুলে দৌড়াচ্ছে।
আমি অবশ্য আমার দায়িত্ব ভুলিনি। ছবি তোলার জন্য পজিশন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। ক্যামেরাটা নিয়ে একটু সমস্যা অবশ্য হয়েছে। আমি প্রথম যখন বের করি তখন বুলেট ভাইয়ের বাবা এসে জানতে চাইলেন, “এটা আমি কোথায় পেলাম! মিথ্যা করে বলেছি, আমার এক খালাত ভাই বিদেশ থেকে আমাকে পাঠিয়েছে।”
তিনি ক্যামেরাটা ভালো করে দেখে বললেন, “ঠিক আছে ছবি ওঠাও। পরে কথা বলব।”
জানা গেল, “বুলেট ভাইয়ের মামা তাদের বাড়িতে বেড়াতে এসে এরকম একটা ক্যামেরা হারিয়ে ফেলেছিলেন।”
তার মানে সন্ধ্যায়ই আমি ক্যামেরা-চোর হিসেবে মার খেতে পারি, কিন্তু বুলেট ভাই খেলায় জিতলে নিশ্চয়ই কিছু একটা ব্যবস্থা করে ফেলবে।
কাজেই টেনশন ভুলে আমি জায়গামতো দাঁড়াই। বুলেট ভাই যখন লাফটা দেবে তখনই ধরতে হবে। একেবারে লাইভ ছবি।
বুলেট ভাই লাফ দিচ্ছে। আমি ক্যামেরা টিপলাম। এবং ক্যামেরার ফোকাসে দেখলাম লাফটা উপরের দিকে না দিয়ে বুলেট ভাই উল্টা ঘুরে দৌড় দিল। ঠিক যে সময় সে উচ্চতাটা দেখে ভয় পেয়ে উল্টা ঘুরে পালাচ্ছে সেই মুহূর্তের ছবিটা সি’র হয়ে গেছে ক্যামেরায়।
বুলেট ভাই সেই যে উল্টা ঘুরে দৌড় শুরু করল সেই দৌড় কোথায় শেষ হয়েছিল সে সম্পর্কে কেউ নিশ্চিত নয়। কেউ বলে বাড়িতে ঢুকে কম্বলের নীচ পর্যন্ত। কারো মতে, শহর ছেড়ে বাইরে গিয়ে তবেই থেমেছিল, যেখানে চেনা কেউ তাকে দেখবে না।

কাজেই বুলেট ভাইয়ের পুরষ্কার পাওয়া হলো না। পুরস্কার পেলাম আমি। দিন কয়েক পর আমাদের স্কুলের ছবি তোলা প্রতিযোগিতায় আমি সবার উৎসাহে ছবিটা জমা দিলাম। প্রতিযোগিতার বিচারক হিসেবে এসেছিলেন শহরের স্বনামধন্য ফটোগ্রাফার আজফার ভাই, তিনি ছবি দেখে বললেন, “সত্যি বলছেন এটা আপানাদের স্কুলের ক্লাস এইটের একটা ছেলের ছবি! কোথায় তাকে ডাকুন। আমার বিশ্বাস হচ্ছে না।”
বিশ্বাস হওয়ার কথা না। অসাধারণ ছবি হয়েছে। নিজের বলে বাড়িয়ে বলছি না, সত্যিই অসাধারণ। জাহাঙ্গীর ছবিঘর থেকে বাঁধাই করার পর দেখে তো আমার নিজেরই মনে হচ্ছিল ঢাকার কোনো চিত্র প্রদর্শনীর ছবি।
আমাকে পুরষ্কৃত করা হলো। আজফার ভাই আমার মধ্যে আন্তর্জাতিক মাপের ফটোগ্রাফারের ভবিষ্যত আবিষ্কার করে প্রতিভাকে বিকশিত হতে দেয়ার জন্য দেশ ও দশের প্রতি আহ্বান জানালেন। প্রতিভার মূল্য, ভবিষ্যত, দেশের তরুণ সমাজ এসব নিয়ে তিনি জ্ঞানগর্ভ অনেক কথা বললেন আর সুধীজনেরা খুব হাততালি দিল।
পুরস্কার একটা বুলেট ভাইও আমাকে দিলেন। সেই ক্যামেরাটা। সেদিন রাতেই ক্যামেরাটা বুলেট ভাইয়ের বাবা আমার কাছ থেকে নিয়ে গিয়েছিলেন, পরে শুনেছিলাম সেটা তার মামার কাছে ফেরতও পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। বুলেট ভাই সন্ধ্যায় বাসায় এসে ক্যামেরাটা আমার হাতে দিয়ে বলল, “নে। এই তোর জিনিস!”
বুলেট ভাইয়ের বাবা ক্যামেরা নেয়ার সময় কড়া কয়েকটা কথা শুনিয়েছিলেন। আমি বললাম, “তোমার ক্যামেরা তোমার কাছে থাক। তোমার বাবা…”
“আরে। এটা বাবার ক্যামেরা নাকি! আমি মামাকে খবরটা জানিয়ে বলেছিলাম, এই ক্যামেরা এখন তোরই পাওয়া উচিত। মামা সঙ্গে সঙ্গে পাঠিয়ে দিয়েছেন। নে। ধর।”
তারপর একটু গলা বদলে বলল, “আরে আমি কি দৌড়-ঝাঁপ এসব পারি নাকি! এগুলো তো চোর-বাটপারের কারবার। মানুষের ভয়ে দৌড়াতে হয় চোরকে। পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে লাফ দিতে হয় ডাকাতকে। আমি তো এই প্রতিযোগিতায় অংশই নিয়েছিলাম তোর প্রতিভাটা সবাইকে জানানোর জন্য। অন্যরা বুঝবে না, তুই নিশ্চয়ই বুঝতে পারছিস?”
“পারছি।”
“তুই হাসছিস কেন?”
“বাহ! তুমি এমন মহামূল্য একটা জিনিস উপহার দিলে। খুশি হয়েছি। হাসব না।”“
“তাহলে ঠিক আছে। আমি আবার ভেবেছিলাম তুই আমার কথাটা বিশ্বাস না করে হাসছিস।”
“কী বলো! তোমার কথা বিশ্বাস করবো না!”
“তাহলে একটু সবাইকে বলিস আর কী!”

Micro Web Technology

আরো দেখুন

আমার আমি

আমি হলাম জয়া করি নানান ক্রিয়া ইংরেজীতে এক্সপার্ট তাই সবাইকে দেখায় পার্ট গান করতে লাগে …

Leave a Reply